বীরাঙ্গণা সাধিকা ময়নামতী

    0
    mainamoti-of-comilla

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    সময়কাল : ১০০৫ খ্রিস্টাব্দ।
    অধুনা বাংলাদেশের পূর্বসীমায় কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমে একটি অনুচ্চ পাহাড়ি টিলা, নাম “ময়নামতী।” কেউ কেউ বলেন, “লালমাই হিলস্।”
    প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে বৌদ্ধযুগের বহু মূল্যবান নিদর্শনসহ এখানে একটি দুর্গ-প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ আবিস্কৃত হয়েছে।
    হারিয়ে যাওয়া বীরাঙ্গণা এই ময়নামতীকে নিয়েই আজকের বীর-গাথা।…
    চন্দ্রবংশীয় রাজা ছিলেন মানিকচাঁদ। কেউ বলেন, মানিকচন্দ্র। তাঁর রাজ‍্যের নাম “কমলাঙ্ক।” বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা। রাজধানী ছিল প্রাচীন ত্রিপুরা রাজ‍্যের “পট্টিকেরা।” স্থানটি বতর্মান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার “পটিকার পরগণা।”
    অন্যদিকে, মেহেরকুল রাজ‍্যের রাজা ছিলেন তিলকচাঁদ। তাঁর এক কন্যার নাম “শিশুমতী।”
    কমলাঙ্ক অর্থাৎ কুমিল্লার রাজা মানিকচাঁদের সঙ্গে বিয়ে হয় শিশুমতীর। তিলকচাঁদের কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর অনুরোধে বিয়ের পর মেয়ে-জামাই শিশুমতী ও মানিকচাঁদ মেহেরকুল রাজ‍্যেই বসবাস করতে থাকেন।
    শৈশবকাল থেকেই ধর্মের প্রতি অনুরাগ ছিল শিশুমতীর। বিয়ের পর প্রসিদ্ধ নাথযোগী গোরক্ষনাথের কাছে দীক্ষা নিলেন শিশুমতী। দীক্ষার পর শিশুমতীর নতুন নাম হলো “ময়নামতী।”
    ড: আশুতোষ ভট্টাচার্য সম্পাদিত (১৯৬০) “গোপীচন্দ্রের গান” থেকে আমরা পাচ্ছি সে তথ্য:
    “বাপ মাহে নাম থুইল শিশুমতী আই।
    গোর্খনাথে থুইল নাম সুন্দর মৈনাই।।”
    মৈনাই অর্থাৎ ময়নামতী।

    আরও পড়ুন – শালি ধান, শালি ব্রাহ্মণ ও ধানলক্ষ্মীর পাঁচালী


    এদিকে সতীনদের মধ্যে নিত্যদিন কলহ-বিবাদে বিরক্ত মানিকচাঁদ স্ত্রী ময়নামতীকে নির্বাসিত করলেন ফেরুসা নগরে। ময়নামতী তখন গর্ভবতী। সেকথা জানা ছিল না মানিমানিকচাঁদের। এরপর একসময় অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন মানিকচাঁদ।
    ইতিমধ্যে স্বামীর মৃত্যুর পর যথারীতি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন ময়নামতী। পুত্রের নাম রাখা হলো “গোপীচাঁদ।” ময়নামতী ফিরে এলেন স্বামীর রাজ‍্য কমলাঙ্কের রাজধানী পটিকেরা শহরে।
    ১২ বছরের পুত্র গোপীচাঁদের সঙ্গে ঢাকার কাছে সাভার রাজ‍্যের রাজা হরিশ্চন্দ্রের কন্যা অদুনার বিয়ে দিলেন ময়নামতী। পুত্র গোপীচাঁদ মায়ের মতোই ছিলেন ধর্মপ্রাণ। তিনি বেশির ভাগ সময়ে মামার বাড়ি পটিকেরায় থাকতেন এবং তন্ত্রসাধনা করতেন।
    পিতার মৃত্যুর পর গোপীচাঁদ কমলাঙ্ক রাজ‍্যের রাজা হোন। মা ময়নামতী তাঁর রাজ‍্যাভিষেক করেন।
    পুত্র মামার বাড়িতে সাধন-ভজনে ব‍্যস্ত থাকায় নাবালক পুত্রের হয়ে রাজ‍্য পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন ময়নামতী ( আনুমানিক ১০০৫ –১০৩০ খ্রি:)।
    চল্লিশজন সামন্তরাজা ময়নামতীকে কর দিতেন।
    “চল্লিশ রাজায় কর দেয় আমার গোচর।
    আমা হতে কোন্ জন আছয়ে ডাঙ্গর।।”—গোপীচন্দ্রের পাঁচালী, ভবানী দাস
    ময়নামতীর সৈন্যবাহিনীও ছিল বিশাল। যেমন, লক্ষ লক্ষ ধনুর্বাণ,
    ৩২ কাহন ( ৪০,৯৬০ টি ) নৌকো,
    ৮০ হাজার হাতি,
    ৯ লক্ষ ঘোড়া,
    ৭২ লক্ষ অন্য সৈন্য,
    ৮২ হাজার ঢালি সৈন্য,
    ৯ হাজার ধানুকী,
    ৬২ জন উজির,
    ৬৪ জন শিকদার এবং
    ময়নামতীর নিজের জন্য ছিল একটি স্পেশাল “হংসরাজ ঘোড়া।”
    সুযোগ বুঝে একবার ঢাকার নিকটবর্তী রংপুর রাজ‍্যের রাজা দ্বিতীয় ধর্মপাল আক্রমণ করে বসলেন ময়নামতীর রাজ‍্য। এই ধর্মপাল কিন্তু পালবংশের লোক ছিলেন না। তিনি ছিলেন কামরূপের রাজা ভগদত্তের বংশধর। অন্যদিকে, ঘনারামের “ধর্মমঙ্গল” অন্যসারে, আবার তিনি ছিলেন ময়নামতীর ভগ্নিপতি। ময়নামতীর বোন বনমালার স্বামী।
    ময়নামতী পুত্র গোপীচাঁদের শ্বশুর অর্থাৎ নিজের বেয়াই হরিশ্চন্দ্রের সহায়তায় পাল্টা আক্রমণ করলেন ধর্মপালের রাজধানী ধর্মপুর। স্থানটি রংপুর জেলার ডিমলা থানার অন্তর্গত। এই ডিমলা থানার মধ্য দিয়েই বয়ে চলেছে তিস্তা নদী।

