ঋষি কবি এনামূল হক থেকে বীরভূম-বধূয়াঁ আচার্য শ্রীশূদ্রোত্তম, এক উত্তরণ এবং তীর্থভূমি তিলুটিয়া

    1

    Last Updated on

    উত্তম মন্ডল

    বীরভূমে বাস করেন অথচ তিলুটিয়া যাননি, তবে এ জেলার ইতিহাস সম্পর্কে আপনি এখনো আঁধারের মুসাফির। শান্তিনিকেতন প্রান্তিক থেকে বিগত এক বছর ধরে তিলুটিয়া আসার আমণ্ত্রণ জানিয়ে আসছিলেন তিলুটিয়ার আত্মজন জনাব আহাসান কামাল। আর তাঁর ডাকেই বাড়ি থেকে মোটর বাইকে ৭৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলাম  এবছরের ২ রা মার্চ সকালে। প্রথমে সিউড়ি, তারপর পাঁড়ুই ছুঁয়ে সিয়ান গ্রামের ভেতর দিয়ে বোলপুরকে পাশে রেখে গঙ্গারামপুরের দিকে ৩ কিলোমিটার গিয়ে তিলুটিয়া, পো: কুরুম্বা, ঠিকানা–উদয়ন কল‍্যাণ কেন্দ্র। ১৯৬০ সালের ডিসেম্বরে প্রচার মাধ্যমে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল এই তিলুটিয়া গ্রামকে নিয়ে। স্থানীয় কুরুম্বা মুকুন্দলাল উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা ও ভূগোলের শিক্ষক ঋষি কবি এনামূল হক তাঁর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নিজের গ্রাম এই তিলুটিয়ায় ১৯৫২ সালে গড়ে তুলেছিলেন “বাপুজী আশ্রম।” গড়ে ওঠে একটি পাবলিক লাইব্রেরি এবং বেড়গায়ের আদিবাসী সাঁওতাল ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটি নৈশ বিদ্যালয়। তিলুটিয়ার দাস পরিবারের পরিবারের ছেলেমেয়েরাও সেখানে পড়াশোনা করতো। রাস্তা ঘাট পরিস্কার রাখা, হাজামজা পুকুরের সংস্কার, মাছ চাষ–এসব শুরু হয়েছিল। আজকের দিনের একশো দিনের কাজের ভাবনাটা ১৯৫২ সালেই বাস্তবে রূপদান করেছিলেন শিক্ষক এনামূল হক। দুর্গাপুজোর পর আশ্রমে ছাত্রছাত্রীরা বিজয়া সম্মেলন করতো, হিন্দু পরিবারের ছেলেরা মুসলমান পরিবারের ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দিতো বাড়িতে মায়ের হাতে তৈরি নাড়ু। তারপর চলতো মহাভোজ। ১৯৫৫ সালের বিজয়া সম্মেলনের দিন শিক্ষক এনামূল হক তুলে ধরলেন তাঁর নতুন প‍রিচয়–তিনি কবি। বাংলা ভাষায় “ডিঙি” এবং ইংরেজিতে “ক‍্যারাভেন” কাব্য গ্রন্থ দুটির জন্য বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ঘোষণা করা হলো, এখন থেকে তিনি ঋষি কবি এনামূল হক। এরপর ঋষি কবির কন্ঠ মুখর হলো, আমি ভুলেও ভুলতে পারিনা এই পৃথিবীতে কত জাতির কত উপাসনা ঘর। আমার এমন যোগ্যতা নেই যে, আমি সেখানে পায়ের ধুলো রাখি। মেথরের মেথর আমি এই পৃথিবীর, শূদ্রের শূদ্র আমি, আমি তোমাদের শূদ্রোত্তম। জাতিতে আমি “মানুষ।” আর তোমরা আমার দেবতা। শুধু ভালোবাসা দেবো তাই, আর নেবো তাই। তোমরা ভালোবাসায় আপন করে নাও পৃথিবীকে, যে পৃথিবীতে কোনো অস্ত্র কারখানা থাকবে