লোকমাতা রাণী রাসমণি ও সমকালীন বাংলা

    0
    RANI RASHMONI AND BENGAL AT THAT PERIOD

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল
    ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের জন্মলগ্নে অজ পাড়াগাঁয়ের এক গরীব মাহিষ‍্য পরিবারের মেয়ে কলকাতার বিত্তবান বনেদি বাড়ির বধূ হয়ে এসে যে আশ্চর্য কর্মদক্ষতা, তেজস্বিতা ও মাতৃস্পর্শ দিয়ে বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে যে অনতিক্রম‍্য ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেই লোকমাতা রাণী রাসমণিকে এ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই এই প্রয়াস।…
    কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছতে ,চলুন, আমরা পিছিয়ে যাই বাংলা ১২০০ সনের ১১ আশ্বিনের দেবীপক্ষের সকালে। ইংরেজি ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৭৯৩, মঙ্গলবার, সকাল ৭-১০ মি। পাঁজিতে দেখা যাচ্ছে, তখন রোহিনী নক্ষত্রযোগ। আশ্বিনের দেবীপক্ষের এই শারদপ্রাতে রামপ্রিয়ার কোল আলো করে এলো তাঁর স্বপ্নে দেখা রাধারাণী। বর্তমান উত্তর ২৪ পরগণার সাধক রামপ্রসাদের স্মৃতিধন্য হালিশহরের কাছে কোণা গ্রামের হরেকৃষ্ণ দাসের বাড়িতে বেজে উঠলো শাঁখ। মা রামপ্রিয়ার ইচ্ছে, রাস উৎসবের স্বপ্নে পাওয়া মেয়ে বলে তার নামের সঙ্গে “রাস” কথাটা থাক্, তাই নাম হলো “রাসমণি।” বাবা হরেকৃষ্ণ ডাকেন, “রাণী।” বাড়িতে দুই ছেলে রামচন্দ্র ও গোবিন্দ আর বিধবা বোন ক্ষেমংকরীকে নিয়ে হরেকৃষ্ণর অভাবের সংসারে এখন চাঁদের হাট।

    আরও পড়ুন: গিনিপিগের ভূমিকায় মানুষ “রোমথা” ও সমাজকল‍্যাণে অপরাধীরা


    ১৮০৪ সালের ২১ এপ্রিল কলকাতার জানবাজারের ধনী জমিদার প্রীতিরামের কনিষ্ঠ পুত্র রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে খুবই সাধারণভাবে বিয়ে হলো রাসমণির। এর আগে পর পর রাজচন্দ্রের দুই স্ত্রী মারা গিয়েছে অকালে। কিন্তু এবারের বিয়েটা হলো রাজযোটক। বাপের বাড়িতে রাসমণি ছিলেন সবার মা, এখানে এসেও শ্বশুর-শ্বাশুড়ি থেকে দাস-দাসী,কর্মচারী,দারোয়ান—সবার কাছেই হয়ে উঠলেন সেই মা।
    ১৮২৩ সালে মারা গেলেন হরেকৃষ্ণ। বাবার পারলৌকিক ক্রিয়া-কর্মের জন্য অনেক টাকাই পাঠালেন রাসমণি। আর সে বছরই বন‍্যায় ভেসে গেল বাংলার বহু মানুষের ঘর-বাড়ি। হাজার হাজার মানুষ একমুঠো খাবারের খোঁজে তখন কলকাতার রাস্তা-ঘাটে ঘুরছে। সামান্য সরকারি সাহায্যে মিটলো না সে মহামারির সমস্যা। রাসমণির আবেদনে স্বামী রাজচন্দ্র খুলে দিলেন তাঁর জানবাজার প্রাসাদের অতিথিশালার দরজা। সেখানে আহার আশ্রয় দুই-ই পেল আর্ত মানুষের দল। বন‍্যা থামলে ফিরে যাবার সময় চাষ আবাদের জন্য হাতে নগদ টাকাও পেল তারা। গোটা বাংলা সেদিন চিনলো করুণাময়ী রাণীমাকে।

