শালি ধান, শালি ব্রাহ্মণ ও ধানলক্ষ্মীর পাঁচালী

    0
    Godess-Laxmi

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    মানুষ প্রথমদিকে ধান বুনে আসছিল। শুকনো ধান মাটিতে ছড়িয়ে দিলেই প্রকৃতির নিয়মে তার থেকে ধান গাছ জন্মাতো–পাকা ধান ঘরে আসতো। অবস্থাটা বদলে গেল বৌদ্ধ যুগে। বীজ ধান মাটিতে বুনে তার থেকে তৈরি হলো কচি চারা। গ্রামে এই কচি ধান চারাকে বলা হয় “আফর্।” আর যে জমিতে এই আফর্ তৈরি হয়, সেই জমিকে বলে “আফরে মাঠ।” এই আফর্ অর্থাৎ কচি ধানচারাকে তুলে রোপণ করা হলো আলাদা জমিতে। দেখা গেল, এতে ফলন অনেক বেশি। সেই থেকে এই রোপণ পদ্ধতিকেই ব‍্যবহার করে আসছেন আমাদের দেশের আজকের দিনের চাষিরা। বীজ ধান থেকে চারা তৈরি করে রোপণ পদ্ধতিতে ধান চাষের বিবরণ আমরা দেখতে পাই আদি পালি সাহিত্যে। প্রথমদিকে বৈদিক যুগের চাষিরা যে ধানের চাষ করতো, তার নাম ছিল “ব্রীহি।” এই ধান শুধুমাত্র বুনে চাষ করা হতো। এর চাষ হতো বর্ষাকালে। অন্যদিকে, বৈদিক যুগের পরে এলো আরেকটি নতুন ধান, নাম–“শালি।” এই শালি ধানের চাষ হতো রোপণ পদ্ধতিতে এবং তা হতো শীতকালে। এখানে রোপণ কৌশলের প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, আসামে অসমীয়া ভাষায় রোপণ পদ্ধতিতে চাষের জন্য চারা তৈরির উপযোগী বীজ ধান জলে ভেজানোকে বলা হয় “জালি”—যেটি এসেছে “শালি” শব্দ থেকে। রোপণ পদ্ধতিতে চাষ করা “শালি” ধান এত জনপ্রিয় হয়েছিল, যার ফলে আসামে একটি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের নাম হয়ে যায় এই ধানের নামেই ” শালি ব্রাহ্মণ।” অন্যদিকে, একটি বৌদ্ধ জাতকের নাম হয় “শালি কেদার জাতক।” আমাদের এই বাংলাতেও জনপ্রিয় হয়েছিল “শালি ধান”, অর্থাৎ রোপণ করে ধান চাষের পদ্ধতি। এই ধান রোপণ পদ্ধতিতে ধান চাষের জনপ্রিয়তা জন্ম দিয়েছে চিরকালীন ভালো লাগা ছড়ার : “উড়কি ধানের মুড়কি দেবো, শালি ধানের চিড়া।”…

    আরও পড়ুন – মানুষ থেকে লৌকিক দেবী হাঁড়ি-ঝি


    এ তো গেল শালি ধানের কথা। এবার ধানলক্ষ্মীর কথায় আসি।
    একসময় ধানের তুল‍্য ধন ছিল না আমাদের কৃষি প্রধান দেশে। তাই আমাদের দেশে পেঁচা ও শেয়ালকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পেঁচাকে বলা হয় মা লক্ষ্মীর বাহন। অন্যদিকে যাত্রাকালে ডাইনে-বাঁয়ে শেয়াল দেখার বিভিন্ন ফলের কথা বলা হয়েছে প্রবাদে।
    কিন্তু প্রশ্ন হলো, কৃষিতে এই দুটি প্রাণীর সত্যিই কি কোনো গুরুত্ব আছে ?
    উত্তর হলো, আছে।

    আরও পড়ুন –বাংলার ভয়-ভক্তির ব্রহ্মদৈত‍্য


    পেঁচা ও শেয়াল এ দুটো প্রাণীর সঙ্গে কৃষিজীবনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
    পেঁচা রাতের বেলা ধান ক্ষেত্রের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। সে সময় ধানের অনিষ্টকারী পোকাদের তারা ধরে ধরে খেয়ে ফেলে। এর ফলে পোকামাকড় ও তাদের দ্বারা সৃষ্ট রোগ-ব‍্যাধি থেকে মাঠের ধান রেহাই পায়।
    অন্যদিকে,শেয়াল মাঠের সমস্ত কাঁকড়াদের খেয়ে ফেলে। শেয়ালরা এক অভিনব কায়দায় কাঁকড়া ধরে। প্রথমে কাঁকড়ার গর্তে নিজের লেজটা ঢুকিয়ে দেয় । গর্তে থাকা কাঁকড়া শেয়ালের লেজটা কামড়ে ধরে। শেয়াল আস্তে আস্তে কাঁকড়াসহ লেজটা মুখের ভেতরে পুরে দেয়। এভাবেই খেয়ে ফেলে কাঁকড়াটা।
    কাঁকড়ার দল ধান গাছের গোঁড়া কেটে নষ্ট করে দেয়। শেয়ালরা কাঁকড়াদের খেয়ে ক্ষেতের ধান বাঁচায়। তাই পেঁচা ও শেয়াল আমাদের দেশের ধানলক্ষ্মী।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here