বেগম সাহেবার পুতুল

    0

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    ঘটনা। সময়কাল : ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দ। স্থান : বীরভূমের প্রাচীন রাজধানী রাজনগর এবং বর্তমানে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া এ জেলার প্রান্তিক অঞ্চল “রাজনগর।” রাজনগরের রাঢ়ী শ্রেণির ব্রাহ্মণ বংশীয় “বীর রাজা” বসন্ত চৌধুরী তাঁরই দুই পাঠান সেনাপতি ভাই আসাদ খান ও জোনেদের হাতে অতর্কিত আক্রমণে ইতিমধ্যেই নিহত হয়েছেন। বীর রাজার সঙ্গে আসাদ লড়াই করছিলেন। এই লড়াই করতে করতে দুজনেই কুয়োয় পড়ে গেলেন এবং দুজনেই মারা গেলেন। রাজনগরের শাসক হলেন জোনেদ খান। দুর্ভাগ্যবশত এরপর কঠিন কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হলেন জোনেদ।

    নদীয়া জেলার শান্তিপুরের কাছে বাংলা রামায়ণের কবি কৃত্তিবাস ওঝার বাড়ি ফুলিয়া এলাকার মালঞ্চ নগরে বাস করতেন বিখ্যাত বৈদ‍্য ভবানীশংকর সেনগুপ্ত। জোনেদের কাছে খবর গেলে তিনি ভবানীশংকরকে রাজনগরে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। বীরভূমরাজের আমন্ত্রণ পেয়ে ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশ বছর বয়সী তরুণ কবিরাজ ভবানীশংকর এলেন রাজনগরের রাজদরবারে। জোনেদ তাঁকে তাঁর চিকিৎসার ভার দিলেন। রাজার কাছ থেকে ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় খরচপত্রসহ কয়েক মাস সময় নিয়ে ভবানীশংকর ফিরে গেলেন নিজের মালঞ্চ নগরের বাড়িতে। এরপর তিনি নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ নিয়ে হাতির পিঠে চেপে এলেন রাজনগরে। দেখালেন, ছোট্ট একটি মাটির পাত্রে লেপন ও কিছু খাবার বড়ি। কিন্তু দু’হাজার টাকার বিনিময়ে ওই সামান্য পরিমাণ ওষুধ দেখে রাজা ও তাঁর পারিষদবর্গ বলে উঠলেন, ভবানীশংকর ঠক্! এত টাকার বিনিময়ে এই সামান্য ওষুধ! এতে রাজার রোগ সারবে না। ভবানীশংকর বললেন, সাতদিন ব‍্যবহার করে দেখুন তার ওষুধ। কিন্ত জোনেদ কোনো কথা না শুনে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন সেই ওষুধ এবং ভবানীশংকরকে বন্দি করে রাখলেন কারাগারে।

    আরও পড়ুন :অবহেলায় পড়ে বীরভূমের পাইকরে পালযুগের শিলালিপি।

    দেবী ভবানীর একনিষ্ঠ ভক্ত ভবানীশংকর মনের দু:খে একমনে ডাকতে লাগলেন তাঁর ইষ্টদেবীকে। অবশেষে একদিন স্বপ্ন দেখলেন, দেবী ভবানী তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভয় দিচ্ছেন, রাত কেটে গেলেই রাজা তার ভুল বুঝতে পারবেন। আমি থাকতে তোর কোনো চিন্তা নেই। পরদিন রাজা জোনেদ রাজদরবারে এসেই রীতিমতো অবাক! তাঁর ছুড়ে ফেলা পাত্র থেকে যেখানে যেখানে ওষুধ ছিটকে পড়েছে, সেখানে সেখানে গজিয়ে উঠেছে ছত্রাক জাতীয় গাছ। এরপর তিনি নিজে সেই পড়ে থাকা ওষুধের ওপর পাগলের মতো গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। আর সেই ওষুধ গায়ে লাগামাত্র সেসব জায়গায় সাড় ফিরে আসতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত জোনেদ ছুটে গেলেন কারাগারে এবং মুক্ত করলেন ভবানীশংকরকে। রোগমুক্ত হলেন জোনেদ। এরপর জোনেদ পুরস্কৃত করতে চাইলেন ভবানীশংকরকে। ভবানীশংকর বললেন, বেগম সাহেবার সোনার পুতুলটি তাঁর চাই। কারণ, সেটি পুতুল নয়, ভবানী বিগ্রহ এবং মা ভবানীকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চান। জোনেদ বেগম সাহেবাকে বললেন সব কথা। কিন্তু বেগম সাহেবা জানালেন, তাঁর বোনের একটি ছেলে হয়েছে। তিনি পুতুলটি তাকে দেবেন বলেছেন।

    আরও পড়ুন :বীরভূমের দুই বীররাজা ও এক রাজনগর

    অনেক কথার পর অবশেষে রাজি হলেন বেগম সাহেবা। ভবানীশংকর তো মা ভবানীকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা! জোনেদের কথামতো রাজনগর থেকে দুই ক্রোশ দূরে রাণীপুরে মহাধুমধামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করলেন মা ভবানীকে। প্রতি বছর রাজনগরের এই পাঠান রাজপরিবার হাজির থাকতেন দুর্গাপুজোর সময় ভবানীশংকরের মা ভবানীর পুজোয়। পুজোর খরচও দিতেন।

    ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে বেশ পরিণত বয়সেই মারা গেলেন কবিরাজ ভবানীশংকর। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে কিছুক্ষণ পরে তাঁর স্ত্রী হরসুন্দরীও মারা গেলেন। সে খবর এলো রাজনগরে। রাজনগরের রাজা তখন বাহাদুর খান। তিনি সপরিবারে পাল্কি চেপে পৌঁছলেন ভবানীশংকরের বাড়িতে এবং মহাসমারোহে বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে তাঁদের যুগল মৃতদেহ সৎকারের যাবতীয় বন্দোবস্ত করে দিলেন। দিলেন একমণ চন্দন কাঠ ও ঘি। রাজনগর রাজার দশটি হাতি শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে পৌঁছালো বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে। সেখানে চিতাভস্মে মিশে গেলেন ভবানীশংকর ও হরসুন্দরী। এদিকে মা ভবানীর নাম অনুসারে রাণীপুরের নতুন নাম হয়ে গেল ” ভবানীপুর।” রাজনগর ব্লকের ভবানীপুরের ভবানী মন্দিরে আজও প্রতিষ্ঠিতা রয়েছেন দুর্গতিনাশিনী দুর্গারূপিণী মা ভবানী। রাজনগরের পাঠান রাজারা ছিলেন প্রজাদরদী। জাতপাতের কোনো বাছ-বিচার করতেন না তাঁরা। রাজনগররাজ বাহাদুর খান মা ভবানীর সেবা-পুজোর জন্য দান করেন ঊনচল্লিশ বিঘে নিষ্কর জমি। সেই দানে আজও পূজিতা হচ্ছেন ভবানীপুরে মা ভবানী।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here