সিন্ধু সভ‍্যতা, আর্য ভারত ও হিন্দুত্ব

    0
    Indus Civilization, Aryan India and Hindutva

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ‍্যতার ভেতর থেকেই জন্ম হয়েছিল আর্য ভারতের। এরপর আধুনিক ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে আর্য-ভারত বিভিন্ন সমাজ ও ধর্মবিশ্বাসে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু বিভক্ত হয়েও একটি জাতিসূত্রে ঐক্যবদ্ধ যে ভারত এবং তা হলো, ভারতীয়তা। ভারতবর্ষের আরেক নাম হিন্দুস্থান। এই হিন্দুস্থানের প্রতিটি অধিবাসীই “হিন্দু।” কারণ, “হিন্দু” শব্দটি কোনো ধর্মসূচক শব্দ নয়, এটি হলো একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রসূচক শব্দ‌।
    পরিধি অনুসারে ঋগ্বেদে ভারতবর্ষের নাম ছিল “সপ্তসিন্ধব:।” সাতটি নদী দ্বারা বিধৌত যে দেশ, সেই দেশ “সপ্তসিন্ধব:।” পাঞ্জাবের পাঁচটি নদী এবং আরও দুটি নদী মিলে সাতটি নদী। শেষের দুটি নদী কারো মতে,গঙ্গা ও যমুনা কিংবা সরস্বতী।

    আরো পড়ুন :সোমনাথ মন্দিরের ভাঙা-গড়া : ধ্বংসশক্তিকে হারিয়ে সৃষ্টিশক্তির জয়ের এক মাইলস্টোন

    ঋগ্বেদে আমরা নদীগুলির উল্লেখ পাচ্ছি :
    “ইয়ং মে গঙ্গে যমুনে সরস্বতী শুতুদ্রি
    স্তোমং সচতা পরুঞ‍্যা ।
    অসিক্লয়া মরুদ্ধৃধে বিতস্তয়ার্জ্জীকীয়ে
    শৃণুহ‍্যা সুষোময়া ।।” —ঋগ্বেদ ১০/৭৫/৫.
    অর্থাৎ গঙ্গা, সিন্ধু, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, শতদ্রু, বিতস্তা, আর্জিকিয়া, পরুঞ্চি, অসিক্লি।

    বাইরের দেশের মানুষ আমাদের দেশকে “সপ্তসিন্ধু” নামেই অভিহিত করেছিল। কিন্তু আমাদের প্রত‍্যন্ত প্রতিবেশী ইরাণীগণ এই “সপ্তসিন্ধু” নামটিকে সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে না পেরে বলতো “হপ্তহন্দু।” ইরাণী ভাষায় “স”-এর উচ্চারণ নেই। তাই “স” হয়ে যায় “হ।” এই কারণে সিন্ধু বিধৌত অঞ্চলগুলি “হিদুষ” নামে পরিচিত হয়ে যায়। সিন্ধুনদের ব-দ্বীপ এলাকা কিছুদিনের জন্য পারসিক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং তখনই এই এই অঞ্চলের নাম হয় “হিদুষ।”

    পরবর্তীকালে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতক নাগাদ গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডটাস প্রথম ব‍্যবহার করেন “ইণ্ডিয়া” নামটি। গ্রীক ভাষায় “হ”-এর উচ্চারণ নেই। তাই তার বিকল্প “ই” ব‍্যবহার করে পূর্বের সিন্ধুনদের উপত্যকা অঞ্চল সিন্ধু-হিন্দুষকে পশ্চিমস্থিত আইয়োনীয়ান গ্রীকরা উচ্চারণ করতো “ইন্দস” এবং সেই গ্রীক উচ্চারণ থেকেই এদেশের নাম হয়ে গেল “ইণ্ডিয়া।” যদিও হেরোডটাস এ দেশে আসেন নি, পারসিক লেখাপত্র থেকেই তিনি ভারত সম্পর্কে জেনেছিলেন। তবে “ইণ্ডিয়া” শব্দটি দিয়ে তখন কিন্তু সিন্ধুনদের ব-দ্বীপ এলাকাকেই বোঝাতো। পরবর্তীকালের গ্রীক বিবরণীতে “ইণ্ডিয়া” সমগ্র ভারত উপমহাদেশকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ, ভারতের ভৌগোলিক পরিধি তখন বেশ বেড়েছে।
    এরপর দেশের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের নাম হয়েছে “ব্রহ্মাবর্ত”, তারপর আরও বেড়ে হয় “ব্রহ্মর্ষিদেশ”, তারপর “মধ্যদেশ”, তারপর “আর্যাবর্ত” এবং সব শেষে “ভারতবর্ষ।”

