খাদ‍্য বিচার

    0
    bengali food

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    আমিষ, না নিরামিষ—এই নিয়ে আমাদের খাদ‍্য বিচার সেই আদিকাল থেকে চলে আসছে আজও। একদল বলেন, মানব শরীরের জন্য আমিষ খাদ‍্যই যথার্থ প্রয়োজনীয়। আবার উল্টোদিকে অন্যদল বলেন, না না, নিরামিষ আহারই প্রশস্ত। অনেক আমিষভোজী আবার দু’নৌকোতেই পা দিয়ে ভেসে চলেন। কি রকম জানেন ?
    তারা অনেকেই শনি, মঙ্গল বা বৃহস্পতিবার নিরামিষ খাদ‍্য “সেবা” করেন। অন্যদিন, মাছ-মাংস-ডিম ভালোই চলে। এঁরা ধর্মেও আছেন, আবার জিরাফেও আছেন।
    মাছ খেকো বা মছলিখোর বলে বাঙালিদের বহুত বদনাম আছে দেশে। অনেকে বাঙালিকে গাল পাড়ে, মাছ খাবি আর লোকের ঘর থেকে মেয়ে বের করবি ! অথচ বৌধায়নের ধর্মসূত্র খুলে দেখুন, সেখানে দেখবেন বাঙালিদের মাছ খাওয়ার বিধান আছে।

    আরও পড়ুন:ব্লিৎজক্রিগ(Blitzkrieg) : হিটলারের তড়িৎগতির যুদ্ধ

    Bengali culture

    এছাড়া বীরভূমের তারাপীঠের মা তারা, আকালীপুরের মহারাজা নন্দকুমারের গুহ‍্যকালী এবং কলকাতার কালীঘাটের মা কালীর ভোগে মাছ দেওয়া হয়ে থাকে।
    আবার মহাভারত খুলুন।
    দেখুন, বেদব‍্যাস লিখছেন, একবার ১২ বছরকাল অনাবৃষ্টি হয়েছিল দেশে। এর ফলে দারুণ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। তখন চারদিক থেকে ক্ষুধার্ত মুনি-ঋষির দল জড়ো হলেন সরস্বতী নদীর তীরে। সরস্বতীর পুত্র সারস্বত মুনি পেটের জ্বালায় খাবারের খোঁজে অন্যত্র যাবার সংকল্প করলেন। তখন সরস্বতী নদী দিব‍্যমূর্তি ধারণ করে তাঁদের কাছে হাজির হলেন। বললেন, —
    “ন গন্তব্যমিত: পুত্র ! তবাহারমহং সদা।
    দাস‍্যামি মৎস্যসপ্রবরানদ‍্যতামিতি ভারত।।
    ইত‍্যুক্তস্তর্পয়ামাস স পিতৃণ দেবতাস্তথা ।
    আহারমকরোন্নিতং প্রাণান্ বেদাংশ্চ ধারয়ন্।।”
    অর্থাৎ হে পুত্র, এখান থেকে এদের সঙ্গে নিয়ে কোথাও যেতে হবে না তোমাকে। খাদ্যের জন্য আজ থেকেই আমি তোমাকে ভালো ভালো মাছ দিতে থাকবো। তাই খেতে থাকো।
    সরস্বতী নদীর একথা শুনে সারস্বত মুনিসহ অন্যান্য মুনি-ঋষিরা প্রাণে বাঁচার জন্য প্রতিদিন মাছ খেতে লাগলেন।

    আরও পড়ুন:কলকাতা সফর, ডিম ভাত ও চার্জশিট গঠন না হওয়া একুশে জুলাইয়ের অসুখ


    তবে যারা বলেন, মাছখেকো বাঙালির আধ্যাত্মিক উন্নতি হওয়া কঠিন, তবে তারা শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ ও ভারতের দ্বিতীয় শংকরাচার্য শ্রীঅতীশ দীপংকরের কথা স্মরণ করুন। এছাড়াও মহর্ষি কপিল তাঁর শেষ তপস্যাস্থল হিসেবে মাছখেকো বাঙালিদের বাংলার সাগর-সঙ্গমকেই বেছে নিয়েছিলেন।
    বেদের গোলাধ‍্যায়ে আছে :
    “বিষয়াভিলাষং আমিষং , তদরাহিতাং নিরামিষংবা।”
    অর্থাৎ বিষয় আসক্তিই হলো প্রকৃত আমিষ ভোজন। বিষয়ের প্রতি সম্পূর্ণ অনাসক্তি জন্মালে তবেই তাকে নিরামিষাশী বলা যায়।
    আর যদি কোনো ব‍্যক্তি দুধ, তুলসী পাতা বা ফল আহার করে থাকলেও যদি তার বিষয়ের প্রতি আসক্তি থাকে এবং সে যদি লোভী ও প্রতিষ্ঠাপরায়ণ হয়, তবে তাকে আমিষভোজীই বলা হবে। আর যদি কেউ মাছ-মাংস-ডিম খেয়েও সম্পূর্ণ নিষ্কাম ও বিষয়ের প্রতি নিরাসক্ত হয়, তবে সে লোক যথার্থ নিরামিষাশী বলে গণ‍্য হবার যোগ্য।

    আরও পড়ুন:ছত্তিশগড়ে চা বিপ্লব, সরকারি বনবিভাগ এবং পার্বত্যকন‍্যাদের ভূমিকা

    Indian food

    আর যদি কেউ খাদ্যের প্রভাবের কথা বলেন, তবে ছাগলের দিকে তাকান। ঘাস-পাতা খায়, নিরামিষাশী জীব। কিন্তু মা-মাসী মানে না।
    অন্যদিকে, পশুরাজ সিংহকে দেখুন। জীবজন্তুর টাটকা মাংস খায়, কিন্তু বাচ্চা হয় ১২ বছর পর একটি। কাজেই খাদ্যের ওপর ধর্মাধর্মের পুরোটা নির্ভর করে না। যে খাদ্য যার পক্ষে সহজপাচ্য হবে অর্থাৎ যার পেটে যা সইবে, সেই খাদ‍্যই হলো তার কাছে উপযোগী।
    যদিও দুধ সাত্বিক খাবারের মধ্যে পড়ে, তবুও যার পেটে দুধ সহ‍্য হয়না, তার কাছে দুধ হলো তামসিক খাদ্য।
    সুতরাং, যার পেটে যা সহ‍্য হয়, তার কাছে সেই খাবারই হলো যথাযথ খাদ্য। আর তা ভোজন করাই হলো স্বাস্থ্যকর ও সুখকর।
    সুজাতার দেওয়া পায়েস খেয়েই ভগ্নস্বাস্থ্য সিদ্ধার্থ বোধিজ্ঞান লাভ করে হয়েছিলেন বুদ্ধ।
    আপনারা কি বলেন ?

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here