নালন্দা ধ্বংসকারী,বঙ্গবিজয়ী বখতিয়ার,কামরূপে ব্যর্থ কেন

    0
    bakhtiyar khilji

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    ইখতিয়ার উদ্দিন মহম্মদ বখতিয়ার খিলজি। মহম্মদ ঘোরীর এই তুর্কি সৈন্যাধ‍্যক্ষকে আমরা সাধারণভাবে বখতিয়ার খিলজি বলেই জানি। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দের গোঁড়ার দিকে উদন্তপুর বিহার জয় করে ধ্বংস করেন বখতিয়ার। তার হাতেই ধ্বংস হয় নালন্দা বিশ্ববিদ‍্যালয়। কিন্তু ১০ হাজার শিক্ষক-ছাত্র মিলে নালন্দায় বখতিয়ারের আক্রমণকে কেন রুখে দেওয়া গেল না, তা আজও রীতিমতো বিষ্ময়ের! প্রতিরোধ গড়ে তুললে কি সসৈন্য বখতিয়ারের শেষ প্রহর হতো না নালন্দাভূমি ? ঠিক যেমনটা হয়েছিল বখতিয়ারের তিব্বত অভিযানে। কী ঘটেছিল, সে কথায় আসছি।…
    ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে উদন্তপুর বিহার জয়ের পর ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সেনরাজ লক্ষ্মণসেনের হাত থেকে নদীয়া জয়, তারপর ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে গৌড় বা লক্ষ্মণাবতী জয় করে ওই বছরই রাজধানী সরিয়ে নিয়ে এলেন দেবকোটে। ততদিনে শুনেছেন, তিব্বতে নাকি প্রচুর সোনাদানা রয়েছে। আর সেকথা যাচাই না করেই ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ ঠা জানুয়ারি রাজধানী দেবকোট থেকে বের হলেন তিব্বত অভিযানে।
    সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার অশ্বারোহী বাহিনী। তিব্বত ও লক্ষ্মণাবতীর মাঝে যে পর্বতমালা, সেখানে তিন জাতের মানুষের বাস ছিল—কোচ, মেচ ও থারু। এরমধ্যে কোচ ও মেচ উপজাতির সর্দারকে বখতিয়ার দীক্ষিত করলেন ইসলামধর্মে। তার নাম হলো, সর্দার আলী মেচ। ধর্মকে প্রথম থেকেই ব‍্যবহার করেছিলেন বখতিয়ার। ধর্মান্তরিত সর্দার আলী মেচ হলো বখতিয়ারের তিব্বত অভিযানের পথ-প্রদর্শক।
    বখতিয়ার বাহিনী পৌঁছালো বর্ধনকোট। বর্তমান নাম বর্ধনকুঠি। স্থানটির অবস্থান লক্ষ্মণাবতীর পূর্বদিকে বগুড়া জেলার সীমানার মধ্যে রংপুরে।
    সামনে বয়ে চলেছে বদায়ূনীর “মন্তখব-উৎ-তওয়ারিখ” অনুসারে “ব্রহ্মণপুত্র” অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্র নদ। দশদিন চলার পর এখানে ব্রহ্মপুত্রের ধারে পৌঁছালেন। এখানে নদীর ওপর “সিলহাকোপুল” ( যার অর্থ –পাথরের পুল ) নামে প্রায় ২১ টি খিলান দেওয়া একটি পাথরের সেতু ছিল। স্থানটি গৌহাটি শহরের পূর্ব প্রান্তের উল্টোদিকে ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীরে কানাই-বড়শী গ্রামের কাছে। ( তথ‍্যসূত্র : I.H.Q, 1933, pp. 49-62).

    আরও পড়ুন:তন্ত্রক্ষেত্র তন্ত্রেশ্বর : পঞ্চপাণ্ডবের স্মৃতি আঁকড়ে ইতিহাসের এক বধ‍্যভূমির ঠিকানা ঝাড়খণ্ড


