ডিহি-বক্রেশ্বরের সতীপীঠ মাটির তলায়, সাজানো সতীপীঠেই চলছে পুজো-পাঠ

    1

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    বীরভূম জেলার দুবরাজপুর থানার অন্তর্গত গোহালীয়াড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন সুপ্রাচীন শৈব তীর্থক্ষেত্র বক্রেশ্বরের অষ্টাবক্রেশ্বর ও উষ্ণ প্রস্রবণের খ‍্যাতি প্রায় সারা বছর ধরে ভ্রমণপিপাসু মানুষকে আকর্ষণ করে আসছে বহুকাল ধরে। বক্রেশ্বরের গুপ্তযুগীয় প্রাচীন মন্দিরটি প্রাকৃতিক কারণে ভেঙে গেলে উড়িষ্যারাজ প্রথম নরসিংহদেব উত্তর রাঢ়ের রাজনগরে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার সময়কালে এই বক্রেশ্বরের বতর্মান মন্দিরটি উড়িষ‍্যাদেশীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মাণ করে দেন। প্রাচ‍্যবিদ‍্যামহার্ণব নগেন্দ্রনাথ বসু মন্দিরের গায়ে “নরসিংহ” কথাটি পাঠোদ্ধার করে গেছেন। এ থেকে বলাই যায়, বতর্মান শিবমন্দিরটি উড়িষ্যারাজ প্রথম নরসিংহদেবের ( ১২৩৮ খৃ-১২৬৪খৃ ) তৈরি। কিন্তু তার পাশেই আটপৌরে সাদামাটা বাড়ির মতো বক্রেশ্বর মহাপীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহিষমর্দ্দিনীর মন্দিরটি এত আধুনিক কেন–এই প্রশ্ন জাগতেই এই ইতিহাস পথিকের অনুসন্ধান পর্ব। এই কাজে আমার সহায় হয়েছেন বক্রেশ্বর আচার্য পরিবারের প্রবীণ থেকে নবীন প্রজন্ম। আমার শিক্ষক আচার্য পরিবারের ৮৪ বছরের প্রবীণ শক্তিপদ আচার্য এ কাজে আশির্বাদ করেছেন আমায়, পাশে থেকেছে আমার বিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী অন্তরঙ্গ বন্ধু বামদেব আচার্য এবং এই প্রজন্মের ভ্রাতৃপ্রতীম কল‍্যাণ আচার্য থেকে বক্রেশ্বরের প্রায় পুরো আচার্য পরিবার। এই আচার্য পরিবারের-ই পূর্বপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য রাজনগরের “বীররাজা” বসন্ত চৌধুরীর আহ্বানে বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের কাছে আমড়াই গ্রাম থেকে বক্রেশ্বর শিবের সেবাপুজোর জন্য এই বক্রেশ্বরে এসেছিলেন খৃষ্টিয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। বক্রেশ্বর তখন ছিল “ডিহি-বক্রেশ্বর।” “ডিহি” সাওতালি শব্দ, যার অর্থ–জঙ্গল অধ‍্যুষিত বাসভূমি। ঘন জঙ্গলের মাঝে ছোট ছোট জনবসতি পরিচিত ছিল “ডিহি” নামে। যাই হোক, ১২৪৪ খৃষ্টাব্দ নাগাদ লক্ষ্ণণাবতীর শাসক তুগরল খানকে পরাস্ত করে এবং রাজনগরের খিলজি শাসনকর্তা ফকর-উল-মুলুক করিম উদ্দিন ল‍্যাংঘ্রিকে পরাজিত ও নিহত করে উড়িষ্যার গঙ্গা বংশীয় রাজা প্রথম নরসিংহদেব দখল করে নেন রাজনগরসহ সমগ্র রাঢ়। তারপর তিনি বক্রেশ্বরের বতর্মান শিবমন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করে দেন। কিন্তু রাজা নরসিংহদেব সতীপীঠের উপর মহিষমর্দ্দিনীর মন্দিরটি নির্মাণ করেননি। কারণ, এখানে তিনি সতীপীঠের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ খুঁজে পাননি। বহু পরে বৃটিশ আমলে বক্রেশ্বরে শিবমন্দিরের