শ্রাবণ মাস, বাংলার “কাচাঁ দেবতা” মনসা ও আয়ুর্বেদ প্রসঙ্গ

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    প্রাচীন সর্পপুজো কালক্রমে পরিণত হয়েছে আজকের মনসা পুজোয়। আর্যাবর্তে অর্থাৎ উত্তর ভারতে ঋষি বংশোদ্ভূত ব‍্যক্তিদের নামে ছিল গোত্র গ্রহণের রীতি, কিন্তু আর্য সীমার বাইরে বৃহত্তর অনার্য সমাজে প্রচলিত ছিল টোটেমবাদ। ঐতরেয় আরণ্যকে পূর্ব ভারতের অনার্য জনগোষ্ঠীকে বলা হয়েছে, “বায়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চেরপদা:”, অর্থাৎ বঙ্গ, মগধ ও দক্ষিণ ভারতের চের রাজ‍্যের মানুষজন হলো পাখি বা যাযাবর। “বায়াংসি” মানে পাখি। যাদের টোটেম ছিল পাখি, এখানে সেই সব উপজাতি মানুষদের কথাই অবজ্ঞার সঙ্গে বলা হয়েছে। রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালেখতে “নাগ” জাতির কথা উল্লিখিত রয়েছে ( তথ্য সূত্র : Epigraphica India, XVI, page-24 )। এই নাগ জাতির মানুষেরা ঐতিহাসিক যুগেও বহুদিন নিজেদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা বজায় রেখে রাজত্ব করেছেন। মগধের শিশুনাগ বংশ তার প্রমাণ। প্রাচীন অনেক জাতির মধ্যেই কচ্ছপ, সাপ, কুকুর, ময়ূর প্রভৃতি টোটেম প্রচলিত ছিল। এরমধ্যে যে জাতিগোষ্ঠীর টোটেম ছিল সাপ, তারা সাপের পুজোই করতো। শুধু নাগ জাতিই নয়, বাংলায় “বিষবৈদ‍্য” নামে একটি কবিরাজ শ্রেণি ছিল, যাদের কাজ ছিল বিভিন্ন বিষধর সাপের বিষ থেকে জীবনদায়ী ওষুধ তৈরি করা। এদের সবার কাছেই সাপ ছিল দেবতাস্বরূপ। অন‍্যদিকে, যারা খাল-বিল-নদী-পুকুরে মাছ ধরতে যান, সেইসব কেওট বা ধীবর, মাল, বাগ্দী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও ব‍্যাপকভাবে সাপের দেবী মনসার পুজোর প্রচলন আছে। জল-জঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যেমন সাপ, তেমনি এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধীবর-মাল-বাগ্দী প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর জীবিকা। তাই মনসা তাদের ঘরে ঘরে পূজিতা হোন। তাদের ঘরের মেয়েদের মধ্যে বহুল প্রচলিত “মনসা” নাম।                                             “মনসা” নামটি বাংলায় এসেছে সেনযুগে। কারণ, তখন থেকেই “মনসা মঙ্গল” ( বিজয়গুপ্ত), “পদ্মাপুরাণ”  প্রভৃতি মনসা বিষয়ক মঙ্গল কাব‍্যগুলি রচিত হতে থাকে। মনসা শিবের কন‍্যা। চাদ সদাগর ছিলেন মঙ্গলকাব‍্যযুগের একজন গণ‍্যমান‍্য প্রতিষ্ঠিত ব‍্যক্তি। তাই ব্রাত‍্যজনগোষ্ঠীর সীমানা ছাড়িয়ে সমাজের অভিজাত মহলে মনসা পুজো প্রচলনের জন‍্য চাদ সদাগরের সাহায্য দরকার ছিল।                                                          