গণনায়ক নিত‍্যানন্দ, সংঘশক্তি গোপাল ও বাঙালি সমাজ

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    শ্রীচৈতন্যের প্রেমধর্মকে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বীরভূমের একচক্রা গ্রামের ভূমিপুত্র নিত‍্যানন্দ অবধূত। ডাকনাম “কুবের” এবং পরবর্তীকালে তিনি “অবধূত” নামে পরিচিত হয়েছিলেন। “অবধূত” শব্দের অর্থ–অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি থেকে বিধৌত।
    নিত‍্যানন্দ বুঝেছিলেন, সংঘশক্তি ছাড়া বড়ো কাজ অসম্ভব। তাই তিনি তাঁর সমপ্রাণ, সমব‍্যথী ও সহচর ১২ জন পণ্ডিত ভক্তকে নিয়ে তাদের “গোপাল” আখ্যা দিয়ে বাংলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই ১২ জনের বিষয়টি অর্থাৎ দ্বাদশ তত্ত্বের বিষয়টি একটি ধর্মীয় ঐতিহ্য। প্রভু যীশু তাঁর একান্ত অনুগত ১২ জন শিষ্যকে নিয়ে ধর্মপ্রচারে নেমেছিলেন। আবার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবও তাঁর কাছের ১২ জন শিষ্যকেই বিশেষভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন।
    যেহেতু নিত‍্যানন্দ ছিলেন “অবধূত”, তাই তাঁর মধ্যে কোনোরকম গোঁড়ামি ছিল না। অন্য ধর্মের মানুষদেরও তিনি নির্বিচারে দীক্ষা দিতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ছত্রভোগের ত্রিপুরাসুন্দরীর সেবক তান্ত্রিক তারাচরণ চক্রবর্তীকে সপ্তগ্রামে তিনি দীক্ষা দেন এবং দীক্ষান্তে তাঁর নাম রাখেন “শ্রীচৈতন্যদাস।”
    বাংলায় বৈষ্ণবধর্ম প্রচারে নিত‍্যানন্দই ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী ও সংঘশক্তির প্রতিষ্ঠাতা। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে পানিহাটিতে নিত‍্যানন্দের চিঁড়ে-দৈ মহোৎসব হলো বাংলায় জাতিভেদ প্রথা বিলোপের প্রথম পদক্ষেপ। এখানে একসঙ্গে ৩৬ জাতকে ভোজন করিয়েছিলেন নিত‍্যানন্দ। আজও বাংলায় এই রীতি মেনে কীর্তন শেষে এক পংক্তিতে সব জাতের মহোৎসবের খিচুড়ি খাওয়ানোর প্রচলন রয়েছে। তাই ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বলেছেন, “নিত‍্যানন্দ বঙ্গের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ গণতন্ত্রবাদী।”
    বড়ো কাজ করতে গেলে যে সংঘশক্তির দরকার, সেটা উপলব্ধি করে পানিহাটির গঙ্গাতীরে চিঁড়ে-দৈ মহোৎসবের সময়েই “দ্বাদশ গোপাল” নির্বাচন করে বাংলার বিভিন্ন স্থানে শ্রীপাট স্থাপন করেছিলেন নিত‍্যানন্দ। “গোপাল” মানে কৃষ্ণের রাখাল বন্ধু। বৃন্দাবন দাসের ভাষায় নিত‍্যানন্দের এই “গোপাল”-রা হলেন :
    “শিঙ্গাবেত্র বংশী ছান্দা দৌড়ি গুঞ্জমালা।
    সবে ধরিলেন গোপালের অংশকলা।।”
    যাঁরা “গোপাল” হয়েছিলেন, তাঁদের পরিচয় হলো :