পাশেই বতর্মান মহিষমর্দ্দিনী মন্দিরটি তৈরি করান এখানকার এক সিদ্ধ সাধক খাঁকি বাবা। তাই এই মন্দিরটি এত আধুনিক। বোঝাই যায়, অতি দ্রুত এই মন্দির তৈরি হয়েছে। এর কারণ ছিল। ১৯২২ খৃষ্টাব্দে ডিহি-বক্রেশ্বরের ডোম পাড়ার “ধরম গোড়ে ” পুকুর থেকে পাওয়া যায় দুই গুপ্তযুগীয় প্রাচীন তান্ত্রিক মাতৃকা মূর্তি, একটি কালো কষ্টি পাথরের তৈরি অষ্টাদশভূজা “মহালক্ষ্মী” রূপের মহিষমর্দ্দিনী মূর্তি এবং অন‍্য প্রস্তর বিগ্রহটি দশমহাবিদ‍্যার এক রূপ “কমলে কামিনী।” পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, মূর্তি দুটি হাজার বছরের পুরোনো। ধরম গোড়ের ঈশান কোণে ছিল একটি বটগাছ আর এই বটগাছের নিচে পুকুরের জল থেকে পাওয়া যায় সংশ্লিষ্ট মন্দিরের ধ্বংসাবশেষসহ মূর্তি দুটি। প্রাকৃতিক ভূকম্পনের ফলেই মাটির নিচে জলের তলায় চাপা পড়ে যায় সেই প্রাচীন মন্দির, যা ছিল ডিহি-বক্রেশ্বরের আসল সতীপীঠ। যাই হোক, খাঁকিবাবাও বক্রেশ্বরের প্রাচীন সতীপীঠের প্রামাণ্য কোনো অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে ধরম গোড়ে থেকে পাওয়া সতীপীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহিষমর্দ্দিনীর ভ্রূ-সন্ধি সম্বলিত কালো পাথরের মণিবেদিটি বক্রেশ্বর শিবের পাশেই প্রতিষ্ঠিত করেন। এভাবেই খাঁকি বাবার হাতে তৈরি হয় বতর্মান সতীপীঠ। বসানো হয় পিতলের তৈরি মহিষমর্দ্দিনী মূর্তি। সে মূর্তি চুরি গেলে আবার পিতলের নতুন মূর্তি বসানো হয়। এভাবেই আস্তে আস্তে মানুষের মনে জায়গা করে নেয় বতর্মান সতীপীঠ। আর আসল সতীপীঠ হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গহ্বর–ধরম গোড়ের জলের তলায়। তবে এই পুকুর থেকে উদ্ধার হওয়া আসল সতীপীঠের প্রাচীন মাতৃকা মূর্তি দুটি বর্তমানে আচার্যদের দুর্গা মন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ঋষি অষ্টাবক্র নিজের প‍্যারালিসিস ব‍্যাধি নিরাময় করতে দুশ্চর তপস‍্যা করে গুপ্ত কাশী বক্রেশ্বরের নৃত্যরত ঈশানকে সন্তুষ্ট করে বক্রেশ্বর শিবকে প্রকটিত করলেও আদি সতীপীঠকে এখনো পর্যন্ত কোনো সাধক প্রকটিত করেননি। তাই আদি সতীপীঠ গুপ্ত-ই থেকে গেছে এখনো। এখন এর একমাত্র সমাধান ধরম গোড়ে এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন। আর তাহলেই উদঘাটিত হবে ডিহি-বক্রেশ্বরের আদি সতীপীঠ। এখনো পর্যন্ত বক্রেশ্বরের আদি সতীপীঠ ধরম গোড়ের জলের তলায় চাপা পড়ে রয়েছে। অন‍্যদিকে, সাজানো সতীপীঠেই চলছে পুজো-পাঠ। বর্তমানে বক্রেশ্বরের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে তৈরী হয়েছে “বক্রেশ্বর উন্নয়ন পর্ষদ।” কংক্রিটে ঢাকছে ডিহি-বক্রেশ্বর। কিন্তু এখানকার মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না এখনও। ছবি : ধরম গোড়ে থেকে পাওয়া প্রাচীন মহালক্ষ্মী ও কমলে কামিনী প্রস্তর বিগ্রহ এবং বতর্মান বক্রেশ্বর।

    1 COMMENT

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here