আর্যরা বিদেশ থেকে আসেনি। হিন্দুরাই আর্য, বলতেন স্বামীজী….

    0
    swami vivekananda

    Last Updated on

    রামকৃষ্ণের ফৌজ

    বেদের যুগ থেকে হিন্দুরা গঙ্গা-যমুনা, নর্মদা-সিন্ধু, গোদাবরী-কাবেরী, সরস্বতী নদীর পূজা করে এসেছে। পূজা করে চলেছে দেবতাত্মা হিমালয়ের। বেদ-পুরান, রামায়ণ-মহাভারত — বহু শাস্ত্র হিন্দুরা রচনা করেছে। রামায়ণে রামকে, রাবণকে, বালিকে হিন্দুরা “হে আর্যপুত্র” বলে সম্বোধন করে এসেছে। হিন্দুরা বেদের যুগ থেকে বহু কিছু রচনা করেছে। কোন গ্রন্থে হিন্দু লেখেনি যে তারা বিদেশ থেকে এসেছে।

    ১৮৫৭ সিপাই বিদ্রোহ হয়। আওয়াজ উঠলো, বিদেশী ইংরেজ ভারত ছাড়ো। ইংরেজ প্রমাদ গণলো। বেনিয়া ইংরেজ দেখলো, মোগল-পাঠান তো বিদেশী এটা প্রমাণিত। যদি প্রমাণ করা যায়, হিন্দুরাও বিদেশী, তবে আর ঝঞ্ঝাট থাকেনা। শরণাপন্ন হলো মাক্সমুলারের, যাঁকে হিন্দু জাতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করে। মাক্সমুলার ইংরেজের পয়সায় বেদের ইংরেজী অনুবাদ করেন। তখন মাক্সমুলার একটি বই লেখেন, নাম History of Ancient Literature । মাক্সমুলারই এই বইয়ে প্রথম এক থিওরী খাড়া করেন — আর্যরা বিদেশ থেকে এসে ভারত দখল করে। প্রকাশিত হয় 1859 সালে, সিপাই বিদ্রোহের দুবছর পর। এইবার বেনিয়া ইংরেজ জাতি এই থিওরীকে পল্লবিত করতে থাকে। হিমালয় বেষ্টিত সপ্ত সিন্ধু পূজিত আর্যভূমিতে নতুন তত্ত্ব চালু হলো— হিন্দু বিদেশ থেকে আগত এক জাতি — ইংরেজ, মোগল-পাঠানের মতো। নিজে যেটুকু জানি লিখলাম না। স্বামীজী যা লিখেছেন সেটুকু পড়ুন : —

    . “ঐ যে, ইউরোপী পণ্ডিত বলছেন যে, আর্যেরা কোথা হতে উড়ে এসে ভারতের ‘বুনো’দের মেরে কেটে জমি ছিনিয়ে নিয়ে বাস করলেন — ও-সব আহাম্মকের কথা। আমাদের পণ্ডিতরাও দেখছি সে গোঁয়ে গোঁ — আবার ঐ সব বিরূপ মিথ্যা ছেলেপুলেদের শোনানো হচ্ছে। এ অতি অন্যায়।

    আরও পড়ুন:শ্রীশ্রী সারদা মা ও আমজাদ সম্পর্ক কি আদৌ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে, না কি অন্য ইঙ্গিত।

    আমি মূর্খ মানুষ, যা বুঝি তাই নিয়েই এ প্যারি-সভায় বিশেষ প্রতিবাদ করেছি। এদেশী এবং স্বদেশী পণ্ডিতদের জিজ্ঞাসা করছি। সময় পেলে আরও সংশয় ওঠাবার আশা আছে। এ-কথা তোমাদেরও বলি — তোমরা পণ্ডিত-মনীষী, পুঁথি-পাতড়া খুঁজে দেখ।

    ইউরোপীরা যে দেশ বাগে পান, আদিম মানুষকে নাশ করে নিজেরা সুখে বাস করেন, অতএব আর্যরাও তাই করেছে!! ওরা হা-ঘরে, ‘হা অন্ন হা অন্ন’ করে, কাকে লুটবে, কাকে মারবে বলে ঘুরে বেড়ায় — আর্যরাও তাই করেছে!!! বলি, এর প্রমাণটা কোথায়—আন্দাজ? ঘরে তোমার আন্দাজ রাখোগে।

    কোন বেদে, কোন সূক্তে, কোথায় দেখেছো যে, আর্যরা বিদেশ থেকে এদেশে এসেছে? কোথায় পাচ্ছ যে, তারা বুনোদের মেরে, কেটে ফেলেছেন? খামকা আহাম্মকির দরকারটা কি? আর রামায়ণ পড়া তো হয়নি, খামকা এক বৃহৎ গল্প — রামায়ণের উপর —কেনো বানাচ্ছ?

