কলকাতার বাড়ি থেকে বারোয়ারি, সার্বজনীন ও একচালা থেকে পাঁচচালার দুর্গা

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    কলকাতার জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজোয় আমন্ত্রিত হতেন বিশিষ্ট অতিথি থেকে ইংরেজ সাহেব-সুবোর দল। কিন্তু সাধারণ মানুষের সেখানে ঠাকুর দেখার কোনো অধিকার ছিল না। বাড়ির সদর দরজায় চাবুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতো মাইনে করা দারোয়ান। অনাহুত কেউ ঢোকার চেষ্টা করলেই পিঠে পড়তো সপাসপ চাবুক। অগত্যা দুর্গানাম জপতে জপতে দরজার বাইরে থেকেই পিছনে হাঁটতে হতো জনগণকে।
    জনসাধারণের ঠাকুর দেখার সুযোগ হলো ১৯১০ সালে। ওই বছর ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহী সভা সেখানকার বলরাম বসু ঘাট রোডে বারোয়ারি দুর্গাপুজোর আয়োজন করে।
    ” বারোয়ারি” মানে “বারো ইয়ার” অর্থাৎ ১২ জন বন্ধুর চাঁদায় দুর্গাপুজো।
    অবশ‍্য প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজোটি হয়েছিল হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১৭৯০ সালে।
    যাইহোক, মা দুর্গা এই প্রথম জমিদার বাড়ির ঠাকুর দালান ছেড়ে বারোয়ারি মণ্ডপে এলেন।
    কলকাতার ভবানীপুরের পর ১৯১০ সালে উত্তর কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটে বৃন্দাবন মাতৃমন্দিরের বারোয়ারি দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় সুকিয়া সাহেবের নামের রাস্তা সুকিয়া স্ট্রিটের “বাড়ির পুজো” বলতে ছিল ইন্দুভূষণ মুখার্জিদের বাড়ির পুজো, যা লোকমুখে “মুখুজ‍্যে বাড়ির পুজো” নামে পরিচিত ছিল।
    শোনা যায়, কোনো এক কারণে, কারো মতে পাঁঠাবলিকে কেন্দ্র করে সেই বাড়ির পুজোয় বাধা পড়ে। পুজো হবে না শুনে পাড়ার লোকের ভীষণ মন খারাপ। তখন বাবু প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়, বাবু নির্মলকৃষ্ণ মিত্র, বাবু হরিনারায়ণ মুখোপাধ্যায়, ও বাবু মহেন্দ্রনাথ শ্রীমানী প্রমুখ পাড়ার গণ‍্যমান‍্য ব‍্যক্তিরা মিলে মিত্রদের বাড়ির সামনের মাঠে মাতৃমন্দিরের নামে এই পুজোর আয়োজন করেন। তখন থেকেই বাড়ির পুজো রূপান্তরিত হয়ে গেল বারোয়ারিতে। সে সময় উত্তর কলকাতার বারোয়ারি পুজো বলতে এই বৃন্দাবন মাতৃমন্দিরের পুজোকেই বোঝাতো।

