চীনে ভালো নেই তুরস্কের উইঘুর মুসলমানেরা, দাবি একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের

    0

    Last Updated on

    আশুতোষ মন্ডল

    বাঙালির একাংশের মধ্যে এখনও একটি স্লোগান খুব জনপ্রিয়,যা শুনলে যাদের হৃদযন্ত্র এখনও একটু জোরেই স্পন্দিত হয় তা হল , “চীনের চেয়ারম্যন , আমাদের চেয়ারম্যান” । এ রাজ্যের বহু লোকের অখনও সেই চীন-প্রীতি আছে । আবার সেই মানুষেরাই এ দেশের কেন্দ্রীয় সরকার কতটা হিন্দুত্ববাদী, সাম্প্রদায়িক,এ দেশে সংখ্যালঘু মুসলিম মানুষেরা কত খারাপ রয়েছেন ,তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সোচ্চার হন | তাঁদের অবগতির জন্যই চীনের উপরে খানিকটা আলোকপাতের চেষ্টা এই প্রতিবেদন | গত বছর রাষ্ট্রসংঘের একটি বিশেষ মানবাধিকার কমিটি সই চীন ঘুরে এসে একটি রিপোর্ট পেশ করেছে | কিন্তু কেন গিয়েছিলেন তঁরা ? কোন মানবাধিকার লঙ্ঘচ হচ্ছে সেখানে ? তাঁরা গিয়েছিলে চীন দেশে বসবাসরত উইঘুর মুসলমানদের প্রতি বিগত কয়েক বছর ধরে কেমন ব্যাবহার করছেন সেখানকার প্রশাসকরা |

    চীনের সর্ববৃহৎ প্রদেশটির নাম – শিন্ জিয়াং । এই প্রদেশটির উত্তরে মঙ্গোলিয়া, পশ্চিমে কাজাকিস্তান ও কিরঘিজস্তান এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান। এই বৃহৎ প্রদেশে বসবাসরত মুসলমানরা তুরস্ক থেকে আগত। কয়েক শত বত্সর আগে এই লোক গুলো তুরস্ক থেকে এসে বসবাস শুরু করে । ভারতেও কয়েকশ বছর আগে তুরস্ক থেকে মুসলমানরা এসে বসবাস শুরু করেছিল । এই উইঘুর মুসলমানের সংখ্যা এক কোটি দশ লক্ষ।

    কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন দাবী করছে, চিনে শিন্ জিয়াং প্রদেশে মুসলমানদের প্রতি অকথ্য অত্যাচার করছে সেই দেশের সরকার । চীন সরকার সেদেশে মসজিদে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে ভয়ংকর কড়া বিধি নিষেধ আরোপ করেছে । চিনে মাদ্রাসা শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে । ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রচন্ড কড়া নিয়ম কানুন লাগু করা হয়েছে।

    রমজান মাসে রোজা রাখবার ধর্মীয় স্বাধীনতা চীনের মুসলমানদের আর নেই। রোজা রাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
    শেষ এখানেই নয়, উইঘুর মুসলমানদের তাঁদের ইসলাম ধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চীন সরকার। একদিকে দমন-পীড়ন জারি আছে, অন্য দিকে হাজার হাজার উইঘুর মুসলমানদের বন্দী শিবিরে রেখে উত্পীড়নের মাধ্যমে মগজ ধোলাই করছে চীন সরকার।

    সম্প্রতি বি.বি.সি.র এক অন্তরতদন্তে উঠে এসেছে যে, চীন সরকার সেদেশের উইঘুর মুসলমানদের নতুন প্রজন্মকে ইসলামী রীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখবার জন্য পিতা মাতা থেকে কৌশলে শিশুদের পৃথক করে রাখবার ব্যাবস্থা করছে। বি.বি.সি.র তদন্তে দেখা যাচ্ছে যে, উইঘুরদের যারা জেলে কিম্বা ক্যাম্পে আছে, তাদের বাচ্চা কাচ্চারা সরকারের হাতে পড়ে ইসলাম ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চীন সরকার প্রচুর সংখ্যায় স্কুল ও বোর্ডিং নির্মান করেছে উইঘুর মুসলমানের বাচ্চাদের রাখবার জন্য। মুসলমান সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে শিশুদের এই সব বোর্ডিংএ রেখে বড় করা হচ্ছে। এর ফলে নতুন প্রজন্ম ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বার আশঙ্কা করছেন উইঘুর মুসলমানরা ।

