বাংলা লেখার বাঁক বদল এবং বর্ণপরিচয়ের আসল নকল

    1
    bengali language

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    বদলে যাচ্ছে বাংলা ভাষা। না, এ বদল কোনো ব‍্যাকরণ মেনে হচ্ছে না, অথচ ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে ওলোট-পালোট হয়ে যাচ্ছে এ ভাষার ব‍্যাকরণটাই। যেমন ধরুন, কেউ হয়তো বলছে, আরে ফোট বে, মেরে মুখের জিওগ্রাফি চেঞ্জ করে দেব। আবার দেখুন,আমার বাড়ি এই নিকটেই হ‍্যায়, তুম মেরা পোঁদ মে , পোঁদ মে আ যাও, অর্থাৎ আমার বাড়ি এই কাছেই। তুমি আমার পিছু পিছু চলে এসো। এখানে দেখুন, হিন্দি-বাংলার জোর করে মাখামাখি। এমনিভাবে প্রায় প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে বাংলা ভাষা। আর এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছর পরেই প্রকৃত বাংলা ভাষাকে খুঁজে পেতে সত্যিই কঠিন হবে। তখন হয়তো আমাদের “আ মরি বাংলা ভাষা”-কে খুঁজতে হবে ইতিহাসের পাতায়।
    কথায় কথায় বাংরেজি ভাষায় অর্থাৎ বাংলা-ইংরেজি ভাষায় কথা বলার অভ‍্যেস আমাদের অনেকদিন আগে থেকেই হয়ে গেছে। “বড্ড বোর্ ফিল্ করছি” কিংবা “এখন ভীষণ টায়ার্ড লাগছে” –এ ধরণের কথা তো আমরা হামেশাই বলে থাকি।

    আরও পড়ুন:জীবন শেষের দিনগুলিতে বিদ‍্যাসাগর


    কথায় কথায় বাঙালি রেগে গেলে এখন বলে, “থোবড়া চেঞ্জ করে দেবো।” এই যে নয়া বাংলা ভাষা, এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয় বৈকি!
    বাংলাভাষাকে রুচিশীল, গতিশীল ও শ্রুতিমধুর করতে রবি ঠাকুর, নজরুল, মাইকেল, বিদ‍্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র কত না ভাবনা চিন্তা করে শব্দ প্রয়োগ করেছেন। সেই মধুর বাংলা ভাষার এ কী হাল ! অথচ কোথাও কোনো খেদ নেই। টিভির পর্দা জুড়ে এ রকম নয়া বাংলা ভাষা দেখে মনে হয়, বাংলা ভাষাকে বুঝি খুন করা হচ্ছে ! অথচ আমরা প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস পালন করি। বাংলা ভাষার জন্য অনেক বোলচাল করি। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তারপর সব বেমালুম ভুলে যাই। টিভির পর্দার সামনে বসে পড়ি পাঁচ মিশেলি বাংলা ধারাবাহিক দেখতে।
    রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ” মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ।” আর আমাদের এই প্রিয় বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে নতুন প্রজন্মের রুচিশীল কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-প্রাবন্ধিকদেরই দায়িত্ব নিতে হবে।
    একটা জাতির পরিচয় হলো তার মাতৃভাষা। আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশ অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। অথচ আমরা মাতৃভাষাকে দিন দিন বিকৃত করে চলেছি।
    একদল ভাড়াটে লেখক আছেন, যারা কিছু নতুনত্ব আনার জন্য বাংলা ভাষায় উদ্ভট সব শব্দ আমদানি করে চটজলদি চমকে দিতে চাইছেন। কিন্তু এর ভাবীফল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। বাংলা সাহিত্যের অগ্রগতির পথে এই ধরণের ভাষা ঘোলা জলের শ‍্যাওলার মতো। একটু রুচিশীল মানুষের ঢেউ পেলেই আপনি তা সরে যাবে।
    বাংলায় বৈষ্ণব সাহিত্যের কথা চিন্তা করুন।
    বড়ু চণ্ডীদাসের পদগুলি কি মধুর বাংলায় লেখা। যেমন, :
    “সই কেবা শুনাইল শ‍্যাম নাম—
    কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো—
    আকুল করিল মোর প্রাণ।”
    এর পাশে আজকের উদ্ভট বাংলা ভাষা কি দাঁড়াতে পারে ?