    আবার ২৬২ খ্রিস্টাব্দে খোদিত ইরাণের সাসানীয় শাসকের একটি শিলালিপিতে পাওয়া যাচ্ছে “হিন্দুস্থান” শব্দটি। এখানেও “হিন্দুস্থান” বলতে সিন্ধুনদ সংলগ্ন অঞ্চলকেই বোঝানো হয়েছে। পরবর্তীকালে খ্রিস্টিয় দশম শতকের শেষভাগে এক অজ্ঞাতনামা লেখকের লেখা “হুদুদ-অল্-আলম” গ্রন্থে “হিন্দুস্থান” বলেন বোঝানো হয়েছে গোটা ভারতবর্ষকে।
    সুতরাং দেখা যাচ্ছে, প্রাচীন ভারতে “হিন্দু” শব্দটি প্রচলিত ছিল না। তখন ছিল শৈব-শাক্ত-সৌর-গাণপত‍্য-বৈষ্ণব প্রভৃতি ধর্ম, যেগুলিকে আম‍রা আজ হিন্দুধর্মের উপ-বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত করি।
    তাই ভারতবর্ষের প্রাচীন পরিচয়ের নাম “আর্য ভারত” এবং প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির নাম “আর্য সংস্কৃতি”, আর ভারতের প্রাচীন ধ‍র্মের নাম “বৈদিক ধর্ম ” বা “আর্যধর্ম।”
    আর্য ভারতের ঋষিরা বলেছিলেন,
    “সংগচ্ছধং সংবদধং সংবো মনাংসি জানতাম্।”

    অর্থাৎ, তোমরা ভিন্ন নও, তোমরা একসঙ্গে চলো, এক তত্ত্বে স্থির হও, সকলের মনে নিজের মনকেই জানো।
    বিশ্বমানবতার বার্তা দিয়ে তাঁরা ঘোষণা করেছিলেন,
    “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস‍্য পুত্রা:
    আ যে দিব‍্যানি ধামানি তস্থু ।।” –ঋগ্বেদ
    অর্থাৎ, “শোন বিশ্বজন, তোমরা সব অমৃতের পুত্র ; দিব‍্যধামের নিত‍্য অধিকারী।”
    অমৃতের পুত্রদের শান্তির সন্ধান দিতে আর্য ঋষিদের কোনো অস্ত্রের দরকার হয়নি ।

    আরো পড়ুন :বাপ্পা রাওয়াল, রাজস্থানের যুদ্ধ এবং পরাজিত আরব বাহিনীর সিন্ধুদেশ ত‍্যাগ

    তাঁদের প্রার্থনা ছিল সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতির জন্য। তাঁরা বলেছিলেন,
    “শান্তা দৌ: শান্তা পৃথিবী
    শান্ত মিদ্ মুর্বন্তরিক্ষম্ ।
    শান্তা উদন্বতীরাপ শান্তা ন: সন্তোষধী: ।।
    শান্তানি পূর্বরূপানি শান্তাং নোৎস্তু কৃতাকৃতম ।
    শান্তং ভুতং চ ভব‍্যং চ সর্বমেব শামস্তু ন:।।”
    –অথর্ববেদ ১৯/১/৯/১-২.
    অর্থাৎ, ” এই আকাশ শান্তিময়, এই পৃথিবী শান্তিময়, শান্তিময় এই অন্ত:রীক্ষ। জল-স্থল-বৃক্ষ-ব্রততী সব শান্তিময়। শান্তিময় আমাদের পূর্বরূপ। শান্তি নামুক, যা করা হয়েছে, তার মধ্যে। শান্তি নামুক, যা করা হয়নি,তার মধ্যে। অতীত শান্তিময়, ভবিষ্যতও হবে শান্তিময়, শান্তি ঘিরে থাক্ আমাদের সবকিছু।”
    এই হলো বৈদিক ধর্মের স্বরূপ। ভারতবর্ষের ঋষিগণ এই ধর্মের স্বরূপ সাক্ষাৎ করেছিলেন ।

    ছবি সৌজন্য: টুইটার

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here