    আরও পড়ুন: এদেশের মানুষের গলা কাটছে চিনা সুতো।


    ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতায় “বাবু” লোকের অভাব ছিল না। তাদের অনেকের-ই পয়সা গেছে বে-হিসেবি বিলাসিতায়। কিন্তু বাবু রাজচন্দ্র দাসের কীর্তি রয়ে গেছে কলকাতার বুকে বাবুঘাটে, বেলেঘাটা খালের পুলে, নিমতলার শ্মশানঘাট থেকে ইণ্ডিয়া গেজেটের পাতায়, মেটকাফ হলে লাইব্রেরি তৈরির ইতিহাসে এবং অন্যদিকে টোনা খাল, সোনাই বাজার, যদুবাবুর বাজার থেকে আজকের দক্ষিণেশ্বর পর্যন্ত রাণীমার কথা বলে শেষ করা যায় না।
    ৫৩ বছর বয়সে ১৮৩৬ সালের ৯ জুন মারা গেলেন বাবু রাজচন্দ্র। রাণীমার বয়স তখন ৪৪। রাণী হলেন যোগিনী। শক্ত হাতে হাল ধরলেন জমিদারির। সেজন্য জমিদারি সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্রে ব‍্যবহারের জন্য তৈরি করলেন নিজের নামে শীলমোহর ” কালীপদ অভিলাষী শ্রীরাষমণি দাসী‌।”

    আরও পড়ুন: মানুষ থেকে দেবতা!


    বাড়িতে শুরু হলো আবার বারো মাসে তেরো পার্বণ। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর রাণীমার কাছে ম‍্যানেজারির চাকরি চাইতে এসেছিলেন, উল্টে তাকেই লিখে দিতে হলো রাজচন্দ্রের কাছে ২ লাখ টাকা দেনার দায়ে রংপুর ও দিনাজপুরের অন্তর্গত স্বরূপনগর পরগণাটি, যেখান থেকে বছরে খাজনা আসতো ৩৬ হাজার টাকা। এছাড়া নড়াইলের অত‍্যাচারী জমিদার রামরতন রায়কে জব্দ করে এবং মকিমপুর পরগণার নীলকুঠির কর্তা ডোনাল্ড সাহেবকে শায়েস্তা করে রাণী রাসমণি প্রজাদের স্বস্তি দিয়েছিলেন। এদেশে নীলকরদের অত‍্যাচার রুখতে রাণীমা দেখালেন নতুন পথ। গঙ্গা ইজারা নিয়ে জেলেদের মাছ ধরার জীবন-জীবিকা ফিরিয়ে দেন ইংরেজদের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করে। একবার চৌরঙ্গীর ইংরেজ সাহেবদের বেয়াদপির প্রতিবাদে বন্ধ করে দিয়েছিলেন কোম্পানির রাস্তা। যে সময় অনেক ধনী বাঙালি মেতেছিল ইংরেজ ভজনায়, সে সময় ইংরেজ সরকারের বহু অন‍্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন রাণীমা। গোরাদের অত‍্যাচারে অসিও ধরেছিলেন তিনি। বহু গরীব ছাত্রকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং তাদের খাওয়া-পরা ও লেখাপড়ার খরচ বহন করা ছাড়াও হাত খরচের জন্য মাসিক বৃত্তিও দিতেন। ‌ তাই সেকালের কলকাতার রাস্তায় শোনা যেতো তাঁর নামে গান :
    কলকাতায় রাজা আছে অনেকগুলো
    রাণী আছে একজন-ই
    যার কেউ নেই তার আছে
    দেশের রাণী রাসমণি।

    আরও পড়ুন: নেটফ্লিক্সকে ‘হিন্দুবিরোধী’ ও ‘দেশদ্রোহী’ তকমা এঁটে থানায় অভিযোগ দায়ের শিবসেনা নেতার


