বৃষ্টি-কথা

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    আমাদের দেশে তো বটেই, বিদেশেও বৃষ্টি নিয়ে বহু প্রচলিত সংস্কার রয়েছে। যেমন, আমাদের বাংলায় বৃষ্টির জন্য ব‍্যাঙের বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ আছে। কোথাও আবার শিবঠাকুরকে জল ঢেলে ডোবানো হয়। প্রায় বছর তিরিশ আগে বীরভূমের দুবরাজপুরে ( থানা : দুবরাজপুর ) বৃষ্টির জন্য অন্ত‍্যজ বাউরী সম্প্রদায়ের মহিলারা রাতের বেলায় নগ্ন হয়ে দল বেঁধে কাঁদতে কাঁদতে “মোতেনামা” অনুষ্ঠান করেছিল। ওই সময় পাড়ার পুরুষদের বেরোনো ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি কোনো বখাটে ছেলে লুকিয়ে এ দৃশ্য দেখার চেষ্টা করতো, তবে মহিলার দল অশ্রাব্য গালাগালি দিয়ে তার অন্নপ্রাশনের ভাত বমি করিয়ে ছাড়তো। তাদের কান্নার আবেদনে ছিল কুমারী মায়ের সন্তান প্রসবের যন্ত্রণা। এখন আর এই অনুষ্ঠান হয় না। তবে বীরভূমের শৈবক্ষেত্র বক্রেশ্বরে দেবাদিদেব মহাদেবকে এলাকার মানুষ , বিশেষ করে চাষিরা বৃষ্টির জন্য কলসি কলসি জল ঢেলে তাকে ডোবান আজও।
    বাংলার বাইরে গুজরাটে অন্ত‍্যজ শ্রেণির বালিকা ও বয়স্কা মহিলারা শাকসবজি ভর্তি মাটির ঢিপি নিয়ে লোকের বাড়ি বাড়ি যায় বৃষ্টির আহ্বান নিয়ে এবং তখন বাড়ির মহিলারা জল ঢেলে তাদের গা ভিজিয়ে দেয়।
    আবার কর্ণাটকে পায়রাকে জলে ভিজিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
    মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় আবার বেশকিছু বাচ্চা ছেলে উলঙ্গ হয়ে একটি পাত্রে জ‍্যান্ত ব‍্যাঙ ভরে লোকের বাড়ি বাড়ি ঘোরে। সে সময় ওইসব বাড়ির লোকজন তাদের গায়ে জল ঢেলে ভিজিয়ে দেয়।
    অন্যদিকে, দেশের বাইরে সুদূর অ্যাবিসিনিয়ার ইঘিউ (Egghiou) সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রতি বছর জানুয়ারিতে গ্রামে গ্রামে রক্তক্ষয়ী বিবাদে লিপ্ত হয়। এক সপ্তাহ চলে এই লড়াই। এর ফলে বৃষ্টি নামে বলে তাদের বিশ্বাস।
    আবার অষ্ট্রেলিয়ার ডাইরি (Dieri) সম্প্রদায়ের মানুষজন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে অনাহার, অর্ধাহার ও খরাপীড়িত অবস্থার কথা তাদের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্য বলে এবং সেই সঙ্গে এই দুরবস্থা দূর করতে বৃষ্টি দেবার জন্য করুণ আর্তি জানায়।
    চিন দেশে বৃষ্টির জন্য কাগজের তৈরি একটি বিশালাকায় ড্রাগনকে শোভাযাত্রা করে রাস্তায় রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর সেটিকে ছিঁড়ে ফেলা হয়।
    দক্ষিণ রাশিয়ার কুরস্ (Kursk) প্রদেশে বৃষ্টির জন্য সেখানকার মেয়েরা কোনো এক পথিককে অপহরণ করে নদীতে নিয়ে গিয়ে চুবিয়ে দেয়।
    জাপানের উঁচু জায়গায় বৃষ্টির জন্য গাঁয়ের একদল লোক শোভাযাত্রা করে একটি পাহাড়ের কাছে যায়। একটি কালো কুকুর নিয়ে সবার আগে যান পুরোহিত। তারপর নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পাথর দিয়ে কুকুরটির বাঁধন কেটে দেওয়া হয়। এরপর সকলে মিলে তিরধনুক বা বন্দুক দিয়ে কুকুরটিকে মেরে ফেলে চিৎকার করে বৃষ্টিদেবতার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানায়, যাতে বৃষ্টি নেমে কুকুরের রক্তমাখা অঞ্চলটি ধুয়ে পবিত্র হয়ে ওঠে।
    আবার সুমাত্রায় বৃষ্টির জন্য সেখানকার গ্রামের সমস্ত মহিলা স্বল্প বসনা হয়ে নদীতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে জল ছোঁড়াছুড়ির খেলায় মাতে। তারপর একটা কালো বিড়ালকে জলে ফেলে কিছুক্ষণ সাঁতার কাটিয়ে আবার তাকে ডাঙায় তুলে দেওয়া হয়।
    এ তো গেল বৃষ্টি আনার জন্য অনুষ্ঠানের কথা।
    এবার বৃষ্টি বন্ধের জন্য কী করা হয়, সে সম্পর্কে দু’চার কথা বলি।
    দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত রীতি আছে, কোনো মহিলা বিবসনা হয়ে অতি বৃষ্টির মধ্যে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে ঘুরলে বৃষ্টি বন্ধ হয় বলে বিশ্বাস।
    আবার মহারাষ্ট্রের শোলাপুরে প্রচলিত রীতি আছে, কোনো পুরুষ বৃষ্টির মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিলে বৃষ্টি নাকি থামে।
    কর্ণাটকে বৃষ্টি বন্ধের জন্য বৃষ্টির মধ্যে আকাশের দিকে একটি জ্বলন্ত মশাল ছুঁড়ে দেওয়া হয়। জলের বিপরীত আগুন, তাই এখানে লৌকিক সংস্কারে রয়েছে আগুনের ব‍্যবহার।
    ভিল জাতির লোকেরা আবার বৃষ্টি বন্ধের জন্য একটি পুতুলকে বেঁধে বৃষ্টির মধ্যে ফেলে রাখে।
    নিউ ব্রিটেনের সালকা (Sulka) সম্প্রদায়ের লোকেরা বৃষ্টি থামাতে আগুনে পাথর গরম করে সেটিকে বৃষ্টির মধ্যে ছুঁড়ে দেয়।
    আবার ইংল্যাণ্ডে শিশুর দল বৃষ্টি বন্ধ করতে সুর করে বলে :
    “Rain, Rain go away,
    Come again another day.”

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here