মৃত্যুর এক অভূতপূর্ব শিল্পায়ন–আউসউইচ এবং এক পরমাসুন্দরী কাঁচা মালের জোগানদার

    0

    Last Updated on

    দেবাশিস লাহা

    মার্চ, ১৯৪৩ । একটা মালগাড়ি ।বেশ বড়। কুড়ি বাইশটা বগি । সেই কখন থেকে ছুটে চলেছে। বসন্তের আকাশ।ঘন নীল, ঝকঝকে। রেল লাইনের দুপাশে সবুজ বনানী। উইলো গাছে নাম না জানা পাখি। তবু পথ যেন আর শেষ হচ্ছে না। ৫৫৮ কিলোমিটার পথ। খুব যে বেশি এমন নয়। কিন্তু একে মালগাড়ি তার উপর কানায় কানায় ভর্তি। দশ বারো ঘণ্টা তো লাগবেই। সেই সক্কাল বেলা বার্লিন থেকে মাল তুলে হুইশেল বাজিয়েছে। ড্রাইভার বলে কি আর ক্লান্তি নেই ! প্রতিদিন অন্তত দুটো ট্রিপ। একদিনও ছুটি নেই। ঘড়ির দিকে তাকাতেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস। না আর বেশি দেরি নেই। রকলো অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে। সামনেই ওপোল। তারপর আর দু এক ঘন্টা। ব্যাস আজকের মত ক্ষান্তি। যাক, রাতে অন্তত নিজের নামটা আর একবার মনে করার ফুরসৎ পাওয়া যাবে। এইসব এলোমেলো চিন্তা নিয়েই লোকোমোটিভ সামলাচ্ছেন আলবার্ট। আলবার্ট ডুমন। গুডস ট্রেনটির দায়িত্বশীল ড্রাইভার।
    ওই তো সেই গুদামঘর।আর বড় জোর দু শ মিটার। এত বড় গো ডাউন দুনিয়াতে আর একটাও নেই। প্রায় চল্লিশ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ।একটা গুদাম হলে অন্য কথা ছিল। শয়ে শয়ে গো ডাউন। চারপাশের পাঁচ কিলোমিটার আবার পুরোপুরি জনহীন। এসেই গেল প্রায়। বাইরে থেকে যে মূল স্ট্রাকচারটা নজরে পড়ে তার রঙ পোড়া ইটের মত । মাঝখানে উঁচু মিনারটা অনেক দূর থেকেই দেখা যায়।
    এই তো গন্তব্য ! কী মজা আমরা পৌঁছে গেছি। ডুমনের চোখে খুশির ঝিলিক।যাক আজকের মত মুক্তি—এই বলে বিড়বিড় করে উঠলেন জার্মান রাইখ রেলওয়ের চল্লিশোর্ধ ড্রাইভার। ওদিক্বের ট্র্যাকগুলোতে আরও দু তিনটে মালগাড়ি। স্বাভাবিক ব্যাপার। এত মালের যোগান দেওয়া কি একটা রেল কোম্পানির পক্ষে সম্ভব ! জার্মান রাইখ রেলওয়ে ছাড়াও একাজে যুক্ত আছে, বেলজিয়ামের ন্যাশনাল রেলওয়ে কোম্পানি, নেদারল্যাণ্ডস স্পুগওয়াগেন্, ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল রেলওয়ে কোম্পানি, রোমানিয়া এবং হাঙ্গেরীর ন্যাশনাল রেলওয়ে।! ওই যে বড় বড় করে লেখা—জার্মান ভাষায়—Arbeit Macht Frei অর্থাৎ Work will give you freedom—কাজেই মুক্তি ! ভাবা যায় ! কত বড় কর্মযজ্ঞ ! ওই তো, ওয়াগনের দরজাগুলো খুলে যাচ্ছে। কিন্তু একী ! রাশি রাশি লাল নীল হলুদ সবুজ পোশাক ট্রেন থেকে লাফ মারছে ! কারও মাথায় টুপি, কারও চোখে চশমা, উদ্ভ্রান্ত মেঘচুলে গোধূলির আলো ! এরা তো মাল নয়, নিশ্চিতভাবেই ভাবেই মানুষ। মেলা বকবক করবেন না ! ওরা আগে মানুষ ছিল, এখন মাল। মাল বলেই মালগাড়ি ! ওই দেখুন উর্দি পরা বন্দুকধারী। প্রত্যেক বগির সামনে একজন করে। ওদের কাজ মাল সর্টিং করা। নারী এবং পুরুষ –হ্যাঁ প্রথমে এই দুটি লাইনে ওদের ভাগ করা হচ্ছে। বয়স যাই