মোগল সম্রাট আকবরের “রায়বাঘিনী” রাণী ভবশঙ্করী এবং ভূরশুটের মোগল-পাঠান দ্বন্দ্ব।

    0
    Rani Bhavashankari

    Last Updated on


    –উত্তম মণ্ডল

    সময়কাল : ১৫৫৬-১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ।
    দিল্লির মসনদে তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবর।
    এদিকে সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে বাংলায় তখন চলছে মোগল-পাঠান দ্বন্দ্ব।
    এই সময় সাড়া পড়ে গেল রাণী ভবশঙ্করীকে নিয়ে। ভবশঙ্করী মানে ভূরশুট রাজ‍্যের রাণী ভবশঙ্করী।
    পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান হাওড়া ও হুগলি জেলা মিলে একসময় গড়ে উঠেছিল ভূরশুট রাজ‍্য। “ভূরিশ্রেষ্ঠ” থেকে ভূরশুট। এলাকাটি একসময় নাম ছিল ভূরিশ্রেষ্ঠ নগর। শ্রেষ্ঠ বণিকরা এই নগরে বাস করতো বলেই নাম হয় ভূরিশ্রেষ্ঠ। নগরের পাশ দিয়ে বয়ে যেত দামোদর নদ ও রণ নদী। এই দুই নদীপথে বাণিজ্য চলতো। এলাকায় এখনো বেশকিছু বনেদি পরিবার বসবাস করছেন।
    ফিরে আসি ভবশঙ্করীর কথায়।
    ভবশঙ্করী ছিলেন ব্রাহ্মণ কন‍্যা। পিতা দীননাথ চৌধুরী ছিলেন পেঁড়োর জমিদারের অধীনস্থ পেঁড়ো দুর্গের সেনাপতি। বেশ লম্বা-চওড়া চেহারার মানুষ ছিলেন দীননাথ। রণকৌশলে ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। ভূরিশ্রেষ্ঠ নগরের গণ‍্যমান‍্য ব‍্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি।

    আরও পড়ুন :অবহেলায় পড়ে বীরভূমের পাইকরে পালযুগের শিলালিপি।


    এই পেঁড়োতেই জন্ম হয় ভবশঙ্করীর। পিতার দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছিলেন ভবশঙ্করী। ছোট ভাইয়ের জন্মের সময় মৃত্যু হয় তাঁর মায়ের। যখন তাঁর ভাই বিমাতার কাছে বড় হচ্ছে, তখন ভবশঙ্করীর দিন কাটছে পিতার সাহচর্যে। এভাবে শৈশবেই ভবশঙ্করী পিতার কাছে থেকে অস্ত্রবিদ‍্যা, ঘোড়ায় চড়া ও তীরন্দাজিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এরপর কূটনীতি, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব ও দর্শণের পাঠ নেন।
    যুবতী ভবশঙ্করী একদিন দামোদর ও রণ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে শিকারে গেছেন। একটি হরিণকে তাড়া করার সময় একটি বুনো বাইসন আক্রমণ করলো তাঁকে। ভবশঙ্করী এক হাতেই মেরে ফেললেন সেই বাইসনটিকে।
    ওই সময় ভূরিশ্রেষ্ঠরাজ রুদ্রনারায়ণ নৌকোয় চেপে দামোদর বেয়ে কাষ্ঠসাংড়ার দিকে যাচ্ছিলেন। এই ঘটনা দেখে রীতিমতো অবাক হলেন তিনি। এই মেয়েকেই তিনি বিয়ে করবেন বলে মনস্থির করলেন।
    সেইমতো ভূরিশ্রেষ্ঠ নগরের রাজপুরোহিত হরিদেব ভট্টাচার্যের পৌরোহিত‍্যে ভবশঙ্করীর সঙ্গে বিয়ে হলো রাজা রুদ্রনারায়ণের।
    বিয়ের পর দামোদরের তীরে গড়-ভবানীপুরের পাশেই তৈরি হলো নতুন রাজবাড়ি। ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজবংশের কুলদেবী ছিলেন রাজবল্লভী। দেবী চণ্ডীর একটি রূপ এই দেবী রাজবল্লভীর নাম থেকেই ভূরিশ্রেষ্ঠ রাজ‍্যের পুরোনো রাজধানী “রাজবলহাট” নামটি এসেছে।
    রাণী ভবশঙ্করী দেবী রাজবল্লভীর অষ্টধাতুর মূর্তি তৈরি করালেন। মায়ের কাছে মানত করে তিনদিন উপবাস থাকার পর রাণী ভবশঙ্করী গড়-ভবানীপুরের লেকের জলে স্নান করতে গেলেন। আর সে সময় জল থেকে পেলেন মায়ের স্বপ্নাদিষ্ট তরবারি। এই তরবারি হাতে থাকলে কেউ কোনোদিন তাকে হারাতে পারবে না, এই ছিল দেবী রাজবল্লভীর বর।

