স্বধর্ম রক্ষায় সুন্দরবনে দক্ষিণ রায়ের লড়াই

    0
    dakshin ray

    Last Updated on

    —উত্তম মণ্ডল

    পাতলা চকচকে শরীর, হলুদ বরণ গা, সারা গায়ে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ, বিরাট গোঁফ, মুখের দু’দিক থেকে ঝরছে লালা, ছয় মিটার লম্বা একটি লেজ—সব মিলিয়ে এরকমই চেহারা দক্ষিণ রায়ের। তবে লেজটি তাঁর শরীরের লেজ নয়। লেজটি আসলে পোশাকের লেজ। সোজা কথায়, দক্ষিণ রায় লেজ লাগানো পোশাক পরতেন। আর তিনি ছিলেন একজন রক্ত-মাংসে গড়া বীরপুরুষ, স্বধর্ম রক্ষায় যাঁর ছিল এলাকায় সতর্ক পাহারা। বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে প্রতিহত করেছিলেন হিন্দুদের ক্রমে ইসলামধর্মে ধর্মান্তরিত করার বড় খাঁ গাজীর প্রচেষ্টাকে। আর সেজন্যই “মানুষ দক্ষিণ রায়” আজ সুন্দরবন এলাকার “দেবতা দক্ষিণ রায়।” আসছি সে কথায়।…

    আরও পড়ুন:হিংসা বনাম সভ্যতা


    পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলের ব্রাত‍্যজনের লোকদেবতা দক্ষিণ রায়।
    যশোরের ব্রাহ্মণনগরের রাজা মুকুট রায়ের অধীন ভাটি দেশের রাজা ছিলেন তিনি।
    সুন্দরবনের অধিবাসীরা তাঁকে ভাটি অঞ্চলের অধিপতি বলে মানেন।
    জনশ্রুতি অনুসারে দক্ষিণ রায়ের রাজত্বের সীমানা ছিল পূর্বে বাকলা জেলা, পশ্চিমে ঘাটাল, উত্তরে ভাগীরথী এবং দক্ষিণে কাকদ্বীপ।
    প্রত‍্যেক অমাবস্যা তিথিতে দক্ষিণ রায়ের মন্দিরে পশুবলি হয়। কলকাতার গড়িয়া রেল স্টেশনের কাছে লক্ষ্মীকান্তপুর ও ধবধবি থেকে কয়েক মাইল দূরে দক্ষিণ রায়ের মন্দির আছে। এই অঞ্চলটি একসময় সুন্দরবনের মধ্যে ছিল।
    দক্ষিণ রায়ের বার্ষিক পুজোয় লোককবি কৃষ্ণরাম দাসের লেখা “রায়মঙ্গল” ( রচনাকাল ১৬৮৬-৮৭ খ্রি:) পরিবেশিত হয়। সুন্দরবন অঞ্চলের বাউল‍্যা, মউল‍্যা, মলঙ্গিদের মতো শ্রমজীবি মানুষের দল এ পালাগানের ভক্ত-শ্রোতা। সুন্দরবনের এইসব মানুষেরা ম‍্যানগ্রোভ অঞ্চলে মাছ ধরতে, কিংবা কাঠ বা মধু আনতে যাবার আগে এই দক্ষিণ রায়ের পুজো দিয়ে যায়। এদের কেউ কেউ আবার দক্ষিণ রায়ের মুখোশ পরে বনে যায়, যাতে বাঘ ভয়ে পালায়, এই বিশ্বাসে।
    দক্ষিণ রায় গান-বাজনা পছন্দ করেন। তাই স্থানীয় মানুষজন তাঁর মন্দিরে নাচ-গানের আসর বসান।
    এর কারণ হলো নাচ-গানের মাধ্যমে এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রাতে পাহারা দেওয়া। বিনোদনের টানে মানুষ এসে রাত জেগে এলাকা পাহারা দিতো।
    প্রশ্ন, কিসের জন্য পাহারা দিতে হতো সাধারণ মানুষকে ?
    স্বভাবতই একটা উত্তর আসে, তা হলো বাঘের ভয়ে।

    আরও পড়ুন:কমিউনিস্টদের খোঁজ পড়েছে !


    কিন্তু শুধু কি তাই ?
    তাহলে তো মানুষ রাতে ঘরের দরজায় খিল এঁটে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতো। বাইরে নাচ-গান করার দরকার ছিল কী ?
    আসুন, উত্তর খুঁজতে এবার পায়ে পায়ে সুন্দরবনের গভীরে যাই।…
    ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আমরা সুন্দরবন এলাকায় দক্ষিণ রায়, ধোনাই বণিক, মোনাই বণিক ও এক মুসলমান গাজীর অস্তিত্ব পাচ্ছি। দক্ষিণ রায়ের কথা এতক্ষণ বলেছি। তবে তাঁর সম্পর্কে আরও একটা কথা বলার আছে, সেটা হলো, তিনি একসময় দেহধারী ব‍্যক্তি ছিলেন। সোজা কথায়, রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন দক্ষিণ রায়। মানুষ থেকে পরে দেবতা হয়েছেন। কিন্তু কীভাবে তিনি মানুষ থেকে দেবতা হলেন, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা যাক্। তার আগে ধোনাই বণিক, মোনাই বণিক ও গাজীর পরিচয় জেনে নিই।
    “বণিক” পরিচয়েই স্পষ্ট, ধোনাই-মোনাই ছিলেন স্থানীয় সুন্দরবন এলাকার ব‍্যবসায়ী। সুন্দরবনের সহজলভ্য মাছ, কাঠ ও মধু নিয়েই ছিল তাদের কারবার, তা বলাই বাহুল্য।
    গাজীর পরিচয় বলতে তিনি নি:সন্দেহে ইসলামধর্মের প্রচারক। তিনি “বড় খাঁ গাজী” নামে পরিচিত।
    কেউ বলেন, হুগলি পাণ্ডুয়ার পীর জাফর খাঁ গাজীর ছেলে এই বড় খাঁ গাজী।
    কারো মতে, খ্রিস্টিয় পঞ্চাদশ শতকের পীর ইসমাইল গাজীই হলেন এই বড় খাঁ গাজী।
    ড: সুকুমার সেনের মতে, খ্রিস্টিয় চতুর্দশ শতকের পীর সুফি খান হলেন এই বড় খাঁ গাজী।
    আবার অনেকের মতে, বড় খাঁ গাজী কোনো একজনের নাম নয়। মধ্যযুগের বাংলায় ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের শীর্ষ ব‍্যক্তিরাই “বড় খাঁ গাজী” নামে পরিচিত।
    গাজীর চেহারা কেমন ?

