শিকারসেঁদরাকথা (তৃতীয়পর্ব)

    0

    Last Updated on

    দুর্গেশনন্দিনী

    অকয় মায় চিয়ায়া হো বির বিসম দ?
    অকয় মায় দহয় হো আতোরে পাঁয়রি?
    মারাং বুরুয়া চিয়ারা হো বির দিশম দ,
    জাহের এরায় দহয় হো আতোরে পাঁয়রি।

    দিহিরির পর শিকার যাত্রার দিন ভোরবেলা গাঁয়ের শিকারীরা সকল সংস্কার নিয়ম পালন করে গ্রামের দেবী জাহের থানে এসে উপস্থিত হন।এদিকে পুরোহিত মশাই জাহের থানে গিয়ে দেবতাদের স্মরণ করেন যাতে দেবতারা তাদের মাঝে উপস্থিত হন।এখানে একটা কথা বলে রাখি আদিতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর এত বোঙ্গাবুরু ছিল না,তারা একমাত্র ঠাকুর – জিউরই সেবা করত।তাদের ধারনাই তিনি সৃষ্টিকর্তা- জগদীশ্বর। এখনও অনেকেই মাঝে মাঝে চান্দো বোঙ্গা বলে সেই ঠাকুরকেই স্মরণ করে।

    গ্রাম ছাড়ার পর তাঁরা পূর্ব নির্ধারিত স্থানে এসে উপস্থিত হন। একটি গ্রামের শিকারীদের নিয়ে সাধারণত একটা দল হয় । সমস্ত দল এসে উপস্থিত হতে হতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। ফলে সবাইকে রাত কাটাতে হয়। তবে তার প্রয়োজনও থাকে । হ্যাঁ সামাজিক প্রয়োজন । একসঙ্গে রাত কাটাবার ফলে পরস্পরের পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতার একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে । তাছাড়া আত্মীয় বাড়ির ভালো-মন্দ খবর ইত্যাদির খুব সহজেই পাওয়া যায় । তার থেকে বড় কথা হল যে অরণ্যে স্বীকার করবে তার একটা প্রাথমিক ধারণা অভিজ্ঞদের কাছ থেকে নতুনরা লাভ করেন । শিকারের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। তেমনি বেশ গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয় আত্মরক্ষার বিভিন্ন কৌশল। এখানে আবার অভিজ্ঞ লোক দিয়ে হাতিয়ার গুলিকে পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয় ।

    প্রাথমিক পরিচয় ও আলোচনা সাঙ্গ হলে সঙ্গের “#পটকাদাকা” অর্থাৎ শালপাতায় মোড়া ভাত থাকলে পরস্পর ভাগ করে খান। সে রাতে কোন রান্নার ব্যবস্থা থাকে না ।পরের দিন দিহিরি বা দিহরির নির্দেশে এক একটি দল অরণ্যে প্রবেশ করেন। সব দলেই অভিজ্ঞ লোক থাকেন। দুপুর থেকেই সূচিত হয় #দুপুড়ুপটাডি মূল শিকার পর্ব। প্রত্যেকটি শিকারীর দলে দুটি অংশ #সেঁদরা এবং #কারকা। দলের সামনের সারিতে যাঁরা থাকেন তাদের বলে #সেঁদরা, এরাই মূলত শিকারী। এদের পিছনে আরেকটি দল থাকে । এদের দায়িত্ব সবকিছু বহন করে নিয়ে অনুসরণ করা। এদের বলা হয় #কারকা। তবে প্রয়োজনে এরাও হাতিয়ার নিয়ে শিকার করে থাকেন।

    একটা সময় শিকার আনন্দের বিষয় হলেও আদিম কালে নিছক আনন্দ করার বিষয় মাত্র ছিলনা। জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে শিকার যেমন ছিল আদিমের নিকট অপরিহার্য তেমনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ । পাহাড়, গিরিখাত ঝোপ-জংগলের, বৈচিত্র্যময় নিবিড় অরণ্য , ডুংরি তে গুপ্তঘাতকের মত ওত পেতে বসে থাকতো চিতা ,বাঘ, ভাল্লুক, নেকড়ে, হায়েনা …..এছাড়াও ছিল তৃণভোজী কিন্তু হিংস্র বুনো মোষ, সম্বর হরিণ, বন্য শূকর। এসব প্রাণীর আক্রমণের কতজন শিকার করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই ।

    এক্ষেত্রে একটি কথা বলি…..শিকার কাহিনী গুলিতে নানা জীবজন্তুর উল্লেখ থাকলেও হাতি শিকার এর কাহিনী শোনা যায় না। অতি প্রাচীনকাল থেকে হাতিকে দেবতা হিসাবে মান্য করে এসেছে সাঁওতালি সমাজ ।তাই #হাতি_ঠাকুর শব্দটি তাদের সমাজে বিশেষভাবে প্রচলিত । কি কেমন সব লৌকিক, বৈদিক , পৌরাণিক মিলে মিশে এক দেহে লীন হচ্ছে না?

    এই শিকার পর্ব একদিন হতে পারে আবার পাঁচ থেকে ছয় দিনও হতে পারে। বেশি দিন ধরে চললে তখন অরণ্যের মধ্যে থাকার ব্যবস্থা করতে হয় …সঙ্গে যে খাবার থাকে সবাই ভাগ করে খান। রাতে আগুন জ্বেলে পালা করে বিশ্রাম করেন। সে সময় কারো চোট-আঘাত লাগলেও অরণ্যের ভেষজ ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এমনি করেই হয়তো শিকারিদের হাত ধরে ভেষজ ঔষধ প্রসারিত হয়েছিল…..

    শিকারের সময় প্রতিটি শিকারীকে সর্বদা চোখ-কান খোলা রাখতে হত । সামান্য ভুলে কিংবা মুহূর্তের অন্যমনস্কতার প্রাণ যাওয়া বিচিত্র ব্যাপার ছিল না । তাই যতইচোখ কান খোলা রাখুক , দক্ষতা ক্ষমতা থাকুক, তবুও বিপদ এড়ানো যেত না। তাই সেই যে আগের পর্বে বলেছিলাম, শিকারী যতদিন ফিরে না আসেন কোন উৎসব হতোনা। বধূরা সিঁথিতে সিঁদুর ধারণ করতেন না । সেই নিয়ম আজও পালিত হয় সমান ভাবে ও কঠোর ভাবে….

    গভীর অরণ্যের মধ্যে হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে যদি কেউ প্রাণ হারাতেন তাহলে মৃত দেহকে বনের মধ্যে সমাধিস্থ করা হতো । তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে নিকট আত্মীয়কে দিয়ে মুখাগ্নি করে একটি ডাল চাপা দিয়ে চলে যেতেন । অন্যান্য দল এই পথ ধরে এলে তাঁরাও ডাল চাপা দিয়ে চলে যেতেন। এই অবস্থায় অধিক সময় ধরে শোক প্রকাশের অবকাশ যে থাকে না। গ্রামেও ফেরা সম্ভব হয় না….

    এমনি করে পাঁচ সাতদিন বনে বনে শিকার শেষে সাঁওতাল শিকারীগন পূর্বনির্ধারিত #সুতানটাডি টে এসে শিকার পর্ব শেষ করেন। তারপরে শুরু হয় শিকার উৎসব। #সুতানটাডি প্রকৃতপক্ষে শিকার অনুষ্ঠান উৎসবের আকার ধারণ করে…

    (ক্রমশ)

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here