বাংলার মাঠে-ঘাটে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র সাপের দেখা মেলে। আর সর্পদংশনের আতঙ্ক মানুষের মধ্যে যথেষ্ট আছে। তাই সাপের দেবী লোকমুখে হয়েছেন, “কাচাঁ দেবতা।” জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমীহ করেন এই দেবীকে। জল-জঙ্গলের দেশ পূর্ববঙ্গে মনসা পুজো বেশি প্রচলিত হলেও এই বাংলায় তা নেহাৎ কম নয়। বাংলায় দু’বার মনসা পুজো হয় আনুষ্ঠানিকভাবে, এক, শ্রাবণ মাসে শাওডালী মনসা পুজো। প্রধানত ধীবর সম্প্রদায়ের মধ্যেই এই পুজো বেশি প্রচলিত। তবে এর বাইরে চাদসি চিকিৎসক ও হাড়ি সম্প্রদায়ের মধ‍্যেও এই পুজোর প্রচলন আছে। অন‍্যদিকে, আরেকটি মনসা পুজো হয় ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন “বগা পঞ্চমী” তিথিতে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে। এটি প্রধানত মাল,বাগ্দী ও বাউরী সম্প্রদায়ের পুজো। এ পুজোয় পুরোহিত লাগে না, নিজেরাই পুজো করেন। লাগে না কোনো মূর্তিও।  পারিবারিক মনসা থানগুলিতে বহু আগে থেকেই এলাকার সহজলভ্য পাথরকেই তেল-সিন্দুর মাখিয়ে দেবীর প্রতীক তৈরি করা হয়েছে, সেই পাথর-প্রতীকেই পুজো হয়।                                          মনসা পুজোর আকর্ষণ মনসা-মঙ্গল গান আর “বারি” অর্থাৎ স্থানীয় পুকুর বা জলাশয় থেকে ঘটে জল ভরতে আসা-যাওয়ার পথে সম্মীলিতভাবে “শাখি কাটা।” এটি আসলে দেবী মনসার মাহাত্ম্য বর্ণনা। “বারি” আনতে শোভাযাত্রায় বহু মানুষ সামিল হোন এবং প্রবীণ ব‍্যক্তিরা পাল্লা দিয়ে “শাখি কাটেন।”                                ভারতীয় আয়ূর্বেদ অনুসারে এক ধরণের উৎকট ব‍্যাধির নাম “মনসা।” শৈবসিদ্ধান্ত তন্ত্রে বলা হচ্ছে,  ” জিহ্বা মৌঢ‍্য-শিরোদাহ-ভ্রমোন্মাদ-অরুচি-জ্বরৈ:।/ শ্বাস-হিক্কাক্ষিতাপৈশ্চ দানীয়াৎ মনসাং ভিষক্ ।।” অর্থাৎ যে রোগে রোগির জিবের স্বাদ নষ্ট হয়, মাথা ব‍্যথা, ভ্রম, পাগলামি, অরুচি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, হিক্কা, চোখ হয়ে ওঠে গরম, সেই উৎকট রোগের নাম “মনসা।” এই রোগের রোগির ঘরে সাপের খোলস দিয়ে ধূপ দেওয়ার ব‍্যবস্থা দেওয়া হয়েছে আমাদের দেশের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে। উক্ত শৈবসিদ্ধান্ত তন্ত্রে বলা হয়েছে, ” সর্পত্বক লশুনং মূর্বা সর্ষপারিষ্ট পল্লিবে:। / খ‍্যাত: মনসা জুষ্টস‍্য ধূপোইয়ং পর্বতাত্মজে।।” অর্থাৎ মনসা ব‍্যাধির প্রতিকারের জন‍্য সাপের খোলস, রসুন, মূর্বা, সর্ষে ও নিমপাতার ধূপ অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া “মনসা” নামে একপ্রকার গাছ আছে গ্রাম-বাংলায়। দশহরা গঙ্গা পুজোর দিন গৃহস্থের ঘরে একটি মনসা গাছের ডাল পুতে তার গায়ে দুধ ঢেলে পুজো করা হয়। তারপর দুর্গাপুজোর দশমীর দিন পুনরায় পুজোর পর সেই ডালটি মাথায় করে নিয়ে গিয়ে  কাছের কোনো জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। আসলে আয়ুর্বেদ অনুসারে এই মনসা গাছের শিকড় সাপের কামড়ের জীবনদায়ী ওষুধ। তাই মনসা গাছকে দেবতাজ্ঞানে পুজো করার রীতি বহুকাল ধরে চলে আসছে আমাদের দেশে এবং এখনও চলছে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here