‌রাখাল-কথা

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    বৌদ্ধ যুগে অহিংসার আবহাওয়ায় ভারতে পশু হত্যা অনেকটাই কমেছিল এবং অন‍্যদিকে বেড়েছিল কৃষি কাজের জন্য গবাদিপশুর গুরুত্ব। আগে জমিতে ধান বুনে বা ছড়িয়ে দেওয়া হতো। সেটাই ছিল চাষের আদি পদ্ধতি। এখনো বিভিন্ন দেবদেবীর পুজোর সময় অনুষ্ঠিত যজ্ঞে পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করা হয়ে থাকে। এই প্রথা প্রাচীনকালে জমিতে শস‍্য ছড়ানোর কথাই মনে করিয়ে দেয়। প্রথমদিকে আমাদের দেশের প্রধান কৃষি ফসল ধানের চাষ এভাবেই করা হতো। কিন্তু আমাদের দেশের এই কৃষি পদ্ধতির বদল ঘটলো বৌদ্ধ যুগে। নতুনভাবে শুরু হলো “রোপণ” পদ্ধতিতে ধান চাষ। প্রথমে জমিতে বীজ ধান ছড়িয়ে চারা তৈরি করা হলো এবং তারপর সেই কচি চারাকে তুলে অন্য জমিতে গোছা গোছা করে পোঁতা হতে লাগলো। আজকের দিনে চাষিরা এই পদ্ধতিতেই চাষ করে থাকেন।

    ‌আরও পড়ুন:পুরাতন বক্রেশ্বর কথা

    এই সময় লোহার তৈরি লাঙল ব‍্যবহার শুরু হলো গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে এবং তার ফলে কৃষিতে কৃষকের ঘরে এলো উদ্বৃত্ত উৎপাদন। আর এসবের প্রেক্ষাপটে কৃষিকে কেন্দ্র করে উদ্ভব হলো এক নতুন পেশার, যার নাম–“রাখাল-প্রথা।” পৌরাণিক আখ‍্যান অনুসারে, ক্ষাত্র-তনয় কৃষ্ণ-বলরাম গরু চরাতেন। তখন সাধারণত গাভী পালন করা হতো আভীর (গোয়ালা ) সম্প্রদায়ের মধ্যে। মূলত ব্রজগোপিনীদের-ই তাই আমরা হাটে দৈ বেচতে যেতে দেখি। সুতরাং, এ সময় গাভীর চেয়ে বলদ গরুর যে বিশেষ গুরুত্ব ছিল না, তা বোঝাই যায়। বৌদ্ধ যুগে নতুনভাবে রোপণ পদ্ধতিতে ধান চাষ শুরু হলে কৃষিকাজে বেড়ে গেল বলদ গরুর গুরুত্ব, যার ফল এই “রাখাল-প্রথা।” বৌদ্ধ যুগে এই রাখাল-প্রথার উদ্ভব সমাজে নতুন এক পেশার জন্ম দিল। এই রাখালরাই আমাদের দেশের প্রথম শিশু শ্রমিক। এই রাখাল হবার যোগ্যতার কথাও লেখা আছে বৌদ্ধ গ্রন্থ “মঝ্ঝিম-নিকায়”-তে। সেখানে বলা হয়েছে, রাখালকে জানতে হবে জলের সন্ধান। এছাড়া গরুর গায়ে এঁটুলি হলে তা বেছে পরিস্কার করে দিতে হবে এবং তার থাকতে হবে ষাঁড় চেনার ক্ষমতা। এই রাখাল-প্রথাই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে “মাহিন্দার প্রথা।”

    ‌আরও পড়ুন:এক বরফঢাকা নভেম্বর ও গিরিপথের রক্ষক ভারতমাতার বীর সন্তানরা

    গ্রামে এখনো এর অপভ্রংশ “মান্দের” কথাটি চালু আছে। একমাত্র অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবারেই ছিল এই মাহিন্দার প্রথা। মাহিন্দাররা কৃষক পরিবারের গবাদি পশুর দেখাশোনা করতো। বিনিময়ে পেতো প্রতিদিনের ভাত, জলখাবার, স্নানের তেল-গামছা, পুজোয় নতুন জামা-কাপড়, শীতের সময় “গায়ের কাপড়” অর্থাৎ চাদর থেকে মেলা দেখার পয়সা। এককথায়, মাহিন্দাররা গৃহস্থ পরিবারের একজন বিশ্বস্ত সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিল। অনেক সময় গৃহস্থ পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কোলে পিঠে করে মানুষ করতো তারা। এভাবেই রাখাল-প্রথা পরবর্তীকালে গ্রাম-বাংলায় মাহিন্দার প্রথা হিসেবে বহুকাল টিকে ছিল। এখনো কোনো কোনো জায়গায় আছে। আবার কোথাও মাহিন্দার প্রথা বাস্তবে হারিয়ে গেলেও লোকপ্রবাদে প্রচলিত রয়েছে। এখনো মানুষজন কথায় কথায় বলেন, আমি কি তোমার মান্দের ?

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here