হোক। ওই দেখুন পিতার আদরের মুঠো থেকে ছিটকে যাচ্ছে তেরো বছরের এক কিশোরী। আর ওপাশে সত্তরোর্ধ বৃদ্ধের হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তাঁর ষাটোর্ধ সহধর্মিনী। কী অবিশ্বাস্য দ্রুতটায় সম্পন্ন হচ্ছে সমস্ত প্রক্রিয়া। না , কোনো ভুলচুক নেই। প্রিয়জন বিয়োগের আর্তনাদ, আঁকড়ে থাকা কোল, বিভাজিত মানবিকতার কলরব ! না, সেসব কেউ শুনছে না ! বেশি আওয়াজ করলেই, বেশি জড়িয়ে ধরলেই রাইফেলের গুঁতো। শৃঙ্খলা বজায় রাখুন মহামান্য মাল ! থুড়ি ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ ! এ এক মহান কর্মভূমি। কান্নার জায়গা নয়। ওই দেখুন, লেখা আছে কাজেই মুক্তি। আপনাদের সুবিধার জন্যই এই বিভাজন। নারী পুরুষ সবাই কি এক রকম কাজ করতে পারে ? পারে না। আসুন আপনাদের মহান যোগদানের মাধ্যমে জার্মান জাতীকে আরও দৃঢ় আর শক্তিশালী করে তুলুন। আপনাদের কাছে যা যা মূল্যবান সামগ্রী আছে যেমন সোনার অলঙ্কার, মণি মুক্তো, ঘড়ি, অর্থ সব কিছু এই পাত্রটির মধ্যে রাখুন। পরে সব ফেরত পেয়ে যাবেন।সুরক্ষিত রাখবার জন্যই এই ব্যবস্থা। পালের গোদা এক সিপাই। পরনে অফিসারের ইউনিফর্ম। সত্যিই তো ! যুক্তি আছে বটে।
    আসুন এবার নারীদের দিকে তাকাই। তাঁদের ঠিক কি কাজ দেওয়া হচ্ছে। ওই দেখুন ওদের সারিবদ্ধ ভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের পেছনে একজন করে নাপিত। বিদ্যুতগতিতে চুল ছাঁটা হচ্ছে। বারোর কিশোরী থেকে আশির বৃদ্ধা। সবার জন্যই একই ব্যবস্থা। কর্মশিবিরের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা খুব জরুরী। বাহ এই তো কাজ শেষ। এবার নাম্বারিং। এক এক করে আপনাদের হাত এগিয়ে দিন। এই যে নীল কালিতে আপনার আইডেন্টিটি নাম্বার লিখে দেওয়া হল। কাজের সুবিধার্থেই এই নিয়ম। বাহ আপনাদের সহযোগিতার মনোভাব সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। আসুন এই বার সব জামা কাপড় খুলে ফেলুন। না না ভয়ের কোনো কারণ নেই। এতটা পথ এসেছেন। স্নান না করে ক্যাম্পে ঢুকলে যে রোগ ব্যাধি ছড়াবে। আপনাদের সুরক্ষার জন্যই এই ব্যবস্থা। ওই যে বিশাল বাথরুম ! এক সঙ্গে অনেক অনেক মানুষ স্নান করতে পারে। আরে মাসীমা ওদিকে নয়। চল্লিশ পেরনো নারীদের জন্য আমরা পৃথক বাথরুমের ব্যবস্থা রেখেছি। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের সঙ্গে স্নান করলে আপনাদের মান সম্মান থাকবে !
    একসঙ্গে ৯০০ রমণী স্নানাগারে প্রবেশ করলেন। বেশ তাড়াহুড়ো করেই। এটাই শেষ ঝামেলা। তারপর অন্তত নিষ্কৃতি মিলবে। ঠিক তাই ! শাওয়ার থেকে জলের পরিবর্তে বেরিয়ে এলো Zyklon-B ! ভয়াবহ এক মারণ গ্যাস ! কি, আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছেন ? কান পাতলে পাবেন , তবে খুব জোরে নয়। যতই নিশ্ছিদ্র করেই বানানো হোক, নয় শত মানুষের নয় শত মুখ গহ্বর এবং জিহ্বা। আঠের শ ঠোঁট এবং হাত পা ! শব্দ তো একটু হবেই। হ্যাঁ প্রায় আধ ঘন্টা ধরে। তারপর সব চুপ !
