সেকুলারিজম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা : ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত

    0

    Last Updated on

    শ্রী দেবীপ্রসাদ রায়

    স্বাধীন ভারত যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৫০ সালে গৃহীত সংবিধানের উদ্দেশিকা(Preamble) অনুযায়ী, স্বাধীন, সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে যে রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায় নিশ্চিত করবে, চিন্তা, বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা প্রদান করবে এবং আত্মমর্য্যাদা ও জাতীয় ঐক্যকে নিশ্চিত করার জন্য সৌভ্রাতৃত্বের পথ অনুসরণ করবে। সেকুলারিজম – এর কোনো কথা তখন সংবিধানে ছিল না। ছাব্বিশ বছর পর বিয়াল্লিশতম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সোভারিনিটি( সার্বভৌমত্ব ) – র পরই ‘সেকুলার’ এবং’সোসালিষ্ট’ শব্দদুটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন এই সংযোজন হল তার কোনো গ্রহণীয় বিশদ ব্যাখ্যা বা বক্তব্য পাওয়া যায় না। বস্তুতপক্ষে প্রাথমিক উদ্দেশিকার ব্যাখ্যায় প্রশাসন ও ধর্মাচরণের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে যথেষ্টভাবে – ছাব্বিশ বছর পরে ‘ সেকুলার ‘ শব্দটির সংযুক্তি উদ্দেশিকা কে সুস্পষ্ট অর্থবোধক কোনো নুতনতর মাত্রা দিতে পারে নি বরং অভিজ্ঞতা বলছে অভাবিত এক বিভ্রান্তির অবকাশ সৃষ্টি করেছে। ‘সোস্যালিস্ট’ শব্দটির অনুপ্রবেশ ও সমান্তরাল অর্থনৈতিক আদর্শের অনুল্লেখে, অস্পষ্ট এবং ঘোলাটে থেকে গেছে। যে সময়ে শব্দ দুটির সংবিধানে সংযোজিত হয়েছে তার সঙ্গে বর্তমান কালের বিশ্পরিস্থিতির তুলনা করল ঐ সংযোজনের তৎকালীন যান্ত্রিকতাও দূর- ভবিষৎ ব্যাপী-উদ্দেশ্যহীনতাই প্রকটিত হয়, বিশেষ করে সোভিয়েত রাশিয়ার বিলুপ্তিতে এবং পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলিতে সোস্যালিজমের দূরাবস্থার নিরিখে। অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারী বলে ঐ শব্দদুটি কে বর্জন করার দাবীও একেবারে অযৌক্তিক – তা মনে হয় না।

    দেখা যাক, ‘ সেকুলার ‘ শব্দটির সংযোজন কতটা অর্থবহ বা তাৎপর্যপূর্ণ হতে পেরেছে আমাদের জাতীয় জীবনে। সেকুলার শব্দ টি বিদেশী ভাষা লাটিন Seculum থেকে নেওয়া। খৃষ্টীয় পরিভাষায় এর অর্থ হল – যা চার্চ সংক্রান্ত নয় বা যাজকীয় নয় – Non ecclasiastical বা Non Religious বা Non Sacred(অপবিত্র), Profane. রোমান ক্যাথলিক চার্চের ধর্মাযাজকদের ভ্রষ্টাচারে ইউরোপের সাধারণ মানুষ যখন উৎপীড়িত, ক্লিষ্ট এবং হতাশাগ্রস্ত তখন চার্চের প্রভাবের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনই রাষ্ট্রীয় আদর্শের ক্ষেত্রে Non ecclesiastical বা সেকুলার ( secular) রাষ্ট্রচিন্তার উদ্ভব ঘটায় যা প্রথমদিকে যতটা না ঈশ্বরবিরোধী ছিল তার চাইতে অনেক বেশী ছিল চার্চবিরোধী। শিক্ষা, সাহিত্য, দর্শন, সমাজ চিন্তায় এই চার্চবিরোধী মানসিকতা শেষ অবধি ঈশ্বর – নিরপেক্ষতায় বা ঈশ্বর বিরোধিতায় উত্তীর্ণ হয়ে ‘secular’ শব্দটিকে একটি রেঁনেশাঁধর্মী মহিমা প্রদান করে। ইতালীতে মেকিয়াভেল্লিই প্রথম রাজনীতিকে ধর্ম বা নীতিশাস্ত্রের আনুগত্য থেকে মুক্ত করার প্রয়াস করেন। সেকুলার বা ধর্মহীন রাষ্ট্রনীতির জন্ম এভাবেই হয় ইউরোপে। কিন্তু এই ‘সেকুলার’ রাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্ট এক অবয়ব পেতে সময় নিয়েছিল বহুমুখী আন্দোলন সম্মৃদ্ধ প্রায় দুই শতাধিক বছর। সেকুলার রাষ্ট্রাদর্শ অনুযায়ী মানুষই সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে তাদের সুখ, শান্তি, নিরাপত্তা ও জাগতিক উন্নতির জন্য, সমাজকে ধারণ করে রাখে ধর্ম নয় – মানুষ রচিত বিধিবিধান ও নীতি – ঈশ্বরের অস্তিত্বই অনাবশ্যক ও অযৌক্তিক। চিন্তার পথ যুক্তির পথ, যুক্তির পথ বিজ্ঞানের পথ, বিজ্ঞানের পথ ই