প্রধানমন্ত্রী, এক গাঁওবুড়ো ও বারাসিঙ্গা

    0

    Last Updated on

    স্বাগতা মন্ডল

    সালটা 1973।প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি তে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী । মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট জেলায় একটি তামার খনি আছে । এই বালাঘাট জেলা অঞ্চলে জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া 1969 সাল থেকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে খোঁজ চালাচ্ছিল , কোথায় কোন ধাতুর আকরিক পাওয়া যায় । হিন্দুস্তান কপার লিমিটেড কে তামার আকরিক নিষ্কাশনের লিজ দেওয়া হয় 1973 সালে । যার ফলশ্রুতিতে 1980 সালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী মালাঞ্জখন্ড কপার লিমিটেড এর উদ্বোধন করেন ।
    গল্পটা সেটা নিয়ে নয় । জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এই বালাঘাট জেলা জুড়ে যখন সার্ভে করে , মধ্যপ্রদেশের এই অঞ্চলে অনেক ধাতু আকরিক পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায় ।

    1973 সালের কোনো একদিন। বিভিন্ন শিল্পপতি , সরকারি উচ্চপদস্থ কর্তা , ও জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কর্তাব্যক্তিদের সাথে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চলছে । কোন জমি থেকে কোন ধাতু পাওয়া যাবে , তারই একটা রূপরেখা ঠিক করে নিচ্ছিলেন সবাই । বৈঠকের শেষ পর্যায়ে শ্রীমতি গান্ধী খবর পান মুক্কি গ্রামের গাঁওবুড়ো তাঁর সাক্ষাৎপ্রত্যাশী । সকাল থেকেই বসে আছেন । মূলত গোঁন্দ ও বাইগা জনজাতির মানুষরাই মধ্যপ্রদেশের বালাঘাট
    জেলার বাসিন্দা ।
    অপরাহ্ন বেলায় ডাক পড়ে গাঁওবুড়োর । শ্রীমতি গান্ধী সমস্ত বিষয়টি নিজে বুঝে দেখার চেষ্টা করতেন । বয়স্ক মানুষটি এসে এক অদ্ভুত আবদার করেন । প্রধানমন্ত্রী কে তাঁর সাথে জঙ্গলভ্রমণে যেতে হবে ! তাঁর স্পষ্ট কথা , বড় মানুষ দের কথা অনেক শোনা হল , এবার সামান্য মানুষদের কথাও শুনতে হবে ! গ্রামপ্রধান খবর পেয়েছেন , জঙ্গলের জমি সরকার নিয়ে নেবে । তামা আছে জমির নীচে । খনি হবে জঙ্গলের জমিতে , কাজ পাবে গ্রামের মানুষ । তাঁকে অনেক বোঝানো হয়েছিল গ্রামের ভালোর কথা ! কিন্তু গাঁওবুড়ো নাছোড়বান্দা ! প্রধানমন্ত্রী কেই মনের কথা বলবেন !
    কি আর করেন প্রধানমন্ত্রী ! পড়ন্ত বেলাতেই হাতিতে চেপে চললেন জঙ্গল ভ্রমণে , পায়ে হেঁটে গাঁওবুড়ো । জঙ্গলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে জঙ্গলের মায়াবী সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ ইন্দিরা গান্ধী । অনেক হরিণ , ময়ূর , বিভিন্ন নাম না জানা পাখিরা উৎসব করছে যেন চারপাশে ! জঙ্গলের মধ্যে এক জায়গায় ঘাসবনের মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা রাস্তা । গ্রামের লোকের চলাচলের ফলে তৈরি । সেই রাস্তায় একজায়গায় থমকে দাঁড়ালেন গাঁওবুড়ো । ইশারায় দাঁড়াতে বললেন হাতিচালককে । সবাই স্থির । সবার নিঃশ্বাসের শব্দ এসে মিশছে পড়ন্ত বেলার বয়ে যাওয়া হাওয়ার শব্দে । অনতিদূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুন্দর হরিণ ! হরিণই তো নাকি একটু অন্যরকম কিছু । এবার মুখ খুললেন গাঁও বুড়ো , বললেন, ”প্রধানমন্ত্রীজি , ভালো করে দেখুন , এরকম আর কোথাও দেখেছেন ?” ছোটবেলা থেকেই দেশ বিদেশ ঘোরার সূত্রে বহু পশু পাখি দেখার অভিজ্ঞতা ছিল শ্রীমতি গান্ধীর । তিনি একটু থমকালেন , তারপর একবাক্যে স্বীকার করেন এরকম হরিণ তিনি দেখেননি সারা পৃথিবীতে । এর নাম কি ? এবার গাঁওবুড়োর পালা । তিনি বলেন এর নাম বারাসিঙ্গা! সারা পৃথিবীতে আর কোথাও নেই ।বৃহৎ গাঢ় বাদামি রঙের হরিণটির শিং এর বাহারে মুগ্ধ প্রধানমন্ত্রী !
    বারাসিঙ্গার ইংরাজি নাম Swamp Deer , এর বৈশিষ্ট্য হল এর বিশাল শিং । প্রত্যেকটি শিং এ তিনটির বেশি শাখাপ্রশাখা আছে । ভূপাল এর ভীমবেঠ্কা গুহাচিত্রে এই বারাসিঙ্গার চিত্র দেখতে পাওয়া যায় । মধ্যপ্রদেশের এই বিস্তীর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ জায়গা প্রাচীন গন্ডোয়ানা ভূমির অংশ । সুপ্রাচীন কাল থেকেই এই প্রজাতির হরিণের বাস এখানে, ওই গুহাচিত্র তার প্রমাণ ।
    তখন সন্ধ্যের অন্ধকার একটু একটু করে দখল নিতে চাইছে পৃথিবীতে লেগে থাকা শেষ সূর্যরশ্মি টুকুকে । দোর্দন্ডপ্রতাপ প্রধানমন্ত্রী গাঁওবুড়োকে জিজ্ঞেস করলেন, ”কি চান আপনি ? আপনি কি চান না এখানে তামার খনি হোক ? আপনার গ্রাম সমৃদ্ধশালী হোক?” গাঁও বুড়ো উত্তর দিলেন, এই জঙ্গলই আমাদের মা । আমাদের ঈশ্বর এখানেই বাস করেন, আমি চাই এই ভূমিতে জঙ্গল থাকুক, আর এই বিশ্বমায়ের আঁচলের এককোণে বেঁচে থাকুক এই বারাসিঙ্গা। আমার পূর্বজদের জঙ্গলের কাছে ঋণ, আমরা গ্রামবাসীরা এভাবেই শোধ করতে চাই । বাকিটা আপনার উপরে।”
    জঙ্গল সাফারি থেকে চিন্তিতমুখে ফিরে আসেন শ্রীমতি গান্ধী । সান্ধ্য বৈঠকে উপস্থিত কর্তাব্যক্তিদের সামনে ঘোষণা করেন , কানহার জঙ্গলের মাটির নীচে যাই থাক, তা মাটির উপরের সম্পদের কাছে কিছুই না । একটা প্রজাতিকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো তামার খনি তৈরির চেয়ে অনেক বেশি জরুরি । বৈঠকে শোরগোল পড়ে যায় ! লাভ ক্ষতির হিসেব কষতে থাকেন শিল্পপতিরা । কিন্তু সমাজের মাপকাঠিতে অশিক্ষিত এক গাঁওবুড়োর কাছে হার মানতে হয় তাদের । কি আর করবেন ! ম্যাডাম এর ইচ্ছা !
    কানহার জঙ্গলে যেতে গেলে মালাঞ্জখন্ড কপার লিমিটেড এর পাশের রাস্তা দিয়েই যেতে হয় । দূরত্ব জঙ্গলের শুরু থেকে প্রায় তেইশ কিলোমিটার। কানহা ন্যাশনাল পার্ক যদিও ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে ঘোষিত হয় পয়লা জুন 1955 তে , 1973 সালেই টাইগার রিজার্ভ হিসেবে ঘোষিত হয় এই কানহার জঙ্গল । আর এই ন্যাশনাল পার্কের ম্যাসকট আজ বারাসিঙ্গা, যার নাম ভুরসিং। এই প্রজাতির প্রায় 900 হরিণের নির্ভয় বিচরণক্ষেত্র এই কানহা ন্যাশনাল পার্ক । আর এই গাঁও বুড়োর গ্রামের মানুষ রাই এই জঙ্গলের সরকারি রক্ষক হিসেবে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here