কায়াহীন হয়েও সবুজ বাঁচাচ্ছেন বীরভূম রাজনগরের ভয়-ভক্তির ‘খেজুরে পীর’

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল
    রাজনগরের নাকাশ গ্রামের শুঁড়ির ডাঙালে রয়েছেন এক পীর। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ” খেজুরে পীর” নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত বলা যায়, রাজনগরে রয়েছে বহু সুফি সাধকের আস্তানা, যেগুলো সাধারণ মানুষের  কাছে “পীর থান” নামে প‍রিচিত। “পীর” শব্দের অর্থ–“প্রাচীন।” আর এই পীর বা সুফি সাধকদের উদার ধর্মমতের প্রভাবেই রাজনগরে অটুট রয়েছে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির সুসম্পর্ক। এই পীররা কেউ সুদূর আফগানিস্তান, কেউ বা পারস্য দেশ থেকে এসেছিলেন। ভারতে মুসলমান শাসনের আগে উচুঁ শ্রেণির ব্রাহ্মণরা সমাজের নিচু শ্রেণির ব্রাত‍্য অবহেলিত মানুষদের হেয় করতো। অভিজাত দেবপুজোয় তাদের অধিকার ছিল না। এরপর যখন হিন্দু সমাজের উচ্চ বর্ণের সঙ্গে মুসলমান ধর্মপ্রচারকদের বিরোধ হয়, তখন মুসলমান পীর-গাজীদের কাজকর্ম উক্ত অনুন্নত শ্রেণির হিন্দুদের মনে ধরে এবং সেজন্য তারা  মুসলমান ধর্মপ্রচারকদের শ্রদ্ধাভাজন হোন। ক্রমে পীর-গাজীরা উন্নীত হোন লৌকিক দেবতার পদে।  এইসব পীর-গাজীদের সঙ্গে তৎকালীন মুসলমান শাসকদের খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং সেজন্য তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তিও বেশি ছিল। তুষ্ট হলে তাঁরা জাতিধর্মনির্বিশেষে মানুষের উপকার করতেন। যেমন, ঘুটিয়ারির পীর মোবারক গাজী বিখ্যাত জমিদার মদন রায়কে সে সময়ের নবাবের ক্রোধ থেকে রক্ষা করেছিলেন। উদার সুফিবাদের প্রভাবে পীর-গাজীরা বাংলার বহু মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। তাছাড়া পীর-গাজীরা ছিলেন নরবলির বিরুদ্ধে। পীর গোঁরাচাদ ও পীর লোহানীর জীবনী থেকে একথা বোঝা যায়। হেকিমি ও কবিরাজি চিকিৎসাতেও দক্ষ ছিলেন এই সমস্ত পীর-গাজীরা। শুধু মানুষ নয়, পশুপাখির জন্যও ওষুধ দিতেন তাঁরা। মানিক পীরের সেবকরা গৃহস্থ ঘরের পোষ‍্য পশুপাখির চিকিৎসায় বেশ দক্ষ ছিলেন বলে জানা যায়।                                                        পীর গোঁরাচাদ বাঁকানন্দের সঙ্গে যুদ্ধে সাংঘাতিকভাবে জখম হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভার্গবপুরের জঙ্গলে। এ সময় দুজন স্থানীয় গোপ কানু ঘোষ ও কিনু ঘোষ তাঁর সেবা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারা গেলেন গোঁরাচাদ। কানু ও কিনু দুজনে মিলে তাঁকে সেখানেই কবর দিলেন। মাটির নিচে পীরের হাড় আছে বলে ভার্গবপুরের নাম তখন থেকে হয়ে গেল ” হাড়োয়া।” দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় এই নাম এখনো রয়েছে এবং কানু-কিনুর বংশধররা এখনো প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে পীর গোঁরাচাদের স্মরণদিনে দুধ দিয়ে তাঁর দরগা ধুয়ে দেন। আর এজন্য তাঁরা কোনো পয়সা নেন না।  