কল্যাণের পথ। চিন্তা করতে সক্ষম, সমস্ত জীব জগতের মধ্যে একমাত্র মানুষ। মানুষ ই সব। সুতরাং ঈশ্বর বা ধর্ম অপ্রাসঙ্গিক। সেকুলার চিন্তার এই হল মূলমন্ত্র, এই হল ভিত্তি। বস্তুবিজ্ঞানভিত্তিক এই রাষ্ট্রাদর্শ, ধর্মকেন্দ্রিক-সংঘর্ষ, যুদ্ধ, খুনোখুনি – ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে একশো ভাগই গ্রহণীয়। কিন্তু আজ বিজ্ঞান প্রযুক্তির অতি দ্রুত এবং অভাবিত উন্নতির যুগেও ধর্ম নিয়ে সংঘাত, বিশেষ বিশেষ ধর্মের অধীনে সমগ্র বিশ্ব কে আনার প্রাতিষ্ঠানিক সুকোশলী প্রয়াস, রক্তক্ষয়ী প্রয়াস ও এখনও বিদ্যমান, কেন? তাহলে কি সেকুলার রাষ্ট্রচিন্তায় অথবা তার রূপায়ণ প্রয়াসে কোনো ‘ দুর্বল ‘ দিক থেকে গেছে? এ প্রশ্নটি আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বব্যাপী ব্যাপক গবেষণা বিষয় হওয়া উচিৎ। একথা প্রায় অনস্বীকার্য যে সেকুলার রাষ্ট্রচিন্তার উদ্ভবের পথ ছিল সঠিক কিন্তু সে চিন্তার বাস্তবায়ণ এবং ব্যপকীকরণ প্রক্রিয়ায় বিবর্তনের ইতিহাসে মানব প্রজাতির মানসিকতার বর্তমান অবস্থানে ধর্ম ও ঈশ্বরচিন্তা প্রভাবের মাত্রার মূল্যায়ন হয় নি ঠিকমতো। যে ধৈর্য্য এবং স্থৈর্য্যের সাথে মানুষের অন্তর্লোকে বিপ্লব ঘটানোর দরকার ছিল তা হতে পারে নি। মানবপ্রজাতির উপর ধর্ম ও ঈশ্বরের প্রভাবের কথা চিন্তা করেই সম্ভবতঃ জন লক, ভলটেয়ার, মন্টেস্কু, ডি এলামবার্ট, রুশো প্রমুখেরা ধর্মহীনতার চাইতে পরধর্মসহিষ্ঞুতার উপর জোর দিয়েছিলেন। স্বয়ং লেলিনও মার্কসীয় আদর্শ গ্রহণ ও তার রূপায়ণের দায়িত্ব নিয়েও বাস্তবতার বিচারে সেকুলার বা ধর্মহীনতার প্রবক্তা হন নি অন্ততঃ তার ১৯০৫ সালের বক্তব্যে তাই মনে হয়। রাশিয়ার জারের কাছে বিপ্লবীদের পেশ করা দাবিগুলির প্রসঙ্গে লেনিন লিখেছিলেন ” The state must not concern itself with rligion ; religious societies must not be connected with the state power. Every one should be absolutely free to process whatever religion he prefers or recognize no religion…. There must be no discrimination whatever in the rights of citizenson religious grounds…. No state grants must be made to ecclesiastic and volentary associations of like minded citizens “. বিপ্লবোত্তর রাশিয়ায় লেলিনের মৃত্যুর আগেই ধর্ম বা ধর্মাচর সম্বন্ধীয় বিধিনিষেধের Non-ecclesiastic পরিকাঠামো তৈরী হয়ে গিয়েছিল। নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্থাপনের পর স্ট্যালিনের নির্দেশে ১৯২৯ সালে গঠিত হল “The League of militant Godless. ” ঈশ্বরহীনতা প্রচারের জন্য স্লোগান চালু হল “The fight for godlessness is fight for socialism.” কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিপুল উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্তরের মানুষের এমনকি দলীয় উচ্চস্তরের মানুষের মনের গভীর থেকে ধর্মের অস্তিত্ব মুছে গেল- এমন টা হল না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বহু নিন্দিত, সমালোচিত জাতীয়তাবাদ তথা স্বদেশভক্তিকে স্থান দিতে হল এবং ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কঠোরতা কে অনেকাংশে শিথিল করতে হল। অর্থাৎ এত তাড়াতাড়ি চাইলেই ধর্মবিহীন বস্তুবিজ্ঞান নির্ভর সমাজ গঠন করা যাবে না – এ সত্য প্রকটিত হল এবং হতে থাকলো। ১৯৫৩ সালের মে মাসে অর্থাৎ স্ট্যালিনের মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যে কট্টর মার্কসবাদী প্রবক্তা সেলপিন ( Komosomol- এর প্রথম সেক্রেটারি) জানান দিলেন “War against religious prejudice is an integral part of the fight for the communist education of the working class, for the education of active and conscientious builders of communism free of any anf all links to the past.” ষাটের দশকে দেখা গেল ‘fight for godlessness’ অতিদ্রুত ক্ষীয়মান, পরিসংখ্যান বলছে শিশুদের মধ্যে ৬০% কে চার্চ ব্যাপটাইজ করেছে-১৫% বিবাহ এবং ৩০% মৃত্যু অনুষ্ঠান চার্চের মতেই সম্পন্ন করা হয়েছে। কট্টরপন্থীরা তথ্য পেল ধর্ম ও ঈশ্বরবিশ্বাসীদের ৭০% ই চল্লিশবয়োসর্ধ, মোট জনসংখ্যার ৬০% যে মহিলারা তাদের ৭০% ই ঈশ্বরবিশ্বাসী।