মহারাজা নন্দকুমারের স্মৃতি আগলে আকালীপুর

    0
    AkalipurGuhya Kalika

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল
    বীরভূমের নলহাটি শহর থেকে কিছুটা দূরেই মহারাজা নন্দকুমারের ভিটে আকালীপুর। এখানেই ব্রাহ্মণী নদীর তীরে পুরোদমে চলছিল গুহ‍্যকালী মন্দির তৈরির কাজ।
    এরপর ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস চক্রান্ত করে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই আগস্ট বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ান মহারাজা নন্দকুমারকে কলকাতার কলুটোলায় ফাঁসি দিলে মাঝপথেই থেমে গেল মন্দিরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার কাজ। পরে পুত্র গুরুদাস অসম্পূর্ণ মন্দিরেই শোকাহত মনে প্রতিষ্ঠা করলেন কষ্টিপাথরে তৈরি সর্পভূষণা মাতৃবিগ্রহ গুহ‍্যকালীর।
    ব্রিটিশরা নন্দকুমারকে ফাঁসিতে ঝোলালেও আকালীপুরে আজও বেঁচে রয়েছেন তিনি। সারা বছর বহু পর্যটক ভীড় জমান নির্জন ব্রাহ্মণী নদীর তীরে।
    আকালীপুরের দেবী গুহ‍্যকালীর পদতলে “শব” বা “শিব” নেই। সাধারণত আমরা কালীদেবীর পায়ের তলায় “শিব”-কেই দেখতে অভ‍্যস্ত। কিন্তু সাধক রামপ্রসাদ বলছেন, “শিব” নয়, মায়ের পদতলে পড়ে থাকেন “শব” এবং শিব হবার আশায়। মা কালী করেছেন অসুর নিধন। তাই কালী শিবারূঢ়া নন, তিনি শবারূঢ়া। তাই মায়ের পায়ের তলায় “শিব” নয়, পড়ে আছেন “শব” অর্থাৎ নিহত দৈত্যের দেহ বা মৃতদেহ। সাধক রামপ্রসাদ বলছেন,
    ” শিব নয় মায়ের পদতলে ।
    ওটা মিথ্যা লোকে বলে ।।
    দৈত‍্য বেটা ভূমে পড়ে।
    মা দাঁড়াবে তাহার উপরে।।
    মায়ের পাদস্পর্শে দানবদেহ ।
    শিবরূপ হয় রণস্থলে ।।”

    আরও পড়ুন :উপপীঠ থেকে সিদ্ধপীঠ তারাপীঠ, দেবী তারা থেকে দেবী কৌশিকী এবং কৌশিকী অমাবস্যা


    আকালীপুরের গুহ‍্যকালী সৃষ্টি ও প্রলয়ের পরবর্তী রূপ হিসেবে বস্ত্র পরিহিতা, দ্বিভূজা, সর্পবেদিমূলে যোগাসনা। বিনাশ করছেন না বলে তাঁর হাতে খড়্গ নেই, তার বদলে দু’হাতে রয়েছে সর্পবলয়। দেবী ঘন মেঘের মতো কৃষ্ণবর্ণা, পরণে রক্তবস্ত্র, লোল জিহ্বা, প্রসারিত ভয়ংকর দন্ত, কোটর মধ্যগত চক্ষু, গলায় সর্পহার, কপালে অর্ধচন্দ্র, মাথায় আকাশগামিনী জটা, হাসি মুখ,বৃহ‍ৎ উদর, কানে শব-কুণ্ডল, ডান হাতে বরমুদ্রা, বাম হাতে অভয়প্রদায়িনী অট্টহাসা মহাভয়ংকরী দেবী গুহ‍্যকালী সাধকের অভিষ্ট ফল প্রদানকারিণী , শিবমোহিনী।
    অন্যদিকে, মায়ের অষ্টকোণাকৃতি মন্দির সাধককে দিচ্ছে যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত‍্যাহার, ধারণা, ধ‍্যান ও সমাধি — এই অষ্টাঙ্গিক যোগের নির্দেশ।
    জানা যায়, মগধরাজ জরাসন্ধ পাতালে মন্দির তৈরি করে এই গুহ‍্যকালীর আরাধনা করতেন। তারপর প্রায় দুশো পঁয়ত্রিশ বছর পর রাণী অহল‍্যাবাঈ স্বপ্নে শিবলিঙ্গের খোঁজে খোঁড়াখুড়ি করতে গিয়ে এই গুহ‍্যকালী মূর্তি পান। কিন্তু রাণী যেহেতু শিবলিঙ্গ খুঁজছিলেন, তাই এই গুহ‍্যকালীর মূর্তিটি তিনি কাশীরাজ চৈত সিংকে দিয়ে দেন।
    এরপর ব্রিটিশ আমলে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস কাশীর একটি বাংলোতে থাকার সময় এই মূর্তিটিকে দেখতে পান এবং তিনি এটিকে ইংল‍্যাণ্ডে নিয়ে গিয়ে সেখানকার যাদুঘরে রাখার পরিকল্পনা করেন।

    আরও পড়ুন :বিবর্তনের পথে দুর্গা : শস্যদেবী থেকে দুর্গতিনাশিনী


    কাশীরাজ চৈত সিং তা জানতে পেরে মায়ের বিগ্রহ রক্ষার কোনো উপায় না পেয়ে সেটিকে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দিলেন।
    এরপর স্বপ্নে মা স্বয়ং মহারাজা নন্দকুমারকে তাঁর বাসভূমির কাছে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করার আদেশ দেন।
    এরপর কাশীরাজের সহায়তায় মহারাজা নন্দকুমার কাশীর গঙ্গা থেকে মাতৃবিগ্রহ তুলে নৌকো করে দ্বারকা নদী এবং দ্বারকা থেকে এলেন ব্রাহ্মণী নদীপথে এই আকালীপুরে।
    নন্দকুমারের ভিটে ভদ্রপুরের কাছে নৌকোর গতি নিয়ন্ত্রণে এলো না, নৌকো এসে থামলো আকালীপুরে। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হলো মাতৃবিগ্রহ। ব্রাহ্মণী নদীতটে শ্মশানধারে এখনো রয়েছে মায়ের সেই পাথরের তৈরি প্রতিষ্ঠাবেদি।
    ইতিমধ্যে হেস্টিংসের কুচক্রে ফাঁসি হয়ে যায় নন্দকুমারের। তবে তার আগেই তিনি পুত্র গুরুদাসকে মাতৃবিগ্রহ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে যান। সেইমতো একরাতেই তৈরি হওয়া অসমাপ্ত মন্দিরেই প্রতিষ্ঠা হলো মায়ের।
    এখনো প্রতিদিন নিয়ম করে চলছে মায়ের পুজো।
    তবে আজও রাতে এখানে কেউ থাকে না। পুজো-পাঠ-দর্শন সেরে সন্ধ্যার আগেই ফিরে যান সবাই।
    সন্ধ্যার পরেই মা নাকি মন্দির থেকে বেরিয়ে ভয়ংকর মূর্তি ধরে এখানকার শ্মশান এলাকায় ঘুরে বেড়ান। তাই রাত নামার আগেই এলাকা ছাড়তে হয় সবাইকেই।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here