গ্রামাঞ্চলে পীররা ইসলাম ধর্ম প্রচার করতেন, পীর গোঁরাচাদের কাহিনী তার প্রমাণ। উচ্চ বর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণদের অত‍্যাচারে একসময় সমাজের ডোম, হাঁড়ি, চণ্ডাল, মুচি প্রভৃতি নিম্ন বর্ণের মানুষেরা বৌদ্ধ হয়ে ধর্মঠাকুরের উপাসক হয়ে গিয়েছিলেন। এইসব ব্রাত‍্য জনগোষ্ঠীর আশেপাশে গড়ে উঠেছিল বহু “ধর্মঠাকুরের থান।” পরবর্তীকালে মুসলমান পীররা এইসব “পতিত” হিন্দু জাতির আশেপাশে বাসগৃহ গড়ে তোলেন এবং হিন্দু থেকে বৌদ্ধ হওয়া এইসব অন্ত‍্যজ শ্রেণির মানুষদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতে শুরু করেন। বীরভূমসহ গোটা বাংলার গ্রামগঞ্জে তাই এখনো দেখা যায় ধর্মঠাকুরের থানের আশেপাশে মুসলমান পীরদের আস্তানা। স‍্যার হার্বাট রিজলে জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের মুসলমানরা হিন্দু অন্ত‍্যজ শ্রেণি থেকে উদ্ভূত।  আসলে বাঙালি মুসলমানের উদ্ভবের প্রকৃত ইতিহাস হলো ধর্মান্তরিত নিম্ন শ্রেণির হিন্দু জাতির ইতিহাস। তাই বলা যায়, পীরদের আস্তানার আশেপাশে যাদের বাস এবং যারা এইসব পীরস্থানের “খাদিম” বা সেবক হিসেবে কাজ করছেন, তারা সবাই হিন্দু থেকে প্রথমে বৌদ্ধ এবং প‍রে বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ।              এবার ফিরে আসি একদা জেলা বীরভূমের রাজধানী রাজনগরের খেজুরে পীরের কথায়। খৃষ্টিয় ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী হলো এইসব পীরদের আবির্ভাবকাল। রাজনগর নাকাশ গ্রামের এই খেজুরে পীরের  অলৌকিক কাজকর্মের কথা আজও এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। একটি খেজুর গাছের তলায় এই পীরের থান বলে নাম “খেজুরে পীর।” এছাড়া আরও জানা যায়, তিনি খেজুর গাছের রস থেকে গুড় তৈরি করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন। সব মিলে মানুষের কাছে তাই তিনি “খেজুরে পীর।” একটি খেজুর ও একটি পাকুড় গাছ এখানে পাশাপাশি রয়েছে। দুটো গাছেই রয়েছে অজস্র পাতা থেকে ডাল। কেউ এখান থেকে গাছের একটি পাতাও নিয়ে যেতে পারে না। ভুল করে কেউ নিয়ে গেলে আবার ফেরৎ দিয়ে যায়। এমনকি, বাইরের পাখমারা যাযাবরের দলের লোকেরাও কখনও জ্বালানির জন্য এখান থেকে কোনো ডাল-পাতা কোনো কিছুই নিয়ে যায় না। রাজনগরের বহু হিন্দু-মুসলমান পরিবারের মহিলারা খেজুর পাতার তালাই বুনে দু’পয়সা আয় করে থাকেন। এলাকার বহু মানুষের বাড়িতে পোষ‍্য ছাগল রয়েছে। কিন্তু কোনো রকমেই এই খেজুর ও পাকুড় গাছ থেকে একটি পাতা বা ডাল কোনো কিছুই বাড়িতে আনে না। আনলে নাকি ফেরৎ দিতেই হবে। আর এভাবেই রাজনগরের “খেজুরে পীর” এলাকার সবুজকে টিকিয়ে রেখে এলাকার মানুষের কাছে দিয়ে চলেছেন নি:শ্বাসের অক্সিজেন। আজও মানুষ তাঁকে কুর্ণিশ জানায়। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ এই খেজুরে পীরের উদ্দেশ্যে সিন্নি মানত করেন।
    ছবি: উত্তম মন্ডল

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here