ভারতীয় ঐতিহ্যে অসুর

    0
    devi durga and mahishasura

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    “অসুর” বলতে যে ভয়ংকর চেহারাটা আমাদের সামনে ফুটে ওঠে, বাস্তবে তা কিন্তু নয়। “অসুর” হলো একটি জনগোষ্ঠী।
    সমাজবিজ্ঞানী হপকিন্স জানাচ্ছেন, দানব, দৈত‍্য এবং রাক্ষসরা পূর্বে মর জগতের অধিবাসী বলেই গণ‍্য হতো। পরে তারা জনমানসে উগ্র আধিভৌতিক অস্তিত্বে পরিণত হয়।
    (“Danavas, Daityas and Rakshasas were treated as human beings earlier but letter as domans.”)
    এই দৈত‍্য এবং দানব নামে পরিচিত জনগোষ্ঠীই বেদ ও বেদ পরবর্তী গ্রন্থে “অসুর” নামে পরিচিত হয়েছে। অসুররা ছিল রাক্ষস, যক্ষ এবং নাগ সম্প্রদায়ের মতোই একটি জনগোষ্ঠী। পরবর্তীকালে দৈত, দানব, রাক্ষস যক্ষ জাতির মানুষজন সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেছে।

    আরও পড়ুন:স্মার্টফোনেই হচ্ছে গ্রাম থেকে হাইটেক্ মানব পাচার !

    তবে এখনো সমাজের ব্রাত‍্যজনগোষ্ঠীর মানুষজন দৈত‍্য-দানা-অসুরদের পুজো করে। যেমন বলা যায়, বীরভূমের দুবরাজপুর থানার ঝাঁপড়তলা গ্রামের বাউরী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ১ লা মাঘ এক্ষেণ পুজোর দিন একটি মহুয়া গাছের তলায় মহাদানা ও বাঘরাসের পুজো করে। এলাকার সহজলভ্য দুটি কালো পাথর এই দুই লৌকিক দেবতার প্রতীক হিসেবে প্রোথিত রয়েছে। এ থেকে বলা যায়, অতীতের দৈত‍্য, দানা, রাক্ষস ও অসুর সম্প্রদায়ের মানুষজন পরবর্তীকালে এলাকার ব্রাত‍্য বাউরী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেছে। কালো পাথর দুটি “মেনহির।” আমরা জানি, কালো রং শোকের চিহ্ন। তাই বাউরী সম্প্রদায়ের মানুষজন আজও তাদের একসময়ের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যেই এই পুজো করে থাকেন।
    তবে দৈত‍্য-দানব-যক্ষ-অসুর-রাক্ষসরা এলাকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেলেও নাগজাতির মানুষেরা ঐতিহাসিক যুগেও বহুদিন নিজেদের স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বা বজায় রেখেছিল। মগধের শিশুনাগ বংশ, পদ্মাবতীর নাগ রাজন‍্যবর্গ থেকে তা স্পষ্ট।

