শিলালিপিতে বাংলার শিল্পীরা

    0
    Rock inscription of Bengali artists

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    বাংলার প্রাচীন স্থাপত‍্য-ভাস্কর্যে ফুটে রয়েছে বিভিন্ন শিল্পীর প্রতিভা ও দক্ষতা। তিব্বতীয় ঐতিহাসিক লামা তারনাথের লেখা বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে আমরা পালযুগের দুই বিখ্যাত পিতা-পুত্রকে দক্ষ শিল্পী হিসেবে দেখতে পাই। এঁরা হলেন ধীমান ও তাঁর পুত্র বীতপাল। তাঁদের শিষ‍্য-প্রশিষ‍্যরা একটি শিল্পী-গোষ্ঠীও তৈরি করেছিলেন।
    সেনরাজা বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপিতে খোদাইকর রাণক শূলপাণির নাম দেখা যায়। ৩২ টি অতি দীর্ঘ পংক্তির অক্ষরগুলি যেভাবে পাথরে খোদাই করা হয়েছে, সেটিই একটি উৎকৃষ্ট শিল্পকর্মের নিদর্শণ হিসেবে গণ্য। শেষে শিল্পীর পরিচয় রয়েছে, তিনি ছিলেন ধর্মের প্রপৌত্র, মনদাসের পৌত্র, বৃহস্পতির পুত্র, “বারেন্দ্রক শিল্পীগোষ্ঠীচূড়ামণি” রাণক শূলপাণি। “রাণক” হলো একটি উপাধি। আবার “কুলিক” মানে “শিল্পী।”

    আরো পড়ুন :কুমারহট্ট থেকে আজকের হালিশহর

    খ্রিস্টিয় পঞ্চম থেকে অষ্টম শতকের তাম্রলেখতে ভূমি দান-বিক্রয় প্রসঙ্গে রাজপ্রতিনিধি রাষ্ট্রের তরফে শিল্পীগোষ্ঠীর প্রধান প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম কুলিকের মতামত নিতেন।
    বাংলায় প্রাপ্ত অসংখ্য দেবদেবীর পোড়া মাটি ও পাথরের মূর্তি, পাহাড়পুরসহ বিভিন্ন স্থানের প্রাচীন মন্দির, স্তূপ ও বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ, মন্দিরের গায়ে উৎকীর্ণ ভাস্কর্য থেকে শুরু করে দেবদেবীর মূর্তির গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা বিভিন্ন অলংকার শিল্পকাজের উদাহরণ হিসেবে উৎকৃষ্ট ।

    শিল্পীর মনোযোগ কেমন ছিল, তার একটি উদাহরণ আমরা পাচ্ছি সিলিমপুরের প্রস্তর লিপিতে। সেখানে সোমেশ্বর নামে এক শিল্পীর কাজ প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে, প্রেমিক যেমন তন্ময় হয়ে বর্ণবিন‍্যাসে তার প্রেমিকার ছবি আঁকে, তেমনি শিল্পী সোমেশ্বর এই প্রশস্তি লেখেন।
    খ্রিস্টিয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দিনের “তবকৎ-ই-নাসিরি” অনুসারে জানা যায়, সেনরাজা লক্ষ্মণসেন আহার করতেন সোণা-রুপোর বাসনে ।

    গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর সময়ে বাংলায় কৃষ্ণ ও রামায়ণের যে ব‍্যাপক প্রসার ঘটেছিল, পাহাড়পুর মন্দিরের পোড়া মাটির ফলকগুলিই তার প্রমাণ। বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী জেলায় অবস্থিত এই পাহাড়পুর পালরাজ ধর্মপালের আমলে “সোমপুর” নামে পরিচিত ছিল। এখানেই গড়ে উঠেছিল বিখ্যাত সোমপুর বৌদ্ধবিহার।সোমপুরের কাছে ওমপুর এখনো সেই সোমপুরের স্মৃতি নিয়ে টিকে রয়েছে ।

    এই পাহাড়পুরে শ্রীকৃষ্ণের গোবর্ধন পর্বত ধারণ, চাণুর ও মুষ্টিকের সঙ্গে কৃষ্ণ-বলরামের মল্লযুদ্ধ, কেশী রাক্ষসী বধ, যমলার্জুন, কৃষ্ণকে নিয়ে বাসুদেবের গোকুলে গমন, রাখাল বালকদের সঙ্গে কৃষ্ণ-বলরাম এবং রামায়ণের মধ্যে বালী-সুগ্রীবের যুদ্ধ, সাগরে বানরসেনার সেতু তৈরির মতো বিষয়গুলি দেখা যায় ।

    এসব পুজোর জন্য নয়, তৈরি হয়েছিল মন্দিরের অলংকরণের কাজে। তাই বলা যায়, গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগে কৃষ্ণায়ণ ও রামায়ণ বাঙালির লোকায়ত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।
    বাংলার শিলালিপি ও তাম্রশাসনে আমরা কয়েকজন শিল্পীর নাম পাচ্ছি, যেমন :
    ১) ভোগটের পৌত্র, সুভটের পুত্র তাতট,
    ২-৩) সৎ-সমতট নিবাসী শুভদাসের পুত্র মঙ্খদাস ও তাঁর পুত্র বিমলদাস,
    ৪) সূত্রধার বিষ্ণুভদ্র,
    ৫-৬) বিক্রমাদিত‍্য-পুত্র শিল্পী মহীধর ও তাঁর পুত্র শিল্পী শশিদেব,
    ৭) শিল্পী কর্ণভদ্র,
    ৮) শিল্পী তথাগতসর।
    উপরোক্ত ৮ জনের মধ্যে কয়েকজন “শিল্পী” উপাধিতে ভূষিত, তা দেখাই যাচ্ছে।

    আরো পড়ুন :বাড়ি তৈরির দেশিয় রীতি

    তবে পাথর ও ধাতু শিল্প যেহেতু খুব ব‍্যয়বহুল, তাই স্বাভাবিকভাবেই বিত্তবানরাই এসব কাজ করাতেন। আর এইসব বিত্তবানরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিল্পবোধসম্পন্ন না হয়ে ধর্মনিষ্ঠ বেশি হতেন। আর তাঁদের ইচ্ছেয় শিল্পীরা শাস্ত্র ও লোকাচার মেনে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করেছেন বহু নন্দিত শিল্পকর্ম, যা আজও আমাদের দু’চোখকে বিস্মিত করে ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here