শত চেষ্টা সত্ত্বেও পারিবারিক স্তর থেকে ধর্মাচরণকে, ধর্মবিশ্বাস কে হঠানো গেল না। আর আজ’ গ্লাসনস্ত’, ‘পেরস্ত্রৌইকা’ পেরিয়ে এসে ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের রাশিয়াতে ধর্ম ফিরে এসেছে বিপুলভাবে- লেলিনগ্রাড শহরের নাম হয়েছে সেন্ট পিটাসবার্গ। সেকুলার বা ধর্মহীনতা – দর্শনের এই ঐতিহাসিক পরিণতি প্রত্যক্ষ করেও কেন ‘ সেকুলার’ শব্দটি ভারতীয় সংবিধানে ঢুকে পড়লো – এটি আশ্চর্য্যের বিষয়। পন্ডিত নেহেরু ছাড়া আমাদের সংবিধান প্রণেতারা কেউ ই ‘সেকুলার’ শব্দটিকে আমল ই দেন নি – সংবিধানের আদি উদ্দেশিকায় তা স্পষ্ট হয়ে ই আছে। বস্তুতপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা বা পরধর্মসহিষ্ঞুতার কথাই প্রকারান্তরে স্থান পেয়েছিল। নেহরুর অভিলাষ পূরণের জন্য ই অথবা রাজনৈতিক হিসেবনিকেশ মোতাবেক মার্কসবাদীদের খুশী করার জন্যই এবং সেই সঙ্গে তথাকথিত প্রগতিশীল পরিচয় তুলে ধরতেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সংবিধানের ৪২তম সংশোধন ঘটিয়ে ‘ সেকুলার’ শব্দটি সংবিধানে ঢুকিয়েছিলেন কিনা তা অবশ্যই চর্চার দাবি রাখতে পারে।
    সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে পণ্ডিত নেহেরু ছাড়া আর সবাই উদ্দেশিকায় সন্নিবেশিত প্রতিশ্রুতির মধ্যেই রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহিষ্ঞুতা কে গুরুত্ব দিয়েছিলেন – অবাস্তব বলেই সম্ভবত ধর্মহীনতা বা সেকুলারিজম কে গুরুত্ব দেন নি। ৪২- তম সংশোধনে ‘সেকুলার’ শব্দটি যোগ করার পর ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মসহিষ্ঞুতা এবং ধর্মহীনতার এক বিচিত্র সমাবেশ রাজনৈতিক নেতাদের হাতে সংবিধানকে ইচ্ছামত ভাষ্যপ্রদান করার এক অস্ত্র তুলে দিল। সংবিধানের অন্তর্নিহিত বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিহীন-সামঞ্জস্যহীন বহু ঘটনা ঘটতে লাগলো। ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত এইবার প্রাসঙ্গিকতার মধ্যে এসে যাচ্ছে।
    ১৯৪৯ সালে বাবরি মসজিদে রামলালার মূর্ত্তির অনুপ্রবেশ, সোমনাথ মন্দিরের দ্বার উদ্ঘাটনে রাষ্ট্রীয় প্রধানদের সংযুক্তি, হিন্দু কোডবিল পাশ রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করে- আইনের সাম্যকে অর্থহীন করে তুলে মুসলিম পার্সোনাল ল’এর সংরক্ষণ – শাহবানু মামলায় সুপ্রীম কোর্টের রায়কে রাজনৈতিক স্বার্থে বানচাল করা- এসবই সেকুলারিজমের নামে, ধর্মনিরপেক্ষতা নাম দ্বিচারিতা মাত্র। কিন্তু খুবই দুঃখ এবং পরিতাপের বিষয় এবং উদ্বেগের বিষয়ও এই যে ভারতীয় নাগরিকের একটি অংশ প্রথম পরিচয় হিসেবে ধর্মকেই মুখ্য মনে করে- ভারতীয়তাকে গৌণ মনে করে। এটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মূলে কুঠারাঘাতের তুল্য। কারণ প্রথম অংশের সাথে দ্বিতীয় অংশের সংঘাত অনিবার্য। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবহমান সংঘর্ষের মূল কারণ এটাই। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের এ ব্যাপারে কোনো মাথা ব্যথা নেই- এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় পরিচয় কেএটাই আবছা করে দিচ্ছে আর এই আলো-আঁধারীকেই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারে আগ্রহী রাজনৈতিক নেতারা। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের স্বার্থে কিছু রাজনৈতিক দল তথা নেতা কখনো সেকুলারিজম কে তুলে ধরে, কখনো বা ধর্মনিরপেক্ষতার ধূয়ো তুলে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আশা-আকাঙ্খা ভাবাবেগ কে তুচ্ছ করে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উগ্রতা কে পরোক্ষভাবে প্ররোচনা দিতে থাকলো – রাষ্ট্রের সাধারণ স্বার্থ কে দিয়ে ও একাজ চলতে থাকলো। সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষজন দেখেছে উদ্বেগের সঙ্গে, কীভাবে পশ্চিমবঙ্গ এবংঅন্যান্য সীমান্ত রাজ্যগুলিতেও বহিরাগত মুসলিমরা রাজ্যের জনচিত্রের চরিত্র পাল্টে দিয়েছে – দিচ্ছে – বিশেষ করে আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে অবস্থা ভয়াবহ। বহিরাগত মুসলিমরা যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণে এখানে ঢুকতে বাধ্য হয়েছে এমন সরলীকৃত ব্যাখ্যা যে প্রযোজ্যো নয় পরিকল্পিতভাবে জনচিত্র পাল্টানোর ব্যাপারটি ও আছে যার সঙ্গে প্যান – ইসলামিক জগতের বৃহত্তর স্বার্থ এবং বৈরী পাকিস্তানের কূট অভিসন্ধিও জড়িত – এটি একটি নির্মম এবং অতি বাস্তব সত্য। আমদের সামাজিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তা আজ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এইরকম একটা পরিস্থিতিতেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলি বালিতে মুখ গুঁজে এসব না দেখার ভান করে এসেছে এবং এখনও করছে ঐ ধর্মনিরপেক্ষতার নামে, সেকুলারিজমের নামে – না হলে বহিরাগতরা অতি দ্রূত রেশনকার্ড পেয়ে স্বল্পায়াসে এবং অনায়াসে ভারতীয় নাগরিকত্ব ও অর্জন করতে পারছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে কি করে? সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক গড়ে তোলার দিকে লক্ষ্য রেখে রাজনৈতিক দলগুলির এই যে দ্বিচারিতা ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলারিজমের নামাবলীর আড়ালে, তা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ ক্রমশ বুঝতে পেরেছে এবং নিজেরাই তার প্রতিকারকল্পে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে তাদের সীমাবদ্ধ চিন্তানুযায়ী। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষজন দেখেছে কাশ্মীরে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পন্ডিত উৎখাত হয়ে আশ্রয় শিবির বাস করছে এবং সেকুলারিজম স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলি নির্বিকার থেকেছে আবার গুজরাটে সাম্প্রতিক দাঙ্গায় হাজার হাজার মুসলিমদের আশ্রয় শিবিরে যেতে হয়েছে দেখে ঐ রাজনৈতিক দলগুলিই সোচ্চার হয়েছে ঐ ‘ সেকুলারিজম ‘ এর জন্যই – কাশ্মীরে বেছে বেছে হিন্দু গণহত্যায়, মন্দিরের হিন্দু পুরোহিতদের শিরচ্ছেদে যারা নির্বাক থেকেছে, গোধরায় করসেবকদের পুড়িয়ে মারায় যারা নির্লিপ্ত থেকেছে – বাংলাদেশে হাজার হাজার মা-বোনেদের লুন্ঠিত ও ধর্ষিত হচ্ছে জেনেও যারা স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন করছে, ‘ সেকুলারিজম ‘ এর স্বার্থে তারাই আবার বোমায় বিধ্বস্ত আফগানদের জন্য প্রতিবাদ মিছিল করছে, গুজরাটের ঘটনাবলীর জন্য প্রতিবাদের ঝড় তুলছে- এগুলি কি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু নয়? গুজরাটে নাকি ” রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ” চলছে! বিজন সেতুতে আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীদের পুড়িয়ে মারা- নানুরের হত্যা – ছোটো আঙারিয়ার হত্যাকাণ্ড – এরম আরো আরো ঘটনা – ওগুলি কি ” প্রগতিশীল সন্ত্রাস ” বলে উপভোগ্য? সেকুলারিজম, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতাবোধের এইসব ‘ন্যাক্কারজনক’ উদাহরণ বৃহত্তর জনসমাজের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদের ধ্বংস সাধন এবং ২০০২ সালের গুজরাটের দাঙ্গা চরিত্র তার উদ্বেগজনক পরিণাম। স্বার্থান্ধে বিকৃত ‘ ধর্মনিরপেক্ষতা, সেকুলারিজ এবং মানবতাবোধ ‘ থেকে সাধারণ মানুষের নিষ্কৃতি পেতে চাইছে তার স্তরের ভাবনা-চিন্তা অনুযায়ী। কিন্তু কেন এমন হল? আমরা কি ‘ সেকুলারিজম ‘ অনুসরণ করার অযোগ্য? ধর্মনিরপেক্ষতার মানে বুঝতে