    আরও পড়ুন:ডিহি-বক্রেশ্বরের সতীপীঠ মাটির তলায়, সাজানো সতীপীঠেই চলছে পুজো-পাঠ


    রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালেখতে দেবাসুর, নাগ-যক্ষ ও রাক্ষসদের কথা আছে। মানুষের উল্লেখ নেই।
    (–Ref. Epigraphica Indica, XVI, P.24)
    এর সঙ্গে ঋকবেদের ১০/৩৫ : ৪ সংখ্যক মন্ত্রের প্রসঙ্গে যাস্কের নিরুক্তের প্রদত্ত তালিকার মিল দেখা যাচ্ছে, সেখানে বলা হচ্ছে :
    “গন্ধর্বা পিতরোদেবা অসুরা রক্ষাংসি ইতি।”
    (–Ref. J.A.R.S., 1820, P. 20 )
    বৈদিকযুগের গোঁড়ার দিকে প্রচণ্ড শক্তিধর ছিলেন যারা, তাদেরই “অসুর” বলা হয়েছে। এজন্য ঋকবেদে মরুৎ (৬৪/২), রুদ্র (৫/৪২/২১), দৌ (৩১/১), ইন্দ্র (৫৪/৩), বরুণ (২/২৭/১০) এবং অগ্নি (৫/১২/১)-কে “অসুর” আখ্যায় ভূষিত করা হয়েছে।
    আসলে বৈদিকযুগেই ধ‍র্মীয় আচার-আচরণকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জনগণ দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যান, দেব ও অসুর। যারা বেদ মেনে যজ্ঞ করতেন, সেই যজ্ঞবাদীরা পরিচিত হলেন “দেব” নামে এবং অন্যদিকে যারা যজ্ঞ করতেন না, তাদের নাম হয়ে গেল “অসুর।” বেদপন্থীদের মধ্যে অগ্নি পুজোর প্রচলন করেছিলেন মহর্ষি ভৃগু। একমাত্র তিনিই আগুনের ব‍্যবহার জানতেন। সেজন্য শতপথ ব্রাহ্মণে যজ্ঞবাদীদেরই “দেব” বলা হয়েছে, “যজ্ঞেন বৈ দেবা:” ( ১-৫/৫/২৬)।
    প্রথমদিকে দেব ও অসুরদের মধ্যে বেশ সদ্ভাব ছিল। পরে সেই সম্পর্ক তিক্ত হয়ে শত্রুতায় পরিণত হয় এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যুদ্ধ পর্যন্ত হয়। দেবগণের নেতা ইন্দ্র বধ করেন বৃত্রাসুরকে। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এই শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাবার পর “অসুর” শব্দটি নিন্দাসূচক হয়ে উঠলো, যেমন :
    “অসুরা: রাক্ষসা: দেবনিন্দকা: ।”

    আরও পড়ুন:প্রকাশ্যে গোহত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন শ্রী শ্রী মা-ও


    পরবর্তীকালে পুরাণের পাতায় অসুররা চিহ্নিত হয়ে গেল ভয়ানক জীব হিসেবে।
    আসলে বৈদিকযুগের শেষদিকে যজ্ঞবাদী আর্যগোষ্ঠীর সঙ্গে বিরুদ্ধবাদী অসুরদের বিরোধ চরম আকার নিয়েছিল। পরবর্তীকালে পুরাণের পাতায় তারই প্রতিফলন স্পষ্ট। সে সময় অসুর জাতির এক বড়ো অংশ ভারত ছেড়ে চলে যায় পারস‍্য ও তুর্কিস্থানে। কেউ কেউ আবার দেশের ভেতরেই প্রয়াগ ও ছোটনাগপুরে। কেউ বা তিব্বত ও কামরূপের দিকে।
    ভারতের বাইরে গিয়ে অসুররা ব‍্যাবিলনের একশো ক্রোশ উত্তর-পশ্চিমে গড়ে তুললেন “আসিরিয়া।” অন্যদিকে, ভারতীয় অসুরদের অন্য একটি শাখা ইরাণে চলে যায়। ইরাণীদের ধর্মগ্রন্থ “জেন্দ আবেস্তা”-য় উল্লিখিত তাদের দেবতার নাম হলো “অহুর মাজদা।” এই “অহুর” শব্দটি এসেছে “অসুর” থেকে।
    তামা অসুরদের ভীষণ প্রিয় ধাতু। ছোটনাগপুরের তামার খনিতে একসময় অসুররা কাজ করতো। সুতরাং, ভারতেরই একটি সভ‍্য ও শক্তিশালী জাতি এই অসুর।
    মহর্ষি কাশ‍্যপের ঔরসে দিতির গর্ভে দৈত‍্যরা এবং দনায়ূর গর্ভে দানবদের জন্ম হয়। বৃত্রাসুরকে বধ করার জন্য ইন্দ্রের শরীরে ব্রহ্মহত‍্যার পাপ লেগেছিল। তাই বলা যায়, অসুররাও ছিলেন আর্যগোষ্ঠীর একটি শাখা। দৈত‍্য-দানব-অসুরদের সঙ্গে মানুষের বৈবাহিক সম্বন্ধ ছিল। যেমন, দৈত‍্যরাজ বৃষপর্বার কন‍্যা শর্মিষ্ঠাকে বিয়ে করেছিলেন যযাতি। মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণ ও অগ্নিপুরাণ থেকে জানা যায়, মানুষদের মতোই দেহধারী এবং সুন্দর চেহারার অধিকারি ছিলেন অসুররা।