    আরও পড়ুন :বীরভূমের দুই বীররাজা ও এক রাজনগর


    এরপর ভবশঙ্করীর কোলে এলো রাজকুমার প্রতাপনারায়ণ। ছেলের বয়স যখন পাঁচ বছর, মারা গেলেন রাজা রুদ্রনারায়ণ। রাজ‍্যের ভার এসে পড়লো রাণী ভবশঙ্করীর ওপর।
    স্বামীর মৃত্যুর পর তিন মাস ব্রহ্মচারিণী হয়ে ছিলেন রাণী ভবশঙ্করী। কাষ্ঠসাংড়ার শিবমন্দিরে রাণী ভবশঙ্করী শৈব সাধনায় নিয়োজিত করলেন নিজেকে। এখানে প্রতিদিন শিব-কীর্তন হতো। সন্ন্যাসী ও ভিক্ষুকদের জন্য ছিল প্রসাদের ব‍্যবস্থা। সঙ্গে থাকতো পুত্র প্রতাপনারায়ণ।
    তপশ্চর্যায় জীবন কাটানোর পাশাপাশি রাণী ভবশঙ্করী রাজ‍্যের সামরিক ব‍্যবস্থাকেও ঢেলে সাজালেন। তাঁর সময়ে শৌর্যে-বীর্যে, কৃষি, বাণিজ্য, তাঁত শিল্প ও ধাতু শিল্পে সমৃদ্ধ হয়ে উঠলো ভূরশুট রাজ‍্য।
    এদিকে আধিপত্য কায়েম নিয়ে বাংলায় তখন চলছে মোগল-পাঠান দ্বন্দ্ব। মোগলদের তাড়া খেয়ে পাঠানরা তখন আশ্রয় নিয়েছে উড়িষ্যায়। সেখান থেকে ফের বাংলায় আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হলেন পাঠান সর্দার ওসমান খান।
    রাণী ভবশঙ্করী বাংলার মোগল-দ্বন্দ্বে নিজেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ রেখেছিলেন। কিন্তু পাঠান সর্দার ওসমান খান মোগলদের বিরুদ্ধে রাণী ভবশঙ্করীর সাহায্য চাইলে তিনি তা নাকচ করে দেন। এতেই রাগ হয় ওসমানের।
    রাণীর দেওয়ান ছিলেন দুর্লভ দত্ত , প্রধান সেনাপতি ছিলেন চতুর্ভূজ চক্রবর্তী। বেইমানি করলেন প্রধান সেনাপতি এই চতুর্ভূজ চক্রবর্তী। তিনি গোপনে হাত মেলালেন পাঠান সর্দার ওসমান খানের সঙ্গে।
    পাণ্ডুয়ার কাছে গড়-ভবানীপুর ছিল ভূরশুটের তদানীন্তন রাজধানী। সেখান থেকে ১৪ মাইল দূরে বাসডিঙা গড়ের কালীমন্দিরে একদিন সন্ধ্যায় পুজো দিতে যান রাণী ভবশঙ্করী। সুযোগ বুঝে দলবল নিয়ে পাঠান সর্দার ওসমান খান আক্রমণ করলেন রাণী ভবশঙ্করীকে। মুষ্টিমেয় কয়েকজন মাত্র দেহরক্ষী সেদিন রাণীর সঙ্গে ছিল। তাদের নিয়েই পাল্টা আক্রমণ করলেন রাণী ভবশঙ্করী। রাতের অন্ধকারে দু’পক্ষের মধ্যে চললো তুমুল লড়াই। রাণী ভবশঙ্করীর হাতে ছিল দেবী রাজবল্লভীর স্বপ্নাদিষ্ট তরবারি। চরম পর্যায়ের লড়াইয়ে পরাজিত ও নিহত হলেন পাঠান সর্দার ওসমান খান।
    পরের দিন সকালে রাজধানীতে ফিরে রাণী প্রধান সেনাপতি হিসেবে রাজা ভূপতিকৃষ্ণ রায়কে মনোনীত করলেন।

    আরও পড়ুন :চৌপাহারি, সামন্তরাজ লাউসেন ও দেবী শ‍্যামরূপা


    খবর পেয়ে মোগল সম্রাট আকবর তাঁর সেনাপতি মানসিংহকে পাঠালেন রাণী ভবশঙ্করীর কাছে। দু’পক্ষের মধ্যে হলো বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তি। ঠিক হলো, কেউ কারো রাজ‍্য আক্রমণ করবে না।
    সম্রাট আকবর বীরাঙ্গণা রাণী ভবশঙ্করীকে “রায়বাঘিনী” উপাধিতে ভূষিত করলেন। রাণী ভবশঙ্করী হলেন “রায়বাঘিনী” রাণী ভবশঙ্করী।
    এরপর বহুদিন পর্যন্ত স্বাধীন ছিল ভূরশুট রাজ‍্য।
    শেষ বয়সে পুত্র প্রতাপনারায়ণের হাতে রাজপাট ছেড়ে দিয়ে কাশীবাসী হয়েছিলেন রায়বাঘিনী রাণী ভবশঙ্করী।
    তাঁর স্মৃতিতে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সরকারি উদ্যোগে প্রতি বছর হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে “রায়বাঘিনী ভবশঙ্করী” মেলা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here