সম্রাট আকবর, রামমুদ্রা ও বাংলায় রাম সংস্কৃতি

0

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

কুষাণ সম্রাট হুবিষ্কের মুদ্রায় দেখা যায় দেবাদিদেব শিবকে। সৌরসেন রাজ‍্যের রাজা সূর্যমিত্র, ব্রহ্মমিত্র, ধৃধমিত্র এবং বিষ্ণুমিত্রর মুদ্রায় দেখা যায় দণ্ডায়মানা লক্ষ্মীদেবীকে।গুপ্তযুগের মুদ্রায় দেখা যায় দেবী লক্ষ্মী এবং সিংহবাহিনী দেবী দুর্গাকে। দক্ষিণ ভারতে সঙ্গম বংশের প্রতিষ্ঠাতা হরিহর ( খ্রি: ১৩৩৬-খ্রি:১৩৫৬ ) নিজের প্রবর্তিত মুদ্রায় হনুমান ও গড়ুড় প্রতীক চিহ্ন ব‍্যবহার করেন। পরবর্তী শাসক তাঁর ভাই বুক্কও (খ্রি:১৩৫৬-খ্রি:১৩৭৭) নিজের মুদ্রায় হনুমান প্রতীক চিহ্নের ব‍্যবহার করেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রচলন করা প্রথমদিকের রুপোর মুদ্রাগুলি ছিল আধ ফানাম, এক ফানাম ও দুই ফানাম। এই মুদ্রাগুলোর সোজাদিকে ছিল বিষ্ণুমূর্তি। এখন একটা কথা উঠছে, রাম বাংলার নন, বহিরাগত। সেজন্য রামের কথা বলতেই হচ্ছে। রামের কথা বলছি বলে ভাববেন না, ধর্মকথা বলছি। বলছি, ইতিহাসের কথা। রাম নিয়ে এখন বহু চর্চা চলছে এই বাংলায়। তাই রামকে নিয়ে আজকের এই ইতিহাস-চর্চা।
ভারতের তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রি:) ছিলেন ধর্ম বিষয়ে উদার। তিনি হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষকে একসূত্রে গাঁথতে “দীন-ই-ইলাহী” নামে এক নতুন ধর্মমত প্রবর্তন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর রাজত্বের ৫০ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে তিনি রাম-সীতার চিত্র উৎকীর্ণ করা কিছু সোনার ও কিছু রুপোর মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন। ছবিতে আমরা সেইসব মুদ্রার ছবি তুলে ধরছি। মুদ্রার সোজাদিকে ধনুর্বাণ হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন শ্রীরামচন্দ্র, পিছনে সীতা। ওপরে নাগরী হরফে ছোট অক্ষরে লেখা “রাম-সীয়া।” উল্টোদিকে লেখা রয়েছে “আমারদাদ্ ইলাহী ৫০।” অন্যদিকে, ব্রিটিশ আমলের ১৮১৮ সাল ছাপা প্রচলিত মুদ্রায় রামের ছবি দেখা যাচ্ছে। তামার মুদ্রা। একপীঠে দেখা যাচ্ছে, রাম-লক্ষ্মণ-সীতা এবং পদতলে হনুমান। অন্যপীঠে রয়েছে শুধুমাত্র হনুমান। এগুলো আসলে হলো ” রামটাকা” বা “রামটঙ্কা।” মুদ্রাবিশেষজ্ঞদের মতে এগুলো “কল্পমুদ্রা।” এই দুষ্প্রাপ্য অ্যান্টিক মুদ্রাগুলো জলপাইগুড়িসহ বাংলার বিভিন্ন মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের বহু পরিবার দীপাবলির সময় লক্ষ্মী-গণেশ পুজোর সময় সামনে রাখে। তখন শিব-পার্বতী, রাম-সীতা, এমনকি বিভিন্ন সময়ের ব্রিটিশরাজ কিং জর্জের মুদ্রাও সামনে রেখে ধনলক্ষ্মীর পুজো করা হয়। এছাড়া বহু বাঙালি পরিবারের মধ্যে দুর্গাপুজোর দশমীর দিন এই রাম-সীতা মুদ্রা দিয়ে “যাত্রা বাঁধা” হয়। এগুলো কোনো মন্দিরের টোকেন মুদ্রা। তবে এগুলোর অ্যান্টিক মূল্য থাকলেও ভারতের ব্রিটিশ সরকার এই রাম-সীতা মুদ্রাগুলি প্রচলন করেনি।

