চের্নোবিল: কয়েকটি ভুল ও কয়েক প্রজন্মকে দেওয়া তার মাসুল

    0

    Last Updated on

    চের্নোবিল, নামটা গড়পড়তা বাঙালির অনেকেরই অজানা । অথচ এ যাবৎকালীন বিশ্বের ইতিহাসে গুটি কয়েক পারমাণবিক দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি সংঘটিত হয় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউক্রেনিয়ান এসএসআরের একেবারে উত্তরের প্রিপিয়াত শহরের এই পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই ।

    সত্তরের দশক ক্রুশ্চেভ জমানা অতিক্রান্ত হয়েছে । কিছুদিন হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আড়াই দশক পার হয়ে গেছে । সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘আয়রন ম্যান’ স্ট্যালিন এবং তারপর নিকিতা ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে নাৎসি আক্রমণের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে সাবেক রাশিয়া । এদিকে দ্বিমুখী বিশ্বের মেরুকরণ প্রায় সম্পূর্ণ । একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্লক তো অন্যদিকে সোভিয়েতের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লক । পু্ঁজিবাদী দুনিয়ার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে ‘সোভিয়েত নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম’। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭০ সালেই অধুনা ইউক্রেনের চের্নোবিল শহরের একটু দূরে প্রিপিয়াত শহরে প্রথম কাজকর্ম শুরু হয় এই পরমাণু প্রকল্পের, যার পোষাকি নাম স্থির হয় ‘ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যাণ্ট’। কাজকর্মের অংশ হিসেবে কর্মীদের বাসস্থান হিসেবে বাড়িঘর তৈরির পর ১৯৭৭ সালে প্রথম নিউক্লিয়ার রিয়্যাকটরটি স্থাপিত হয়| তারপর গোটা ইউক্রেনের মোট বিদ্যুতের দশ শতাংশ সরবরাহের লক্ষে পর পর আরও ৩ টি রিয়্যাকটর বসানো হয় ১৯৮৩ সালের মধ্যে । আমাদের আলোচনার বিষয় তার মধ্যে শেষ এবং চতুর্থ রিয়্যাকটরটি নিয়েই যেখানে ১৯৮৬ সালের ২৬য়ে এপ্রিল দুর্ঘটনা ঘটে।

    যে কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ হওয়ার আগে প্রথা মেনে রিয়্যকটরকে পাশ করতে হয় অনেকগুলি ‘সেফটি টেষ্টে’ । কাকতলীয়ভাবে চতুর্থ রিয়্যাকটরটি পর পর তিন বার সেই সেফটি টেষ্টে ব্যর্থ হয় । তারপর এল সেই কালো দিন অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের ২৬শে এপ্রিল । কোনো এক অজানা কারণে সেদিন সকালে হওয়ার কথা পরীক্ষা বিলম্ব হয় । তার ফলে সেফটি টেষ্ট প্রায় ১০ ঘণ্টা পিছিয়ে রাতে সংঘটিত হবে বলে স্থির হয় । এদিকে রাতের শিফ্টের বেশিরভাগই কর্মীরা ঘটনাচক্রে ছিলেন আনকোরা এবং টেষ্টের সুপারভাইজার নিজের ইচ্ছেমত টেষ্ট করতে গিয়ে একের পর এক ভুল করে ফেলেন ।

    ঘটনার পরে তদন্তে জানা যায় চের্নোবিলের সেসময় ব্যবহৃত বিশেষ আরবিএমকে রিয়্যাকটরের কোর অঞ্চলে ব্যবহৃত কন্ট্রোল রডের প্রযুক্তিত অন্যান্য দেশে উন্নতি হলেও, সোভিয়েত ইউনিয়নে ব্যবহৃত রিয়্যাকটরগুলি চলছিল পুরোনো প্রযুক্তিতেই । ফলে ‘ইমারজেন্সি বাটন’ হিসেবে ব্যবহৃত ‘এ জেড-৫’ বোতাম টিপে বন্ধ করার ক্ষেত্রেও সেদিন চের্নোবিলের কর্মীরা ব্যর্থ হন । ফলে যা হওয়ার তাই হয় ।

    পারমাণবিক বিদ্যুৎ বানানোর নিয়ন্ত্রিত ‘চেইন রিয়্যাকশন’ করার বদলে রিয়্যাকটরটি পরিণত হয় একটা আস্ত পারমাণবিক বোমায় যার ফলে ৩২০০ মেগাওয়াট তাপ উৎপাদন করতে সক্ষম রিয়্যাকটর ৩৩,০০০ মেগাওয়াট তাপ তৈরি করে ফেলে । বিস্ফোরণে উড়ে যায় গোটা রিয়্যকটরই ।

    ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় গোটা অঞ্চল জুড়ে। তৎক্ষণাৎ কয়েকশো মানুষ যারা উদ্ধারকার্যে হাত লাগিয়েছিলেন তারা কিছুদিনের মধ্যেই বিকিরণের কারণে ক্যান্সারে মারা যান । পরবর্তীকালে আরো কয়েক হাজার মানুষ মারা যান একই রোগে ভুগে । একটা বিশাল অঞ্চল জুড়ে রুশ কর্তৃপক্ষ সমস্ত বসবাসকারী মানুষদের সরিয়ে ফেলেন । শোনা যায়, গোটা ইউক্রেন আর বেলারুশ জুড়ে ক্যান্সারের হার ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায় তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে । এভাবেই চের্নোবিল আজও মনে পড়ায় দুর্ঘটনার ভয়াবহতাকে ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here