    আর তারপর ? সোজা ক্রিমেটোরিয়াম। হ্যাঁ মশাই ! ইলেক্ট্রিক চুল্লি । গণদাহ হবে যে ! ছাই হবে ছাই ! কিন্তু কিভাবে ! এত গুলো মাল থুড়ি বডি ! কারা বয়ে নিয়ে যাবে ! ধুত্তেরি মশাই ! কোন যুগে পড়ে আছেন ! গাড়ি কারখানা দেখেন নি ? এসেম্বলি লাইন ! একসঙ্গে অনেক মোটর গাড়ি একটা বেল্টের উপর ঘুরতে থাকে ! এয়ারপোর্ট থেকে লাগেজ নেওয়ার সময়ও এমন কনভেয়র বেল্ট দেখে থাকবেন। বাথরুম থুড়ি গ্যাস চেম্বারের সঙ্গেই তো এই চুল্লি—-ওই দেখুন বেল্টগুলো ঘুরতে শুরু করেছে !
    একটু দূরে আরেকটি “বাথরুমের” সামনে জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে এক পঞ্চাশোর্ধ প্রৌঢ় ভাবছেন তাঁকে ঠিক কি কাজ দেওয়া হবে ! উনি তখনও জানেন না এই “কর্মশিবিরে” চল্লিশ অতিক্রম করা নারী পুরুষের জন্য কোনো কাজই নেই। সোজা গ্যাস চেম্বার !
    আসুন বন্ধু, পরিচয় করিয়ে দিই। আপনি এখন আউসউইচের অভ্যন্তরে ! হ্যাঁ আউসউইচ—পৃথিবীর সর্বপ্রথম মৃত্যুর শিল্পায়ন—-কিলিং ওন ইনডাস্ট্রিয়াল স্কেল ! আর এই বাথরুম থুড়ি গ্যাস চেম্বার ! এর নাম জানেন ? The little Red House ! ভারি মিষ্টি তাই না ? আউসউইচের [আউসউইচ – 2] সর্বপ্রথম গ্যাস চেম্বারটির অফিসিয়াল নাম bunker-1 এক পোলিশ কৃষকের জমি বাড়ি কেড়ে হস্তগত করে নাজিরা এই গ্যাস চেম্বার গড়ে তোলে। চালু হয় ১৯৪০ এর ২০ শে মার্চ। প্রথম দিকে অবশ্য ইলেকট্রিক চুল্লির ব্যবস্থা ছিল না। দৃষ্টিনন্দন বার্চ গাছের সারির পেছনেই গণকবর দেওয়া হত। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন এখানেই সোভিয়েত যুদ্ধবন্দীদের মাথায় গুলি করে গণকবর দেওয়া হত। এর কিছু পরে আরেকটি গ্যাস চেম্বার—the little white house –এর জন্ম হয়। অফিসিয়াল নাম bunker-2 . ইহুদি নিধনের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা এই গ্যাস চেম্বারটি ১৯৪২ এর জুন মাসে উদ্বোধন হয়। কি বুঝলেন ? আসুন পুরো ক্যাম্পটাই একটু ঘুরে দেখাই আপনাকে। দেখে হাঁটুন। অসাবধানে মৃতদেহ মাড়িয়ে ফেলবেন। পাপ হবে। যদিও মাল, কিন্তু এককালে তো মানুষই ছিল।
    ১৯৩৯ সালে হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। আপনারা সবাই কম বেশি জানেন। প্রায় ৬৫০০০ ইহুদি, বেশ্যা, সমকামী, রোমানি জিপসি[যাযাবর] এবং তথাকথিত নিকৃষ্ট জাতির [হিটলারের পরিভাষায় যারা Aryan / nordic race নয়] নাগরিককে হত্যা করা হল। কিন্তু এত মানুষ থুড়ি মালপত্তর ! ঠিকঠাক নিকেশ করতে গেলেও তো একটা বড়সড় জায়গা চাই। সব কিছুর একটা নিয়ম নীতি আছে, শৃঙ্খলা ছাড়া পৃথিবীর কোন বড় কাজটা হয়েছে শুনি। এই চিন্তা মাথায় রেখেই এস এস [গেষ্টাপো] প্রধান হেনরিখ হিমলার ১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে অধিকৃত পোল্যান্ডের এই জায়গাটি বেছে নেন এবং একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। এর নাম দেওয়া হয় আউসউইচ—১ । ১৯৪০ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত এখানে ১৭০০০ ইহুদি এবং পোলিশ নাগরিককে নিয়ে আসা হয়। এই ক্যাম্পটির ভিত্তি প্রস্তর কাদেরকে দিয়ে স্থাপন করা হয় জানেন ? ৩০০ ইহুদি ধরে আনা হয় ওসউইসিম থেকে।