প্রকৃতিতে সমকাম

0
homosexuality in animal kingdom

Last Updated on

স্বাগতা মন্ডল

হোমোসেক্সুয়াল বা সমকামী এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন কার্ল মারিয়া কার্টবেনি 1868 সালে ।
সমকামিতা -এই শব্দ টা শুনলেই সমাজের একটি বড় অংশের মানুষ বিষয়টিকে নৈতিকতা আর অনৈতিকতার মানদন্ডে মাপতে শুরু করেন । এবং বারবার প্রমাণের চেষ্টা করেন সমকামিতা প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ । যদিও এই ভারতবর্ষে সমকামিতা আইনসম্মত হওয়ার এক বছর পূর্তি হল গত শুক্রবার । ‘কামনা’ নামক মানসিক অনুভবটি কোন প্রাণীটির কাকে দেখলে অনুভূত হয় তার একটি সমাজসম্মত ‘গাইডলাইন’ তৈরি করার চেষ্টা হলেও প্রকৃতি কিন্তু এরকম কোনো বিধিসম্মত আইন তৈরি করার চেষ্টা করেনি । কিসের জন্য , কেন এবং কাকে দেখলে মস্তিষ্কে বায়োকেমিক্যাল পরিবর্তন ঘটবে এবং উদ্দীপনা অনুভূত হবে তার নির্দিষ্ট কোনো প্রকৃতিদত্ত নিয়ম নেই ! শুনতে আশ্চর্য্য হলেও এই বিষয়ে প্রকৃতিতেই বিবিধ উদাহরণ আছে যা তথাকথিত মানুষ সৃষ্ট প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে !

দার্শনিক অ্যারিস্টটল পায়রা, তিতির ও কোয়েল পাখির ক্ষেত্রে এইরকম সমকামী আচরণের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন যিশুর জন্মের 300 বছরের ও বেশি আগে ! চতুর্থ খৃষ্টাব্দে মিশরীয় দার্শনিক তথা পুরোহিত হোরাপোল্লো তিতির পাখি ও হায়েনা এই দুটি প্রাণীর ক্ষেত্রে সমকামিতার আচরণ যে আছে তা হিয়েরোগ্লিফ্লিক্স এ লিপিবদ্ধ করেন। এই হোরাপোল্লো নামটি হোরাস আর অ্যাপোলো থেকে এসেছে । উনি শেষ মিশরীয় পুরোহিতদলের নেতা ছিলেন । ওনার মতবাদ খ্রিষ্টীয় মতের বিপরীত হওয়ায় রাজরোষের শিকার হন । ও মিশর ছেড়ে পালান। আলেক্সান্দ্রিয়ার নিকটবর্তী আইসিস ও ওসিরিসের মন্দির ধ্বংস করা হয় । পলাতক পুরোহিত ধরা পড়ার ফলে প্রভুত অত্যাচারের বশবর্তী হয়ে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন

কানাডার গবেষক ব্রুস বাগেমিহল 1999 সালে Biological Exuberance: Animal Homosexuality and Natural Diversity নামক বইতে প্রথম, স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বনে এই বিষয়ে আলোকপাত করেন। সেখানে উনি পরিষ্কার উল্লেখ করেন, নব্বই এর দশকের আগে অবধিও ঐরকম ‘অ্যানিম্যাল বিহেভিয়র’ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত পর্যবেক্ষণ কখনো করা হয় নি । সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গবেষক মহলেও পর্যন্ত সমকামিতা ছিল ভীষণরকম ‘ ‘ট্যাবু’ ! কিন্তু প্রকৃতিতে আবহমানকাল থেকেই বিষয়টি খুব সাধারণ ভাবেই চলে আসছিল । বাগেমিহল ওঁর গবেষণা লব্ধ তথ্যে সারাবিশ্বে প্রায় পাঁচশ টি প্রজাতির ক্ষেত্রে সমকাম অর্থে কোর্টশিপ , সেক্সুয়াল পেয়ার বন্ডিং এবং পেরেণ্টাল অ্যাক্টিভিটির মতো আচরণ লিপিবদ্ধ করেন।

নরওয়ে তে অবস্থিত Natural History Museum, University of Oslo , 2006 সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে 2007 সালের অগাস্ট মাস অবধি ”Against Nature?” নামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন । সেই প্রদর্শনীর ‘Scientific Advisor’ ছিলেন পিটার বোকম্যান । প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু ছিল প্রাণীজগতের বিভিন্ন প্রাণীদের মধ্যে সমকামিতার ছবি ও মডেল ! বোকম্যানের ভাবনায় প্রাণীজগতে সমকামিতার প্রকাশ আরো বৃহত্তর । প্রায় 1500 প্রজাতির ক্ষেত্রে এই আচরণ লিপিবদ্ধ হয় । বোকম্যান আক্ষেপ করে যা বলেন তা হল , ”No species has been found in which homosexual behaviour has not been shown to exist, with the exception of species that never have sex at all, such as sea urchins and aphis. Moreover, a part of the animal kingdom is hermaphroditic, truly bisexual. For them, homosexuality is not an issue.” অর্থাৎ এমন কোনো প্রজাতি নেই , যার ক্ষেত্রে সমকামিতা পরিলক্ষিত হয় না , একমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয় না যাদের কোনো যৌন আচরণই নেই , যেমন সামুদ্রিক আর্চিন বা অ্যাফিস এর মতো পতঙ্গ , কিছু প্রাণী আছে যারা উভয়লিঙ্গ, এদের কাছে সমকামিতা ভাবনার বিষয় নয় একেবারেই।


