মহাভারতের ভারতবর্ষ

    0
    Saptarshi-the seven great sages

    Last Updated on


    –উত্তম মণ্ডল


    আর্য, দ্রাবিড় ও অরণ্যবাসীদের নিয়ে একসময় গড়ে উঠেছিল মহাভারতের ভারতবর্ষ। নিজেদের সংস্কৃতিকে পুরোপুরি আঁকড়ে রেখেছিলেন এবং অন্য কোনো সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে দেননি বলেই অরণ্যবাসীরা পিছিয়ে পড়েন। এর জন্য আর্য ও দ্রাবিড়দের পুরোপুরি দায়ি করা যায় না।
    শ্রীকৃষ্ণের ছিল সাত কোটি নারায়ণী সেনা। সবটাই প্রায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর লোকদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এই বিশাল সৈন্যদল।
    মগধরাজ জরাসন্ধের সঙ্গে যুদ্ধের সময় শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অঙ্গ থেকে দশ হাজার মহারথী সৃষ্টি করেছিলেন। এর অর্থ, পর্বত ও অরণ্যবাসীদের নিয়ে এই সৈন্যদল গড়ে তোলা হয়েছিল।
    এরপর শ্রীকৃষ্ণ যখন দ্বারকায় তাঁর রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেলেন, তখন রাক্ষস, নিষাদ, শবর, নাগ, বানর কূলপ্রতীকযুক্ত পিছিয়ে পড়া জনজাতিদের নিয়েই গড়ে তোলেন তাঁর শক্তিশালী নারায়ণী সেনা। এদের সাহায্যেই পরে তৈরি হয়েছিল বিশাল যদুবংশ।
    বিয়ের মাধ্যমেও জাতিতে জাতিতে মিলন ঘটেছে। মহাভারতের মধ‍্যম পাণ্ডব ভীম বিয়ে করেন রাক্ষস কন‍্যা হিড়িম্বাকে, অন্যদিকে নাগকন‍্যা উলূপী ও গন্ধর্বকন‍্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিয়ে করেছিলেন অর্জুন। এইভাবে জাতের বেড়া ভেঙে উচ্চ বর্ণের সঙ্গে মিলন ঘটেছে পিছিয়ে পড়া জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষের।

    আরও পড়ুন :ভারতীয় ঐতিহ্যে অসুর


    কাজেই আর্য, দ্রাবিড় ও অরণ্যবাসীদের নিয়েই গড়ে উঠেছিল মহাভারতের ভারতবর্ষ।
    পরবর্তীকালে ছত্রপতি শিবাজি পার্বত্য উপজাতি মাওলিদের নিয়েই দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী গড়ে তুলে মোগলদের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন।
    এস.জে. কে লায়েক সম্পাদিত “হিস্ট্রি অব্ হিউম্যানিটি” এবং এল. এল. কাঙালীর “স্ফোরজাৎ আল” গ্রন্থে মানব সমাজের পরম্পরার যে ব‍্যাখ‍্যা দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, আদিম মানব গোষ্ঠীর প্রথম উদ্ভব ঘটেছিল আফ্রিকায় এবং তারই শাখা-প্রশাখা পরবর্তীকালে ভারতসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
    সুতরাং, ভারতের আদিম অধিবাসি বলে আসলে কিছুই নেই। ব্রিটিশরা ভারতের এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে এদেশের আদিম অধিবাসি বলে তাদের গায়ে তফসিলি তকমা সেঁটে দিয়ে এই জাতি বিভেদ ঘটিয়েছে।
    তবে বৈদিক দৃষ্টিতে ভারতের সকল অধিবাসি দশ আর্য ঋষির সন্তান। বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে প্রজাপতি ব্রহ্মার সৃষ্টি। এর মানে বিষ্ণুর মনোনীত উত্তরাধিকারী হলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। এরপর উত্তরাধিকারী মনোনীত হোন সায়ম্ভুব মনু। তারপর ব্রহ্মার মানসপুত্র অর্থাৎ ব্রহ্মার দশ প্রজাপতি ঋষিরা হলেন—১) মরিচি, ২) অত্রি, ৩) অঙ্গিরা, ৪) পুলস্ত‍্য, ৫) পুলহ, ৬) ক্রতু, ৭) বশিষ্ঠ, ৮) দক্ষ, ৯) ভৃগু ও ১০) নারদ।
    ১) ঋষি মরিচির সঙ্গে কর্দম-কন‍্যা এবং কপিল মুনির ভগ্নী কলার বিয়ে হয়েছিল। এই বংশের খ‍্যাতিমান ঋষিরা হলেন কশ‍্যপ, বৈবস্বত মনু , সগর এবং মর্ত্যে গঙ্গা আনয়নকারী ভগীরথ।
    ২) ঋষি অত্রির সঙ্গে বিয়ে হয় কর্দম-কন্যা তথা কপিল-ভগ্নী অনসূয়ার। দুর্বাসা, দত্তাত্রেয়, বিশ্বামিত্র এবং মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে বর্ণিত রাজা সুরথ হলেন এই বংশের বিখ্যাত পুরুষ।
    ৩) ঋষি অঙ্গিরার স্ত্রীর সঠিক নাম জানা যায়নি। তবে উত্তরাধিকারী ছিলেন বৃহস্পতি। আর পরবর্তীকালে এই বংশের তৃতীয় পুরুষ ঋষি দীর্ঘতমার পাঁচ পুত্র–অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র ও সুহ্মের নাম অনুসারেই ভারতের পাঁচটি অঞ্চলের নাম হয়েছে বলে প্রচলিত আছে।
    ৪) ঋষি পুলস্ত‍্যর স্ত্রী ছিলেন কর্দম-কন্যা (মতান্তরে তৃণবিন্দু-কন‍্যা) হবির্ভূ। এই বংশের বিখ্যাত ব‍্যক্তিরা হলেন—রাবণ, কুম্ভকর্ণ, বিভীষণ।
    ৫) ঋষি পুলহর সঙ্গে বিয়ে হয় প্রজাপতি দক্ষ-কন‍্যা ক্ষমার। এই বংশের নামী ব‍্যক্তিরা হলেন—কর্দম, শঙ্খপাদ।

