গ্রামের বাইরে পঞ্চপাণ্ডবদের অস্ত্র চুরি গেলেও বীরভূমের বৈদ‍্যনাথপুর গ্রামে আজও কোনো ডাকাত পড়েনি

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    ময়ূরাক্ষীর উপর আমজোড়া ব্রীজ‌। তারপর ঝাড়খণ্ডের রাণীশ্বর পেরিয়ে ঝাঁ চকচকে পিচ রাস্তা ধরে তকিপুর হয়ে “বর্ডার” বা বীরভূম-ঝাড়খণ্ডের সীমান্ত। সিউড়ি-দুমকা রুটের বাসের খালাসিরা এখানে এলেই “রেফ্” বাদ দিয়ে চেঁচায়,”বডার !” “বডার !” এই বর্ডার পেরিয়ে গ্রাম “বৈদ‍্যনাথপুর।” আগে নাম ছিল “বীজনাথপুর।” রাজনগরের “বীর রাজা”-র সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন ক্ষত্রিয় বংশোদ্ভূত বীজনাথ সিং। খৃষ্টিয় চতুর্দশ শতাব্দী নাগাদ রাজনগরের বীর রাজা বসন্ত চৌধুরীর পতন হলে রাজনগরে শুরু হয় পাঠান রাজত্ব। বীজনাথ সিং সে সময় রাজনগর ছেড়ে চলে আসেন মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের স্মৃতি বিজড়িত এই নির্জন স্থানে। এখানে এসে তিনি যেখানে প্রথম রাতটি কাটান, তার নাম হয় “রাত-ডিহি।” পরে এখন তা “রাগ-ডিহি।” আর বীজনাথ সিংয়ের নাম অনুসারে গ্রামের নাম হলো “বীজনাথপুর।” তা থেকে এখন “বৈদ‍্যনাথপুর।” থানা-মহম্মদ বাজার, গ্রাম পঞ্চায়েত-চরিচা। প্রায় হাজার দুয়েক জনসংখ্যা এই গ্রামের। রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি অঙ্গনবাড়ি কেন্দ্র। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ রাজপুত ক্ষত্রিয়। এই যোদ্ধা জাতির দাপটে এই গ্রামে কোনোদিন ডাকাত পড়েনি। এছাড়াও রয়েছে ব্রাহ্মণ ও ঘর পাঁচেক ঢেকারো পরিবার। এরা একসময় আকরিক পাথর গলিয়ে লোহা বের করতো এবং তা থেকে অস্ত্র-শস্ত্র তৈরি করতো। সে অস্ত্র কখনো রাজাদের জন্য,কখনো সিপাহী বিদ্রোহীদের জন্য আবার কখনো এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য তৈরি হয়েছে। এজন্য বৃটিশ সরকার এদের “অপরাধপ্রবণ জাতি” হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। রাগডিহির ধূ ধূ প্রান্তরে এখনো দেখা যায় তাদের পাথরের তৈরি লৌহ চুল্লির ধ্বংসাবশেষ। গ্রামে রয়েছে “সতীতলা।” একটি নধর বটগাছ ঘিরে গা ছমছম করা পরিবেশ। এখানে কে কবে “সতী’ হয়েছিল কে জানে ! এর উল্টোদিকে মারাঠা বর্গিদের জন্য তৈরি “ফৌজি পুকুর।” তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, গ্রামের পূর্ব দিকে “পাণ্ডব বন।” কেউ কেউ একে “পাণ্ডব তলা”ও বলেন। ইংরেজি ১৯৮৭ সালের অক্ষয় তৃতীয়ার দিন জ্বালানি কাঠের জন্য গাছের মুড়ো তুলতে গিয়ে এই পাণ্ডব বনের একটি পলাশ গাছের নিচে মাটি খুঁড়ে ৫ টি তরবারি পায় গ্রামের নগেন