কিছু উল্লেখযোগ্য প্রজাতি যাদের ক্ষেত্রে সমকামিতা পরিলক্ষিত হয় , তারা হল :
♦ব্ল্যাক সোয়ান -এক তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে পুরুষ পাখিরা জোড় বাঁধে । ডিমের জন্য একসাথে বা আলাদা করে স্ত্রী পাখির সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর , ডিমটি অধিকার করে স্ত্রী পাখিটিকে তাড়িয়ে দেয় পুরুষ জোড়া । পুরুষদের মধ্যে পরস্পরকে শুভেচ্ছা বিনিময় , স্পর্শ ও জোড়া বাঁধার আগে কোর্টশিপ করতে দেখা যায়। পুরুষসঙ্গী নির্বাচন নিয়ে পুরুষদের মধ্যেই সংগ্রাম করতেও দেখা যায়।
♦পুরুষ ফ্লেমিংগো দের মধ্যেও শিশুপালনের ক্ষেত্রে এরকমই নীতি দেখা যায়।
♦অ্যালবাট্রস -হাওয়াই এর ওয়াহু দ্বীপের একটি অংশে ডিম থেকে সন্তানপালনের ক্ষেত্রে নারী পাখির জোড় পরিলক্ষিত হয়।
♦বন্যহাঁস বা Mallards এর ক্ষেত্রেও ডিম পাড়ার সময় ছাড়া অন্য সময় পুরুষ সমকামিতা লক্ষণীয়।
♦আমেরিকান সাদা আইবিস এর ক্ষেত্রে সমকামিতা লিপিবদ্ধ হয়েছে!
♦পেঙ্গুইনদের ক্ষেত্রে 1911 সাল থেকেই সমকামিতার বিবরণ লিপিবদ্ধ।জর্জ মুরে লেভিক এটি লিপিবদ্ধ করলেও,সেই সময় তথ্যটি জনসমক্ষে আসার আগেই গোপন করা হয় !যেটি 2012 সালে পোলার রেকর্ড এ লিপিবদ্ধ হয় একশো বছরের পর! এই সংক্রান্ত জ্ঞান যাতে সবাই জানতে না পারে তাই শুধু গ্রীক অনুবাদটি সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
♦শকুন এর ক্ষেত্রে পুরুষের মধ্যে এবং স্ত্রী প্রজাতির মধ্যে সমকামিতা লিপিবদ্ধ হয়েছে।
♦পায়রা দের স্ত্রী পুরুষ উভয় ক্ষেত্রে সমকামিতা দেখা যায় ।


♦স্তন্যপায়ীদের মধ্যে অ্যামাজন ডলফিনের মধ্যে সমকামিতা দেখা যায় । প্রসঙ্গত একমাত্র এদের ক্ষেত্রে নাসারন্ধ্রের মাধ্যমে যৌন মিলন দেখা যায়।
♦আমেরিকান বাইসনের পুরুষদের মধ্যে পুরোমাত্রায়
পায়ুকাম পরিলক্ষিত হয়।
♦বাদুড় দের কুড়িটি প্রজাতির মধ্যে সমকামিতা দেখা যায়।বেশিরভাগ পুরুষ বাদুড়ের মধ্যে এই আচরণ দেখা গেলেও স্ত্রী বাদুড়ও এরকম আচরণ করে।
♦আশ্চর্য্য বিষয় এমনকি হাতি দের মধ্যেও সমকামিতার আচরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে । এশিয়ান ও আফ্রিকান হাতিদের ক্ষেত্রে এই আচরণ দেখা যায় । এশিয়ান হাতিদের 45% ক্ষেত্রে সমকাম নথিবদ্ধ হয়েছে।
♦জিরাফের মধ্যে 30% থেকে 75% ক্ষেত্রে এরকম আচরণ দেখা যায়। যার মধ্যে 94%পুরুষ ।
♦এছাড়া এমনকি সিংহ , ভেড়া , বানর , বনবিড়াল, পার্বত্য মুষিক, বিভিন্ন প্রাইমেটদের মধ্যেও এই আচরণ স্পষ্টতই দেখা যায়।
♦অন্যান্য প্রাণীজগতের মধ্যে গিরগিটি, কচ্ছপ , মাকড়শা , গয়াল পোকা বা ড্রাগন ফ্লাই, ছারপোকা , মাকড়শা উল্লেখযোগ্য।

এখন প্রশ্ন হল, যে আচরণের প্রকাশ প্রকৃতির সর্বত্র , সমাজবদ্ধ মানুষ কেন বারবার সেই সত্য অস্বীকার করতে চেয়েছে ? কারণ প্রচলিত ধারণায় যৌনতার একমাত্র উদ্দেশ্য হল বংশবিস্তার। কিন্তু প্রকৃতি বোধহয় বারবার প্রমাণ করেছে একমাত্র লক্ষ্য কখনো বংশবিস্তার হতে পারে না , আনন্দলাভের অধিকারও স্বীকৃত সত্য। প্রাচীন রোমক সভ্যতার পম্পেই নগরীর প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষ ও প্রাচীন ভারতের মন্দিরের দেওয়ালে উৎকীর্ণ মূর্তি বোধহয় এটাই প্রমাণ করে পূর্বপুরুষদের কাছে এই সত্য অজানা ছিল না এবং তারা এটি খুব সাধারণ সত্য হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here