কি অপারগ? আসলে খুব ভালো করে বিশ্লেষণ করলে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে আমাদের দেশে জনজীবনে ‘ ধর্মহীনতা’ বা ‘ সেকুলারিজম ‘ একেবারেই অপ্রযোজ্য – ধর্মনিরপেক্ষতা বা পরধর্মসহিষ্ঞুতার তবুও একটা আবেদন আছে। সেকুলারিজম বা ধর্মহীনত অপ্রযোজ্য – তার কারণ এটিকে কৃত্রিমভাবে এবং অনুপযুক্ত সময়ে সংবিধানে ঢোকানো হয়েছে শুধুমাত্র ইউরোপীয় সেকুলার রাষ্ট্রাদর্শকে প্রগতিশীলতার প্রতীক হিসেবে সামনে রেখে। ইউরোপে সুদীর্ঘ দুই শতক ধরে সেকুলারিজম – এর আন্দোলন চলেছে- বহু উত্থান পতন অতিক্রম করেএর যথার্থতা জনসাধারণ সাধারণভাবে স্বীকার করেছে। এই স্বীকৃতির অনুকূল একটা বাতাবরণ ও ছিল। সেটি হল সেখানের জীবনচর্যা অনেকাংশে বস্তুবিজ্ঞান আধারিত । কিন্তু আমাদের দেশের জীবনচর্যা প্রধানতঃ আধ্যাত্মবিজ্ঞান বা দর্শন আধারিত এবং বহু প্রাচীনকাল থেকে যেকালে ইউরোপীয় সভ্যতার উদ্ভবই ঘটে নি। সুতরাং শিল্প বিপ্লবের পর পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের ঘাত এসে পড়লেও প্রায় সাত হাজার বছর ধরে অনুশীলিত দর্শন ভুল হোক বা ঠিক ই হোক, হঠাৎ করে শূন্যে বিলীন হতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী যে আন্দোলন অনুশীলিত দর্শন কে পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপন করতে পারতো সে আন্দোলনই হয় নি। নেহেরুর ই সমকালীন এবং এদেশে সেকুলার চিন্তার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবক্তা এম. এন রায় ও এ আন্দোলন করতে পারেন নি – সীমিতভাবে কযেকজন চিন্তাবিদদের মধ্যেই এটা সীমিত ছিল। সুতরাং অতি মুষ্টিমেয় কয়েকজন যেমন একজন নেহেরু, চাইলেই জনসাধারণ এবং সব নেতারা সেকুলার হয়ে যাবেন তাতো হয় না ! যারা ‘ সেকুলার ‘ হয়ে যান সময় বিশেষে, তারা প্রকৃত অর্থে কতটা সেকুলার? সেকুলার এক রাজনৈতিক দলের প্রধান রামমন্দিরের শিলান্যাস করেন কেন? সেকুলার এক রাজনৈতিক দলের নেতা এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী ‘ শাহবানু’ দের চোখের জল মোছাতে পশ্চাৎপদ হলেন কেন? সেকুলার অপর এক ‘প্রগতিশীল’ রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সময়ে ধর্মসম্প্রদায় বিশেষের প্রধানের কাছে ‘ mandate’ এর ভিখারী হয় কেন? Fight for godlessness is the fight for socialism যাদের দর্শন তাদের প্রশাসন দক্ষিণবঙ্গে ‘ বনবিবি’ উৎসবে মেতে ওঠেন কোন ‘সেকুলার’ আদর্শের তাড়নায়? ধর্মের বিপথগামীতা বা ভ্রষ্টাচার থেকে মুক্ত হয়ে ‘ সেকুলারিজমের’ ভন্ডামীর খপ্পরে পড়া, এটাই কি কাম্য ছিল? এ যেন from frying pan to fire অথবা টকের জ্বালায় পালিয়ে এসে তেঁতুল তলায় বাস ! এই বিকৃত সেকুলারিজম পক্ষপাতপূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য ই স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও জাতীয় সংহতিবোধ, ভারতীয়তাবোধ এক প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন। বুদ্ধিজীবীদের এক্ষেত্রে একটি বিরাট সদর্থক ভূমিকা পালন করার আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের বুদ্ধিজীবীরা তাদের ভূমিকা পালন করছেন না বা করতে চাইছেন না স্বার্গত নানা ধরনের হিসেবের জন্য। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনসাধারণ এবং মুখ্য সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিম জনসাধারণ উভয়েই বিপুল ক্ষতি এবং ক্ষতচিহ্ন নিয়ে, পারস্পরিক অবিশ্বাসের বাতাবরণ নিয়ে আজ মুখোমুখি। জাতীয় স্বার্থে এই অবস্থার সদর্থক পরিবর্তন দরকার, প্রতিকার দরকার, দরকার পারস্পরিক কল্যাণ কামনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাস্তব অবস্থার সঠিক মূল্যায়নে এবং তদনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণে সুস্থ পরিবেশ তৈরী করা। এ কাজ বর্তমানে কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।
    সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মানসিকতা বুঝতে হবে সংখ্যালঘু মুসলিমদের, অন্যদিকে সংখ্যালঘু মুসলিমদের চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের। সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত ধর্মীয় কারণে দাঙ্গার মাধ্যমে ভারত ভাগ করার জন্য যে বেদনাবোধ হিন্দুদের আছে এবং তারপরেও ভারতে থেকে যাওয়া মুসলিমদের দিক থেকে যে সহযোগিতামূলক আচরণ হিন্দুরা প্রত্যাশা করেছিল তা রাজনৈতিক দলগুলির স্বার্থান্ধ আচরণে ও হস্তক্ষেপে এবং পাকিস্তানের প্ররোচনায় যেভাবে বিপথগামী হয়েছে তার অনুধাবন করতে হবে ভারতীয় মুসলিম সমাজকে, অপরদিকে শিক্ষায় অনগ্রসর দারিদ্রপীড়িত হীনমন্যতাবোধে আক্রান্ত মুসলিম সমাজের যুগোপযোগী সামাজিক পরিবর্তনে প্রগতিশীল মুসলিম ব্যক্তিদের সহযোগিতায় হিন্দু শিক্ষিত সমাজকেও উদ্যোগী হতে হবে। একাজ যেটি সত্যিকারের সংহতি রক্ষা ও বৃদ্ধির কাজ, তা হচ্ছে না – পরন্তু অশিক্ষা ও দারিদ্রক্লিষ্ট মুসলিম আমজনতার ধর্মীয় বোধে সুড়সুড়ি দিয়ে তাদের ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এজন্যই যেখানে হিন্দু সমাজে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ইত্যাদির উত্থান সম্ভব হয়েছে – মুসলিম সমাজে তা হতে পারে নি। এটা সম্ভব করার জন্য মুসলিমদের চাইতে হিন্দুদের দায়িত্ব বেশী কারণ ” পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে”, অপর পক্ষে মুসলিম সমাজের আলোকপ্রাপ্ত অংশকে অগ্রণী হতে হবে হিন্দু মুসলিম যৌথ উদ্যোগে মুসলিম সমাজে অতি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার জন্য। ইংরাজ শাসনের শুরুতে ভারতে মুসলিম সমাজে শিক্ষিতের হার কম ছিল না। কোলকাতা মাদ্রাসা ই প্রথম ইংরাজ স্থাপিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইংরাজ বিচার – ব্যবস্থায় মুসলিমদের প্রাধান্য দিয়েছিল, হিন্দু কে দিয়েছিল রাজস্ব ব্যবস্থা র। ‘দশশালা’ বন্দোবস্ত চালু হওয়ার পর দেখা গেল রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হিন্দুদের আরথিক অবস্থা দ্রুত উন্নত হল আর সময় মতো খাজনা দিতে অক্ষম হওয়াতে মুসলিমরা আর্থিক দিক থেকে পঙ্গু হতে থাকলো। কিছুকালের মধ্যেই এক স্পষ্ট আর্থিক পুনর্বিন্যাস সাধিত হল যাতে করে অবস্থা ভালো হওয়া হিন্দুরা ইংরাজী শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করে পাশ্চাত্য ধ্যান – ধারণা বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হল। অন্যদিকে ক্ষুব্ধ, শাসকশ্রেণী থেকে বিচ্যুত মুসলিমরা ইংরেজী শিক্ষা ব্যবস্থা বর্জন করে সংকীর্ণ ধর্মীয় বেড়াজালে আবদ্ধ করতে থাকে নিজেদেরকে। ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় নবজাগরণ যা মূলতঃ বাংলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তা কার্য্যতঃ হিন্দু নবজাগরণে পরিণত হল। হিন্দু – মুসলিম সমাজের মধ্যে এই বৌদ্ধিক পার্থক্য ধীরে ধীরে একটা স্থায়ী রূপ পেতে থাকে – মানসিক দূরত্বও ক্রমবর্দ্ধমান হতে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার বাতাবরণ সৃষ্টির জন্য এবং ঐক্য স্থাপনের জন্য গান্ধীজি খিলাফৎ-আন্দোলন শুরু করেন – হিন্দু মুসলিম কাছাকাছি আসার একটা সম্ভাবনা দেখা দিলেও শেষ অবধি ওয়াহাবি ইন্দোলনের প্রভাবে সে সম্ভাবনা বিনষ্ট তো হলোই উপরন্তু খিলাফৎ আন্দোলনের সুবাদে সংগঠিত হওয়া মুসলিম সমাজে ধর্মীয় উগ্রতা ঠাঁই করে নিল, যার প্রকাশ দেখা যায় কেরালার মোপালা বিদ্রোহের সাম্প্রদায়িক চরিত্রে – বহু হিন্দুর নিধনে এবং বলপূর্বক ধর্মান্তকরণে। ধর্মান্তরিত হিন্দুদের স্বধর্মে ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে শেষ অবধি খুন হলেন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ। কিন্তু কেন খিলাফৎ আন্দোলন ধর্মীয় উগ্রতায় পর্যবসিত হল? এটি ব্যাখ্যার জন্য আমাদের যেতে হবে মুসলিম ধর্ম বাস্তৃতির গোড়ার দিকের ইতিহাসে।