    আরও পড়ুন:প্রধানমন্ত্রী, এক গাঁওবুড়ো ও বারাসিঙ্গা


    ভারতীয় অসুররা ছিলেন দুর্গ নির্মাণে অত্যন্ত দক্ষ। ঋকবেদের শম্বর অসুরের ছিল ৯০ টি দুর্গ (ঋগ্বেদ ১/১৩০/৭), দুর্দান্ত বীর যোদ্ধা বর্চি অসুরের ছিল লক্ষ লক্ষ যোদ্ধা (ঋগ্বেদ ১০/১৫৩/৩)। বড়ো কেল্লা ছিল পিপরু অসুরের, যা ধ্বংস করেছিলেন ইন্দ্র (ঋগ্বেদ ১০/১৩৮/৩)।
    বিহারের সিংভূম থেকে গাংপুর পর্যন্ত প্রায় ৮০ মাইল এলাকা জুড়ে রয়েছে বহু তামার খনির নিদর্শণ। তাম্রপ্রিয় অসুর জাতির বসবাস ছিল বলে এই বিশাল এলাকাটির নাম হয় “অসুরগড়।”
    প্রত্নতত্ত্ববিদ্ কীলহর্ণ সাহেব ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে “Indian Antiquary”-তে একটি তাম্রশাসনের অনুলিপি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন, তা থেকে জানা যাচ্ছে, ১০৮৪ বিক্রমাব্দে বিজয়পালদেব, রাজ‍্যপালদেব এবং ত্রিলোচনপালদেব ছিলেন অসুর বংশের রাজা। এঁরা নি:সন্দেহে কোনো অতিকায় ভীষণ ভয়ংকর জীব ছিলেন না, অবশ্যই মানুষ ছিলেন।

    আরও পড়ুন:সুন্দরী মহিলা সান্নিধ্যে বিপদ বাড়ছে পুরুষদের


    পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় ছিল অসুর জাতির বসবাস ছিল। অসুরদের কোট অর্থাৎ বসতিক্ষেত্র বলে পরিচিত সেই স্থানের নাম এখন “কোটাসুর।” জেলা সদর সিউড়ি-বহরমপুর পাকা রাস্তার ধারেই অবস্থিত এই “কোটাসুর।” এর কাছেই রয়েছে স্থান “অর্সুলা” , যেটি আদিতে ।ছিল “অসুরালয়।”
    এই কোটাসুরে অজ্ঞাতবাসপর্বে হিড়িম্বক নামে দুর্দান্ত রাক্ষসকে বধ করে তার বোন হিড়িম্বাকে বিয়ে করে সহানুভূতি ও মানবতার উজ্জ্বল উদাহরণ রেখেছেন মধ্যম পাণ্ডব ভীম। কোটাসুর মদনেশ্বর শিব মন্দিরে হিড়িম্বক বা সংক্ষেপে বক রাক্ষসের হাড় ও কুন্তীর পাথরের তৈরি বিশাল প্রদীপ রয়েছে। রাক্ষসের হাড়ও এখন পাথর।
    বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ‍্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তরফে এই কোটাসুরে খননকাজ চালানো হয়। এই প্রতিবেদক সে সময় ওই খননকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
    যাই হোক্, বোঝা গেল, রাক্ষস-অসুর-দৈত‍্য—এরা কেউ ভীষণ দর্শণ জীব ছিলেন না, ছিলেন সাহসী, বুদ্ধিমান ও বলবান স্বাভাবিক মানুষ।
    দেবী দুর্গার পদতলে শূলে বিদ্ধ মহিষাসুর আসলে ছিলেন একদিকে যেমন ছিলেন পরম মাতৃভক্ত, অন্যদিকে তেমনি পরাক্রমশালী বীর যোদ্ধা। আদিবাসী সাঁওতাল জনজাতির মানুষ দুর্গাপুজোর সময় আজও সশ্রদ্ধচিত্তে মাতৃভক্ত বীর মহিষাসুরকে স্মরণ করেন।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here