    আরও পড়ুন:আমরা কারা? ভদ্রলোক । দাবীটা কী ? বাঁচতে চাই


    খাড়িগ্রামের মূর্তিটা দেখেই বলা যায় গাজীর চেহারার নমুনা।
    গাজী রয়েছেন ঘোড়ায় চেপে। পরণে যোদ্ধার বেশ। পায়জামা, চোগাচাপকান পিরাণ পরিহিত। মাথায় টুপি, মুখে লম্বা গোঁফ ও দাড়ি, গালপাট্টা ঝুলপি, বড়ো বড়ো টানা টানা চোখ, এক হাতে অস্ত্র, অন্য হাতে ঘোড়ার লাগাম ধরা, দু’পায়ে বুট জুতো এবং জুতোসমেত পা একটি রেকাবির উপরে রাখা।
    তিনিও বাঘের দেবতা এবং ইসলামধর্মের প্রচারক।
    তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়ালো ?
    দক্ষিণ রায় বাঘের দেবতা আবার বড় খাঁ গাজীও বাঘের দেবতা। এক বনে দুই বাঘ থাকলে সংঘর্ষ অনিবার্য। বিশেষ করে, গাজী যখন ইসলাম ধর্ম প্রচারক, তখন তো সংঘর্ষ হবেই। আর গাজী তো আর ছায়ায় সঙ্গে যুদ্ধ করবেন না।
    তাই দক্ষিণ রায় ও বড় খাঁ গাজী—দুজনেই রক্ত-মাংসের মানুষ।
    ঘোড়ায় চড়ে যোদ্ধার বেশে অস্ত্র হাতে গাজীর এই ইসলাম প্রচার মেনে নিলেন না সুন্দরবন এলাকার ভাটির দেশের রাজা দক্ষিণ রায়। তিনিও অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়ালেন।
    এলাকার লোককথা বলছে, স্থানীয় হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে গিয়ে বহুবার এলাকার দেবতাদের সঙ্গে গাজীর বিরোধ এবং শেষে যুদ্ধ হয়। মানুষের লোককথায় ইতিমধ্যেই রক্ত-মাংসের মানুষ দক্ষিণ রায় পরিণত হয়ে গিয়েছেন লৌকিক দেবতায়।

    আরও পড়ুন:অরণ্যের অধিকার: ভাঁওতা প্রতিশ্রুতি ও জেরবার বনবাসী


    দক্ষিণ রায় ও বড় খাঁ গাজীর মধ্যে এত জোর লড়াই হয়েছিল, যে লড়াই থামাতে কৃষ্ণরাম দাসের “রায়মঙ্গল” থেকে স্বয়ং জগদীশ্বরকে বেরিয়ে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত “কৃষ্ণপয়গম্বর” বেশ ধারণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হতে হয়েছিল। আর যুদ্ধবিরতির শ‍র্ত অনুযায়ী কুমীর দেবতা কালু রায়কে হিজলি এলাকার অধিকার ছেড়ে দিতে হয়েছিল। এই কালু রায় কিন্তু রাঢ়ের ধর্মঠাকুর “কালু রায়” নন। এই কালু রায় সুন্দরবনের জল ও অরণ্যজীবী মানুষদের উপাস‍্য দেবতা। তিনি কুমিরের দেবতা। কুমিরের বাস জলে। তাই সুন্দরবনের মানুষ কুমির ভীতি থেকে বাঁচতে কালু রায়ের পুজো করে থাকেন।
    মানুষের মতোই কালু রায়ের মূর্তি। হাতে টাঙি, ঢাল, কোমরবন্ধে নানান্ অস্ত্র ঝোলানো। পিঠে তির-ধনুক। সব মিলে রীতিমতো যোদ্ধার সাজে সজ্জিত কালু রায়।
    ইসলামধর্ম প্রচারে বাধা দিয়ে সুন্দরবন এলাকার একসময়ের হিন্দু বীর যোদ্ধারা আজ হয়েছেন লৌকিক দেবতা কেউ দক্ষিণ রায় ,আবার কেউ কালু রায়।
    দক্ষিণ রায়ের মন্দিরে ভক্তদের নাচ-গানের রীতি একসময়ের এলাকা পাহারা দেওয়ার স্মৃতিকেই মনে করে দেয় আজও। শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রাখতে আজও দেশে চলছে পাহারা দেওয়ার আবশ্যিক নিয়ম

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here