কমিউনিস্টদের খোঁজ পড়েছে !

    0

    Last Updated on

    নীলাঞ্জন কুমার

    এখন থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টি ঝাড়েগোড়ে নিকেশ হয়ে যাবার পর আবার তাদের খোঁজ পড়েছে কিছু অনুসন্ধিৎসুর আগ্রহে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষের প্রাক্কালে লোকসভা নির্বাচনের পর সেই যে তারা গায়েব হয়ে গিয়েছিল আজ পর্যন্ত তাদের সন্ধান কেউই করেনি। কিন্তু হঠাৎ করে দেড়শো বছরের সময় তাদের খোঁজ করার আগ্রহ খুব একটা দোষের নয়, কারণ ভারতে পঞ্চাশ কিংবা একশো বছর পরপর বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যায়ন বা সভাসমিতির বিশেষ আগ্রহের জন্য মিডিয়াও সে আগ্রহের ধুনুচিতে ঠেসে ধুনো পুরে দেয় যাতে বাজারে বিষয়টি খায়। দেশের উৎসাহী মানুষ ‘হোয়াট নট’ নামের এক ইতিহাসকেন্দ্রিক নলেজ চ্যানেল সার্চ করে বুঝতে পেরেছে ১৯২০ সালে বিদেশ থেকে আমদানি করা ও ভারতে পত্তন হওয়া এই রাজনৈতিক দলটি বিশেষ করে বাংলা , ত্রিপুরা ও কেরালায় দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করেছিল , জাতীয় পার্টিও হয়েছিল। ওসব প্রদেশে তাদের শাসনকালে মানুষকে নিরন্তর অত্যাচার ও ভুল পদক্ষেপ তাদের মানুষের মন থেকে মুছিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে এই পার্টি নির্বংশ হয়ে যায়।

    দেশে কমিউনিস্টদের খুঁজে বের করার বিষয়টি জোরালো হলে জাতীয় সরকার তা নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। কয়েক মাসের মধ্যেই কমিটি একটি রিপোর্ট তৈরি করে ফেলে। তাতে বলা হয়,ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির কেউ বেঁচে আছে কিনা তা খুঁজে দেখা হোক , এছাড়া এই বিলুপ্ত পার্টির সব তথ্য, তত্ত্ব, তাদের প্রকাশিত বইপত্র, সংবাদপত্র সহ অন্যান্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হোক, তাতে বিদগ্ধজন ও গবেষকদের বিশেষ উপকার হবে। এসব নিয়ে একটি আর্কাইভ তৈরী হোক । যদি কোন কমিউনিস্টএর খোঁজ পাওয়া যায় তবে তাকে অতি যত্নে প্রতিপালন করা, যাতে অনুসন্ধিৎসু মানুষের উপকার হয়। শোনা যায় তারা বৈজ্ঞানিক রিগিং নামে এক ধরনের ক্ষমতা দখলের কৌশলও আবিষ্কার করেছিলেন। রাজনৈতিক নির্বাচনের সময় ওই পার্টি রিগিংএর ট্রেনিং দিত কর্মীদের। যিনি এর আবিষ্কারক তাকে’ রিগিং দেব’ উপাধি দেওয়া হয়। যারা এ ট্রেনিং দিতেন তাদের রিগিং মাস্টার নামে ডাকা হত। বিশেষ করে এবিষয়ে জানতে অনেকে উৎসাহী। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলায় ২০১১ সালে তাদের শাসন চলে যাবার আগে তারা সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম নামে দুটি এলাকায় ধান জমিতে কারখানা খুলতে গেলে বিরোধীদের বিরোধীতায় তা সম্ভব হয়নি। তাদের বিনাশের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম প্রধান কারণ। কিভাবে এই বিলুপ্ত পার্টির জনগণের কাছে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা যায় সে বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়, কয়েক একর জমি অধিগ্রহণ করে এই বিলুপ্ত পার্টির লোকজনদের( যদি থাকে) সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ , তৎকালীন জীবনযাত্রার নিদর্শন, আর্কাইভ ইত্যাদি নিয়ে সুদৃশ্য অঞ্চল গড়ে উঠুক। পাঁচিল ঘেরা এই এলাকায় ঢোকার জন্য টিকিটের ব্যবস্থা থাকবে। জায়গাটা টুরিস্ট স্পট হিসেবে পর্যটন দপ্তরের আওতায় আনার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এ বিষয়ে যারা গবেষণা করবেন তাদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের অনুমতি থাকবে।

