খ্রিস্টান থেকে ইসলাম, জেনিসারি বাহিনী এবং অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের ওঠা-পড়া

    0
    conversion-of-Christian-to-Islam-Jaanisar

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    অপহৃত খ্রিস্টান বালকদের ইসলামধর্মে ধর্মান্তরিত করে একদিন ইওরোপের পুরো অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্য চালানো হয়েছিল। শুনতে অবাক লাগলেও এই ইতিহাস নিয়েই আজকের লেখা।…
    বাহিনীর নাম “জেনিসারি।” ওসমানীয় তুর্কি ভাষায় এর মানে “নতুন সেনা।”
    যতদূর জানা যায়, তৃতীয় অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় মুরাদের আমলে ( ১৩৬২-১৩৮৯ খ্রি:) গঠন হয় এই জেনিসারি বাহিনী। প্রথমে যুদ্ধে নিযুক্ত সকল ক্রীতদাসদের মধ্যে থেকে এক-পঞ্চমাংশ সম্রাটের অংশ হিসেবে বেছে নিয়ে জেনিসারি বাহিনীর জন্য প্রথম সৈন্য সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীকালে খ্রিস্টান পরিবার থেকে জোর করে ৬ থেকে ১৪ বছরের বালকদের ধরে এনে এই বাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল। মূলত বলকান, আনাতোলিয়া, আলবেনিয়া, বসনিয়া ও বুলগেরিয়া থেকে এইসব অল্প বয়সী বালকদের ধরে আনা হতো। তবে ইহুদি ও তুর্কিদের এই দলে নেওয়া হতো না। প্রথমদিকে গ্রিক ও আলবেনিয়ার বালকদের মধ্যে থেকেই ক্রীতদাস জোগাড় করা হতো। পরে অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে বসনিয়া,বুলগেরিয়া, আর্মেনিয়া, হাঙ্গেরি এবং আরও পরে দক্ষিণ রাশিয়া থেকেও ক্রীতদাস আনা হয়েছিল। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে খ্রিস্টান বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবেও এই বাহিনীতে দিয়ে দিতো।

    আরো পড়ুন : মদ‍্যপান যুগে যুগে


    খ্রিস্টান পরিবার থেকে অল্প বয়সী বালকদের আনার পর তাদের তুর্কি পরিবারে রাখা হতো, যাতে তারা তুর্কি ভাষা ও ইসলামীয় আদব-কায়দা শিখতে পারে। এরপর তাদের ইসলাম ধ‍র্মে দীক্ষিত করে জোর করে সুন্নত করানো হতো। ২৪ ঘণ্টা তাদের খোজাদের তত্ত্বাবধানে থাকতে হতো। এরপর তাদের শহরের কোনো সামরিক স্কুলে ভর্তি করা হতো।
    তারা বিয়ে করতে পারতো না। আবার মুসলমানদের মতো দাড়িও রাখতে পারতো না।
    যুদ্ধবিদ‍্যা ছাড়া আর কোনো কিছুই শিখতে দেওয়া হতো না তাদের। তাদের ঘর ছিল সেনানিবাস এবং সম্রাট ছিলেন তাদের পিতা। দরবেশ হাজী বেকতাস ভেলির উপদেশ মেনে চলতে হতো তাদের। তার আশির্বাদ ছিল তাদের পাথেয়।
    এই জেনিসারি বাহিনী ছিল একদিকে অভিজাত পদাতিক বাহিনী এবং অন্যদিকে সম্রাটের দেহরক্ষী ও ইওরোপের প্রথম আধুনিক সেনাবাহিনী। তারা না ছিল ক্রীতদাস, না ছিল মুক্ত মানুষ। বিয়ে ছাড়াও ব‍্যবসা বা অন্য কোনো পেশা নিতে পারতো না তারা। কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ছিল এই বাহিনীর। তবে উচ্চ হারে বেতন ও পেনশন ছিল তাদের।
    খ্রিস্টিয় সপ্তদশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের ব‍্যাপক বিস্তৃতির কারণে এই বাহিনীর নিয়োগ প্রক্রিয়া কিছুটা শিথিল করা হয়। সে সময় অসামরিক ব‍্যক্তিরাও এই বাহিনীতে যোগ দেয়। এর ফলে ধীরে ধীরে এই বাহিনীর বৈশিষ্ট্য হারাতে থাকে।

    আরো পড়ুন : সোমনাথ মন্দিরের ভাঙা-গড়া : ধ্বংসশক্তিকে হারিয়ে সৃষ্টিশক্তির জয়ের এক মাইলস্টোন


    খ্রিস্টিয় আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারা বিয়ে করার অনুমতি পায়। এরপর তাদের ছেলেরাও এই বাহিনীতে সুযোগ পেতে থাকে।
    একসময় এই জেনিসারি বাহিনী দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারি হয়। তারা একসময় আরও বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দাবি করতে থাকে এবং ১৮২৬ সালে সম্রাটের এই একান্ত অনুগ্রত বাহিনী বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এমনকি, তারা সম্রাট দ্বিতীয় মাহমুদকে ক্ষমতাচ‍্যুৎ করার হুমকি দেয়। এদিকে সম্রাটের পক্ষেও ১ লক্ষ ৩৫ হাজার বাহিনীর খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
    শেষে ৬ হাজার সেনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ১৮২৬ সালে অটোমান সম্রাট দ্বিতীয় মাহমুদ এই জেনিসারি বাহিনীর অবলুপ্তি ঘটান।
    জেনিসারি গেল, কিন্তু অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে রেখে গেল খ্রিস্টান থেকে ইসলামে ধর্মান্তরকরণের সাক্ষ‍্য।…

    আরো পড়ুন : জাত বদলের জামানত

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here