কাঙালের হরি “কাঙাল হরিনাথ”

    0
    Role of Kangal Harinath

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    অত‍্যাচারীর বিরুদ্ধে এখনও গর্জে ওঠে যাঁদের কলম, তাঁদের মধ্যেই বেঁচে রয়েছেন কাঙালের হরি—“কাঙাল হরিনাথ।” আর বেঁচে রয়েছেন তাঁর লেখা “হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, পার কর আমারে” , কিংবা ” যদি ডাকার মতো পারিতাম ডাকতে। তবে কি মা এমন করে তুমি লুকিয়ে থাকতে পারতে।।” –র মতো কালজয়ী গানে।
    আসল নাম—হরিনাথ মজুমদার। আজন্ম দরিদ্র এই মানুষটির জন্ম ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ শে জুলাই ব্রিটিশ ভারতের নদীয়া জেলার কুমারখালি গ্রামের কুণ্ডুপাড়ায়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার অন্তর্গত।
    বছর খানেকেরও কম সময়ে মা কমলিনী দেবীকে হারান। চার বছর বয়সে মারা যান বাবা হরচন্দ্র মজুমদার। এরপর এক দরিদ্র ঠাকুরমার আশ্রয়ে শৈশব কাটে। কখনও ঠাকুরবাড়ির প্রসাদ, কখনও প্রতিবেশিদের দেওয়া পান্তা ভাত এবং সঙ্গে জামিরের পাতা আর নুন দিয়েই মেটাতে হয়েছে পেটের খিদে। পরণের কাপড় পযর্ন্ত জোটেনি। শেষে এক রাতের মধ্যে রামমোহন রায়ের “চূর্ণক” নামের বইটি নকল করে এক ধনী ব‍্যক্তির কাছ থেকে পরণের কাপড় জোগাড় করেন।
    ভর্তি হয়েছিলেন গ্রামের পাঠশালায়। কিন্তু অভিভাবকহীন দরিদ্র এক বালকের পক্ষে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে তাঁর মেধায় মুগ্ধ হয়ে এক আত্মীয় তাঁকে কৃষ্ণনাথ মজুমদারের ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেখানে সহপাঠীদের কাছে বই ধার নিয়ে, কখনও নকল করে পাঠ‍্য পুস্তকের অভাব মিটিয়েছেন। কিন্তু অর্থাভাবে প্রথাগত শিক্ষায় বেশিদূর এগোতে পারেননি।

    আরো পড়ুন :মহারাজা হরি সিং, শেখ আবদুল্লার “কাশ্মীর ছাড়” আন্দোলন ও আবদুল্লার সঙ্গে নেহেরুর কারাবরণ

