তরবারির এক কোপে আজান পীরের মুণ্ডু কেটে দিয়েছিলেন ভদ্রসেন।

    0
    raja bhadrasen and azan pir

    Last Updated on

    —উত্তম মণ্ডল

    সেনরাজত্বের সময় বাংলায় ইসলামধর্ম প্রচারে এসেছিলেন বিভিন্ন পীরের দল। এইরকমই এক পীর ছিলেন জেলা বীরভূমের পাইকর গ্রামের আজান পীর। ইসলামধর্ম ও ইসলামীয় উপনিবেশ স্থাপনের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন সুদূর বোগদাদ থেকে। তাঁরা তিন ভাই। বড় ভাই রয়েছেন পাইকরের পাশেই মিত্রপুর গ্রামের মাঠে, মেজ ভাই রয়েছেন পাইকরের কাছে কামারপুর গ্রামে এবং ছোট ভাই এই আজান পীর। পুরো নাম — সৈয়দ শা আজান। আজ এই আজান পীরের কথাই বলবো।
    জেলা বীরভূমের মুরারই রেলস্টেশনে নেমে প্রায় আধ ঘন্টার টোটো পথে পাইকর। পাগলা নদীর তীরে অবস্থিত এই পাইকর।
    পাইকরের পূর্ব নাম “প্রাচীকোট।” সেনরাজ বিজয়সেনের (১০৯৫-১১৫৮ খ্রি:) এক মন্ত্রী ছিলেন পাহি দত্ত। তাঁর সেনাছাউনি বা কোটকে বলা হতো “পাহি কোট।” এই প্রাচীকোট বা পাহি কোট থেকে পরবর্তীকালে এই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “পাইকর।”
    পাইকর গ্রামের পাশেই রয়েছে সেনরাজ বিজয়সেনের স্ত্রী বিলাসিনী দেবীর নামে গ্রাম, নাম—বিলাসপুর। রয়েছে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত “রাণীদীঘি।”

    আরও পড়ুন :বাংলা-গুরু বীরভূম


    এছাড়াও পাইকরে রয়েছে পাল ও সেনযুগের বিভিন্ন পাথরের মূর্তি। সূর্য, মনসা, গণেশ থেকে শুরু করে পালরাজ নয়পালদেবের সঙ্গে চেদিরাজ কর্ণের যুদ্ধের স্মৃতিস্মারক শিলালিপি পর্যন্ত। সুতরাং, এলাকায় পাল ও সেন রাজত্বের প্রমাণ রয়েছে। পাইকরের কাছের এলাকা ভাদীশ্বরে একটি ঢিবিকে লোকেরা রাজা ভদ্রসেনের মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ বলে থাকেন।
    এই এলাকার পীর আজান ইসলামধর্ম প্রচার করতে বেরিয়েছিলেন ঘোড়ার পিঠে চেপে তরবারি হাতে। বাধা দেন এলাকার রাজা ভদ্রসেন, যার পরিণাম যুদ্ধ। যুদ্ধে তরবারির এককোপে পীরের মাথা কেটে ফেললেন ভদ্রসেন। কাটা মাথাটা পড়লো পাইকরের কাঁটাগোড়ায়। পরবর্তীকালে এই জায়গার নাম হয় –মীরপুর। তখনও ছুটে চলেছে পীরের ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে পীরের ধড়। অবশেষে পাইকরে এসে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়লো এই ধড়। এখানে এই পাইকরেই রয়েছে পীরের মাজার। ইসলামধর্মযোদ্ধা আজান পীর এখানে লোকমুখে হয়েছেন “আজান শহীদ পীর।” পাইকর গ্রামের উত্তরদিকে রয়েছে পীরের মাজার। অন‍্যদিকে, রাজা ভদ্রসেন যে স্থানে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন, তার নাম হয় “ফতেপুর।” “ফতে” মানে বিজয়।

    আরও পড়ুন :স্বধর্ম রক্ষায় সুন্দরবনে দক্ষিণ রায়ের লড়াই


    পাইকর থেকে মুরারই-রঘুনাথগঞ্জ রাস্তা ধরে পূর্বে কিছুটা এগিয়েই পড়ে হিয়াতনগর মোড়। এই মোড় থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে হিয়াতনগর গ্রাম। এখানেই প্রাচীন দুর্গ বা কোট ছিল বলে জানা যায়। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ মুসলমান, এর বাইরে কিছু হিন্দু তফসিলি মাল জাতির বাস।
    এর কিছুটা দূরে গ্রাম “ভাগাইল।” পালরাজ নয়পাল ও চেদিরাজ কর্ণ বা লোকমুখে লক্ষ্মীকর্ণের রাজ‍্যসীমার শেষভাগ এই গ্রাম। নাম তাই “ভাগাইল।”
    ভাগাইল গ্রামের লাগোয়া আরেকটি গ্রাম, নাম–লক্ষ্মীডাঙা। চেদিরাজ লক্ষ্মীকর্ণের নামের সঙ্গে জড়িত বলেই গ্রামের নাম “লক্ষ্মীডাঙা।” এই এলাকার সমস্ত গ্রামগুলি বর্তমানে মুসলমান অধ‍্যুষিত। পেশা–চাষবাস।
    পরের গ্রাম “মিত্রপুর।” এখানেই পালরাজ নয়পাল ও চেদিরাজ লক্ষ্মীকর্ণের মধ্যে অতীশ দীপংকরের মধ্যস্থতায় সন্ধি অর্থাৎ মিত্রতা হয়েছিল। তাই গ্রামের নাম মিত্রপুর। এই মিত্রপুরে গ্রামে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের বাস।
    এই এলাকায় আরেকটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ গ্রাম রয়েছে, নাম–ননগড়। নয়গড় থেকে ননগড়, এমনটাই মত পণ্ডিতদের। এই গ্রামে রয়েছে পালরাজ মহীপালের দীঘি।
    রাজা ভদ্রসেনের নাম বাংলার সেনরাজাদের বংশতালিকায় পাওয়া না গেলেও পাইকরের আজান শহীদ পীরের মাজারে গেলেই তাঁর বীরত্বের কথা শোনা যায়। আজান পীরকে “শহীদ” বানানো হলেও রাজা ভদ্রসেন আজও বীরের মর্যাদায় বেঁচে রয়েছেন জেলা বীরভূমের পাইকরের মাটিতে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here