    আরও পড়ুন :রাষ্ট্রদ্রোহী “দেবতা” পরশুরাম, বিবর্তনবাদ ও ভারতের কৃষি সভ‍্যতা


    ৬) ঋষি ক্রতুর স্ত্রী ছিলেন দক্ষ-কন‍্যা সন্নতি। ক্রতুর ছিল ষাট হাজার শিষ‍্য-সন্তান। তাঁরা “বালখিল্য মুনি” নামে পরিচিত ছিলেন।
    ৭) ঋষি বশিষ্ঠের সঙ্গে কপিল মুনির ভগ্নী অরুন্ধতীর বিয়ে হয়েছিল। এই বংশের বিখ্যাত ব‍্যক্তিরা হলেন—পরাশর ও মহভারত রচয়িতা ব‍্যাসদেব।
    ৮) ঋষি দক্ষ ( মতান্তরে প্রচেতা ) স্ত্রীর কথা সঠিকভাবে জানা যাচ্ছে না। কেউ কেউ দাক্ষায়ণী বলে থাকেন। এই বংশের পুত্র সন্তানরা নারদের সাহচর্যে এসে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করে সংসার ত‍্যাগী হয়েছিল। তবে এই বংশের নাম উল্লেখযোগ্য হলো কন্যা সতীর কারণেই। সতীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শিবের। তারপর তো দক্ষযজ্ঞ এবং এরপর সেইসূত্রে ভারতে ৫১ পীঠের উৎপত্তি।
    ৯) ঋষি ভৃগুর তিন স্ত্রী—খ‍্যাতি, পুলোমা ও তৃতীয়জন অজ্ঞাত।
    প্রথমা স্ত্রী খ‍্যাতির গর্ভে লক্ষ্মী, দ্বিতীয়া স্ত্রী পুলোমার গর্ভে চ‍্যবন এবং তৃতীয়া স্ত্রীর গর্ভে শুক্রাচার্যের জন্ম হয়।
    ১০) ঋষি নারদের স্ত্রীর কথা নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না। তবে তাঁর পিতা ছিলেন দ্রুমিল, মায়ের নাম কলাবতী। কান‍্যকুব্জের ( কনৌজ) গোপ বংশোদ্ভূত ছিলেন তিনি।
    ভারতের সব জাতির উৎস পুরুষ হচ্ছেন কোনো না কোনো ঋষি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মুচি-মেথরের মতো ভারতের ব্রাত‍্য জনগোষ্ঠীর মানুষদের অধিকাংশ হলেন ঋষি অত্রির সপ্তদশ অধ:স্তন পুরুষ ঋষি বিশ্বামিত্রের বংশধর। স্বামী বিবেকানন্দ সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন আমাদের, বলেছেন, “মুচি মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই।”
    কাজেই ভারতের জনগণের সবাই কোনো কোনো না আর্য ঋষির বংশোদ্ভূত উত্তরাধিকারী। আমাদের নিজেদের গোত্রগুলি বংশের সেইসব উৎস পুরুষ ঋষিদের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। সকল ভারতবাসীর রক্তের রসায়ন এক, সবার উৎস পুরুষ দশ আর্য ঋষির কোনো এক ঋষি। ঋষি পরম্পরার সেই মহান উত্তরাধিকারী হিসেবে আমাদের নিজেদের বিভেদ ভুলে গড়ে তুলতে হবে বিবেকানন্দের ভাবনার ভারতবর্ষ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here