    বিস্তর আলোচনার পর জাতীয় সরকার এ প্রকল্প অনুমোদন করে। শুরু হয়ে যায় রূপরেখা। দ্রুত গড়ে ওঠে প্রকল্পটি। হয়ে ওঠে এক সুন্দর অঞ্চল যেখানে অত্যন্ত ভালোভাবে কমিউনিস্টদের রাখার ব্যবস্থা আর্কাইভ ইত্যাদি ভালোভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। খোঁজ শুরু হয়ে যায় কমিউনিস্টদের আর আর্কাইভের জন্য বইপত্র ইত্যাদি। দুর্গোৎসব ও অন্যান্য উৎসবে প্যান্ডেলের বাইরে বসে যে শারদীয় ঢাউস বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও বই বিক্রি করা হতো , তাছাড়া ওই পার্টির একটি দৈনিক পত্রিকা যা তারা জোর করে বিক্রি করত তার কিছু সংগ্রহ করা গেলেও কমিউনিস্ট মানুষ খুঁজে পেতে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হল। অশিতিপর ও নবতিপর তিন জন শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল। এদের মধ্যে নবতিপরটি পার্টির লোকাল কমিটির সেক্রেটারিও ছিলেন, বাকি দুই অশিতিপর ছিলেন সাধারণ কর্মী। সেক্রেটারির বয়স যখন চল্লিশোর্ধ তখন পার্টি বিলুপ্ত হয়। ২০১৯ সালের আগে পার্টির ভোটদাতা ছিল প্রায় ত্রিশ শতাংশ কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থানের কারণে তারা বাংলায় একটি আসনেও জিততে পারেনি আর তারা মাত্র আট শতাংশ ভোট পায়। তারপর বিলুপ্ত হওয়ার পালা। এ সবও পাওয়া গেল ওই সময়ের কাগজপত্র মাধ্যমে। বাকি দুই অশিতিপর ছিলেন পার্টির আকসান সমিতির সদস্য। তারা বিরোধী দলদের শায়েস্তা করতে বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতেন।বোমা, পাইপগান, বন্দুক, পেট্রল বোমা তাদের প্রিয় অস্ত্র ছিল। দেশে এ পার্টি ধর্মঘট নামে কর্মনাশা এক বিশৃঙ্খলার উৎসব পালন করতো যাতে প্রতিবার বেশ কিছু হতাহত হত, বাস ট্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হত। এভাবেই তারা তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতো। ২০১১সালের ভোটে তৃণমূল কংগ্রেস নামে এক অখ্যাত আঞ্চলিক দলের হাতে হেরে তাদের শাসনহারা হতে হয়। বেশিরভাগ কমিউনিস্ট তৃণমূলে ভিড়ে যায়। এই তিন জন তা করেনি, তবে কমিউনিস্ট পার্টি আর করবো না মুচলেকা দিয়ে তারা এলাকায় থাকতে পেরেছিলেন।

    সংরক্ষণ কমিটির তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্পটি রূপায়ণ করতে সময় লাগলো এক বছর। স্থির হলো বিলুপ্তপার্টির দেড়শো বছর উপলক্ষে এটির উদ্বোধন হবে। নির্দিষ্ট দিনে মহা ধুমধামে উদ্বোধন করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রকল্পটিকে সাধুবাদ দিয়ে পর্যটন দপ্তরের হাতে তুলে দিলেন। বিলুপ্ত পার্টির তিন জনকে সন্মানিত করে এখানে বসবাসের জন্য তাদের হাতে চাবি তুলে দেওয়া দেন প্রধানমন্ত্রী। সমস্ত প্রকল্পটি ঘুরে দেখে তিনি সাধুবাদ জানান ও এই বিলুপ্ত পার্টির আরো অনেক কিছু সংগ্রহ করার উপদেশ দেন। অনুষ্ঠান শেষে ওই তিন কমিউনিস্ট নিয়ে পড়লো মিডিয়া। উপস্থিত মিডিয়াগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে এক তরুণ গবেষককে সঞ্চালনার ভার দেওয়া হল। সঞ্চালক তাদেরকে পার্টির বিলুপ্ত হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে নবতিপর ভূতপূর্ব সেক্রেটারিটি বলে উঠলেন – আরে মশাই , সব শালা হারামি পাবলিকের দোষ। মাথামোটারা আমাদের ভোট না দিয়ে পার্টিটাকে শেষ করে দিয়েছে। আজও ভাবি কি মজায় ছিলাম। পাবলিক আমার কাছে এসে কাজ তোলার জন্য কত কি দিত!ব্যবসাদারগুলো ছিল আমার আসল দোস্ত। ওরা দাম বাড়িয়ে টাকা তুলতো আর আমি কাটমানি পেতাম। সত্যি কি মজায় ছিলাম! শালা পার্টি ১৯৭৭এ বাংলায় শাসন পাবার আগে চেয়ে চেয়ে বিড়ি খেতাম। তারপর আমার এলাকার কমিটির সেক্রেটারি হয়ে বিদেশী সিগারেট আর স্কচ ছাড়া ছুঁতাম না। আ!এখনো সে সব মুখে লেগে আছে। বিরোধীরা শাসনে আসতেই আমাদের বাড়ি , পার্টি অফিস ভাঙচুর করলো ওরা। পরে আর পার্টি করবো না মুচলেকা দিয়ে প্রাণে বাঁচি। এখনো ওখানেই বাস করি। কোথায় যাব, পার্টিটাই উঠে গেল!

    আপনারা পার্টিটা আবার গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন?- সঞ্চালকের প্রশ্ন
    – কি করি বলুন তো, কমরেডরা তৃণমূলে ভিড়ে গেল।
    – কমরেড কাদের বলছেন ?
    – কমরেড বলতাম আমাদের নেতা কর্মীদের। মানে বলতে পারবো না ।
    – আপনি পার্টির বই পত্রপত্রিকা পড়তেন না?
    – সময় কোথায় তখন ? টাকা লুটবো না পড়বো। তাছাড়া পড়াশোনার দিকে কোনদিন আগ্রহও ছিল না।
    – তার মানে নীতি আদর্শ নিয়ে আপনার কোন মাথাব্যথা ছিল না। আপনি আবার নেতা ছিলেন!
    – তা ছিলাম। কিন্তু পয়সা ছাড়া কোথাও মতি ছিল না । সত্যি বলছি, এ পার্টি করলে বুঝতেন বিনা পরিশ্রমে, বিনা মূলধনে কিভাবে টাকা রোজগার করা যায়।

    সঞ্চালক কার্ল মার্কসের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পড়েছেন , কিন্তু তার সঙ্গে এ মানুষটার কথা মেলাতে পারছেন না। তিনি বুঝলেন বিলুপ্ত হওয়ার জন্য অনেক দোষের প্রয়োজন। সে দোষ ধীরে ধীর কুরেখায়,তারপর একদিন দোষী সকলের মন থেকে মুছে যায়।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here