    রামায়ণ কিনা আর্যদের দক্ষিণী বুনো-বিজয়!! বটে —রামচন্দ্র আর্য রাজা, সুসভ্য; লড়ছেন কার সঙ্গে?— লঙ্কার রাবণ রাজার সঙ্গে। সে রাবণ, রামায়ণ পড়ে দেখ, ছিলেন রামচন্দ্রের দেশের চেয়ে সভ্যতায় বড় বই কম নয়। লঙ্কার সভ্যতা অযোধ্যার চেয়ে বেশী ছিল বরং, কম তো নয়ই। তারপর বানরাদি দক্ষিণী লোক বিজিত হলো কোথায়? তারা হলো সব শ্রীরামচন্দ্রের বন্ধু মিত্র। কোন গুহকের, কোন বালির রাজ্য রামচন্দ্র ছিনিয়ে নিলেন—তা বলো না?

    হতে পারে দু-এক জায়গায় আর্য আর বুনোদের যুদ্ধ হয়েছে, হতে পারে দু-একটা ধূর্ত মুনি রাক্ষসদের জঙ্গলের মধ্যে ধুনি জ্বালিয়ে বসেছিলো। মটকা মেরে চোখ বুজিয়ে বসেছে, কখন রাক্ষসেরা ঢিলঢেলা হাড়গোড় ছোঁড়ে। যেমন হাড়গোড় ফেলা, অমনি নাকিকান্না ধরে রাজাদের কাছে গমন। রাজারা লোহার জামাপরা, লোহার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোড়া চড়ে এলেন; বুনো হাড় পাথর ঠেঙ্গা নিয়ে কতক্ষণ লড়বে? রাজারা মেরে ধরে চলে গেলো। এ হতে পারে; কিন্তু এতেও বুনোদের জঙ্গল কেড়ে নিয়েছে, কোথায় পাচ্ছ?

    আরও পড়ুন:১১ই সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩, স্বামীজী বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে শিকাগোতে বললেন : –

    অতি বিশাল নদনদীপূর্ণ, উষ্ণপ্রধান সমতল ক্ষেত্র—আর্য সভ্যতার তাঁত। আর্যপ্রধান, নানাপ্রকার সুসভ্য, অর্ধসভ্য, অসভ্য মানুষ—এ বস্ত্রের তুলো, এর টানা হচ্ছে — বর্ণাশ্রমাচার, এর পোড়েন —প্রাকৃতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষনিবারণ।

    তুমি ইউরোপী, কোন দেশকে কবে ভালো করেছ? অপেক্ষাকৃত অবনত জাতিকে তোলবার তোমার শক্তি কোথায়? যেখানে দূর্বল পেয়েছ, তাদের সমূলে উত্সাদন করেছ, তাদের জমিতে তোমরা বাস করছ তারা একেবারে বিনষ্ট হয়ে গেছে। তোমাদের আমেরিকার ইতিহাস কি? তোমাদের অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জ — তোমাদের আফ্রিকা।

    কোথা সে সকল বুনো জাত আজ? একেবারে নিপাত, বন্য পশুবত্ তাদের তোমরা মেরে ফেলেছ; যেখানে তোমাদের শক্তি নাই, সেথা মাত্র অন্য জাত জীবিত।

    আর ভারতবর্ষ তা কস্মিনকালেও করেননি। আর্যেরা অতি দয়াল ছিলেন। তাঁদের অখণ্ড সমুদ্রবত্ বিশাল হৃদয়ে, অমানব-প্রতিভাসম্পন্ন মাথায় ও-সব আপাতরমণীয় পাশব প্রণালী কোন কালেও স্থান পায়নি। স্বদেশী আহাম্মক! যদি আর্যেরা বুনোদের মেরে ধরে বাস করতো, তাহলে এ বর্ণাশ্রমের সৃষ্টি কি হতো?