    তবে চির দারিদ্র্য, দু:খকে সঙ্গী করেই স্বশিক্ষিত হয়েছিলেন হরিনাথ।
    বেঁচে থাকার জন্য দৈনিক ২ পয়সা বেতনে কাজ নেন একটি কাপড়ের দোকানে। সত্য পথে চলতে গিয়ে সেখানে বিরোধ বাঁধে। ছেড়ে দেন কাজ। এরপর ৫১ টি নীলকুঠির কুমারখালির হেড অফিসে শিক্ষানবিশীর কাজ নেন। কিন্তু প্রজাপীড়নে ব‍্যথিত হয়ে সে কাজও ছেড়ে দেন।
    এরপর ঈশ্বর গুপ্তর “সংবাদ প্রভাকর” ও হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত “হিন্দু প‍্যাট্রিয়ট” পত্রিকায় শুরু করেন সাংবাদিকতা।
    আত্মসন্তুষ্ট হতে না পেরে নিজেই বের করে ফেলেন একটি মাসিক পত্রিকা “গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা।” চার ফর্মার এই পত্রিকাটির দাম ছিল পাঁচ আনা। পরে সেটি পরিণত হয় এক পয়সার সাপ্তাহিকে। সুদখোর মহাজন, দেশীয় জমিদার থেকে শুরু করে অত‍্যাচারী ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে বার বার গর্জে ওঠে হরিনাথের কলম। হুমকিও আসে। এমনকি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষ জমিদাররা লেঠেল পাঠান তাঁকে জব্দ করতে। শেষে লালন ফকির তাঁর দলবল নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে জমিদারদের লেঠেলদের প্রতিহত করেন। পত্রিকাটি কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ‍্যারত্নের ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়ে কুমারখালি থেকে প্রকাশিত হতো। পরবর্তীকালে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে নিজের গ্রাম কুমারখালিতেই নিজস্ব ছাপাখানা বসান। ছাপাখানাটি বসিয়েছিলেন বন্ধু তথা পরবর্তীকালের ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র বাবা মথুরানাথ মৈত্রেয়। সেজন্য তাঁর নাম অনুসারে ছাপাখানাটির নাম ছিল সংক্ষেপে “এম.এন. প্রেস।” পরে মথুরানাথ পরে সেটি হরিনাথকে দান করে দেন। ছাপাখানায় ছিল লণ্ডনের ডিক্সন অ্যাণ্ড কোম্পানির ডাবল ক্রাউন সাইজের মেশিন। মেশিনের মডেল নম্বর—কলম্বিয়া ১৭০৬।
    গোপাল কুণ্ডু , যাদব কুণ্ডু , গোপাল সান‍্যালের মতো বন্ধুদের সহযোগিতায় হরিনাথ ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ই জানুয়ারি নিজের গ্রাম কুমারখালিতে তৈরি করেন একটি ভার্ণাকুলার বিদ্যালয়। এখানে বিনা বেতনে বহুদিন তিনি শিক্ষকতা করেছেন। পরে ১৮৬৩-তে কুমারখালিতে তৈরি করেন মেয়েদের একটি বিদ্যালয়, নাম—“কুমারখালি পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়।” এই বিদ্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর।
    কাগজ চলতো রাজশাহীর রাণী স্বর্ণকুমারী দেবীর অর্থানুকুল‍্যে।
    দীর্ঘ ১৮ বছর চলার পর আর্থিক অনটন ও ব্রিটিশ সরকারের মুদ্রণ ব‍্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়।
    এরপর হরিনাথ সাংবাদিকতা ছেড়ে মন দেন সঙ্গীত সাধনায়। অচিরেই একজন লালন অনুরাগী হয়ে ওঠেন। নিজেও হয়ে ওঠেন সাধক কবি।
    ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন নিজস্ব বাউল গানের দল—“কাঙাল ফিকির চাঁদ ফকিরের দল।” নাম হয়ে যায়—“ফকিরচাঁদ বাউল।” নিজেও লিখতে থাকেন কালজয়ী গান :
    “হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, পার কর আমারে।
    তুমি পারের কর্তা, জেনে বার্তা, তাই ডাকি তোমারে।।
    আমি আগে এসে, ঘাটে রইলাম বসে।
    যারা পরে এল, আগে গেল,
    আমি রইলাম পড়ে।‌।”
    বাউল গানের দল নিয়ে চষে বেড়ান হরিনাথ।
    এরপর মোট ১৮ খানি বই লেখেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
    ১) বিজয় বসন্ত (১৮৫৯),
    ২) চারু-চরিত্র (১৮৬৩),
    ৩) কবিতা কৌমুদী ( ১৮৬৬),
    ৪) কবিকল্প (১৮৭০),
    ৫) অক্রূর সংবাদ ( ১৮৭৩),
    ৬) চিত্ত চপলা (১৮৭৬),
    ৭) কাঙাল ফিকির চাঁদ ফকিরের গীতাবলী (১২৯৩-১৩০০ বঙ্গাব্দ),
    ৮) দক্ষযজ্ঞ,
    ৯) বিজয়া,
    ১০) পরমার্থগাথা,
    ১১) মাতৃমহিমা,
    ১২) ব্রহ্মাণ্ড বেদ।
    তাঁর জীবদ্দশাতেই “বিজয় বসন্ত” উপন্যাসটির ২০ টি সংস্করণ বের হয়েছিল।
    বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর অনুরাগী। এছাড়া তাঁর সুযোগ‍্য লেখক শিষ্যরা হলেন—অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, দীনেন্দ্রনাথ রায়, জলধর সেন।

    আরো পড়ুন :লক্ষ্মণসেনের হাতে পরাজিত হয়েছিলেন বখতিয়ার

    কাঙালের পাশে সর্বদাই থেকেছেন কাঙাল হরিনাথ। কিন্তু দুর্দিনে লালন ফকিরসহ মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া কেউ তাঁর পাশে ছিলেন না।
    ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ই এপ্রিল কাঙাল হরিনাথের জীবনাবসান হয়। তাঁর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী মৃতদেহ দাহ করার পর মাথার খুলি, হাতের কনিষ্ঠা ও বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের দেহাবশেষ সমাধিস্থ করা হয় হরিনাথের কাঙাল কুটিরের পুজোর ঘরে।
    ইণ্ডিয়ান মিরর লিখেছিল, নদীয়াবাসী এক ব‍্যক্তিকে হারালো।
    মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় হরিনাথ গ্রন্থাবলী।
    এক প্রতিবাদের নাম হিসেবে কাঙাল হরিনাথ আজও প্রাসঙ্গিক ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here