হনুমানের লেজ, লেজের হনুমান‌

    0
    tail of hanuman

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    আচার্য সুনীতিকুমারের তথ‍্য অনুসারে আদি কবি বাল্মীকি তাঁর রামায়ণ রচনা শেষ করেন খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের মাঝামাঝি নাগাদ। রামায়ণ হলো উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতের দুই আর্যগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের পটভূমিতে লেখা  উত্তর ভারতের আর্যগোষ্ঠীর বিজয়গাথা। উত্তর ভারতের আর্য রাজকুমার রামচন্দ্র আর্য সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে দাক্ষিণাত‍্যে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। উত্তরাখণ্ডের মাটিতে দুটি বিবদমান আর্যগোষ্ঠী ছিল–সুর ও অসুর। অদিতি ও দিতি নামে দুই বোন ছিলেন। দু’জনের মধ্যে যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক ছিল। দুজনের-ই  বিয়ে হয়েছিল কশ‍্যপ মুনির সঙ্গে। দুই বোনের সন্তানাদিও হয় এবং তারা একসঙ্গেই বড়ো হতে থাকে। দিতির সন্তানেরাই প্রথম শক্তিশালী রাজা হোন এবং তাদের বংশ “দৈত্য বংশ” নামে প‍রিচিত হয়। পরে বিষ্ণু তাদের বধ করে তাদের রাজত্বে অদিতির ছেলেদের প্রতিষ্ঠিত করেন ।

    আরো পড়ুন :বাংলার ভয়-ভক্তির ব্রহ্মদৈত‍্য

    তখন থেকেই শুরু হলো সুর-অসুরের দ্বন্দ্ব। অদিতির পুত্ররা “দেব বংশ” নামে পরিচিত হোন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র–এগুলো কোনো ব‍্যক্তিবিশেষের নাম নয়, এগুলো সবই পদের নাম। সেকালে গাড়োয়াল হিমালয়ের নাম ছিল “স্বর্গ।” বিষ্ণুপুরাণে পরাশর মুনি বলছেন, “ভৌমা হ‍্যেতে স্মৃতা: স্বর্গাধর্মিণামালয়া মুনে।” অর্থাৎ হিমালয় পৃথিবীর স্ব‍র্গ ।

    রামায়ণের “উত্তর কাণ্ড” হলো প্রকৃত ইতিহাস, বাকি গল্পগাথা। মূল রামায়ণ বাল্মীকির একক রচনা, অন্য অংশ প্রক্ষিপ্ত। মূল রামায়ণের “উত্তর কাণ্ড” থেকে জানা যাচ্ছে, রামের জন্মের আগেই গাড়োয়াল হিমালয়ের দেব শিবিরে লংকা কাণ্ডের পরিকল্পনা এবং সেই সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের অসুর  রাক্ষস সাম্রাজ্য ধ্বংসের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। গবেষণায় জানা গেছে, রামায়ণী যুগে ভারতের দক্ষিণী জাতিবর্গের মধ্যে বানর, ভালুক প্রভৃতি টোটেমী জাতির বসবাস ছিল ।

    বিন্ধ‍্যপর্বতের দক্ষিণে অরণ্যময় অঞ্চলে বাস করতেন তারা। সে সময় বিভিন্ন পশুর নামে জাতিগোষ্ঠী পরিচিত হতো, যেমন ঋক্ষ ( ভালুক টোটেম), নাগ ( সাপ টোটেম), বানর-কুকুর-মহিষ ইত্যাদি সুপরিচিত টোটেম ছিল। আর্য ও অনার্য–উভয় জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই ছিল এই টোটেম। ওল্ডেনবার্গ লক্ষ্য করেছেন, মাছ ও কুকুর টোটেমকে আর্যরা বিশেষভাবে মান‍্য করতেন ।

