বাংলায় ধর্মঠাকুর, মানুষ বদল ও ব্রাত্য জনজীবন

    0
    God-Dharma

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    খ্রিস্টিয় দুশো শতাব্দীর আগে ভারতবর্ষে ব্রাহ্মণ‍্যধর্মের বিরুদ্ধে যে ধর্মীয় আন্দোলনগুলি গড়ে উঠেছিল, ড: রাজেন্দ্রচন্দ্র হাজরা মোটামুটিভাবে সেগুলিকে ৫ টি ভাগে ভাগ করেছেন, ১) বৈদিক, ২) বেদ বিরোধী, ৩) আংশিক বৈদিক, ৪) বেদের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য ও ৫) মিশ্র প্রকৃতির।
    পরবর্তীকালে বর্ণাশ্রম বিরোধী বিদেশিদের আগমন ও এদেশে তাদের সাম্রাজ্য স্থাপনের ফলে ব্রাহ্মণরা এদেশীয় মানুষদের উপর তাদের প্রভাব ধরে রাখতে ক্রমশ ব‍্যর্থ হচ্ছিলেন। নন্দ ও মৌর্য রাজাদের আমলে বেড়েছিল শূদ্রদের প্রাধান্য এবং কমে গিয়েছিল ব্রাহ্মণদের সামাজিক পদমর্যাদা। নন্দবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহাপদ্মনন্দ ছিলেন জাতে নাপিত, অপরদিকে মৌর্যবংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক ছিলেন দাসীপুত্র। এসব কারণে নন্দ ও মৌর্য আমলে ব্রাহ্মণদের গুরুত্ব কমে যায়। এর আরেকটি কারণ ছিল বৌদ্ধ প্রভাব।
    মৌর্যযুগে বৌদ্ধ রাজাদের সময় বৈশ‍্যদের প্রাধান্য বেড়েছিল। বুদ্ধের শিষ্যদের অনেকেই ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ধনী ব‍্যবসায়ী। এর ফলে সেই সময়ের ভারতীয়রা বর্ণাশ্রমধর্মের বিরোধী হয়ে পড়েছিল। পুজো, উপবাস পালন প্রভৃতি ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে তারা আর ব্রাহ্মণদের একতরফা নির্দেশ মেনে চলতো না। এ সময় অনেক অব্রাহ্মণ ব‍্যক্তিও রাজনীতিতে উঁচু স্থান লাভ করে এবং জীবিকার জন্য ব্রাহ্মণরাও তাদের খাতির করে চলতো। পরবর্তীকালে নিজ নিজ বর্ণের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে।

    আরও পড়ুন: আর্যরা বিদেশ থেকে আসেনি। হিন্দুরাই আর্য, বলতেন স্বামীজী….


    ধর্মীয় বিষয়ে প্রচুর স্বাধীনতা থাকায় এ সময় মহিলারাও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে ভিক্ষুণীর জীবন যাপন করতে থাকেন। এইভাবে দেশে একদিকে যেমন বৌদ্ধ পরিব্রাজক ও সন্ন্যাসীর সংখ্যা বেড়ে গেল, অন্যদিকে তেমনি কমে গেল গোঁড়া ব্রাহ্মণের সংখ্যা। এককথায় বৌদ্ধযুগে বর্ণাশ্রম ব‍্যবস্থার উপর শিথিল হয়ে গেল ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণ।
    এইসময় অনেক গোঁড়া ব্রাহ্মণ বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র লিখে বর্ণাশ্রম ব‍্যবস্থাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে নিজেদের অধিকার কায়েম করতে উঠেপড়ে লাগলেন। সেই সুযোগ এলো গুপ্তযুগে। গুপ্তরাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রাহ্মণদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদমর্যাদা পুনরায় বৃদ্ধি পেল। তাই বলা যায়, গুপ্তযুগ ভারতের ব্রাহ্মণদের কাছে “স্বর্ণযুগ।” এই গুপ্তযুগেই রচিত হলো বিভিন্ন