না, যে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে অস্ত্র তৈরির কাজে, সেই টাকা খরচ হবে মানব কল‍্যাণে। পৃথিবীর সকল নাগরিক হবে বিশ্ব নাগরিক। এই ভাবনায় ১৯৬০ সালে ১১ টি হিন্দু-মুসলমান পরিবারের ৫৫ জন সদস্য নিয়ে ৫৮ বিঘে জমির ওপর গড়ে উঠলো “উদয়ন কল‍্যাণ কেন্দ্র।” প‍্যারিসের প‍্যারি কমিউনের আদলে গড়ে ওঠা এই আশ্রমে চালু হলো ৭ টি কর্মকেন্দ্র –কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বাণিজ্য, দুগ্ধ, ম‍ৎস‍্য ও পক্ষীকেন্দ্র বা আধুনিক পোল্ট্রি। এক কথায় তৈরি হলো বিশ্ব পরিবারের বিন্দুতম সংস্করণ। ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই নয়, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব ভাই এক এক ঠাঁই। ইতিমধ্যে দার্শনিক কবি এনামূল হক তাঁর পারিবারিক জন্মগত খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের নতুন নাম নিলেন “আচার্য শ্রীশূদ্রোত্তম।” শিক্ষকের শিক্ষক তিনি, তাই তিনি “আচার্য।” সেই সঙ্গে এই আশ্রমের মানুষেরাও পরিচিত হলেন নতুন নামে, যে নামে কোনো পদবি নেই। যেমন, কর্মসচিব দেবিদাস মজুমদার হলেন “শ্রীদেবেন্দ্র”, শিল্প সচিব   সেখ সাইদার রহমান হলেন “শ্রীরাজেন্দ্র”, শিশু মেলার সম্পাদক কাজী সামসুজ্জোহা হলেন “শ্রীসমরেন্দ্র”, সেখ ইসরাইল হলেন “শ্রীঅভয়”, সুশান্ত দত্ত হলেন “শ্রীতাপস”, এমনকি, আচার্যদেবের আপন পুত্র প্রথিতযশা শিক্ষক “শ্রীবিশ্বজিৎ।” কোনো বাধাই থামাতে পারেনি আচার্যদেবের বিজয় রথ। মৌলবাদীরা গুজব ছড়িয়ে দিলো, তিনি নাকি এলাকার সব মুসলমানদের ধরে ধরে হিন্দু করছেন। বিষাক্ত হয়ে উঠলো এলাকার বাতাস। তারপর একদিন রাতে এলাকার ধর্মান্ধ মুসলমান মৌলবাদীদের হাতে আক্রান্ত হয় আশ্রম। নিহত হয় আক্রমণের নেতাটি। আশ্রমিকদের জেল হয়। জেলে আচার্যদেবের ঋষি অরবিন্দর মতো ঈশ্বর উপলব্ধি ঘটে। এরপর তিনি হলেন তপস্বী। আচার্যদেবের মাসতুতো ভাই ৯০ বছর বয়সী প্রবীণ মোল্লা আব্দুল হালিম দৃঢ়ভাবে জানালেন, এই আশ্রম থাকবে,। কারণ, সত‍্যের ওপর এটি প্রতিষ্ঠিত।              আচার্যদেব তিলুটিয়ার আশ্রমে এখন চিরনিদ্রায় শায়িত। কিন্তু কর্মযজ্ঞ চলছে। হোলির সময় সাহিত্য সভা, শিশু মেলা চলে দুদিন ধরে। বিশাল আয়োজন। অস্থির সময়ের মৌলবাদকে উপেক্ষা করে মানুষকে চির সত‍্যের মানবতার পাঠ দিচ্ছে তীর্থভূমি তিলুটিয়া। বীরভূমের সামাজিক ইতিহাসে আচার্য শ্রীশূদ্রোত্তম একটি মাইল স্টোন। প্রণাম আচার্যদেব। প্রণাম তীর্থভূমি তিলুটিয়া। বাইরে বেরিয়ে এসে মন বলে উঠলো, “হে নূতন, দেখা দিক আর বার।”…ছবি : তিলুটিয়া উদয়ন কল‍্যাণ কেন্দ্র ও আচার্য শ্রীশূদ্রোত্তম ।

    ছবি উত্তম মন্ডল

    1 COMMENT

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here