    ঋগ্বেদে বিভিন্ন লতা বনস্পতির উদ্দেশ্যে স্তুতিমূলক যেসব স্তোত্র আছে, সেগুলো সব টোটেমের আদি উৎস। এমনকি, বৈদিক শ্লোকে অচেতন বস্তুকেও দেবতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ম‍্যাকডোনেল ও কীথ্ এগুলোকে আর্য টোটেম বলে মনে করেছেন। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের ২৬ তম অধিবেশনে ড: ডি. সি. চ‍্যাটার্জ্জী জানান, ঋগ্বেদে টোটেমের উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না ।

    তার প্রভাব আরো বেশি করে পড়েছে রামায়ণ ও মহাভারতে। পুরাণ রচয়িতারা টোটেমী অনার্য জাতিগোষ্ঠীকে তাদের টোটেম দিয়ে অভিহিত করে মানুষের ওপর জান্তব প্রাণীর অবয়ব আরোপ করেছেন। বানর জাতি দক্ষিণ ভারতের অধিবাসী। তাদের রাজধানী কিষ্কিন্ধ‍্যা নগরী ছিল এক সমৃদ্ধশালী জনপদ ।

    কিষ্কিন্ধ‍্যা নগরীর কাছেই ছিল প্রস্রবণগিরি। এই পর্বত থেকে কিষ্কিন্ধ‍্যা নগরীর নাচ-গান-বাজনার মধুর আওয়াজ শোনা যেতো। উত্তর ভারতের চেয়ে দক্ষিণ ভারতের মাটিতেই গড়ে উঠেছিল বেশি শিল্পসুষমামণ্ডিত স্থাপত্য। দাক্ষিণাত‍্যের বানর রাজধানী এই কিষ্কিন্ধ‍্যা নগরীর ঐশ্বর্য দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন লক্ষ্মণ ।

    বানর রমণীরাও ছিলেন রীতিমতো শিক্ষিতা। বালীপত্নী “তারা ” ছিলেন এই রকম একজন সুশিক্ষিতা নারী। বিন্ধ‍্যপর্বতের দক্ষিণে অরণ্যময় অঞ্চলে বানর জাতির বালী-সুগ্রীব-হনুমান-অঙ্গদের মতো বীর পুরুষরা থাকতেন। আর নিজেদের জাতিগোষ্ঠীর টোটেম হিসেবে তারা পোশাকের সঙ্গে ব‍্যবহার করতেন বাহারি লেজ। ( তথ্য সূত্র : India in Ramayana Age by Dr. S.N.Vyas ).

    আরো পড়ুন :খোঁড়া যমরাজের বাড়ি

    শুধু দক্ষিণ ভারতের বানর জাতিই নয়, মিশরের ফ‍্যারাও এবং পুরোহিত সম্প্রদায়ের লোকেরা লেজবিশিষ্ট পোশাক পরতেন। ( তথ্য সূত্র : Egyptian Mythology by Veronica Ions ). এই মিশরীয়রাই ছিলেন লেজবিশিষ্ট পোশাকের আবিষ্কর্তা ও ব‍্যবহারকারী। ভারতে রামায়ণী যুগে অরণ্যচারী আদিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই ধরণের লেজপ্রীতি ছিল। ড: ডি.সি. সেন জানাচ্ছেন, অভিষেকের সময় কোনো কোনো ভারতীয় রাজপরিবারে লেজবিশিষ্ট পোশাক ব‍্যবহারের প্রথা আবশ্যিকভাবেই পালনীয় ছিল। আন্দামানের একটি আদিম জনগোষ্ঠীকে লেজবিশিষ্ট পোশাকে দেখেছিলেন ভি. ডি. সাভারকার। সুতরাং বলাই যায়, রামায়ণের বালী-সুগ্রীব-হনুমান-অঙ্গদের মতো বীরদের কোনো লেজ ছিল না, তারা লেজ লাগানো পোশাক পরতো। পোশাকের লেজ তাদের শরীরের লেজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভুল ভাবনায়। আশা করি, আমাদের এতদিনের সে ভুল এবার ভাঙবে ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here