বাগ্দী‌। অস্ত্রগুলি গামছা ঢাকা দিয়ে মাথায় করে বাড়িতে ফিরছিল নগেন। লোকেরা ভেবেছিল, মাছ নিয়ে যাচ্ছে‌। কিন্তু কার পুকুরের মাছ, কী মাছ, তা দেখতে গিয়ে দেখা গেল, ৫ টি তরবারি। এর মধ‍্যে ৩ টির ওজন প্রায় ২০ থেকে ২৫ কেজির মতো, অন্য ২ টি তুলনায় হালকা। খবর পেয়ে গ্রামের লোকেরা সেগুলিকে পঞ্চপাণ্ডবদের অস্ত্র মনে করে ফের পাণ্ডব বনেই রেখে দেয়। পরে কোনো কারণে নগেন কুষ্ঠ রোগে মারা গেলে লোকের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। এরপর জেগে ওঠে পাণ্ডব বন। গড়ে ওঠে “নরনারায়ণ আশ্রম।” শিব প্রতিষ্ঠা হলো, মেলা-মোচ্ছব হতে শুরু করলো। মানুষের আনাগোনা বাড়তে লাগলো। প্রায় বারোশো বছরের পুরোনো এক বটগাছের তলায় গড়ে উঠলো ছোট্ট পঞ্চপাণ্ডব মন্দির। মন্দিরের ভেতরে মোট ৬ টি পাথর দিয়ে সাজানো হলো মা কুন্তিসহ ৫ পাণ্ডবের প্রতীক। চলতে থাকলো পুজোপাঠ। ভক্তদের দানে মিললো আট বিঘে দেবোত্তর জমিসহ একটি পুকুর। এলাকার চাষিরা বৃষ্টির এখানে পুজো দিতে শুরু করলো গুড়ের পায়েস দিয়ে। বট-নিম আর পলাশ গাছে ঘেরা পাণ্ডব বন পরিণত হলো এক সত‍্যিকারের নয়ন মনোহর প্রাকৃতিক পরিবেশে। বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বর থেকে ঝাড়খণ্ডের তন্ত্রক্ষেত্র তন্ত্রেশ্বর হয়ে এই পাণ্ডব বন ছুঁয়ে বীরভূমের কোটাসুর পর্যন্ত এলাকা পঞ্চপাণ্ডবদের অজ্ঞাতবাসের স্থান হিসেবে জনশ্রুতি রয়েছে। তবে এই বৈদ‍্যনাথপুরের পাণ্ডব বনের তরবারিগুলি সময়ের বিচারে মহাভারত যুগের হওয়াটা একরকম প্রায় অসম্ভব। প্রশ্ন, এই অস্ত্রগুলি তাহলে কাদের ? এ বিষয়ে বলা যেতে পারে, এলাকার যুদ্ধপ্রিয় রাজপুত জাতির কেউ এখানে অস্ত্রগুলি পঞ্চপাণ্ডবের কাছে মানত করে করেছিলেন। এগুলি স্থানীয় ঢেকারোদের হাতে তৈরি সেই মানতের তরবারি। দ্বিতীয়ত, বলা যায়, বর্গি আক্রমণ এবং পরবর্তীকালে সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় এলাকার রাজপুতরা তাদের বাড়িতে রাখা তরবারিগুলি এখানে পু়ঁতে রেখেছিলেন, পাছে শত্রুর হাতে পড়ে সেগুলি “বুমেরাং” হয়ে না যায়, এই আশংকায়। এরমধ্যে ৩ টি তরবারি চুরি হয়ে গেছে, বাকি ২ টি এখনো এই পাণ্ডব বনেই রয়েছে। গ্রামের মানুষ এগুলো বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখতে রাজি নন। তাই অদৃশ্য পঞ্চপাণ্ডবদের উদ্দেশ্যে আবেগ এখনো প্রবল এখানে। তাঁদের অস্ত্র, ইচ্ছে হলে তাঁরাই রক্ষা করবেন।
    পাণ্ডবতলায় চুরি হলেও যুদ্ধপ্রিয় জাতি রাজপুত অধ‍্যুষিত বৈদ‍্যনাথপুর গ্রামে আজও কিন্তু ডাকাত পড়েনি।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here