মূলত কর্মক্ষম পুরুষ। হ্যাঁ এঁরাই আউসউইচ-১ গড়ে তোলে। মেইন বেস হিসেবে গড়ে উঠলেও আউসউইচ -১ আসলে ক্ষুদ্রতম একটি শিবির। এই ক্যাম্পে কম্যান্ডেন্ট-এর কার্যালয় এবং বসবাসের জন্য কোয়ার্টার, প্রশাসনিক ভবন, নেহাতই ক্ষুদ্র একটি ডেথ ব্লক অর্থাৎ মৃত্যু শিবির, এবং বন্দীদের জন্য রান্নাঘর ছিল। পরে যুক্ত হয় প্রথম গ্যাস চেম্বার এবং ক্রিমেটোরিয়াম, গেষ্টাপো ক্যাম্প , গণহত্যার জন্য ফাঁসি মঞ্চ এবং ফায়ারিং ওয়াল, যেখানে এক সঙ্গে শয়ে শয়ে ইহুদিকে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা হত। দ্বিস্তরীয় কাঁটাতারের বেড়া , হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন ইলেকট্রিক ফেন্স আর নটি ওয়াচ টাওয়ার দিয়ে ঘেরা ছিল এই আউসউইচ-১ ।
    আউসউইচ-২ যা বার্কেনো নামেও পরিচিত ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে নির্মিত হয়। যাতে করে আরও অনেক মাল পত্তরকে ঢুকিয়ে ফেলা যায়। এখানে এক সঙ্গে সর্বোচ্চ দু লক্ষ মানুষ থুড়ি মালকে রাখা যেত। মোট ২৫০টি ব্যারাক ছিল। আস্তাবলের মাপ অনুসারে এক একটি ব্যারাক । ৫২ টি ঘোড়া রাখার জন্য এই মাপের আস্তাবল বানানো হত। কিন্তু মানুষ থাকত হাজার হাজার। কতজন করে ? ধুত্তেরি ! সহজ অংকও জানেন না ! দু লক্ষকে ২৫০ দিয়ে ভাগ করে ফেলুন। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। প্রতি ব্যারাকে ৮০০ থেকে হাজার । ১৯৪২ এর অগাষ্ট মাসে কিছু ব্যারাক কেবল নারীদের জন্য চিহ্নিত করা হয়। এখানে ১৫০০০ কর্মক্ষম নারীকে রাখার ব্যবস্থা হয়। আর কি ছিল ? আরে মশাই ইণ্ডাস্ট্রি বলে কথা ! থতমত খেলে চলবে ? হ্যাঁ এখানে ছিল চার চারটি গ্যাস চেম্বার এবং মালপত্তরকে ছাই বানিয়ে দেওয়ার জন্য সম সংখ্যক চুল্লি। অফিসিয়াল পরিভাষায়—ক্রিমেটোরিয়াম—২,৩,৪ এবং ৫ ! ব্যারাকের গা ঘেঁষেই তৈরি হয়েছিল এইসব মৃত্যুওপুরী যাতে অসহায় বন্দীরা সবসময় সন্ত্রস্ত থাকে—যে কোনো মুহূর্তেই তাদের পালা আসতে পারে— কর্মক্ষম মানুষ যারা তখনও জীবিত , দিন রাত পোড়া মাংসের গন্ধ পেত ! আর ভাবত—কি ভাবত ! হয়ত অলৌকিক কিছু ঘটবে ! সে হয়ত বেঁচে ফিরবে একদিন—অথবা কিছুই ভাবত না ! সবই শূন্য হয়ে গিয়েছিল যে ! কিন্তু এখানেই যে শেষ নয়। আউসউইচ -২ এ আর একটি অনন্যসাধারণ বিজ্ঞান মঞ্চ ছিল ! এক্সপেরিমেন্টাল ব্লক ! ঠিক ধরেছেন ! এই অনার্য ইহুদি মালগুলো ঠিক দিয়ে তৈরি দেখতে হবে না ! গবেষণার জন্য ছিলেন “স্বনামধন্য” চিকিৎসক জোসেফ মেঙ্গেলে !