মনোহর ডাকাতের মনোহরপুকুর

    0
    Manohar Robber of Manoharpur

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    সময়টা পলাশির যুদ্ধের পরেই। ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির শাসন তখনও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। আবার দেশিয় শাসকদের হাতেও ক্ষমতা নেই। এই সন্ধিক্ষণে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় তখন গড়ে উঠেছে ডাকাতদলের আস্তানা। তেমনি একটি জায়গা দক্ষিণ কলকাতার আজকের মনোহরপুকুর রোড।
    যার নামে এই রাস্তা, সেই মনোহর বাগ্দী ছিল দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চলের দুর্ধর্ষ ডাকাত।
    এলাকায় তখন হোগলা বন, খাল-বিলে ভরা। একদিকে একটি ছোট খালে নৌকো চলতো। এখান থেকে আদি গঙ্গায় , কখনও গঙ্গায়, আবার কখনও আশেপাশের বিল ও ঝিলে মাছ ধরতে যেতো এই অঞ্চলে বসবাসকারী জেলে, বাউরী, বাগ্দীদের দল। সুন্দরবনের যাত্রীরা কাঠ ও মধু আনতে এই পথেই আসা-যাওয়া করতো। দক্ষিণ অঞ্চল থেকে ঘন বনপথ কিংবা আদি গঙ্গায় নৌকো বেয়ে লোকজন এই পথে আসতো কালীঘাটে কালী দর্শনে। বাঘ-ভালুক থেকে ডাকাত সবাই ছিল এই এলাকায় ।

    আরো পড়ুন :চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যদের দীক্ষাদাত্রী ডাকিনীরা

    এলাকার ডাকাত সর্দার মনোহর বাগ্দী ডাকাতি করতে চলে যেতো কখনও শহরের দিকে, কখনও বা উত্তরপাড়া, চন্দননগর, বাঁশবেড়িয়া, ত্রিবেণী থেকে নদীয়া পর্যন্ত। ডুমুরদহ ও গুপ্তিপাড়া ছিল ডাকাতের খাস আড্ডা।
    মনোহরের পরিবারের একমাত্র সদস্যা ছিল তার এক বুড়ি পিসি। পিসিই রান্নাবান্না করতো। বাড়ির সামনেই ছিল একটি পুরোনো ভাঙা পাষাণ কালীর মন্দির। অস্ত্রভূষিতা, মুণ্ডমালা বিভূষিতা দেবী “কংকালমালিনী”-র নিত্য পুজো হতো। আর বিশেষ পুজোয় ছাগ বলি থেকে নরবলি পর্যন্ত হতো।
    একবার এক সন্ধ্যের পর কালীঘাট থেকে নিজের গ্রাম রাজাপুরে ফিরছিল স্ত্রী ও এক শিশুপুত্রসহ এক বয়স্ক দম্পতি। পথে হোগলা বনের আড়ালে একটি বাঘ খালে জল খাচ্ছিল। দেখতে পেয়ে বাঘ বয়স্ক ব‍্যক্তিটিকে আক্রমণ করে তাকে টেনে নিয়ে যায় গভীর বনে। স্ত্রীও আহত হয়। শিশুটি ছিটকে পড়ে থাকে।
    সেদিন রাতে ওই পথেই আসছিল মনোহর ডাকাতের দল। আগে আগে জ্বলন্ত মশাল হাতে আসছিল দলের এক ডাকাত। চোখে পড়ে স্ত্রী ও শিশু পড়ে থাকা দেহ দুটি। দু’জনকেই নিয়ে আসা হয় ডাকাতের ডেরায়। সেখানে তাদের সেবা-শুশ্রূষা করা হয়। স্ত্রীলোকটি মারা যায়, শিশুটি বেঁচে যায়।
    শিশুটিকে মনোহর ডাকাত নিজের ঘরে নিয়ে এসে লালন-পালন করতে থাকে। তার নাম দেওয়া হয় —হারাধন। শিশুটির পূর্ব স্মৃতি কিছুই ছিল না। তাই সে মনোহরকেই বাবা বলে জানতো। মনোহরও তাকে ছেলের মতোই ভালোবাসতো। কিন্তু বুড়ি পিসি হারাধনকে দেখতে পারতো না। বুড়ির ইচ্ছে ছিল, মনোহর তার সব সম্পত্তি বুড়ির দেওরকে দিয়ে দিক। কিন্তু হারাধন থাকলে তা হবে না।
    তাই একটু বড়ো হলে মনোহর ভবানীপুরে এক পাদ্রীর স্কুলে ভর্তি করে দিল হারাধনকে। পরিচয় দিল হারাধন বিশ্বাস, পিতা—মনোহর বিশ্বাস। হারাধন জানতো না, মনোহর ডাকাত।
    ক্রমে বয়স বাড়ছিল মনোহরের। এদিকে কোম্পানির শাসন তখন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এলাকায় এলাকায় গড়ে উঠছে থানা ফাঁড়ি। কমে আসছে ডাকাত দলের সংখ্যা। এভাবে মনোহরের ডাকাত দলটাও এক সময় ভেঙে গেল।
    তিন দিনের জ্বরে বুড়ি পিসি মারা গেল। মনোহরও অসুস্থ হয়ে পড়লো ।

    আরো পড়ুন :পুরুলিয়ার অহল‍্যাবাঈ রোড

    একদিন অসুস্থ মনোহর কাছে ডেকে বিছানার পাশে বসালো হারাধনকে। তারপর এ কথা , সে কথা বলার পর ঘরের মেঝেটা খুঁড়তে বললো।
    মেঝে খুঁড়ে পাওয়া গেল তিন ঘড়া টাকা, মোহর ও অনেক সোণা-রূপো।
    মনোহর তার পালিত পুত্র হারাধনকে সেসব অর্থ দিয়ে ঘটা করে বাপের শ্রাদ্ধ, কাঙালী ভোজন ও এলাকার জলকষ্ট দূর করার জন্য পুকুর খোঁড়ার কথা বললো।
    পালিত পিতা মনোহরের সব কথাই রেখেছিল হারাধন। ঘটা করে মনোহরের শ্রাদ্ধ, কাঙালী ভোজনের পর এলাকায় তৈরি করে পুকুর। পালিত পিতা মনোহরের নামে সেই পুকুরের নাম রাখা হয় “মনোহর পুকুর।”
    পরবর্তীকালে সেই পুকুরের নামেই দক্ষিণ কলকাতার বুকে তৈরি হয়েছে “মনোহরপুকুর রোড ।”

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here