বিবর্তনের পথে দুর্গা : শস্যদেবী থেকে দুর্গতিনাশিনী

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    এখন যে সিংহবাহিনী দশভূজা দুর্গা প্রতিমার পুজো হচ্ছে, বাংলায় আগে তা ছিল না। এমনকি, তখন দেবী দুর্গার সঙ্গে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী–কেউই ছিলেন না। সেই আদি সময়ে বাংলায় দুর্গাপুজো হতো জলপূর্ণ ঘটে এবং দেবীকে আবাহন করা হতো এই ঘট ও যন্ত্রে, আর পুজো হতো ভদ্রকালীর। সুতরাং, দুর্গাপুজোর আদি রূপটিকে চিনতে আমাদের পুত্রকন‍্যা পরিবৃতা দশভূজাকে বাদ দিয়ে এখন ওই ঘট ও যন্ত্রের দিকেই আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে, যে ঘট ও যন্ত্র হলো দুর্গাপুজোর প্রধানতম অঙ্গ। এই দুর্গাপুজোর যন্ত্রটির নাম “সর্বতোভদ্রমণ্ডল।” এই যন্ত্রের মূলকথা হলো অষ্টদল পদ্ম ও বীথিকা, যে বীথিকার নাম ” কল্পলতিকা।” এখন দেখা যাক, তন্ত্রে এই পদ্ম ও বীথিকার গুরুত্ব কী ? দেখা যাচ্ছে, শুধু সর্বতোভদ্রমণ্ডল যন্ত্র-ই নয়, সমস্ত তন্ত্রযন্ত্রের-ই মূল বিষয়বস্তু হলো এই পদ্ম ও বীথিকা। তন্ত্রের এই যন্ত্রে পদ্ম বা অষ্টদলপদ্ম হলো নারী জননাঙ্গের প্রতীক। এই পদ্মকে ঘিরেই রয়েছে বীথিকা। নারী জনন অঙ্গের তান্ত্রিক নাম “লতা।” যন্ত্রে অষ্টদলপদ্মকে ঘিরে রয়েছে বীথিকা অর্থাৎ সোজা কথায়, নারী অঙ্গের জননশক্তির স্পর্শে প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করার পরিকল্পনা।            এবার ঘট পরিকল্পনার কথায় আসা যাক।  আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সর্বতোভদ্রমণ্ডল যন্ত্রের অর্থ হলো নারী জনন অঙ্গ। আর এই সর্বতোভদ্রমণ্ডল যন্ত্রের ওপর যে  ঘট এবং ঘটের গায়ে সিন্দুরের পুতুল—এ হলো মানুষের প্রজননের প্রায় একটি পূর্ণাঙ্গ নকল করার আয়োজন। ঘট স্থাপনের মধ্যে নারী জনন অঙ্গের স্পর্শে প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করার পরিকল্পনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা। পুজোর সময় যজ্ঞে পঞ্চশস্য নিক্ষেপ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে ফসল ফলানোর মহড়া। এটি জমিতে শস্য বোনার প্রতীক।  তাহলে দেখা গেল, যন্ত্র আর ঘট-ই হলো দুর্গাপুজোর প্রধানতম অঙ্গ। এটি হলো আসলে কৃষি-আবিষ্কার পর্যায়ের এক আদিম বিশ্বাস, যা হলো দুর্গাপুজোর বিষয়বস্তু। এর মধ্যে রয়েছে আদিম জাদু বিশ্বাস। আসলে আদিতে দুর্গাপুজো কোনো “পুজো” ছিল না, ছিল জাদুবিশ্বাস। বাস্তবের কৃষিকার্যপ্রণালীকে একটি প্রতীকী যন্ত্র ও ঘটে ধরে তাতে কামনা সফল করার কল্পনাই হলো দুর্গাপুজোর প্রাচীনতম বিষয়।                                                                      অন্ন অর্থাৎ খাদ্য-ই হলো মানুষের আবশ্যিক প্রয়োজনীয় উপাদান। তাই প্রাচীনকাল থেকেই খাদ্য উৎপাদনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবী চণ্ডী নিজেই বলছেন, ——- “ততোহহমখিলং লোকমাত্মদেহসমুদ্ভবৈ:                    ভবিষ‍্যামি সুরা: শাকৈরাবৃষ্টৈ: প্রাণধারকৈ: ।।               শাকম্ভরীতি বিখ‍্যাতিং তদা যাস‍্যাম‍্যহং ভুবি।।”       অর্থাৎ, বর্ষাকালে নিজের দেহ থেকে উদ্ভূত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সারা জগতের পুষ্টি সরবরাহ করবো এবং তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হবো। দুর্গার-ই আরেক নাম শাকম্ভরী। দুর্গাপুজোর সঙ্গে পাকা ফসলের যোগ রয়েছে।  