কত কাজ ছিল তার ! তিনি ইহুদি বাচ্চা কাচ্চার বাদামী চোখে বিভিন্ন কেমিক্যাল স্প্রে করে দেখতেন মণিগুলো নীল হচ্ছে কিনা, খর্বকায় নারী পুরুষের হাত পা বিশেষ মেসিন দিয়ে টেনে বলতেন শুয়োরের বাচ্চা তোরা লম্বা হতে পারিস না ! এত চেষ্টা করছি ! যুবতীদের যৌণাঙ্গে এবং স্তনে –আর শুনবেন ? না থাক ! উনি যে আবার এনাসস্থিশিয়ার ব্যবহারই জানতেন না ! না এখানেই শেষ নয়। আউসউইচ-২ কি আর এইটুকু এলাকা ! এখানে গন কবর, ফায়ারিং স্কোয়াড থাকবে না হয় নাকি ! আর ছিল একটা বিশাল গোডাউন—-মৃতদের তথা বন্দীদের ব্যক্তিগত সামগ্রীর গুদাম। জামা কাপড়, জুতো , চশমা, ব্যাগ লাগেজ—কী বললেন সোনা ? দূর মশাই দামী জিনিষ পত্র কি আর এখানে রাখবে। সেসব তো নাজিরা অনেক আগেই ছিনিয়ে নিয়েছে ! নাজি গোল্ড শব্দটা নিশ্চয় শুনেছেন ! যাক আউসউইচ ২ তে মোট ২৮ টা ওয়াচ টাওয়ার ছিল। মাছিও গলাও অসম্ভব ছিল। তবু পাঁচ মোট হাজার খানেক চেষ্টা করেছিল। ১৪৪ জন পালিয়ে আসতে পেরেছিল। সেই রোমহর্ষক গল্প পরে কখনও শোনাব।
    আউসউইচ-৩ মূলত একটি কেমিক্যাল ফ্যাকটরি। যুদ্ধ জয়ের জন্য কত রকমই না রাসায়নিক জিনিষপত্র লাগে। সেই উদ্দেশ্যেই এটি গড়ে তোলা হয়। সিনথেটিক রাবার উৎপাদনের জন্য গড়ে তোলা এই কারখানাতে কর্মক্ষম যুদ্ধ বন্দীদের কাজ করতে পাঠানো হত। অমানুষিক পরিশ্রম বললেও কম বলা হবে। আউসউইচ – ২ থেকে এই সব ইহুদি বন্দীদের এখানে পাঠানো হত। প্রথম দিকে এক হাজার বন্দী এখানে কাজ করত। পরে তা এগারো হাজারে দাঁড়ায়। প্রতিদিন পঁচিশ কেজি ওজন বহন করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হত। প্রতি সপ্তাহের ফিজিক্যাল প্যারেডে নিজেকে “ফিট” প্রমাণ করার জন্য উলঙ্গ অবস্থাতেও মাথা উঁচু করে হেঁটে যেত হত। পা নড়বড় করা মানেই আনফিট –অতএব সোজা গ্যাস চেম্বার।
    মাল লোড করার আগেই যে ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে থাকত। চল্লিশের উর্ধ্বে নারী পুরুষ মানেই সোজা গ্যাস চেম্বার। এরা তো আর ভারি কাজ করতে পারবে না। অসুস্থ, পাগল, আধ পাগল হলেও একই পরিণতি। পনের থেকে চল্লিশ বছর বয়সী নারী পুরুষকে বিভিন্ন কাজ দেওয়া হত। ইয়ে মানে আধ পেটা খেয়ে যতদিন পারে—একটু অসুস্থ হলেই তো — আর পনেরো বছরের নিচের যারা তাদের একটু হাল্কা কাজই দেওয়া হত। রাশি রাশি জামা কাপড় থেকে মৃতদের জামা, জুতো, চশমা ইত্যাদি সর্টিং করা। গার্তা সোলান নামের এক বেঁচে আসা নারী [তখন তার বয়স বারো বছর] তাঁর আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন তিনি মৃতদের জ্যাকেট সর্টিং করতেন। হিটলার বিজয়ী হলে এসব গর্বের স্মারক হিসেবে প্রদর্শিত হওয়ার কথা ছিল যে ! তাই এত যত্ন !