    আরও পড়ুন – পলাশির আগেই বেইমানির শিকার বীরাঙ্গণা চাঁদ বিবি


    তিস্তা নদীর তীরে দু’পক্ষের মধ‍্যে তুমুল লড়াই চললো।
    মারা গেলেন ময়নামতীর বেয়াই হরিশ্চন্দ্র। তবে ময়নামতী নিজে ধর্মপালকে হারিয়ে দখল করে নিলেন তার রাজধানী ধর্মপুর। সেইসঙ্গে কামরূপ রাজ‍্যটিও ময়নামতীর দখলে চলে এলো।
    এরপর বেয়াই হরিশ্চন্দ্রের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ময়নামতী ধর্মপালের পিছু ধাওয়া করে চলে এলেন বাঁকুড়া পর্যন্ত। এখানে হাকন্দ নদীর তীরে স্থাপন করলেন তাঁর অস্থায়ী রাজধানী, নিজের নামেই তার নাম হলো “ময়নাপুর।” এখানে তিনি নিজের নামেএকটি দুর্গ তৈরি করেন‌। নাম হয় “ময়নামতীর কোট।”
    এই বাঁকুড়া পর্বের পর থেকে ময়নামতীর আর কোনো সঠিক খোঁজ পাওয়া যায় না।
    অন্যদিকে, ময়নামতীর তাড়া খেয়ে পরাজিত দ্বিতীয় ধর্মপাল মেদিনীপুরের দণ্ডভূক্তি অর্থাৎ বর্তমান দাঁতনে গিয়ে নিজের নতুন রাজ‍্য স্থাপন করলেন।
    বাঁকুড়ার ময়নাপুরে বর্তমানে হাকন্দ নদী হারিয়ে গেছে। রয়েছে হাকন্দ পুকুর। এই পুকুরের পাড়ে একটি মন্দিরে রয়েছে পাথরের খোদাই করা ময়নামতীর ধ‍্যানমগ্না মূর্তি ও ঘোড়ায় চড়া মূর্তি।
    মানিকচাঁদের গানের মধ্যে ময়নামতী ও গোপীচাঁদ লোকসমাজে আজও জীবন্ত। এছাড়াও নাথ সম্প্রদায়ের কিছু মন্দিরে গোরক্ষনাথের সঙ্গে ময়নামতী ও গোপীচাঁদের পুজো হয়।
    কলকাতার দমদমে গোরক্ষ-নিবাসে গোরক্ষনাথ, মীননাথ, ময়নামতী, গোপীচাঁদের মন্দির রয়েছে। এই গোরক্ষনাথ, ময়নামতী ও গোপীচাঁদের শিষ্যরা নাথ সম্প্রদায় নামে পরিচিত।
    এর বহুদিন পরে ময়নামতীর সম্পর্কিত নাতি সামন্তরাজ লাউসেন সাধিকা ও বীরাঙ্গণা ময়নামতীর নাম চিরস্মরণীয় করে রাখতে মেদিনীপুর গড়ের নামকরণ করেন “ময়নাগড়।”
    রাজকার্য পরিচালনা থেকে ঘোড়ায় চেপে তরবারি হাতে যুদ্ধ পরিচালনা এবং তন্ত্রসাধনায় ভারত বিখ্যাত হয়েও বীরাঙ্গণা ময়নামতী প্রচার থেকে আজও কয়েক আলোকবর্ষ দূরে। এ লেখা বাংলার ইতিহাসের শূন্যস্থান কিছুটা হলেও পূরণ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here