পুরাণ এবং এইসব পুরাণের মাধ্যমে ব্রাহ্মণরা পুনরায় শুরু করলেন বর্ণাশ্রম ধর্মের প্রচার। ব্রাহ্মণদের এই শক্তি বৃদ্ধিতে কী ফল হলো, তা জানাচ্ছেন নগেন্দ্রনাথ বসু তাঁর “বঙ্গের ইতিহাস”, বৈশ‍্য কাণ্ড, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় সংস্করণ, কলকাতা, ১৩২০, পৃষ্ঠা ৮৩-তে। তা হলো, বৌদ্ধদের নিষ্কর জমিগুলো কেড়ে নিয়ে ব্রাহ্মণদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। গৌড়ের ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের কাছ থেকে কর আদায় করতো। এ ছাড়া, জৈন ও বৌদ্ধদের সময়ে মহিলা ও শূদ্রদের যে স্বাধীনতা ছিল, ব্রাহ্মণরা তা মেনে নেয়নি। বৌদ্ধ ও শ্বেতাম্বর জৈনরা যে সমস্ত মহিলাদের কঠোর তপশ্চর্যায় নিযুক্ত করেছিলেন, তা নিষিদ্ধ হয়ে গেল।
    এখানেই শেষ নয়। ব্রাহ্মণদের আরও একটি কীর্তি হলো, বিভিন্ন গল্পের জন্ম দিয়ে এলাকার জৈন ও বৌদ্ধ মন্দিরগুলিকে ব্রাহ্মণ‍্যধর্মে নিয়ে আসা। বাংলার বহু শিবমন্দিরে লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, ঐসব শৈবক্ষেত্রগুলিতে পীঠরক্ষক হয়ে পাহারা দিচ্ছেন “ভৈরব মূর্তি।” এবার ঐ ভৈরব মূর্তিগুলিকে লক্ষ্য করে দেখুন, তাদের মধ্যে অনেক গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীর জৈন বা কোনো বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বা জৈন তীর্থংকরকে খুঁজে পাবেন। সোজা কথায়, এই ভৈরব মূর্তিগুলি আসলে বুদ্ধ, মহাবীর বা কোনো বৌদ্ধ অথবা জৈন তীর্থংকরের মূর্তি। এ থেকে একটি বিষয় পরিস্কার, এসব শিবমন্দিরগুলি আদিতে কোনো জৈন বা বৌদ্ধ মন্দির ছিল। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণরা এগুলিকে দখল করে শিবমন্দিরে রূপান্তরিত করেছেন। বীরভূমের সিউড়ি থানার খটঙ্গা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মহুলা গ্রামের পাথরের তৈরি মৌলেশ্বর শিবমন্দিরটি আদিতে জৈন মন্দির ছিল বলে পণ্ডিতদের অভিমত। খুঁজলে বাংলায় এ রকম অনেক উদাহরণ পাওয়া যাবে। তা না হলে প্রবল বৌদ্ধযুগে নির্মিত বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরগুলিকে আমরা দেখতে পাই না কেন ? তবে মন্দিরের দখল নিলেও ব্রাহ্মণ‍্যধর্মের প্রতিনিধিরা সেখানকার বুদ্ধ ও জৈন মূর্তিগুলিকে ফেলে দেননি। সেগুলিকে তারা “ভৈরব” বানিয়ে ঐ মন্দিরের ক্ষেত্ররক্ষক পাহারাদার রেখে দিয়েছেন। গৌতম বুদ্ধ যে ভগবানের নবম অবতার, তা স্বীকৃত হয়েছে গুপ্তযুগে।

    আরও পড়ুন: বিবর্তনের পথে দুর্গা : শস্যদেবী থেকে দুর্গতিনাশিনী