    উপায় কি ! আসউইচ নামক মৃত্যুপুরীতেই তো ১৩ লক্ষ মানুষকে খতম করা হয়। সিংহ ভাগই গ্যাস চেম্বারে। কেউ কেউ বুলেটে, টাইফাস নামক মহামারিতে অথবা স্ক্রাব ভাইরাস ! এদের মধ্যে এগারো লক্ষই ইহুদি “মাল”, বাকিরা সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী, বেশ্যা, জিপসি সম্প্রদায়ের মানুষ এবং সমকামী। ষাট লক্ষ ইহুদির এগারো লক্ষই এইখানে ! তার সিংহ ভাগ আবার মাত্র তিন বছরে। হ্যাঁ ১৯৪৫ এর ২৭ শে জানুয়ারি মিত্র বাহিনী এখানে পৌঁছানোর আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে চার হাজার ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে পাঠানো হয়েছে। যদিও এই মৃত্যুপুরীর কথা ইংল্যান্ড আমেরিকা কয়েক বছর আগেই জেনে ফেলেছিল। ১৯৪৪ এর অগাস্ট মাসে আমেরিকান নজরদারি প্লেন এর ছবিও তুলে ফেলে। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ হাতে আসা সত্ত্বেও কেন এই মৃত্যু শিবির গুঁড়িয়ে দেওয়া হল না, সে নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন আছে। সে প্রসঙ্গ পরে ।
    কি ? থিমে গেলেন যে ! আর পড়বেন না ? প্রশ্ন জাগছে না ? লক্ষ লক্ষ ইহুদি নিজে নিজে এসে ধরা দিয়েছিল ? হিটলার বললো ট্রেনে ওঠো , অমনি সবাই উঠে পড়ল ! প্রথম প্রথম না হয় সব আচম্বিতেই হয়েছিল ! কিছু বুঝে ওঠার আগেই গ্যাস চেম্বার। কিন্তু পোড়া মাংসের গন্ধ যে অনেক দূর যায়। অন্যান্য দেশ থেকে আগে শুরু হলেও বার্লিন থেকে ইহুদি ধরা শুরু হয় ১৯৪১ এর অক্টোবরে। কিন্তু এত বড় মাপের গণহত্যা কতদিন চেপে রাখা যায়। বাতাসেরও কান আছে যে ! অতএব হাজার হাজার ইহুদি আত্মগোপন করতে শুরু করল। যারা পারল পালিয়ে গেল জাল কাগজ পত্র বানিয়ে। কিন্তু সীমানা তো ততদিনে সিল করে দেওয়া হয়েছে। অগত্যা আন্ডারগ্রাউণ্ড ছাড়া কোন পথ নেই। হ্যাঁ এভাবেই অনেকে শুভাকাঙ্ক্ষী , সহৃদয় “আর্য” জার্মানদের বাড়ি আশ্রয় নিল। মাটির তলার সেলারে অথবা পরিত্যক্ত চিলেকোঠায়। দিন রাত কেবল ঘরের মধ্যে। কেউ কেউ নাম পরিচয় বদলে জার্মান বন্ধু বান্ধবের চেষ্টায় ছদ্মবেশ নিলেন। মিশে গেলেন জার্মান জনস্রোতে। নাজিরা এদের নাম দিল ইউবোট—অর্থাত সাবমেরিন –জলের তলায় লুকিয়ে থাকা মাল ! এদেরও তো ধরতে হবে ! নইলে প্রিয় হিটলারের স্বপ্ন ফাইনাল সলিউশন সফল হবে কি করে ! কিন্তু এদের ধরবে কারা। কে কোথায় কোন গলি ঘুঁজিতে গা ঢাকা দিয়ে আছে “সভ্য, ভদ্র, শিক্ষিত” গেষ্টাপো বাহিনীর পক্ষে জানা অসম্ভব। তবে কে খুঁজবে এই ইউ বোটদের ? কেন ইহুদিরাই খুঁজবে ! নিজের জাতের লোককে ওদের চেয়ে ভাল কে চিনবে ? তাই ইউ বোটকেই ইউ বোট ধরতে লাগিয়ে দাও। আসুন বন্ধু আলাপ করিয়ে