    জাতি গোপাল শ্রীপাট জেলা

    ১)ব্রাহ্মণ/রামদাস/খানাকুল-কৃষ্ণনগর/ হুগলি
    ২)ব্রাহ্মণ/সুন্দরানন্দ ঠাকুর/মহেশপুর/যশোর
    ৩)ব্রাহ্মণ/ধনঞ্জয় পণ্ডিত/শীতলগ্রাম/বর্ধমান
    ৪)ব্রাহ্মণ/গৌরীদাস পণ্ডিত/অম্বিকা-কালনা/বর্ধমান
    ৫)ব্রাহ্মণ/কমলাকর পিপ্পলাই/মাহেশ/হুগলি
    ৬)বৈশ‍্য/উদ্ধারণ দত্ত/সপ্তগ্রাম/হুগলি
    ৭)ব্রাহ্মণ/মহেশ পণ্ডিত/পালপাড়া/নদীয়া
    ৮)বৈদ‍্য/পুরুষোত্তম দাস/চাঁদুরে/নদীয়া
    ৯)বৈদ‍্য/পরমেশ্বর দাস/তরা-আঁটপুর/হুগলি
    ১০)ব্রাহ্মণ/কালীকৃষ্ণ দাস/আকাইহাট/বর্ধমান
    ১১)ব্রাহ্মণ/শ্রীধর দাস/নবদ্বীপ/নদীয়া

    ১২)ব্রাহ্মণ/হলায়ূধ ঠাকুর/রামচন্দ্রপুর/নদীয়া

    নিত‍্যানন্দের এই দ্বাদশ গোপালদের মধ্যে অনেকেই ভাবের ঘোরে আশ্চর্য আশ্চর্য কাজ করেছেন। যেমন, খানাকুল-কৃষ্ণনগরের “গোপাল”, অসাধারণ বলবান রামদাস, ১৬জন বলশালী লোক মিলে যে কাঠের গুঁড়ি তুলতে পারতো না, তা তিনি একাই তুলে তাতে বাঁশি বাজানোর ভঙ্গি করতেন। প্রেমভক্তি বিরোধী অনেক মানুষকেই তিনি চাবুক দিয়ে পিটিয়ে সোজা করেছিলেন।
    আবার রাখাল সেজে হৈ হৈ করতেন “গোপাল” পরমেশ্বর দাস।
    ভাবে উন্মত্ত হয়ে আরেক গোপাল মুরারী চৈতন‍্য
    “ব‍্যাঘ্রগালে চড় মারে, সর্পসঙ্গে খেলা” করতেন।
    গদাধর দাসের হতো রাধাভাব, “হৈলা রাধিকাভাব গদাধর দাসে / দধি কে কিনিবে বলি অট্ট অট্ট হাসে।” তবে মনে তার রাধাভাব থাকলেও তিনি এক হিন্দু বিদ্বেষী মুসলমান কাজীকে প্রচণ্ড গর্জন করে বলেছিলেন,
    “ঝাট কৃষ্ণ বোল, নহে ছিণ্ডো এই মাথা।”
    পরবর্তীকালে নিত‍্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্র ( নামান্তরে বীরচন্দ্র ) প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধতান্ত্রিক সহজিয়া “নেড়া-নেড়ি”-দের বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত করে পিতার প্রবর্তিত বৈষ্ণবধারাটিকে সমৃদ্ধ করেন।
    নিত‍্যানন্দ ও অপর এক চৈতন্য পার্ষদ অভিরাম দাসের নেতৃত্বে বাংলায় গড়ে উঠেছিল জাত-বৈষ্ণব সমাজ। জাত বৈষ্ণবের কোনো অশৌচ নেই এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো অনুষ্ঠানেই নেই আগুনের ব‍্যবহার। যে কোনও ধর্মের মানুষ এই জাত বৈষ্ণব সমাজে দীক্ষিত হতে পারে। এই সমাজ সম্পূর্ণ অবৈদিক। একসময় বাংলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছিল জাত বৈষ্ণবদের আখড়া। আর বৌদ্ধ বিহার ও ভিক্ষুণী সংঘের অনুকরণে গড়ে ওঠা জাত বৈষ্ণবদের এই আখড়াগুলিই ছিল একসময় সমাজচ‍্যুতা অসহায়া নারীদের আশ্রয়স্থল। নিত‍্যানন্দের এই অবদানের সঠিক মূল্যায়ন আজও হয়নি, তবে বাংলার গৃহী বৈষ্ণব সমাজ নিত‍্যানন্দপন্থী হয়ে স্মরণে রেখেছেন সে অবদান। আজও তাই বৃহত্তর বাঙালি বৈষ্ণব সমাজের গণ-সম্বোধন “জয় নিতাই !”

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here