    বাংলার গৃহস্থবাড়ির উঠোনে কান পাতলে আজও শোনা যায় কোনো এক বোকা তাঁতি, নয়তো কোনো এক বোকা চাষির গল্প। অন্যদিকে, শোনা যায়, কোনো এক স‍ৎ দরিদ্র ব্রাহ্মণের কাহিনী। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যাবে, গোঁড়া ব্রাহ্মণদের অত‍্যাচারে এই বাংলার এক বড়ো অংশের পিছিয়ে পড়া মানুষ প্রথমে বৌদ্ধ এবং পরে বৌদ্ধ থেকে মুসলমান হয়েছেন। ড: মিসেস ম‍্যাকফারলেনের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, বর্ণ, বর্ণেতর ও অস্পৃশ্য বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে যে রক্ত-বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে, বাঙালি মুসলমানদের মধ্যেও সেই একই রক্ত-বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ থেকে বলা যায়, বাঙালি মুসলমানরা আসলে বাঙালি হিন্দুদেরই সমগোত্রীয়।
    (–তথ্যসূত্র : বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, : ড: নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ, কলকাতা, ৭ ম সংস্করণ, ফাল্গুন ১৪৭৬, পৃ: ২৯ )
    গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় শুরু হয় পাল রাজত্ব। এই সময়টা হলো পুরোপুরি বৌদ্ধ শাসনের কাল। প্রবল বৌদ্ধ প্রভাবে তাই এই সময় হিন্দু-কাশীর কাছেই গড়ে উঠলো বৌদ্ধ-কাশী সারনাথ, আবার হিন্দু-গয়ার কাছেই গড়ে উঠলো বৌদ্ধ-গয়ার মতো বৌদ্ধক্ষেত্র। এককথায় বলা যায়, যেখানে যেখানে ব্রাহ্মণ‍্যধর্মের প্রাধান্য ছিল, সেখানেই বৌদ্ধরা নিজেদের ধর্মমত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হাজির হয়েছিলেন এবং গড়ে তুলেছিলেন বৌদ্ধ তীর্থস্থান।
    এ সময় উল্টোদিক থেকে ব্রাহ্মণ‍্যধর্মের প্রতিনিধিরাও উঠেপড়ে লাগলেন বৌদ্ধদের নিকেশ করতে। আগেই গুপ্তযুগে বুদ্ধকে ভগবানের নবম অবতার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার শুরু হলো বৌদ্ধধর্মকে পুরোপুরি আত্মসাৎ করার প্রক্রিয়া।
    ইতিমধ্যে বৌদ্ধরা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেন –হীনযান ও মহাযান। মহাযানী বৌদ্ধদের কাছে ব্রাহ্মণ‍্যধর্মের মতোই মূর্তিপুজোর প্রচলন ছিল। এর মধ্যে হিন্দু তন্ত্র এসে মিশলো এই মহাযান বৌদ্ধমতের সঙ্গে। এর ফলে মহাযান বৌদ্ধমত, হিন্দু তন্ত্র ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে সৃষ্টি হলো এক নতুন ধর্মীয় ধারার, নাম–“ধর্মপূজা বিধান।” সোজা কথায়, হিন্দু তন্ত্র ও স্মৃতি + মহাযান বৌদ্ধমত = ধর্মপূজা।
    সমাজচ্যুত বিদ্রোহী ব্রাহ্মণপুত্র রামাই পণ্ডিত, লাউসেন প্রমুখরা হলেন এই ধর্মপুজোর প্রবর্তক।
    পালযুগে বাংলার রাজধর্ম বৌদ্ধ হলেও উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের মধ্যে এর বিশেষ প্রভাব পড়েনি। কিন্তু নিম্ন বর্ণের হাঁড়ি, মুচি, ডোম, বাগ্দী প্রভৃতি জাতির ওপর প্রবলভাবেই বৌদ্ধ প্রভাব পড়েছিল। কারণ, উচ্চ বর্ণের হিন্দুর অত‍্যাচারে নিম্ন বর্ণের এইসব ব্রাত্য মানুষেররা একদিকে যেমন ছিল দু:খিত এবং অন্যদিকে তেমনি ক্ষুব্ধ। আর তাই ব্রাহ্মণদের অত‍্যাচার থেকে সমাজের এইসব অন্ত‍্যজ শ্রেণির এক বিরাট অংশের মানুষ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে ধর্মঠাকুরের উপাসক হয়ে গেল। রাঢ়-বাংলার গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠলো বহু “ধর্মঠাকুরের থান।” “স্থান” শব্দের অপভ্রংশে “থান।”