পাকা ধানের সময়েই হয় দুর্গাপুজো। তার আগে হয় বড়-ষষ্ঠী পুজো, যাতে লাগে বাশেঁর তৈরি নতুন ডালা। বিভিন্ন বনফুল, ধানের থোড় প্রভৃতি দিয়ে সেই ডালা পূর্ণ করার নিয়ম। এছাড়া, দুর্গাপুজোর আরেকটি প্রধান অঙ্গ হলো নবপত্রিকার পুজো। এই নবপত্রিকার ঘটের উপর সাজানো হয় রম্ভা, কচ্চি, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান–এই নয়টি গাছের পাতা। এই নয়টি উদ্ভিদের প্রতিটিকেই এক-একজন দেবী হিসেবে কল্পনা করা হয়। এখানে উদ্ভিদ জগতের সঙ্গে দেবী মাহাত্ম‍্যের স্পষ্ট যোগাযোগ লক্ষ্য করা যায়। আর শাকম্ভরী বলেই দেবী দুর্গা হলেন অন্নদা বা অন্নপূর্ণা। তাই ঐতিহাসিক রমাপ্রসাদ চন্দ বলেছেন, দুর্গা আদিতে ছিলেন শস্য দেবী। পৃথিবীর অন‍্যান‍্য দেশের শস্যদেবীদের মতো ফসল পাকার সময়টিতেই তাই দুর্গোৎসবের আয়োজন।                                                            যে দুর্গাকে আমরা রণচণ্ডী মহিষাসুরমর্দিনীরূপে দেখি, এই রূপটি পরবর্তীকালের সংযোজন। রামায়ণ অনুসারে, রাবণ বধের জন্য রামচন্দ্র দুর্গার কাছে বর প্রার্থনা করছেন। কিন্তু এই উপাখ্যানটি মূল বাল্মীকি রামায়ণে নেই। মূল রামায়ণে আছে, রামচন্দ্র রাবণ বধের জন‍্য বর প্রার্থনা করছেন সূর্যের কাছে। এর থেকেই প্রমাণিত, দুর্গার রণচণ্ডী দুর্গতিনাশিনী মূর্তির পরিকল্পনা পরবর্তীকালের রচনা।                                     প্রত্নতাত্ত্বিক স‍্যার জন মার্শাল হরপ্পায় একটি অদ্ভুত ধরণের সীল আবিষ্কার করেছেন। তার একপিঠে দেখা যাচ্ছে একটি নারী মূর্তি। এই নারীর দুটি পা দু’পাশে সরানো এবং তার গর্ভের ভেতর থেকে একটি লতা গজিয়েছে। এই সীলটির গায়ে ছয় অক্ষরে কিছু লেখা রয়েছে, যার পাঠোদ্ধার এখনো হয়নি। তবে বেশ বোঝা যায়, এই নারী চিত্রটির পিছনে রয়েছে এক আদিম বিশ্বাস এবং তা হলো, নারীদেহ থেকেই আদি শস্যের উদ্ভব ঘটেছে। তন্ত্রে একজাতীয় নকশার ব‍্যবহার আছে, যার নাম “যন্ত্র।” যন্ত্র সাধারণত দু’ প্রকার–পূজা যন্ত্র ও ধারণ যন্ত্র। পূজা যন্ত্রের ক্ষেত্রে যে দেবতার পুজো করতে হবে, সেই দেবতার যন্ত্র অঙ্কণ করে তার পুজো করা হয়। একে বলে পূজা যন্ত্র। অন‍্যদিকে, যে যন্ত্র অঙ্কণ করে শরীরে ধারণ করা হয়, তার নাম ধারণ যন্ত্র। সাধারণত তালপাতায় অঙ্কণ করে তা ধারণ করা হয়। আধুনিক তন্ত্রমতে কয়েকটি সিদ্ধযন্ত্র হলো গণেশ যন্ত্র, শ্রীরাম যন্ত্র, নৃসিংহ যন্ত্র, গোপাল যন্ত্র, কৃষ্ণ যন্ত্র, শিব যন্ত্র ও মৃত্যুঞ্জয় যন্ত্র। এ সম্পর্কে আশ্চর্যের দিকটি হলো, বহু যন্ত্রের সঙ্গেই যন্ত্র-সংযুক্ত দেবতাটির স্পষ্ট বিরোধ দেখা যায়। যেমন, উপরোক্ত সব দেবতাই পুরুষ, কিন্তু তাদের যন্ত্রগুলি নারী জনন অঙ্গের প্রতীক। এক্ষেত্রেও সেই উৎপাদনশীলতার ধারণা স্পষ্ট। তাই বলা যায়, দুর্গা আসলে শস‍্যদেবী, তার সামনে কলাবৌ সেই শস‍্যের প্রতীক।                        মার্কণ্ডেয় পুরাণের “দেবী মাহাত্ম্য” রচিত হয় গুপ্তযুগে। ভারতে এই সময় ঘটে দুর্ধর্ষ হুণ আক্রমণ। সে আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন যুবরাজ স্কন্দগুপ্ত। তার ফলে বহুদিন পর্যন্ত ভারতে আর হুণ আক্রমণ ঘটেনি। এই আবহাওয়ায় রচিত দেবী মাহাত্ম‍্যে দেবী চণ্ডী হয়ে উঠলেন দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here