শিকারসেঁদরাকথা: শেষপর্ব

    0
    Hunting-tale-of--ancient-india

    Last Updated on

    দুর্গেশনন্দিনী

    এহো দিনৗম খাটাও হড়
    পাঠে কেটেজ তেঁগোনমে মা
    দিল দাড়েতে বেরেৎমে মা,
    তেয়ার লৗগিৎ তেঁগোয় মে মা
    ধৗরতি জাগাও হর,,
    এহো দিনৗম খাটাও হড়।

    সাব মে আমাঃ কৗখয়ৗ সাবল
    চাকলি-ঝাবা-কুডি ̶ সঁবল
    সির্জন মে মা ধৗরতি নিরৗই
    উদ্গৗও উসৗস্ খঁড়,
    এহো দিনৗম খাটাও হড়।

    ওগো দিনখাটা মানুষজন,
    দৈহিক শক্তি নিয়ে কোমর বেঁধে দাঁড়াও
    ধসে পড়া এই ধরণীর জাগরণ পথকে
    সমান করে সাজিয়ে তোল।

    তোমাদের নিত্য সঙ্গী—
    গাঁইতি-কোদাল-ঝড়া-সাবল শক্ত হাতে ধর,
    আরো যা কিছু সম্বল আছে তা-দিয়ে
    এই সৃষ্টির বুকে উজ্জীবিত শক্তির বীজ বপন কর।
    ওগো দিন-খাটা মানুষ-জন!

    শিকার পর্ব ক্ষান্ত হলে #সুতান_টাডি তে একদিক থেকে যেমন শিকারীর দল এসে হাজির হন অপর দিক থেকে দূর-দূরান্ত থেকে বহু নয় নারী দল বেঁধে উপস্থিত হন। পুরুষরাই নিয়ে আসে ধামসা , মাদল, ঢাক, চরচড়ি, ঘন্টা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র । শুরু হয় নাচ , গান। এখানে মূলত পুরুষরাই আলাদা আলাদা দলে বিভক্ত হয়ে গিয়ে আসর জমান। শিকারীরাও বিশ্রামের পর নাচ-গানে যোগ দেন। এই ভাবেই অনুষ্ঠানের অন্তিম পর্ব উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

    ওগো চাঁপা ফুল,

    এ—চম্পা বাহা—ডৗররেম বাহা আকান,
    আমাঃ রুপরে গাতেয় ঝালাকঃ কান।
    স’ মা দঁগয় দঁগয় গটাম আঁৎকাও হচয়,
    গাতে সঁধাড় স’ তায় সালাগঃ কান।

    আলম আঁধাঞ মাসে ! —হড় দ দিনি তিঞসে,
    তাঁড়খাও মনতিঞ আলম কৗঁহিস হচয়।
    উনি রেগে অনে, তপল আকান মনে
    ঝালাক্ তায় দ আলম দানাং ওকোয়।

    সুন্দর সুসজ্জিত শাখায় ফুটে রয়েছ।
    আমি জানি, তোমার রূপের আড়ালে
    আমার প্রিয় সাথীকে লুকিয়ে রেখেছ।

    বাতাসে সুবাসিত সুগন্ধের বিকীরণে
    তার উপস্থিতি অনুভব করছি,
    আমাকে আর দ্বিধা সংশয়ের মধ্যে রেখো না,
    আমি যে তার কাছে বিলিয়ে দিয়েছি
    সমস্ত মনপ্রাণ।
    ওগো চাঁপা ফুল, আমার প্রিয় সাথীকে
    ফিরিয়ে দাও। ফিরিয়ে দাও না।