    কিন্তু পালযুগ শেষ হয়ে সেন রাজত্বের সময় আবার যখন ব্রাহ্মণ‍্যধর্ম রাজধর্মরূপে দেখা দিল, তখন উচ্চ বর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণরা পুনরায় সমাজের ব্রাত্যজনদের ওপর অত‍্যাচার শুরু করে দিল। পাওনা-গণ্ডা, দান-দক্ষিণা ঠিকমতো দিতে না পারলে ব্রাহ্মণরা এদের শাপ-শাপান্ত করতো, ব্রাহ্মণের ছায়া মাড়ানোর পর্যন্ত অধিকার ছিল না তাদের। এজন্য তাদের খড়ম-পেটাও খেতে হতো। অন্যদিকে, সুদখোর মহাজনদের হাতে পড়ে ব্রাত‍্য মানুষগুলো অনেক সময় সব হারিয়ে ভিটেছাড়া পর্যন্ত হতো।
    মধ্যযুগে, বিশেষত, প্রাক্-চৈতন্যযুগে দেশে মূর্খ ব্রাহ্মণদের সংখ্যাই ছিল বেশি, যার উল্লেখ আমরা পাই কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের “চণ্ডী”-তে :
    “মূর্খ বিপ্র বৈসে পুরে নগরে যাজন করে
    শিখিয়া পূজার অনুষ্ঠান।
    চন্দন তিলক পরে দেবপূজা ঘরে ঘরে
    চাউলের কোচড়া বান্ধে টানা।।”
    ব্রাহ্মণদের একতরফা অত‍্যাচারে হাঁড়ি-মুচি-ডোম-বাগ্দীদের মতো সমাজের ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর মানুষেরা তাই সব সময় অপমানের ভয়ে আতঙ্কে থাকতো। এই অবস্থা থেকে রেহাই পাবার পথ খুঁজতে লাগলো তারা।
    বাংলায় মুসলমান আগমন তাদের সামনে এনে দিল মুক্তির সুযোগ।
    বখতিয়ার খিলজির নদীয়া বিজয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটলো।
    আর সমাজের অবহেলিত ব্রাত‍্যজনতা বাংলায় এই মুসলমান আগমনকে ভেবে নিলেন তাদের “মুক্তিদূত” হিসেবে। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে যখন মুসলমানদের সংঘাত শুরু হলো, তখন এইসব ব্রাত‍্যজনতা মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। এমনকি, সেনরাজ লক্ষ্মণসেনের সভাকবি উমাপতি ধর লিখে ফেললেন যবনবীরের প্রশস্তি।
    মুসলমানদের হাতে মূর্খ ব্রাহ্মণদের কী অবস্থা হলো, তার বিবরণ আমরা পাচ্ছি খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতাব্দীর কবি বিদ‍্যাপতির লেখায় :
    “ধরি আনয়ে বামুন বড়ুয়া।
    ফোঁটা চাট গাইকো চড়ুয়া।।”
    অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের টিকি কেটে, তিলক মুছে তুর্কি নেতারা তাদের গাধার পিঠে চড়িয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতো।
    এদেশে মুসলমান আগমনকে ব্রাত‍্য জনগোষ্ঠীর মানুষ ভেবেছিল, উচ্চ বর্ণের হাতে তাদের ওপর এতদিন ধরে হয়ে আসা অত‍্যাচারের এবার অবসান ঘটতে চলেছে। তারা ভাবলো, মুসলমানের ছদ্মবেশে স্বয়ং ধর্মঠাকুর এসেছেন তাঁর ভক্তদের রক্ষা করতে। এর প্রমাণ আমরা পাচ্ছি, ধর্মপুজোর প্রবর্তক বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুর নিবাসী রামাই পণ্ডিতের লেখা “নিরঞ্জনের রুষ্মা”-য় :
    “জাজপুর পুরবাদি সোলসয় ঘর বেদি
    বেদি লয় কর লয় দুন।
    দক্ষিণা মাগিতে যায় যার ঘরে নাহি পায়
    শাঁপ দিয়া পোড়ায় ভুবন।।
    মালদহে লাগে কর না চিনে আপন পর