    বখতিয়ার বাহিনী সেতু পেরিয়ে ওপারে চলে গেল। বখতিয়ার একজন তুর্কি ও একজন খিলজিকে তাদের কাছে বেশকিছু সৈন্য রেখে গেলেন সেতুর পাহারায়। ফিরে না আসা পর্যন্ত তারা সেতু পাহারা দেবে।
    এদিকে সেতু পেরিয়ে গিরিপথের মাঝে ১৫ দিন হেঁটে ১৬ দিনের মাথায় বখতিয়ার বাহিনী পৌঁছালো সমতলভূমির একটি জনবহুল এলাকার এক গ্রামে। গ্রামটি ভূটান রাজ‍্যের অন্তর্গত। চারদিকে শস্যক্ষেত্র। মাঝে একটি দুর্গ।
    বখতিয়ার বাহিনী আক্রমণ করলো এই দুর্গ। অমনি সঙ্গে সঙ্গে দুর্গের ভেতর ও বাইরে শুরু হলো প্রবল প্রতিরোধ। চারপাশের উন্মুক্ত জনতা ছুটে এলো বাঁশের তৈরি বর্শা ও ঢাল হাতে। মাথায় তাদের কাঁচা রেশমকে শক্ত করে একসঙ্গে বেঁধে সেলাই করে তৈরি শিরস্ত্রাণ। কারো হাতে লম্বা ধনুক।
    শুরু হলো দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই। কিছু স্থানীয় মানুষ বন্দী হলো তুর্কিদের হাতে। রাতের বেলায় তাদের সামনে আনা হলো এবং তাদের কাছ থেকে বখতিয়ার বাহিনী জানতে পারলো, এখান থেকে ৫ ফার্সাং দূরে একটি শহর রয়েছে, নাম–“কারামবাত্তাম।” ড: নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, আধুনিক ভূটানের কারুগোম্পা শহর।
    কারামবাত্তাম ছিল পাথরের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বাসিন্দারা ছিল ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ। শহরটি ছিল অগ্নি উপাসক সর্দারদের দখলে। শহরের বাজারে রোজ ১,৫০০ ঘোড়া কেনাবেচা হতো। কামরূপ ও তিব্বতের মধ্যে ৩৫ টি গিরিপথ দিয়ে কারামবাত্তাম থেকে লক্ষ্মণাবতীতে “তানকানাহ্” ঘোড়া আসতো।
    খবর পেয়ে ইতিমধ্যেই কারামবাত্তামে তীর-ধনুক হাতে তৈরি পঞ্চাশ হাজার সৈন্য।
    আগের দিনের যুদ্ধে ইতিমধ্যেই বখতিয়ার বাহিনীর অনেকেই নিহত, আহত, পথশ্রান্ত। এই অবস্থায় আমীরদের সঙ্গে পরামর্শ করে বখতিয়ার ঠিক করলেন, ফিরে যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত। কারণ, তাহলে ভালোরকম প্রস্তুতি নিয়ে ফের অভিযানে আসা যাবে।

    আরও পড়ুন:শাঁখ বাজান, হার্ট অ্যাটাক এড়ান


    কিন্তু ফেরার পথেই অপেক্ষা করছিল বিপদ! প্রথমে বখতিয়ারের সঙ্গে বন্ধুত্বের অছিলায় সামনাসামনি না লড়ে কামরূপরাজ গ্রহণ করলেন “পোড়া মাটি নীতি।”
    আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো বখতিয়ারের ফেরার পথের দু”পাশের সমস্ত শস্যক্ষেত্র থেকে ডাঙার ঘাস পর্যন্ত।
    উপত্যকা ও গিরিপথের বাসিন্দারা সরে গিয়েছিল আগেই। ফলে ১৫ দিনের মধ্যে এক সের খাদ‍্য পর্যন্ত জুটলো না বখতিয়ার বাহিনীর। ঘোড়াগুলিও পেল না একটুকরো ঘাস‌। এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত নিজেদের ঘোড়াগুলোকেই মেরে খেতে হলো তাদের।
    এমনকি, যে দু’জন আমীরকে সেতু পাহারায় রেখে গিয়েছিলেন বখতিয়ার, তারা একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করে পাহারা ছেড়ে চলে যায়। এই সুযোগে কামরূপের লোকজন এসে সেতুটি ধ্বংস করে দেয়।
    এরপর সসৈন‍্যে বখতিয়ার ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এসে যা দেখলেন, তা তার কল্পনার অতীত‌।
    সেতুর দুটি খিলান ধ্বংস‌। পারাপারের পথ নেই। একটাও নৌকো দেখা গেল না কাছাকাছি কোথাও‌। হতাশ হলেন বখতিয়ার। খোঁজ করতে লাগলেন নৌকোর।
    কাছেই ছিল একটি উঁচু মন্দির। মন্দিরের ভেতরে অনেকগুলো সোনা-রূপোর মূর্তি এবং সেইসঙ্গে দু’হাজার মিসকালের বেশি ওজনের একটি বড়ো সোনার বিগ্রহ। বখতিয়ার বাহিনীর লোকজন সেই মন্দিরে আশ্রয় নিয়ে ভেলা তৈরির জন্য কাঠ ও দড়ির খোঁজ করতে লাগলো।
    এদিকে খবর পেয়ে কামরূপরাজ তাঁর রাজ‍্যের সমস্ত হিন্দু প্রজাদের দলে দলে সেখানে আসার আদেশ দিলেন‌। সেইমতো কামরূপের সাধারণ মানুষ দলে দলে সেখানে হাজির হয়ে বাঁশের বর্শা পুঁতে মন্দিরের চারপাশ ঘিরে ফেললো।