“রাম” নিয়ে আরও তথ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি হলো, খ্রিস্টিয় আঠারো শতকের দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ‍্যের শাসক টিপু সুলতান যখন ব্রিটিশদের।সঙ্গে শ্রীরঙ্গপত্তমের যুদ্ধে মারা যান, তার হাতের আঙুলে দেবনাগরী হরফে “রাম” লেখা একটি সোনার আংটি ছিল। আংটিটি ডিউক ওয়েলিংটন নামে এক ব্রিটিশ জেনারেল সেটি টিপুর আঙুল থেকে খুলে নেন। ফিৎজরয় সমারসেট নামে একজন সামরিক ব‍্যক্তি ছিলেন ডিউকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তারা দুজনে একসঙ্গে ৪০ বছর কাজ করেছেন। ডিউকের এক আত্মীয়াকে বিয়ে করে ওই আংটিটি যৌতুক পান ফিৎজরয়। আংটির ওজন ৪১.২ গ্রাম। ২০১৪ সালে ক্রিস্টি নিলাম সংস্থা লণ্ডনে এটি নিলাম করে। দাম ওঠে ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৯ কোটি টাকা, যা আসল দামের থেকে প্রায় দশগুণ বেশি। ভারতের ঐতিহাসিকরা এটি দেশে ফিরে পেতে চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে খবর।
এতো গেল দেশের খবর। এবার আসি রাম নিয়ে বাংলার খবরে। বাংলার সংস্কৃতিতে রাম রয়েছেন। তবে এই রাম উত্তর ভারতের “বীর রাম” নন, বাংলার রাম শান্ত সৌম‍্য। বাঁকুড়া ও পশ্চিম বর্ধমানে বেশ কিছু পুরোনো রাম মন্দির রয়েছে। নদীয়ার নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের বাড়ির কাছেই গঙ্গার ধারে রাম-সীতা মন্দির ছিল। সেসব এখন ভাগিরথীর গর্ভে বিলীন। তবে এলাকায় অন্য একটি রাম-সীতা মন্দির রয়েছে। পাড়ার নামটিও “রাম-সীতা পাড়া।” অন্যদিকে, রামানন্দ সম্প্রদায়ের শিষ্যরা ১৬৭১ সালে বাঁকুড়া জেলার বড়জোড়ায় বেলুট গোবিন্দপুর গ্রামে একটি রাম মন্দির তৈরি করেন। তাছাড়াও রাঢ় অঞ্চলে ধর্মঠাকুর ও দেবী যোগ্যাদ‍্যার সঙ্গে রামচন্দ্রের মিথ মিশে গেছে। বাংলায় একসময় রামায়ণ ও রামযাত্রা ব‍্যাপক প্রচলন ছিল। নদীয়া জেলার ফুলিয়ার মানুষ ছিলেন বাঙালি রামায়ণের রচয়িতা কৃত্তিবাস ওঝা। শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহদেবতা ছিলেন “রঘুবীর।” আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে কিংবা ভয় পেলে বাংলার মানুষ আজও “রাম” “রাম” বলে থাকেন। বাংলার গ্রামাঞ্চলে প্রবাদ আছে, খেজুর কাঁটায় আছে রাম বাণ। তাই খেজুর কাঁটা শরীরে বিঁধলে ভীষণ জ্বালা করে। গ্রামের দিকে গৃহস্থ ঘরে ধান-চাল মাপতে শুরুতে “এক” না বলে এখনো “রাম” দিয়ে শুরু হয়। যেমন, রাম-দুই-তিন-চার প্রভৃতি।
বাংলায় প্রবাদ আছে, কাঠবেড়ালির গায়ে রাম ছাপ আছে। লংকা যেতে সাগরে সেতু বাঁধার সময় কাঠবেড়ালির দল জলে ডুবে গায়ে বালি মেখে সেই বালি ঝেড়ে ঝেড়ে সেতুর ফাঁক-ফোঁকর বন্ধ করেছিল। একাজে খুশি হয়ে শ্রীরামচন্দ্র তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। বলা হয়, তখন থেকেই কাঠবেড়ালির গায়ে শ্রীরামচন্দ্রের হাতের পাঁচটি আঙুলের লম্বা দাগ।
এছাড়াও গোটা পশ্চিমবঙ্গে প্রায় চারশোটি রাম সংক্রান্ত গ্রামনাম রয়েছে। বীরভূমে রয়েছে ২৪ টি। রঘুনাথপুর-৬টি, রামচন্দ্রপুর-৩, শ্রীরামপুর-৫, রামপুর-৩, রামনগর-৩, রামকৃষ্ণপুর-৪।
এবার প্রত্নতত্ত্বের খবরে আসছি। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে বর্ধমানের মঙ্গলকোট থেকে পাওয়া গেছে রাম-সীতার ছবি আঁকা মুদ্রা। তাই বলা যায়, রাম বাংলার প্রাচীন দেবতা। একদল স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী রামের অস্তিত্ব অস্বীকার করতেই ভালোবাসেন। এই যখন অবস্থা তখন রামের জন্ম বিষয়ে আরও তথ্য সামনে এনে দিল দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদের আই সার্ভে।
ইনস্টিটিউট অব্ সায়েন্টিফিক রিসার্চ অন্ ভেদাজ্ , সংক্ষেপে “আই-সার্ভে” একটি ভারতীয় গবেষণা সংস্থা। এদের সদর দপ্তর হায়দরাবাদে। এদের কাজ হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে হিন্দু পুরাণে বর্ণিত বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং নিরূপণ করা। প্ল্যানেটোরিয়াম সফটওয়্যারের সাহায্যে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের সমাবেশ দেখে বিষয়টি স্থির করা হয়। হায়দরাবাদের এই আই-সার্ভের গবেষকরা জানাচ্ছেন, রামায়ণের রামচন্দ্র ঐতিহাসিক চরিত্র এবং তাঁর জন্মকাল ৫১১৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের ১০ জানুয়ারি , সময় : বেলা ১০ টা থেকে বেলা ১ টার মধ্যে। জন্মস্থান : অয‍্যোধা।
এরপর পাঠক, আপনি নিজেই বিচার করুন, রাম বাংলার , না বহিরাগত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here