দিই এক অত্যাশ্চর্য বস্তু থুড়ি মাল থুড়ি মানুষের সঙ্গে —গ্রেইফার [Greifer] এবং গ্রেইফারিন [Greiferin] ইংরেজি তর্জমায় cacher অর্থাৎ jew catcher ! গ্রেইফার পুরুষ, গ্রেইফারিন নারী ! কি বুঝলেন ? হ্যাঁ এঁরাই লুকিয়ে থাকা ইহুদিদের খুঁজে বের করে গেষ্টাপোকে ফোনে জানিয়ে দিত। এঁদের সাহায্য ছাড়া এত ইহুদিকে ধরে ফেলা সম্ভব হত না। কিন্তু নিজে ইহুদি হয়ে জাতভাইদের ধরিয়ে দিত ! কেন করত এই জঘন্য কাজ ! কেন প্রাণের ভয় ! অর্থের লোভ !
    আসুন আলাপ করিয়ে দিই –স্টেলা কুবলার ! বার্লিনেই জন্ম। মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারের একমাত্র আদরের মেয়ে। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় আসার পর ইহুদিদের পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেন। অতএব ইহুদিদের দ্বারা পরিচালিত ইহুদিদের জন্য নির্দিষ্ট একটি স্কুলেই তাকে শিক্ষা নিতে হল। ডাকসাইটে এক নীল চোখের সুন্দরী কিশোরী—এই বলেই তার নাম ছড়াল। তারপর নুরেমবার্গ ঘোষণা। ইহুদিদের জন্য সব সাম্মানিক পেশাই নিষিদ্ধ করা হল। “আর্য রক্তের” জার্মানদের সঙ্গে নিকৃষ্ট ইহুদির প্রেম ভালবাসা বিয়ে ইত্যাদি যে কোনো যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ হল। ধরা পড়লেই মৃত্যু। স্টেলার বাবা চাকরি হারালেন। একমাত্র সন্তান এবং স্ত্রীকে নিয়ে জার্মানী ছাড়া চেষ্টা করলেন।কিন্তু কোন দেশ ভিসা দিল না। এই চরম দুঃসময়ের মধ্যেও স্টেলা ফ্যাশন ডিজাইনিং কোর্স শেষ করলেন। ১৯৪১ সালেই তাঁকে লেবার ক্যাম্পে কাজ করতে পাঠানো হয়। সেখানেই আলাপ হয় আর এক ইহুদি ম্যানফ্রেড কুবলারের সঙ্গে। সঙ্গীতঙ্গ কুবলারকে তিনি বিয়ে করলেন। ১৯৪২ এ যখন ব্যাপক সংখ্যায় ইহুদি হত্যা শুরু হল,স্টেলা গোপন কাগজ পত্র বানিয়ে ফেললেন। তারপর যথারীতি আন্ডারগ্রাউণ্ড। বাবা মাকে সঙ্গে নিয়ে গা ঢাকা দেওয়া। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। ১৯৪৩ সালে নাজিরা ওদের ধরেই ফেলল। তারপর শুরু হল আমানুষিক নির্যাতন। নারীদেহ বলে কথা ! অত্যাচারের অনেক সুযোগ। প্রকৃতি প্রদত্ত বাঁড়তি ছিদ্র তো আছেই। কে সহ্য করতে পারে এমন অত্যাচার ! এক গেষ্টাপো অফিসারের মাথাতেই আইডিয়াটা এলো। একে দিয়ে তো গ্রেইফারিনের কাজটা দুর্দান্ত হবে। এত সুন্দর দেখতে, নীল নয়না নারী, এত ভাল কথা বলে। অতএব—
    এই সুন্দরী তুমি কি সত্যি বাঁচতে চাও ? বাবা মাকেও বাঁচাতে চাও ? তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না—শুধু লুকিয়ে থাকা ইহুদি ধরে দাও। উঁহু বিনা পয়সায় নয়। ইহুদি পিছু ৩০০ রাইখ মার্ক দেব । তাতেই তোমাদের দিব্যি চলে যাবে। কি বল !