    আরও পড়ুন:সম্রাট আকবর, রামমুদ্রা ও বাংলায় রাম সংস্কৃতি


    অবশেষে উপায় না দেখে সেখান থেকে বেরোনোর জন্য যুদ্ধ শুরু করলো বখতিয়ার বাহিনী। কোনোরকমে একটা পথ করে তারা সবাই ছুটলো ব্রহ্মপুত্রের দিকে।
    পিছু ধাওয়া করলো কামরূপের জনতা। নদীপাড়ের দখল নিল তারা।
    বখতিয়ারের একজন সৈন্য বহু কষ্টে একটি ঘোড়াকে জলের গভীরতা দেখতে নামালো।
    ঘোড়া জলে নামতেই চিৎকার উঠলো, পাওয়া গেছে! পারাপারের রাস্তা পাওয়া গেছে!
    বলতে বলতে ব্রহ্মপুত্রের জলে ঝাঁপ দিল বখতিয়ার বাহিনী।
    নদীর মাঝখানে এসে দেখলো, অনেক গভীর জল! ডুবে মারা গেল বখতিয়ার বাহিনী।
    নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল কামরূপের জনতা।
    শেষে শ’খানেক সৈন্য নিয়ে কোনোরকমে নদী পেরোলেন বখতিয়ার। রীতিমতো অসুস্থ হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে অতি কষ্টে রাজধানী দেবকোটে পৌঁছলেন তিনি।
    কিন্তু তখন তার চরম দুর্দিন। ঘোড়ায় চড়ে বাইরে বেরোলেই নিহত খিলজি সর্দারদের শিশু ও বিধবা স্ত্রীরা বখতিয়ারকে দেখলেই গালাগালি করে, অভিশাপ দেয়।
    বখতিয়ার আফশোষ করে বলেন, সুলতান গাজী মুইজউদ্দিন সামের ( মহম্মদ ঘোরী ) কি কোনো দুর্ভাগ্য দেখা দিয়েছে, যার জন্য আমার ভাগ্য আমাকে ছেড়ে গেল ?
    বাস্তবেও তাই ঘটেছিল। ওই সময়েই ৬০২ হিজরার ১ লা শাবান অর্থাৎ ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ই মার্চ নিহত হোন সিহাবউদ্দিন মহম্মদ ঘোরী।
    ক্রমশ মানসিক চাপে আরও অসুস্থ হয়ে শেষে শয্যাশায়ী হলেন বখতিয়ার।
    খবর পেয়ে তার স্বজাতীয় সর্দার এবং নারকোটি অঞ্চলের শাসক আলী মর্দান বখতিয়ারকে দেখতে দেবকোটে এলেন। কিন্তু বিগত তিন দিন ধরে বখতিয়ারের ঘরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
    আলী মর্দান কোনোরকমে সুযোগ করে বখতিয়ারের ঘরে ঢুকে তার বুকের কাপড় সরিয়ে সেখানে বসিয়ে দিলেন ছোরা।
    মৃত্যু হলো বখতিয়ারের। সালটা ১২০৬। মহম্মদ ঘোরী ও বখতিয়ার দুই প্রভু-ভৃত্য এক বছরেই চলে গেলেন। যে বখতিয়ার মাত্র দুশো অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ওদন্তপুরী বৌদ্ধ বিহার দখল করছিলেন, সেই বখতিয়ার পঞ্চাশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে তিব্বত অভিযানে গিয়ে সর্বস্ব খোয়ালেন শুধুমাত্র সেখানকার রাজশক্তির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের রুখে দাঁড়ানোর কারণেই।
    আসামের গৌহাটি থেকে কিছুটা দূরে ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর তীরে কানাই-বড়শী গ্রামের একটি পাহাড়ের গায়ে একটি লিপি বখতিয়ারের তিব্বত অভিযানের পরাজয়ের সাক্ষ‍্য দিচ্ছে :
    “শাকে তুরগযুগ্মেশে মধুমাস ত্রয়োদশে
    কামরূপং সমাগত‍্য তুরষ্কা: ক্ষয়মায়ষু।”
    অর্থাৎ ১১২৭ শকাব্দের ১৩ ই চৈত্র , ইংরেজি ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের ৭ ই মার্চ কামরূপে আসা তুর্কি বাহিনী বিধ্বস্ত হয়।…

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here