    জালের নাইর দিশ পাস।
    বোলিষ্ঠ হইল বড় দশ বিশ হইয়া জোড়
    সধর্ম্মীকে কর-এ বিনাশ।।
    বেদে করে উচ্চারণ বের‍্যায় অগ্নি ঘনে ঘন
    দেখিয়া সভাই কম্ফমান।
    মনেতে পাইয়া মর্ম্ম সবে বলে রাখ ধর্ম্ম
    তোমা বিনে কে করে পরিত্রাণ।।
    এইরূপে দ্বিজগণ করে ছিষ্টি সংহারণ
    এ বড় হইল অবিচার।
    বৈকুণ্ঠে থাকিয়া ধর্ম্ম মনেতে পাইয়া মর্ম্ম
    মায়াতে হইল অন্ধকার।।
    ধর্ম্ম হইল যবনরূপী মাথায়েতে কাল টুপি
    হাতে শোভে তীরুচ কামান।
    চাপিয়া উত্তম হয় ত্রিভুবনে লাগে ভয়
    খোদার বলিয়া এক নাম।।
    নিরঞ্জন নিরাকার হইল‍্য ভেস্ত অবতার
    মুখেতে বলেন দম্মাদার।
    যতেক দেবতাগণ সবে হয়‍্যা একমন
    আনন্দে পরিল ইজার।।
    ব্রহ্মা হইলা মহাম্মদ বিষ্ণু হইলা পেগাম্বর
    আদম্ফ হইল শূলপাণি।
    গণেশ হইল গাজী কার্ত্তিক হইল কাজী
    ফকির হইল যতমুনি ।।
    তেজিয়া আপন ভেক নারদ হইল‍্য সেক
    পুরন্দর হইল‍্য মৌলানা ।
    চন্দ্র সূর্য আদি দেবে পদাতিক হয়‍্যা সবে
    সবে মিলি বাজায় বাজনা ।।
    আপুনি চণ্ডিকাদেবী তিঁহ হইল‍্যা হায়া বিবি
    পদ্মাবতী হইল বিবি নূর ।
    যতেক দেবতাগণ হয়‍্যা সবে একমন
    প্রবেশ করিল জাজপুর ।।
    দেউল দেহারা ভাঙ্গে কড়া কিড়‍্যা খায় রঙ্গে
    পাখড় পাখড় বলে বোল ।
    ধরিয়া ধর্ম্মের পায় রামাই পণ্ডিত গায়
    ই বড় বিষম গণ্ডগোল ।।”
    —–নারায়ণ, মাঘ, ১৩২২.
    এখানে “রুষ্মা” মানে রাগ বা ক্রোধ, আর “নিরঞ্জন” মানে শিব। তাহলে এর মানে দাঁড়ায় “শিবের রাগ।”
    ধর্মঠাকুরের উপাসক নিম্নবর্ণের মানুষদের প্রতি ব্রাহ্মণদের নির্মম অত‍্যাচারের ফলেই শিব রেগে গিয়ে মুসলমানের ছদ্মবেশে নিজ ভক্তদের রক্ষা করতে স্বয়ং ধরায় অবতীর্ণ হয়েছেন, এটাই ধর্মপুজো প্রবর্তক রামাই পণ্ডিতের বক্তব্য। এজন্য বিষ্ণু হয়েছেন পয়গম্বর, ব্রহ্মা পকম্বর, শিব হয়েছেন আদম, গণেশ এসেছেন গাজীরূপে, কার্তিক কাজী রূপে, চণ্ডী হাওয়াবিবিরূপে এবং পদ্মাবতী অর্থাৎ দেবী মনসা আবির্ভূতা হয়েছেন নূরবিবিরূপে। এমনিভাবে হিন্দু দেবদেবীগণ ইজের পরে মুসলমানের ছদ্মবেশে হিন্দু দেবদেবীর মন্দির, বিগ্রহাদি ভেঙে ব্রাহ্মণদের দর্পচূর্ণ করলেন এবং রক্ষা করলেন ধর্মঠাকুরের ভক্তদের। তাই মুসলমানরা যখন ধর্মঠাকুরের ছদ্মবেশে তাদের “মুক্তির দূত” হিসেবে প্রতিভাত হলেন বাংলার লাঞ্ছিত ব্রাত‍্য জনগোষ্ঠীর কাছে, তখন তারা দলে দলে বৌদ্ধ থেকে ভীড় জমালেন ইসলামের পতাকাতলে। এভাবেই বাংলার পিছিয়ে পড়া এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মানুষ মুসলমান হয়েছেন। ড: মিসেস ম‍্যাকফারলেনের গবেষণা সে কথাই প্রমাণ করে।
    বীরভূম জেলার রাজনগর থানার তেঁতুলবাঁধ গ্রামে বৈশাখী পূর্ণিমায় একটি স্বচ্ছ স্ফটিক পাথরের শিবলিঙ্গকে বহু বছর ধরে “ধর্মরাজ” পুজো করা হচ্ছে। সুতরাং, রামাই পণ্ডিতের শিব যে বাস্তবে ধর্মঠাকুর হয়েছেন, ক্ষেত্রসমীক্ষায় তা প্রমাণিত।