    স্টেলা কাজ শুরু করে দিলেন। শুরু করলেন সহাপাঠীদের দিয়ে। সবারই মুখ চিনতেন। তেমন কোন বেগই পেতে হল না। এভাবে পুরো ব্যাচটাকেই ধরিয়ে দিলেন। ইহুদি হওয়ার সুবাদে অনেক মহল্লার খোঁজ রাখতেন। পাড়া প্রতিবেশী। কেউই বাদ গেল না। এদিকে দিন দিন টার্গেট বাড়ছে। বহুজাতিক কোম্পানির কায়দায়। মাঝে মধ্যেই শাসানি—কাল অন্তত গোটা দশেক চাই—নইলে বাবা মাকেই ট্রেনে তুলে দেব। শেষ রক্ষা হল না । স্টেলার বাবা মাকে হত্যা করা হল। ১৯৪৩ সালে তাঁর স্বামীকেও তাঁর পরিবার সহ আউসউইচে পাঠানো হল। কিন্তু নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য স্টেলা আরও দক্ষ ভঙ্গিমায় ইহুদি ধরতে লাগলেন। বিয়ে করলেন আরেক jew catcher রলফ আইজ্যাকসনকে। এবার দুজন মিলে টার্গেট পূর্ণ করা আরও সহজ হয়ে উঠল ! ভাবুন কি অদ্ভুত জীবন ! হাজার হাজার মৃত্যুর বিনিময়ে নিজের প্রাণ বাঁচানো। হ্যাঁ তিনি একাই প্রায় ৬০০০ হাজার ইহুদিকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৪৫ ফ্রেব্রুয়ারি মার্চ পর্যন্ত চলল এই মৃত্যুর সওদা।
    তারপর ? তারপর আবার গা ঢাকা দেওয়া। মিত্র শক্তির জয় ,হিটলারের পরাজয় ! এখন যে তিনি most wanted war criminal – দাগী যুদ্ধাপরাধী ! হিটলারের হয়ে কাজ করেছেন । কত মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছেন। কিন্তু কোথায় পালাবেন ? সোভিয়েত বাহিনী তাঁকে ধরে ফেলল এবং বিচারে দশ বছরের জেল। বাধ্য হয়েই তাঁকে এ কাজ করতে হয়েছিল বলেই আপাত লঘু শাস্তি। পরে তাঁকে বার্লিনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও আরও দশ বছরের জেল হয়। কিন্তু কিছুদিন পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হল। কিন্তু তাতে কি ? চরম সামাজিক বয়কট এবং ব্যঙ্গ তাঁর পিছু ছাড়বে কেন ? যেখানে যেতেন ইহুদিরা তাঁর মুখে থুতু ছেটাতো। জুতো ছুঁড়ে মারত। বাইরে বেরনো ক্রমশ দুঃসহ হয়ে উঠল। অন্ধকারে কাঁদতে কাঁদতে স্টেলা একদিন জেদী হয়ে উঠলেন। না এ অসহ্য ! মানুষ কেন তাঁকে একটুও বুঝতে চাইছে না ! তিনি কি মনের আনন্দে এ কাজ করেছিলেন ? প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু তাঁকে তাড়া করে বেড়াত। একদিন রাগে দুঃখে তিনি তিনি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। নিজেকে ইহুদি বিদ্বেষী বলেও প্রচার করতে শুরু করেন। কেবল তাই নয় তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহায় তিনজন অ-ইহুদিকে বিবাহও করেন।
    তারপর ? না তার আর পর নেই ! ১৯৯৪ সালে বার্লিনের বহুতল আবাসন থেকে এক বৃদ্ধা মাটির দিকে ঝাঁপ দেন। অনুসন্ধানে জানা যায় মৃতদেহটি স্টেলা কুবলারের। চামড়া কুঁচকে গেলেও কী নীল দুটো চোখ ! তবু তার কখনও আকাশ ছোঁয়া হল না। গ্রেইফারিন স্টেলা কুবলার !

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here