    আরও পড়ুন: ডিহি-বক্রেশ্বরের সতীপীঠ মাটির তলায়, সাজানো সতীপীঠেই চলছে পুজো-পাঠ


    প্রথমে বাড়ি, তারপর বাড়ি থেকে বারোয়ারির পর শুরু হলো কলকাতায় সার্বজনীন দুর্গাপুজো ১৯২৬ সালে। সার্বজনীন মানে সব স্তরের জনসাধারণের চাঁদায় পুজো। এবার আর শুধু ১২ জন ইয়ার-বন্ধুর চাঁদায় নয়, গোটা এলাকার জনগণের টাকায় পুজো। তাই পুজোর নাম “সার্বজনীন পুজো।”
    ১৯২৬ সালে কলকাতায় প্রথম সার্বজনীন দুর্গাপুজো হলো দুটি, সিমলা ব‍্যায়াম সমিতি সার্বজনীন ও বাগবাজার সার্বজনীন।
    সিমলা ব‍্যায়াম সমিতির পুজোর উদোক্তা ছিলেন অতীন্দ্রনাথ বসু। একচালার প্রতিমা তৈরি করেছিলেন কুমোরটুলির প্রথিতযশা মৃৎশিল্পী নিমাই পাল।
    অন‍্যদিকে, বাগবাজারের পুজোটি আগে ছিল বারোয়ারি। শুরু হয়েছিল ১৯১৯ সালে। এর পিছনেও ঘটনা আছে। ১৯১৮ সালে স্থানীয় কিছু যুবক বড়োলোক বাড়িতে দুর্গাপুজো দেখতে গিয়ে অপমানিত হোন। পরের বছর ১৯১৯ সালে তাঁরা বাগবাজার বারোয়ারি পুজোর পত্তন করে পুজো মণ্ডপ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। রামকালী মুখোপাধ্যায়, দীনেন চট্টোপাধ্যায়, নীলমণি ঘোষ, বটুকবিহারী চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এই পুজোর উদ্যোক্তা। পুজো শুরু হয়েছিল স্থানীয় নেবু বাগানে। সেজন্য স্থানের নামে পুজোর নাম হলো “নেবু বাগান বারোয়ারি।”
    নেবু বাগান বারোয়ারি ১৯২৬ সালে বারোয়ারি থেকে সার্বজনীন হলো এবং নাম পাল্টে হলো “বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব।” এই পুজোর একচালার প্রতিমা গড়তেন জিতেন পাল। এই জিতেন পালের সময় থেকেই আলাদা করে অর্ডার দিয়ে তৈরি করানো হতো প্রতিমার সাজ। নদীয়ার কৃষ্ণনগরের রথীন সাহা সেসব সাজ ও অলংকার তৈরি করে দিতেন। এখন তৈরি করেন কৃষ্ণনগরের আশিষ বাগচী। ডাকযোগে সেসব সাজ আসতো বলে এই সাজের নাম ছিল “ডাকের সাজ।”