    হজরত মহম্মদের জীবন দর্শনের দুটি অধ্যায় (১) মক্কার অধ্যায় এবং (২) মদিনার অধ্যায়। মক্কার মহম্মদ সত্যদ্রষ্টা মানবপ্রেমিক নীতির প্রবক্তা আর মদিনার মহম্মদ বিজয়ী বীর ও রাষ্ট্রনায়ক। মুসলিম সমাজ গড়ে উঠেছে মদিনার বিজয়ী রাষ্ট্রনায়ক মহম্মদের আদর্শে, যেখানে প্রয়োজন ছিল পৌত্তলিক আরব ও ইহুদীদের নির্মম শত্রুতার বিরুদ্ধে অন্ধ আনুগত্য ও বিপক্ষের প্রতি সন্দেহশীলতা – এটি ছিল তৎকালীন প্রয়োজনে সাময়িক স্ট্র্যাটেজি – যদিও মুসলিম সমাজে এটিই স্থায়িত্ব পেয়ে যায়। যেমনমদিনায় অবতীর্ণ একটি সুরার শেষে বলা হয়েছে ” হে বিশ্বাসীগণ আল্লাহর রোষে যারা পতিত হয়েছে সেই দলের লোকেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কোরো না।” (৬০:১৩) টীকাকার বলেছেন এখানে ইহুদীদের কথাই বলা হয়েছে – সমসাময়িক মুসলমানরা হয়ত এই কথাই ভালো করে বুঝেছিলেন এবং তাদের অনুবর্ত্তি পরবর্তী মুসলমানেরা হয় তো বুঝে নিয়েছে – যারা মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত নয় তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করো না। কিন্তু এটিও সার্বিক ভাবে সত্য ছিল না। বিচারবুদ্ধি সমন্বিত সুফী মতবাদ যার প্রবক্তা ছিলেন ইমাম আবু হানিফা, তার প্রভাবও ব্যাপক ছিল। ভারতবর্ষে সুফী মতবাদ ই প্রাধান্য পাচ্ছিল ধীরে ধীরে। এর প্রমাণ, যে সময়ে গজনীর মাহমুদ হিন্দু মন্দির ধ্বংস ও ধনরত্ন লুঠ করেছিল ঠিক সেই সময়েই আলবিরুনী বিশেষ শ্রদ্ধায় ও যত্নে হিন্দু জ্ঞান – বিজ্ঞান আহরণ করে তাঁর দেশকে সেই জ্ঞানে সম্মৃদ্ধ করেছিলেন। তবে এ কথাটাই চরম সত্য যে বিচার বিশ্লেষণ ও মধ্যপন্থা বাদ দিয়ে কঠোরভাবে শাস্ত্রপন্থীরা (মদিনা) শেষ অবধি ইমাম গাজ্জালী তথা ত্রয়োদশ শতকের শেষে আবির্ভূত ধর্মগুরু ইবনে তায়মিয়ার প্রভাবে মুসলিম সমাজ কে গঠন করেন। ভারতে সুফী মতবাদের প্রভাব একসময় থাকলেও অষ্টাদশ শতাব্দীতে তায়মিয়ার ভাবশিষ্য আব্দুল ওয়াহাবির প্রচেষ্টায় ভারতে সুফী মতবাদের অবলুপ্তি ঘটে। ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলনের গতি প্রকৃতি অনুধাবন করলেই তা বোঝা যায়। এককালে ভারত কে ” দারুল হরব ” বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, পরে ” দারুল ইসলাম ” বলে গ্রহণ করে দ্রুত ইসলামী করণের ওপর সমধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেক মুসলমান জমিদার ও সাধারণ মানুষ বৃহৎ হিন্দু সমাজের সংস্পর্শের কারণে হিন্দু পূজা-পার্বণকে গ্রহণ করেছিল বিশেষ করে বাংলাদেশে। হিন্দু – মুসলিম সোহার্দ্যের একটি সংস্কৃতি রূপ নিচ্ছিল। কিন্তু ওয়াহাবি আন্দোলন তাকে ব্যহত করে এবং ভারতীয়ত্ব নির্মাণে সেটিই এক বাধায় পরিণত হয় এবং এখন সেই বাধাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কট্টরপন্থীদের নিরন্তর প্রয়াসে। ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের মধ্যেই বিধর্মীদের বিরুদ্ধে ‘ জিহাদের ‘ অনুপ্রেরণায় জন্ম নিয়েছে উগ্রপন্থা, গোটা বিশ্ব আজ যে ত্রাসের সম্মুখীন, ভারত তো বটেই। এইরকম জটিল পরিস্থিতি থেকে আমরা কি মুক্তি পাব না? মিঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গর কবলে পড়াই কি আমাদের ভবিতব্য? এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে ‘তত্ত্বজ্ঞান’ নয় কিছু কান্ডজ্ঞান নিয়েই আমাদের কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে এবং প্রধানতঃ মুসলিম সমাজকেই। এটা কোনো পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গী ভাবলে ভুল হবে। ৮০% মানুষের সঙ্গে সব ব্যাপারে পাল্লা দিয়ে তুলনা করাটা সমীচীন হয় না হতে পারে না। একজন হিন্দু পাকিস্তানে কেমন আছে, বাংলাদেশে কেমন আছে, তালিবান শাসনাধীন আফগানিস্তানে কেমন ছিল তার তুলনায় ভারতে একজন মুসলিম কেমন আছে – এটা ভাবলেই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গীর উদ্ভব ঘটবে। কান্ডজ্ঞানই