    আরও পড়ুন:তেমুজিন থেকে চেঙ্গিস খান, যাযাবর ও যাযাবর থেকে মোঙ্গল জাতি তৈরির ইতিবৃত্ত


    বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে একদিন বৌদ্ধ চর্যাপদের লেখক কাহ্নপাদের হাত কেটে নিয়েছিল ব্রাহ্মণ‍্যবাদী পণ্ডিতের দল। শুধু তাই নয়, তাঁর সাধনসঙ্গিনী ডোম্বীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল। তারপর বাংলা ভাষার ওপর রাজরোষ তো ছিলই। তাই এসব বাধাকে তুচ্ছ করে বিদ‍্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের দেড়শো বছর যখন পেরিয়ে গেল, তখন তো তার অগ্নি পরীক্ষা হয়েই গেল।
    বিদ‍্যাসাগরের “বর্ণপরিচয়”-য়ের কথা যখন উঠলো, তখন এখানে দু’একটি কথা বলতেই হয়।
    ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা লিখিত “বর্ণপরিচয়” লেখকের জীবদ্দশায় ২৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়ে নজির তৈরি করেছিল। বিদ‍্যাসাগরের জীবদ্দশায় মাত্র ২ বার এর সংস্কার হয়।
    আর বিদ‍্যাসাগরের লেখা “বেতালপঞ্চবিংশতি’ বইটি ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের পাঠ‍্যসূচিতে।
    বর্ণপরিচয়ে রাম, যতীন,গোপাল, যাদব, ঈশান নামে বালক চরিত্র আছে। এসেছে মাসি। বিদ‍্যাসাগর বুঝেছিলেন, এসব গল্প শিক্ষকরা পড়াবেন।
    এখনকার বর্ণপরিচয়ের পাতায় ছবি দেখা যায়। কিন্তু আসল বর্ণপরিচয়ের পাতায় কোনো রকম ছবি ছাপা ছিল না।
    বিদ‍্যাসাগরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্র আসল বর্ণপরিচয়কে বিকৃত করে ছবি ছাপেন এবং যথেচ্ছ সংযোজন বিয়োজন ঘটান। তৈরি হয় নকল বর্ণপরিচয়, যা এখন আমরা চোখে দেখি।
    কিন্তু আমাদের দরকার বিদ‍্যাসাগরের লেখা আসল “বর্ণপরিচয়।”
    এরপর স্কুল পাঠ‍্যসূচিতে আসল, না নকল–কোন্ “বর্ণপরিচয়” যুক্ত হয়, এখন সেটাই দেখার।

    1 COMMENT

    1. ভাষা কিন্তু পাল্টাবেই। চর্যাপদের ভাষা আজ আমরা বুঝতে পারি না বিশেষ ভাবে ভাষাতত্ব না জানলে। বিদেশি শব্দ ঢুকবে। খারাপ শব্দ, অর্থাৎ স্ল্যাং ঢুকবে।
      যত দিন যাবে, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যত ব্যবসা, যোগাযোগ বাড়বে, একেকটি ভাষা পৃথিবীর বুক থেকে উবেও যাবে। সে আমি আপনি তার জন্য যাই করি, ভাষা নদীর মত। যত বয় জলের রঙ পালটায়, অন্য নদীতে এসে পড়লে, যার স্রোত বেশি তার দিকেই চলে।
      সরকার কি ভাষা বদলে দিতে পারে? পারে, যদি খুব জোর করে, আর মানুষের ইচ্ছা থাকে। চীনে তাই হয়েছে। কয়েকশো ভাষা মিশে গেছে। ভারতে তা হবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে হবে না তা বলা যায় না। ২০১৯ এর বাংলা ১৯১৯ এর থেকে আলাদা৷ ২১১৯ এর থেকে আরো আলাদা হবে।
      কোন ভাষার স্রোত বেশি? কার সাথে মিশে যায় অন্য ভাষা? সেই ভাষা যা ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত হয়।
      প্যারিসে বেড়াতে এসে দিব্যি ইংরেজিতে চালিয়ে দিলাম এই কারণে।
      আমি ব্যক্তিগত ভাবে এই নিয়ে চিন্তান্বিত নই।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here