    শিকার পর্বের অন্তিম অনুষ্ঠানে তিনটি বিষয় উল্লেখ্য :
    প্রথমত, শিকার দলগত ব্যাপার, শিকারিরা অস্থায়ী আশ্রয় বানিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেন। আর শিক্ষালব্ধ প্রাণীর মাংস ভাগ করেন। সকলের সমানভাবে সেই মাংস ভাগ হয়।কিন্তু প্রাণীটির প্রকৃত হত্যাকারী পান প্রাণীর মস্তক । দুজন দাবিদার হলে দিহরি বা দিহিরি মীমাংসা করে দেন। এছাড়া শিকার চলাকালীন যদি কারো সঙ্গে কোনো রকম মনোমালিন্য থাকে; কিংবা এক দলের সঙ্গে অন্য দলের বিরোধিতা দেখা দেয় তাহলে দিহিরি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আপোষ মীমাংসা করে দেন। দিহিরি এখানে #সর্বেসর্বা, তাঁর আদেশ এখানে সবাই মাথা পেতে নেন।

    আরও পড়ুন – সীমান্ত নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক বসতি ! ইজরায়েল ও প‍্যালেস্তাইনের আইনী লড়াইয়ের পরিণতি বসতি ধ্বংস

    দ্বিতীয়ত, এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন এলাকার , প্রয়োজনে বহুদূর থেকে দূরান্তের মাঝি মোড়লদের আমন্ত্রণ করে আনা হয়। তাদের নিয়ে গঠিত হয় সর্বোচ্চ আদালত । একে #লবিরবায়সি বা #লবিরপরগনা বলে। একে সাঁওতাল সমাজের সুপ্রিম কোর্ট বলা যেতে পারে । কোন এলাকায় কোন সমস্যা যদি তাদের স্থানীয় মোড়ল দ্বারা সমাধান করা সম্ভব না হয় কিংবা মোড়লের বিচার কারো পছন্দ না হয় তাহলে এখানে তিনি আবেদন করতে পারেন। স্বামী-স্ত্রীর দ্বন্দ্ব, থেকে শুরু করে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, বিষয় সম্পত্তির দ্বন্দ্ব, পাড়া এলাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব, দেওয়ানী হোক বা ফৌজদারী , সব অপরাধের পূর্ন বিচার মীমাংসা এখানে করা হয় । লবির বায়সির রায় সবাই মাথা পেতে মেনে নিতে বাধ্য থাকেন।

    আরও পড়ুন – চের্নোবিল: কয়েকটি ভুল ও কয়েক প্রজন্মকে দেওয়া তার মাসুল

    তৃতীয়ত, এখানে অনুষ্ঠিত হয় নাচ-গানের চূড়ান্ত আসর। প্রায় সব ধরনের নাচ গান পরিবেশিত হয়।কোন দল নাচ গানে কতটা পরিশীলিত, কে কত দক্ষ মাদারিয়া, কে ভালো গাইতে পারেন, কোন দল ভালো নাচে
    .. তা নিয়ে একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। অনেকে আবার ব্যক্তিগত একক প্রচেষ্টায় বায়েনের মধ্য দিয়ে, নাচ-গানের মধ্য দিয়ে তাঁর বিরত্ব প্রকাশ করেন। দক্ষতা, আমোদ প্রিয়তা, রসিকতা ইত্যাদি পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে এটি। লক্ষ্য করা যায় ।

    শিকার পর্বের অনুষ্ঠানকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একদিকে যেমন পরিচিত নাচ- গান -বাদ্য পরিবেশিত হয়…. অন্যদিকে তেমনি ভিন্ন স্বাদের ভিন্ন প্রকৃতির নাচ-গানের কথা নাটকের ঢঙে পরিবেশিত হয়। যিনি পরিবেশন করেন তাঁকে #কুঁডিয়া বলা হয় ।কুঁডিয়ার কাজ সবার দ্বারা হয় না। ঠিকমত পরিবেশিত না হলে কারো মনে ধরে না। তাই কোন কোনো শিকারী দল ভাড়া করে নিয়ে যায় ।