    রাজা রামমোহন রায়ের সতীদাহ আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন রাণীমা। আবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনেও তিনি সমর্থন ও অর্থ—দুই-ই জুগিয়েছেন।
    ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে অনেক বাধার পাহাড় পেরিয়ে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করলেন রাণীমা। তাই রাণীমাকে বাদ দিয়ে দক্ষিণেশ্বর মহিমার ইতিহাস অসম্পূর্ণ। দক্ষিণেশ্বর-জননী রাণী রাসমণি এখানেই তৈরি করলেন শ্রীরামকৃষ্ণকে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরেই হুগলির কামারপুকুরের গদাধর চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীকালে হলেন অবতার-বরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ। অনেকে বলেন, “যত মত, তত পথ” কথাটি রাণীমার-ই সৃষ্টি। আরও শোনা যায়, রাণীমা তাঁর মায়ের নাম রামপ্রিয়ার “রাম” এবং বাবার নাম হরেকৃষ্ণর ” কৃষ্ণ” শব্দ দুটি মিলিয়ে তৈরি করেছিলেন ভবতারিণী মন্দিরের “ছোট ভটচাজ্ ” গদাধরের নতুন নাম “শ্রীরামকৃষ্ণ।” কিন্তু রামকৃষ্ণ সাহিত্য রচয়িতারা একবারও সে প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেন না। উল্টে শ্রীম কথিত কথাটিই বার বার বলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ চড় মেরেছিলেন রাণীমার গালে। কিন্তু ইতিহাস বলে,”শ্রীম” অর্থাৎ মাস্টারমশাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসেন তাঁর জীবনের শেষ পর্বে ১৮৮১ সালে। রাণীমা তার প্রায় বিশ বছর আগে চলে গেছেন জগৎ ছেড়ে ১৮৬১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। তাই বলা যায়, মাস্টার মশাই যা লিখেছেন, তা একেবারে কল্পিত কাহিনী। এই বিবরণ কোনোমতেই প্রত‍্যক্ষদর্শীর নয়।

    আরও পড়ুন: প্রকৃতিতে সমকাম

    রামকৃষ্ণ সাহিত্য রচয়িতারা বার বার রাণীমার জাত তুলে কখনও তাঁকে “শূদ্রাণী”, কখনও “কৈবর্ত”, আবার কখনও “মাহিষ‍্য” বলেছেন। বিশদে বলেননি তাঁর অবদানের কথা।
    রাণী রাসমণি প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বর-ই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে স্বাধীন ভারত গঠনের সাধনক্ষেত্র। অমর চট্টোপাধ্যায়, রাসবিহারী বসু ও বাঘা যতীনের মতো মহান বিপ্লবীরা এখানে বসেই দেখেছিলেন স্বাধীন ভারত গড়ার স্বপ্ন। একসময় এই দক্ষিণেশ্বর-ই হয়ে উঠেছিল বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্রবিন্দু। আর এই ক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠাত্রীর দুটি স্বতন্ত্র নাম “রাণী” ও “রাসমণি” মিলে লোকমুখে পরিচিত হয়ে হলো “রাণী রাসমণি।” সরকারের কাছ থেকে “রাণী” উপাধি না পেলেও তিনি হলেন জনগণের হৃদয়ের রাণী। যে গোঁড়া ব্রাহ্মণ‍্যবাদ একদিন দেশের বহু মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করে স্বধর্ম ত‍্যাগে পর্যন্ত বাধ্য করেছে, সেই তথাকথিত ধর্মের ধ্বজাধারীদের অনেকেই রাণীমার অন্ন ও অন‍্যান‍্য দান গ্রহণ করে তাঁকেই হেয় করার চক্রান্ত করেছেন। ইতিহাস তাঁদের চিরকাল-ই চক্রান্তকারীই বলবে, আর অন‍্যদিকে রাণী রাসমণির অনতিক্রম‍্য অমর কীর্তির সামনে আপামর মানুষ ভগিনী নিবেদিতার ভাষায় বলবে, “রাণী রাসমণির অবিস্মরণীয় কীর্তি দক্ষিণেশ্বরে মন্দির ও দেবদেবী প্রতিষ্ঠা। এই কীর্তি তাঁকে শুধু কীর্তিময়ী করেনি, বাঙালি জাতিকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।”
    হে নারী ঋষি, তোমায় শতকোটি প্রণাম!..

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here