দিকনির্দেশক হবে। দাঙ্গা ঘটিয়ে ভারত ভাগ করার পরও পর্যায়ে পর্যায়ে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে কারা হিন্দু না মুসলিম? কেন প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলিতে হিন্দু সংখ্যা ক্রমাগত কমেছে অথচ ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে এর কারণ হৃদয়ঙ্গম করা দরকার নয় কি? ভারতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠদের সঙ্গে সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরী করে থাকার জন্য সংখ্যালঘুদের প্রতি আবেদনকে ” ব্ল্যাকমেলিং” বলে চিহ্নিত করতে রাজনৈতিক ধান্ধাবাজদের অভাব নেই – আপাত গ্রাহ্য যুক্তিও খাড়া করা যায় কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভাবলে এর যৌক্তিকতা কে অস্বীকার করা যায় কি? এ আবেদন অতীতেও করা হয়েছিল। একটি উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৮৩ সালে একটি খৃষ্টান মাইনোরিটি ডেলিগেশনের কাছে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন ” …. Minority can not claim to be safeby constantly irritating the mejority. “ ইন্দিরা গান্ধী কি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গ থেকে এ কথা বলেছিলেন না বাস্তব অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন? শিক্ষিত এবং অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মুসলিম বুদ্ধি জীবীরা এই সত্য উপলব্ধি করেন অনেকেই – সাধারণ মুসলিম জনসাধারণ ও অনেকাংশে তা করে কিন্তু করতে চায় না রাজনীতিসর্বস্ব মুসলিম নেতারা যাদের ধর্মীয় উস্কানির ফলে উপলব্ধ সত্য অন্তরালেই থেকে যায়। ‘Rediscovery of India’ – র লেখক, সুদীর্ঘকাল
    U. N. O-তে কাজ করার বিপুল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ আনসার হোসেন খান তাঁর বইতে লিখেছেন “….. Mr. Sahabuddin and Mr. M. J. Akbar, leave alone the of the shahi masque in Delhi were barking up the wrong tree….. they were only leading the community of Indian Muslims astray by legislation….. those who took the line might get leadership but that road was destructive. It should be abandoned at once and the foundations laid for a permanent reconciliation. Failing that the flames would rise higher and in the end we could predict exactly which community would suffer most and count the greater number of corpses….. Indian Muslims must remember that their forefathers or rather their mediave coreligionist minority – rulers of India were beastly and frightful to Hindus( with exceptio such as Akbar). No Islam sanctioned their conduct. Temples were indeed demolished and their stones often used to construct mosques on the very site. ”

    দেশ ভাগের রক্তাত পটভূমি তে প্ররোচনা থাকা সত্বেও হিন্দুরাষ্ট্রের দাবী ওঠে নি – এখনো সে দাবী নেই বললেই চলে। কিন্তু কে বলতে পারে নিরবচ্ছিন্ন- সংখ্যালঘু ধর্মীয় উগ্রতা, অসহযোগিতা এবং জঙ্গিপনার প্রতিক্রিয়া আগামীদিনে এ দাবীকে অনিবার্য করবে কিনা ! সেই পরিস্থিতি কি মুসলিমদের কাছে বাঞ্ছনীয়হবে?

    তথ্যসূত্র :
    ১) ” Vive constitution proceedings” , Ambedkar’s lecture
    ২) “Sotsializm i reliigiya” in Polnoe Sobranie Sochineii Moscow 1960 :The Radical
    Humanist 41 NO 2.
    ৩) Kommunist No 7(1953)
    ৪) হিন্দু মুসলমানর বিরোধ – কাজী আব্দুল ওদুদ( বিশ্বভারতী বক্তৃতামালা)
    ৫) সেকুলার রাষ্ট্র : সেকুলারিজম ও ধর্ম – ‘ ভাবনা চিন্তা’ ১লা জুন, ২০০০
    ৬) Rediscovery of India – ANSAR HOSSIAN KHAN (Orient Longman)
    ৬) পুরোগামী, জানুয়ারি ১৯৯০

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here