    আরও পড়ুন: সর্বধর্ম সমন্বয় : রামকৃষ্ণ শিক্ষা নয় ধর্ম সংস্থাপন করতে অবতার আসেন

    ১৯৩০ সালে সলিসিটর দুর্গাচরণ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের হাতে প্রথম পুজোর রেজিস্ট্রেশন হয়। এরপর পুজোর পাশাপাশি চালু হয় প্রদর্শনী। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে এই বাগবাজার পুজো কমিটির সভাপতি ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।
    বাগবাজার ছাড়াও নেতাজি সুভাষচন্দ্র আরেকটি পুজোর সভাপতি হয়েছিলেন, সেটি হলো কুমারটুলি সার্বজনীন। কুমোরটুলির শিল্পীরা মিলে উত্তর কলকাতার এই নামী পুজোটি চালু করেন। পুজো কমিটির প্রথম সভাপতি ছিলেন স‍্যার হরিশংকর পাল। সাত বছর পর পুজো কমিটির তরফে নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে নতুন সভাপতি করা হয়। ওই বছরই অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে কুমোরটুলি পুজো কমিটি ছেড়ে ওই পুজোর পাশেই স‍্যার হরিশংকর পাল নতুন একটি পুজো শুরু করেন। এই পুজোটি পরে “হাটখোলা গোঁসাই পাড়ার পুজো” নামে পরিচিত হয়।
    এ পর্যন্ত সব প্রতিমাই ছিল একচালার দুর্গা।
    ১৯৩৮ সালে এক অঘটন ঘটলো কুমোরটুলি সার্বজনীন পুজো মণ্ডপে। পঞ্চমীর দিন মণ্ডপে চলে এসেছে একচালার দুর্গা। পঞ্চমীর সন্ধ্যায় হঠাৎ আগুন লেগে পুড়ে ছাই হয়ে গেল সবকিছু।
    পরের দিন ষষ্ঠীতে বোধন। সবার মাথায় হাত।
    নেতাজি ছুটে গেলেন মৃৎশিল্পী গোপেশ্বর পালের কাছে। জানালেন, এক রাতের মধ্যেই প্রতিমা তৈরি করে দিতে হবে। শুনে শিল্পীর মাথাতেও হাত! কীভাবে সম্ভব ?
    তখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শিল্পী গোপেশ্বর পাল দু’জনে আলোচনা করে নিলেন আপৎকালীন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
    আলাদা আলাদা করে প্রতিমা তৈরি করা হবে। সেইমতো শিল্পী গোপেশ্বর পাল গড়লেন দুর্গা। আর অন‍্যান‍্য শিল্পীরা গড়লেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ।
    একচালার প্রতিমা ভেঙে তৈরি হলো পাঁচ চালার দুর্গা।
    সেইসঙ্গে তৈরি হলো প্রতিমার জমকালো সাজ।
    আর সেসব দেখে বেঁকে বসলো পুরোহিত সমাজ। তারা কেউ এই প্রতিমার পুজো করবেন না।
    শেষে গোপেশ্বর পালের সঙ্গে বহু আলোচনার পর পুরোহিতের খোঁজ মেলে এবং যথারীতি পুজো হয়।
    পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৯ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কমিটির সভাপতি থাকাকালীন এই কুমোরটুলি সার্বজনীন দুর্গা প্রতিমার গায়ে চাপানো হয়েছিল সত্যিকারের বাঘ ছাল। আর তা দেখতে মণ্ডপে উপচে পড়েছিল জনস্রোত। কলকাতার বুকে এভাবেই ১৯৩৯ সালে শিল্পী গোপেশ্বর পাল দুর্গাপুজোয় “থিম” হিসেবে প্রথম বাঘ ছাল ব‍্যবহার করেছিলেন।
    এরপর ১৯৪১ সালে পূর্ব বঙ্গের ফরিদপুর থেকে শিল্প শিখতে এপার বাংলার কলকাতায় এলেন রমেশচন্দ্র পাল। পরে তিনি হোন ভাস্কর রমেশচন্দ্র পাল। রমেশচন্দ্র শেষ পর্যন্ত কলকাতাতেই থেকে যান।
    কলকাতা দমকল, পাশের মহম্মদ আলী পার্ক, পার্ক সার্কাস ময়দান, খিদিরপুর যুবক সংঘ ও একডালিয়া এভারগ্রিনের দুর্গা প্রতিমা গড়তেন ভাস্কর রমেশচন্দ্র পাল। ৫০-৬০ দশকে রমেশচন্দ্রের হাতে গড়া দমকলের পুজোর প্রতিমা দেখতে কাতারে কাতারে লোক আসতো। পুজোর সময় নিজেদের ব‍্যস্ততার কারণে ১৯৬৩ সালে দমকলের পুজো বন্ধ হয়ে যায়। তখন পাশেই মহম্মদ আলী পার্কে বেশকিছু উৎসাহী মানুষ নতুন করে পুজো শুরু করেন।
    এরপর ১৯৪২-৪৩ সাল নাগাদ ওপার বাংলা থেকে কলকাতার কুমোরটুলিতে আসেন ঢাকা-বিক্রমপুর গ্রামের মৃৎশিল্পী রাখালচন্দ্র পাল। সঙ্গে আসেন তাঁর চার ভাই–হরিবল্লভ, গোবিন্দ, নেপাল ও মোহনবাঁশি পাল।
    কলকাতার কুমোরটুলিতে তখন নদীয়া কৃষ্ণনগর-ঘুর্ণি ঘরাণার প্রতিমার একচেটিয়া দাপট। এই দাপট অতিক্রম করে ওপার বাংলার পদ্মাপাড়ের ঢাকা-বিক্রমপুর ঘরাণার দুর্গা প্রতিমাকে এপার বাংলায় বাজার দখল করতে অনেকটাই সময় লেগেছিল।
    বর্তমানে কলকাতা কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্পের ঘরাণায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে পদ্মা-গঙ্গা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here