যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের কন্যা বিমলা ও বৌঠাকুরাণীর হাটের কথা

    0
    Bimala daughter of Jessore Raj Pratapaditya and About the Bauthakurani Hat

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    ১৬০২ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা।
    যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের কন্যা বিমলার সঙ্গে চন্দ্রদ্বীপের রাজা রামচন্দ্রের বিয়ে। চন্দ্রদ্বীপের রাজধানী মাধবপাশা যশোর থেকে দূরের জলপথ।
    নৌকোয় করে রক্ষী, বরযাত্রীসহ এসেছেন বর রামচন্দ্র। সঙ্গে রক্ষীদের সর্দার রামমোহন মল্ল। বরযাত্রীদের মধ্যে রয়েছে এক ভাঁড়, নাম—রামাই চুঙ্গী। সে যথারীতি সবার সঙ্গে রঙ্গ-তামাশা করছে।
    রামাইয়ের তামাশা কিন্তু মাত্রা ছাড়ালো। গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে ঢুকে গেল মেয়েদের অন্দরমহলে। অসভ্যতার একশেষ করে ছাড়লো সবাইকে। মহারাণীও চিনতে পারলেন না ভাঁড়কে। পরে যখন জানলেন, এসব ভাঁড়ের কাণ্ড, বিষয়টা রাতেই জানালেন প্রতাপাদিত্যকে।
    প্রতাপাদিত্য ভাবলেন, জামাই রামচন্দ্রের সায় ছাড়া ভাঁড়ের পক্ষে এ কাজ করা অসম্ভব। তিনি হুকুম দিলেন, রামচন্দ্র ও ভাঁড়—দু’জনেরই গর্দান চাই।
    তোলপাড় হয়ে গেল অন্দরমহল। মহারাণীও এতটা আশা করেননি। কিন্তু প্রতাপাদিত্য তাঁর হুকুম কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নিলেন না। তবুও রামচন্দ্র ভয়ে অস্থির। অগত্যা যুবরাজ উদয়াদিত‍্য গোপনে রামচন্দ্রের ফেরার জন্য নৌকোর ব‍্যবস্থা করে দিলেন ।

    আরো পড়ুন :মারাঠা আক্রমণ ঠেকাতে কলকাতাবাসীদের উদ্যোগে তৈরি অসমাপ্ত মারাঠা ডিচ্

    নৌকোয় উঠেই কামান দাগলেন রামচন্দ্র। গভীর রাতে কামান দাগার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল প্রতাপাদিত্যের। জেগে উঠে সবকিছুই জানতে পারলেন তিনি। রামচন্দ্রকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেন। কিন্তু এলেন না জামাই রামচন্দ্র।
    বিয়ের পর থেকেই বিমলা রয়ে গেলেন বাপের বাড়িতে। স্বামী হিসেবে রামচন্দ্র তাঁর কোনো খোঁজ-খবর নিলেন না।
    এভাবেই কেটে গেল পাঁচটা বছর।
    একদিন বিমলা স্বামীর ঘর মাধবপাশায় যেতে চাইলেন। দু:খী বিমলাকে বাধা দিলেন না পিতা প্রতাপাদিত্য। কিন্তু রটিয়ে দেওয়া হলো, বিমলা কাশী যাচ্ছেন।
    নির্দিষ্ট দিনে সাজসজ্জা করে লোকলস্কর নিয়ে নৌকোয় উঠলেন বিমলা।
    মাধবপাশার অদূরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বিমলার নৌকো বাঁধা হলো।
    চারদিকে প্রচার হয়ে গেল, বৌঠাকুরাণী এসেছেন। খবর পেয়ে দলে দলে আসতে লাগলো গরীব-দু:খীর দল। সবাইকে অকাতরে দান দিলেন বিমলা।
    দেখতে দেখতে ভিড় ক্রমশ বেড়েই চললো। শেষে সেখানে সপ্তাহে দু’দিন হাট বসতে শুরু করলো। সেই হাটের নাম হয়ে গেল—“বৌঠাকুরাণীর হাট।”
    কাছেই গ্রাম সারসী। বিমলা নৌকো থেকে নেমে ডাঙায় তাঁবু খাটালেন।
    অনেকেই এলেন, কিন্তু এলেন না রামচন্দ্র।
    খবর শুনে মা ভীষণ বকাবকি করলেন রামচন্দ্রকে। তবুও এলেন না রামচন্দ্র।
    এবার মা নিজেই এলেন ।

    আরো পড়ুন :নতুন বৌ ও ঠাকুর ডাকাত

    শাশুড়িকে দেখে মাথায় ঘোমটা দিয়ে মোহর ভর্তি একটি সোণার থালা প্রণামী রেখে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন বিমলা।
    শাশুড়িও বিমলাকে একটি হাতির দাঁতের তৈরি বাক্স ভর্তি গয়না দিয়ে আশীর্বাদ করলেন বৌমা বিমলাকে। তারপর বিমলাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন মাধবপাশায়।
    বিমলাকে আর উপেক্ষা করতে পারলেন না রামচন্দ্র। শুরু হলো দু’জনের দাম্পত্য জীবন।
    ক্রমে তাঁদের দুই পুত্র হয়—কীর্তিনারায়ণ ও বসুদেবনারায়ণ।
    রামচন্দ্রের পর কীর্তিনারায়ণ রাজা হোন, তারপর রাজা হোন বসুদেবনারায়ণ।
    সবার নাম আজ হারিয়ে গেছে, কিন্তু বিমলার স্মৃতি নিয়ে টিকে আছে একটি নাম—“বৌঠাকুরাণীর হাট ।”

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here