    বলাই বাহহুল্য শিকার উৎসব যত প্রকার নাচ গান পরিবেশিত হয়, তাদের মধ্যে কুঁডিয়া নাচের আসর সবচেয়ে আকর্ষণীয় । যদিও তাদের নাচগান কতকথা অন্যকোনো উৎসব অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

    কতকথার মধ্যে বন্য প্রাণীর সঙ্গে লড়াইয়ের লোমহর্ষক কাহিনী খন্ড খন্ড চিত্র তুলে ধরা হলেও, তার থেকেও যে বড় অংশ থাকে তাকে এক কথায় বলা হয় কোক শাস্ত্র। নির্জন অরণ্যপ্রান্তরে নরনারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা, যৌন মিলনের নানা প্রকৃতি এবং তার পরিণতি ইনিয়ে-বিনিয়ে রসের মাধ্যমে অত্যন্ত নগ্নভাবে পরিবেশন করা হয়। কুঁডিয়া বর্ণনা করে, সুর করে গান ধরে এবং বাউল কবিয়ালদের ঢঙে এক চক্কর নাচে। অন্য দুজন নারী ও পুরুষ সেজে চুম্বন আলিঙ্গন , মিলন ইত্যাদি অভিনয় করে দেখায়। এই আসরে মেয়েদের কোন স্থান থাকে না । যাহোক কুঁডিয়া দের বিষয় শিকার পর্বের উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং উক্ত কারণবশত অন্যত্র উৎসবে তাঁরা নিষিদ্ধ।

    আরও পড়ুন – সেকুলারিজম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা : ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত

    লাবির বায়সির কাজ শেষ হলে নাচ গানও শেষ হয়।শেষ হয় শিকার উৎসব। এবার সবার ঘরে ফেরার পালা। যে যাঁর দ্রব্য সামগ্রী গুছিয়ে নিয়ে বাড়ির পথ ধরেন । গ্রামের বাড়িতে তখন সবাই অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে থাকেন। শিকারীরা বাড়ি ফেরা মাত্র পাদ্য ,অর্ঘ্য, দীপ দিয়ে তাঁকে বীরের সম্মানে বরণ করা হয় । সেইযে এতদিন ধরে যে নারীরা তাঁদের স্বামীর নিমিত্ত বৈধব্য পালন করেছেন, স্বামীরা ফিরে তাঁদের হাতে নোয়া পড়িয়ে দেন এবং সঙ্গে আনা #মাড়ার_বাহা স্ত্রীর আঁচলে বেঁধে দেন। শিকার পর্বের ইতি হয়।

    এক্ষেত্রে বলে রাখি বর্তমানে শিকার পর্বের উৎসব অনুষ্ঠিত হলেও উপরে বর্ণিত বিষয় গুলি আর তেমন দেখা যায় না। এসব এখন লুপ্ত হয়ে গেছে, এখন রয়েছে কেবলমাত্র উৎসব….

    সত্যি কথা বলতে কি আমাদের আদিম সনাতনী এই প্রাচীন বংশধরটি মারাং বুরু ,সিং বোঙ্গা , দেবী জাহের এরা, টাড়বারো এদের ওপর গভীর বিশ্বস্থতা পোষণ করে থাকেন।এখন এত পরিমাণে বৈদেশিক দুই ম্লেচ্ছ ধর্ম প্রবেশ করছে, জোর করে ধর্মান্তর হচ্ছে যে তাদের আনুগত্য বহুলাংশে কমে গেছে । আগামী দিনের এদের মূলস্রোতের মূল সংস্কৃতিট স্থিতিলাভ করবে কিনা তা নিয়ে ভয় লাগে ?