    ইউরোপের উদ্দেশ্য —সকলকে নাশ করে আমরা বেঁচে থাকবো। আর্যদের উদ্দেশ্য —সকলকে আমাদের সমান করবো, আমাদের চেয়ে বড় করবো। ইউরোপের সভ্যতার উপায় — তলোয়ার; আর্যের উপায় — বর্ণবিভাগ। শিক্ষা সভ্যতার তারতম্যে, সভ্যতা শেখবার সোপান — বর্ণবিভাগ। ইওরোপে বলবানের জয়, দুর্বলের মৃত্যু; ভারতবর্ষের প্রত্যেক সামাজিক নিয়ম দূর্বলকে রক্ষা করবার জন্য॥ (ষষ্ঠ খণ্ড — পৃ — 163 & 164 & 165)

    ” প্রত্নতাত্ত্বিকগণ স্বপ্ন দেখিয়া থাকেন যে, ভারত কৃষ্ণচক্ষু আদিম জাতিসমূহে পরিপূর্ণ ছিলো — উজ্জ্বলবর্ণ আর্যগণ আসিয়া সেখানে বাস করিলেন; তাহারা কোথা হইতে যে উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসিলেন, তাহা ঈশ্বরই জানেন। কাহারও কাহারও মতে মধ্যে-তিব্বত হইতে, আবার কেহ কেহ বলেন মধ্য-এশিয়া হইতে। অনেক স্বদেশপ্রেমিক ইংরেজ আছেন, যাহারা মনে করেন — আর্যগণ সকলেই হিরন্যকেশ ছিলেন। অপরে আবার নিজ নিজ পছন্দমতো তাঁহাদিগকে কৃষ্ণকেশ বলিয়া স্থির করেন। লেখকের নিজের চুল কালো হইলে তিনি আর্যগানকেও কৃষ্ণকেশ করিয়া বসেন। আর্যগণ সুইজারল্যান্ডের হ্রদগুলির তীরে বাস করিতেন — সম্প্রতি এরূপ প্রমাণ করিবারও চেষ্টা হইয়াছে। তাহারা সকলে মিলিয়া যদি এই সব মতামতের সঙ্গে সেখানেই ডুবিয়া মরিতেন, তাহা হইলেও আমি দুঃক্ষিত হইতাম না। আজকাল কেহ কেহ বলেন, আর্যগণ উত্তরমেরুনিবাসী ছিলেন। আমাদের শাস্ত্রে এই সকল বিষয়ের কোন প্রমাণ আছে কি না যদি অনুসন্ধান করা যায়, তবে দেখিতে পাইবে — আমাদের শাস্ত্রে ইহারা সমর্থক কোনও বাক্য নাই; এমন কোনও বাক্য নাই, যাহাতে আর্যগণকে ভারতের বাহিরে কোন স্থানের অধিবাসী মনে করা যাইতে পারে; আর আফগানিস্তান প্রাচীন ভারতে অন্তর্ভুক্ত ছিলো। শূদ্রজাতি যে সকলেই অনার্য এবং তাহারা যে বহুসংখ্যক ছিল, এ সব কথাও সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সে সময়ে সামান্য কয়েকজন উপনিবেশকারী আর্যের পক্ষে শত সহস্র অনার্যের সহিত প্রতিদ্বন্দিতা করিয়া বাস করাই অসম্ভব হইত। উহারা পাঁচ মিনিটেই আর্যদের চাটনির মতো খাইয়া ফেলিত”। (৫ম খণ্ড, পৃ – 146 – চেন্নাই ভাষণ)॥

    আরও পড়ুন:হিন্দুধর্ম অপমানিত হতে দেখলে স্বামীজী প্রতিবাদ করতেন, দুবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন

    স্বামীজী আর কি লিখে গেছেন পড়ুন ॥
    “এখন পণ্ডিতেরা লড়ে মারুন। আর্য নাম হিন্দুরাই নিজেদের উপর চিরকাল ব্যাবহার করেছে। শুদ্ধ হোক, মিশ্র হোক, হিন্দুদের নাম আর্য, বস্ কালো বলে ঘৃণা হয়, ইউরোপীরা অন্য নাম নিনগে। আমাদের তায় কি? (6/129)

    পরিশেষে বলি — ” যে জাতক ঈশ্বর আরাধনার ভিতর ভূমিষ্ঠ হইয়াছে, সে-ই হইল আর্য; আর আনার্য সে-ই যাহার জন্ম হইয়াছে ইন্দ্রিয়পরায়নতার মাধ্যমে”॥ (দশম খণ্ড, পৃ – 64)

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here