খোস-পাঁচড়ার দেবতা ঘেঁটু ঠাকুর

    0
    god's of Ghatu Thakur, in Khos-Panchra

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    একটি বহু ব‍্যবহৃত মাটির আধভাঙা কালো হাঁড়ি, অথবা মুড়ি ভাজার মাটির খোলা। তার ওপর এক তাল গোবর দিয়ে তৈরি মুখ। কড়ি বসিয়ে তৈরি চোখ। কপালে আঁকা সিঁদুরের তিলক‌। হাঁড়ির ওপরে দুর্বা ঘাস ও ভাঁট ফুল। কোথাও আবার হাঁড়ির নিচে ভাঙা কুলো , প্রদীপ এবং দেবতার আবরণ হিসেবে এক টুকরো হলুদ ছোপানো কাপড় ।
    সব মিলিয়ে এই হলো শিশুদের খোস-পাঁচড়া আরোগ্যকারী লৌকিক দেবতা ঘেঁটু ঠাকুরের মূর্তি ।

    আরো পড়ুন :লৌকিক দেবী “পাথর বুড়ি”

    ঘেঁটুর একটি পোশাকি নাম আছে, ঘন্টাকর্ণ‌। দু’কানে ঘন্টা বাঁধা বলে এই নাম। ঘেঁটুর জন্ম বিবরণীতে পাওয়া যাচ্ছে,
    “শুন শুন সর্বজন, ঘেঁটুর জন্ম বিবরণ ।
    পিশাচ কুলে জন্মিলেন শাস্ত্রের লিখন ।।
    বিষ্ণু নাম কোনো মতে করবে না শ্রবণ ।
    তাই দুই কানে দুই ঘন্টা করেছে বন্ধন ।।”
    কোনো কোনো গবেষক মনে করেন, চর্মরোগের আরোগ্যকারী দেবতা এই ঘেঁটু ঠাকুর হলেন সূর্য অথবা ধর্মঠাকুরের লৌকিক সংস্করণ।
    এক সময় গ্রামের শিশুদের ভীষণ খোস-পাঁচড়া হতো। কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল না। তাই ঘেঁটু ঠাকুরের বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। এখন আর ঘেঁটুকে দেখা যায় না।
    ছেলে-বুড়োর একটি দল থাকতো। তারাই ঘেঁটুকে নিয়ে গ্রামে গৃহস্থের দরজায় দরজায় ঘুরে কিছু চাল-ডাল-আলু-সবজি জোগাড় করতো। তারপর সেগুলো দিয়ে একদিন হতো জমিয়ে ফিস্ট। না, সে ফিস্টে কোনো আড়ম্বর ছিল না। বলতে গেলে, এ ছিল গরীবের ফিস্ট। শুধুমাত্র মুখ বদলানোর মতো অতি সাধারণ উপকরণ জোগাড় হতো চেয়ে-চিন্তে। তবে আনন্দ ছিল ঢের বেশি। একে বলা হতো, “ফিস্টি।” গ্রামের নিরক্ষর মানুষেরাও এই ইংরেজি শব্দের সঙ্গে দারুণভাবে পরিচিত ছিল।
    ঘেঁটু বাহিনী গৃহস্থের দরজায় এসে বলতো,—
    “পরথম এলাম ঘর গেরস্থের বাড়ি ।
    গৃহস্থরা রেঁধে রেখেছে সজনের খাড়ি ।।”
    “সজনের খাড়ি” মানে সজনের ডাঁটা।
    এখানে বোঝাই যাচ্ছে, সজনের ডাঁটার মরশুমে ঘেঁটু বেরোতো। একজন ঘেঁটুর নামে ছড়া কাটতো। দলের বাকিরা গোল হয়ে ঘুরতো আর মুখে বলতো,—
    “বোল রাম, বোল রাম।”
    ছড়ায় ঘেঁটুর নামে চাল-ডাল চাওয়া হতো,—

    আরো পড়ুন :চিকিৎসায় যজ্ঞভস্ম

    “আলোর মালা চাল ডাল দাও।

    নয়তো খোস-পাঁচড়া লাও।।
    যে দেবে ধামা ধামা ।
    তারে ঘাঁটু দেবে জরির জামা।।
    যে দেবে শুধু বকুনি ।
    ঘাঁটু দেবে তাকে খোস-চুলকনি।।
    ঘাঁটু ঘোর ঘোর ঘোর ।
    ঘাঁটু বিয়ে দেব তোর ।।
    কে বলেছে বরের বরণ মিশকালো ?
    যেমন দেবা, তেমনি দেবী , মিলন হবে ভালো ।।
    রংটি দেখো ফর্সা হবে বিয়ের জল পেলে ।
    এ বর আর হয় না সাদা, ধোপা বাড়ি গেলে ।।
    ঘাঁটু ঘোর ঘোর ঘোর।
    ঘাঁটু বিয়ে দেব তোর।।…”

    ঘেঁটু ঠাকুর ও তাঁর দলবল আজ গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে গেছে। কেউ আর ওদের খোঁজ করে না ।

    ছবি সৌজন্য: ফেসবুক

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here