    যেসব #থান গুলিতে এদের আর্কিটেকচারের পুরাকীর্তি নিদর্শন দেখা যায় তাতে সামাজিক-ধর্মীয় কৃষি ব্যবস্থার অনেক ছোঁয়া লক্ষ্য করার মত। বিশেষ করে ঝাড়গ্রাম মহকুমা, পুরুলিয়ার পশ্চিম অর্ধাংশ, বর্ধমানের পশ্চিমাংশ, বাঁকুড়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ, বীরভূমের উত্তর-পশ্চিমাংশ প্রভৃতি ডাঙা ডহর স্থানে যেসব থান দেখা যায় অধিকাংশ উপযুক্ত যত্নের অভাবে গলিত শবের মত লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিশাল বিশাল মহীরুহ ব্যতীত তার তলায় আর কিছুই দেখা যায়না -লুপ্ত হয়ে গেছে।

    স্থানীয় মানুষ কিছু আবেগ মিশ্রিত গলায় বলেন দেবতারা মাটির তলায় রয়েছেন। নব্যরা বলেন একসময় হয়তো ছিল এখন আর তার অস্তিত্ব নেই। দুঃখের বিষয় হলো এখন একটি মহীরুহ ঝড়ে ভেঙে গেলে সেখানে বনদেবতা বা ইন্দ্রের থান সৃষ্টি হয় না একটা বৃহদাকার সর্প মারা গেলে সেখানে মনসার থান সৃষ্টি হয় না….. ক্রমশ একটা সংস্কৃতি লুপ্ত হতে বসেছে ….এবার একটু আমাদের ভাবার সময়ও এসেছে…ভাববেন না এদের রক্ষা করবেন?

    ধৗরতিরে তেঁগো কাতে লল ধিপৗং বালি—
    ইঞ অং আকাদৗঞ—বারয়া লুটি ফাদা কাতে,
    ইঞাঃ আঁশ—ধৗরতি রেয়াড়ঃ মা!
    বাঞ্চাও হচ আন ক—কাটিজ্ তালাং দাঃ রেন
    চিলবিলৗও ডৗঁড়কৗ হাকো।
    বাঞ্চাও হচ আন ক—ধৗরতিরেন খাটুওয়ৗ
    হেঁদে লোবোঃ মুউচ্।
    ফারকাও ছিৎয়ৗও হচ আন উড়মালাও দুলৗড়,
    অৗনৗড়ি মৗনমি মনে জিউয়ী রেনাঃ
    রিলৗ মালা উপুরুম চিপিনৗহৗপ
    সৗগৗই হচ আন—মিৎ খুঁদড়ি রৗপুৎ কাঁত্ দানাং
    তেরদেজ্ লেকা।
    ইঞদঞ খজ্ কানা ধৗরতি রেয়াড়ঃ মা।
    বোরকেতঃ মা আনমানাও দুলৗড়।

    গরম বালির ঢিপির ওপর দাঁড়িয়ে
    আমি দুটি ঠোঁট ফাঁক করে ফুঁ দিয়ে যাই
    আহা, পৃথিবী শীতল হোক,
    অল্প জলেতে কিলবিল করে দাঁড়িয়ারা বেঁচে থাকুক,
    আর বেঁচে থাকুক খেটে খাওয়া কালো খুদি পিঁপড়ের দল।
    আনাড়ি মানুষের মনে বেঁচে থাক
    সুকোমল প্রেম, তাদের কুঁড়ে ঘরের
    ভাঙা পাঁচিলের পেছনে স্নিগ্ধ চাঁদের আলো উঠুক,
    অন্ধকার সরিয়ে সুবাসিত হোক অমল বাতাস।
    আমি এই পৃথিবীতে খুঁজে যাচ্ছি সত্যিকারের ভালবাসা …

    সমাপ্ত

    তথ্যঃ বাংলা সংস্কৃতি : লুপ্ত ও লুপ্ত প্রায় : নারায়ণ সামাট

    সাঁওতাল ধর্মের জমসিম বিন্তি. ডঃ স্বপন সরেন

    কবিতা :সারিধরম হাঁসদা—এই ছদ্মনামের আড়ালে স্বনাম-খ্যাত সাঁওতাল কবি বাসুদেব হাঁসদা , ভাবাঅনুবাদক হলেন বিশ্বেশ্বর কুণ্ডু

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here