    চীন সরকার দাবী করছেন, আতঙ্কবাদকে নির্মূল করার জন্য, উইঘুরদের দেশের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে, এবং সমস্ত উইঘুরদের সমগ্র দেশের প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে করতে এই ব্যাবস্থা নিয়েছে চীন সরকার। আর এজন্য তাদেরকেও কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতেও পাঠানো হচ্ছে ।

    উইঘুর নেতৃবৃন্দ আরও দাবী করছেন, নিজেদের ধর্ম বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে নামাজ পড়া, হিজাব পরা, বা তুরস্কের কারও সহিত যোগাযোগ রাখার জন্য বহু উইঘুরকে আটক করা হয়েছে । এ পর্যন্ত দশ লক্ষের অধিক উইঘুরকে আটক করা হয়েছে । আর তাদের ঘরের শিশুদের পাঠানো হয়েছে সরকার নিয়ন্ত্রিত বোর্ডিং-এ, যেগুলো প্রকৃত পক্ষে “কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প” বলে বলা হচ্ছে । চীন সাংস্কৃতিক ভাবে উইঘুরদের “রি-ইঞ্জিনিয়ারিং” করছে বলে বলা হচ্ছে। চীন সরকারের এই আদেশের ফলে ভীত হয়ে ইতিমধ্যে বহু উইঘুর চীন ছেড়ে তুরস্কে চলে গেছে ।

    আগস্ট, ২০১৮ সালে রাষ্ট্র সংঘের একটি বিশেষ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, দশ লক্ষের মতো উইঘুর মুসলমান মানুষদের শিন্ জিয়াং অঞ্চলের কয়েকটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আটক করে রাখা হয়েছে । মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে যে, ঐ সকল শিবিরে উইঘুরদের নতুন করে নতুন করে শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে ।

    যদিও বেজিং আগাগোড়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে । রাষ্ট্র সংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সেই কমিটি ২০১৮ সালে জানতে পারে, চীন সরকার উইঘুরদের স্বায়ত্ব শাসিত এলাকাকে একটা বন্দী শিবিরে পরিণত করেছে । আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে যে, শিন্ জিয়াং প্রদেশের উইঘুরদের ২৬টি স্পর্শ কাতর মুসলিম রাষ্ট্রের লোকজনের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক আছে, তাদের আটক করে ঐ সকল ক্যাম্পে বন্দী করে রাখা হচ্ছে । ক্যাম্পগুলিতে উইঘুরদের নিজস্ব ভাষার বদলে মান্দারিন ভাষা শিখতে বাধ্য করা হচ্ছে । যারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিদেশের কোন লোকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে তাদেরকেও নিশানায় রেখেছে চীন সরকার ।

    শিবিরগুলোতে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যাতে উইঘুররা চীনের চেয়ার ম্যান শি জিনপিং এর প্রতি অনুগত থাকে । তারা যাতে নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করার অঙ্গীকার করে, তার জন্য শিবিরগুলিতে প্রচন্ড চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ।

    কয়েকদিন আগে প্রকাশিত রাষ্ট্রসংঘের ভারত ও এদেশে সংখ্যালঘুদের নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে যারা সোচ্চার হয়েছিলেন ,তাঁরা এই প্রতিবেদনের পর ঠিক সেবাবেই সোচ্চার হবেন তো পতাঁদের চেয়ারম্যানের এহেন কাজের বিরুদ্ধে ? প্রশ্ন এই প্রতিবেদকের |

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here