কার্গিল: অপারেশন বিজয়, এক অসামান্য বীরত্বের দুই দশক অতিক্রান্ত

    0

    Last Updated on

    –শিবাজী প্রতিম

    দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি দুই পরমাণু শক্তিধর দেশ ভারত ও পাকিস্তান। স্বাধীনতার পর এখনো অবধি চার বার সম্মুখ সমরে এসেছে এই দুই দেশ। শেষবারের জন্য সম্মুখ সমরে আসে ১৯৯৯য়ের মে-জুলাইতে। যার পোষাকী নাম কার্গিল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ভারতের প্রায় ৫ হাজারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য মোতায়েন হয় যার মধ্যে পাকিস্তানের ৫২৭ জন সৈন্য মারা যায় অন্যদিকে ভারতের প্রায় ৭০০ জওয়ান এবং অফিসার বীরগতিপ্রাপ্ত হন। এছাড়া ভারতের ১ জন যুদ্ধবন্দির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রায় ৮ জন যুদ্ধবন্দী ভারতের হাতে ধরা পড়ে। এই যুদ্ধের আগা-গোড়া বুঝতে গেলে যেতে হবে তার ঠিক এক বছর আগেকার ইতিহাসে।

    সালটা ১৯৯৮। প্রথমবারের জন্য অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে তখন এনডিএর সরকার দিল্লীতে। ক্ষমতায় এসেই পোখরানে পরমাণু পরীক্ষা করার নির্দেশ দেন তিনি। হিসেব মত কাজও হল। সমস্ত তাবড় ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নজর এড়িয়ে পরপর তিনটি হাইডিরোজেন বোমার সফল বিস্ফোরণ ঘটাতে সমর্থ হয় ভারত। ভারতের এই বাড়বাড়ন্ত দেখে ভীত হয় আমাদের পয়লা নম্বর শত্রু প্রতিবেশী দেশটি। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তাদেরই অনুকূলে। আফগানিস্তান থেকে সরে গেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অনেকদিন হল তার পতনও হয়েছে। অন্যদিকে তার পতনের পর একমুখী বিশ্বের প্রতিভু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধাণ সামরিক জোটসঙ্গী হয় পাকিস্তান। কাজেই তাদের আর পায় কে ! তারাও পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটায় পাল্টা। অন্যদিকে পাকিস্তানের তখত তখন নওয়াজ শরীফের হাতে থাকলেও মূল ক্ষমতা স্বাধীনতার আগে পুরোনো দিল্লীর বাসিন্দা সেনাপ্রধাণ জেনারেল পারভেজ মুশারফের হাতেই। তিনি এবং তার সেনাবাহিনীর দুইজন প্রথম সারির অফিসার ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মুহম্মদ রফিক তারার মিলে ইসলামাবাদে বসে বানালেন ‘কার্গিল প্ল্যান’। তাতে ঠিক হল শীতকালে যখন ‘সিজফায়ার’ মোতাবেক ভারতীয় সেনা ‘লাইন অফ কন্ট্রোল’ ছেড়ে পিছিয়ে যাবে তখন সাধারণ মানুষের পোষাকে পাকিস্তানের নর্দান ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের কয়েক হাজার জওয়ান সেটা অতিক্রম করে ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে এক নম্বর জাতীয় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই লাইনকে কেটে দেবে। ফলে কার্গিল এবং তার সংলগ্ন এলাকা গোটা কাশ্মীর উপত্যকা এবং রাজ্যের বাকি অংশ থেকে আলাদা হয়ে যাবে। কারণ হিসেবে সেই বৈঠকে সিয়াচেনের ‘অপারেশন মেঘদূত’কে বলা হল। এদিকে ততদিনে পাকিস্তান পরমাণু শক্তিধর হয়ে গেছে। কাজেই ক্ষমতার দম্ভে মশগুল পাকিস্তানী অফিসাররা ভাবলেন দূর্বল ভারত কখনোই সেই ভয়ে পাকিস্তানকে আক্রমণ করার সাহস পাবেনা। কথামত সেই শীতকাল থেকে অনুপ্রবেশও শুরু হয়ে গেল। যার খবর দিল্লীতে পৌঁছতে প্রায় মে মাস হয়ে গেল। প্রথমে মনে করা হয়েছিল পাক মদতপুষ্ট জঙ্গীরা হয়তো অনুপ্রবেশ করেছে। কিন্তু পরে ‘পেট্রল পার্টি’ পাঠিয়ে যখন সেনার জওয়ানরা ফেরত আসলো না তখন বোঝা গেল আসল ব্যাপার। প্রধাণমন্ত্রী বাজপেয়ী আর দেরী করেননি। ঘোষণা করে দিলেন যুদ্ধের। দ্রাস, বাতালিক, মুকশো, কার্গিল মূলত এই চারটি সেক্টরেই যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিকে পাকিস্তানী সেনার প্রচুর জওয়ান মোতায়েন করার ফলে এবং ভারতের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেকটাই উপরে থাকার কারণে ভারতেরই ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। তবে পরের দিকে বায়ুসেনার বিমান এবং বোফোর্সের লাগাতার শেলিংয়ের জন্য ভারত জয়লাভের দিকে অনেকটাই এগিয়ে আসে এবং পাকিস্তানের কবজায় চলে যাওয়া জায়গাগুলো পদাতিক বাহিনীর সহায়তায় ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারে সমর্থ হয়। তবে তার মূল্য হিসেবে বহু জওয়ান এবং অফিসারকে বীরের মৃত্যু বরণ করতে হয়। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বহুচর্চিত হলেন ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা।
    সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধাণ ‘ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্ট’ জম্মু কাশ্মীর রাইফেলসের ১৩ নম্বর ব্যাটেলিয়ানের এই অফিসার ৬য় জুন দ্রাস সেক্টরে ২ রাজপুতানা রাইফেলসের রিজার্ভ হিসেবে মোতায়েন হন। অনেকগুলি সফল অপারেশন করার পর অবশেষে ২০ জুন পয়েন্ট ৫১৪০ পূনর্দখল করার দায়িত্ব পান তিনি এবং তাঁর ‘ডেল্টা কম্পানি’। বহুক্ষণ বীরের মত লড়াই করার পর শত্রুর গুলিতে বীরগতি প্রাপ্ত হন এই অফিসার। তার বীরত্বের কাহিনী আজও ভারতীয় সেনার জওয়ানদের মুখে মুখে ঘোরে। যুদ্ধশেষে ভারত সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ যুদ্ধকালীন বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে ‘পরমবীর চক্র’ পুরস্কার প্রদান করে।

    আজ ২৬য়ে জুলাই। কার্গিল বিজয় দিবস
    আজকের দিনেই অপারেশন বিজয় শেষ হয় এবং পাকিস্তান দ্বারা দখলীকৃত জায়গাগুলি পুনরুদ্ধারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষিত হয়। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে কার্গিলে বীরগতিপ্রাপ্ত হওয়া সমস্ত জওয়ান, অফিসারদের প্রতি আজকের দিনে রাইজিং বেঙ্গলের শ্রদ্ধার্ঘ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here