বৈদিকযুগের আর্যরা গোরু মেরে খেতেন না, খেতেন গোরুর দুধ।

    0
    Cow in Indian Culture

    Last Updated on

    –উত্তম মণ্ডল

    এতদিন আমরা ম‍্যাক্সমুলার, ম‍্যাকডোনেল, কীথ পড়ে জেনে এসেছি, বৈদিক আর্যরা, এমনকি আর্য ঋষিরা পর্যন্ত গোরু মেরে তার মাংস খেতেন ! বৈদিক শব্দের প্রকৃত অর্থ না জেনে আর্যদের ঘাড়ে গোমাংস ভক্ষণের দায় চাপানো হয়েছে। অথচ ভারতের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ড: রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখা “হিন্দু সিভিলাইজেশন ( Hindu Civilisation) ” গ্রন্থে বেদের প্রকৃত মর্ম বুঝে জানাচ্ছেন, “The cow was already deemed aghnya–not to be killed.”
    এতদিন তাহলে আমরা ঘরের ঠাকুর ফেলে সত্যি সত্যিই বিদেশি কুকুর ধরেছি !
    আমাদের পরম্পরাগত সংস্কার তো গোমাংস ভক্ষণের দিকে রায় দেয়না। তাই আর্য সমাজে গোমাংস খাওয়ার রীতি ছিল, তা মেনে নেওয়া যায় না। তাহলে এতদিন যা জেনে এসেছি, সব তো ভুল !
    ঋগ্বেদের “গোঘ্ন” শব্দটিকে নিয়েই যত বিপত্তি। অতিথির প্রতিশব্দ হিসেবে “গোঘ্ন” শব্দ ব‍্যবহার করা হয়েছে।
    ঋগ্বেদে স্পষ্ট লেখা রয়েছে,
    “সূর্যায়া বহতু: প্রাগাৎ সবিতা যমবাসৃজৎ ।
    অঘাসু হন‍্যতে গাবো অর্জুন‍্যো: পর্য‍্যুহ‍্যতে ।।” –ঋগ্বেদে ১০/৮৫/১৩.

    এখানে পরিস্কার লেখা রয়েছে “হন‍্যতে গাবো।” গোহত্যা করা যাবে না।
    ঋগ্বেদে আরও লেখা রয়েছে,
    “মাতা রুদ্রাণাং দুহিতা বসুনাং স্বমাদিত‍্যনামমৃ তস‍্য নাভি:।
    প্র নু বোচং চিকিতুষে জনায়, মা গামনাগামদিতিং বধিষ্ট ।।”
    অর্থাৎ বসু, রুদ্র আদিত্যদের কন‍্যা হলো গোরু এবং তা মা ও বোনের সমান। অমৃতরূপ দুধ দান করে গোরু। সকলে জেনে রাখো, অদিতিস্বরূপ গোরুকে কেউ বধ কোরো না।

    আরও পড়ুন : খাদ‍্য বিচার


    যজুর্বেদের একটি মন্ত্রে বলা হচ্ছে,
    “ইড়ে রন্তে হব‍্যে কাম‍্যে চণ্ডে জ‍্যোতিহদিতে সরস্বতী মনি বিশ্রুতি ।
    এতা তে অঘ্ন‍্যে নামানি দেবেভ‍্যো মা সুকৃতং ব্রূতাৎ ।।”–যজুর্বেদ ৮/৪৩.
    এখানে গোরুকে স্পষ্ট বলা হচ্ছে “অঘ্ন‍্যা” অর্থাৎ অবধ‍্য।
    শুধু তাই নয়, ঋগ্বেদের ঋষিরা বলছেন,
    “আরে তে গোদনমুত পুরষঘ্নম্ ।”–ঋগ্বেদ অর্থাৎ গোহত্যাকারী এবং নরহত্যাকারী দূর হঠো।
    যজুর্বেদে বলা হচ্ছে,
    “অন্তকায় গোঘাতম্ ।”
    অর্থাৎ গোঘাতকের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড।
    সুতরাং, আর্যরা কখনই গোমাংসভোজী ছিলেন না, বরং গোহত‍্যার তীব্র বিরোধী ছিলেন তাঁরা।
    “অঘ্ন‍্যা” শব্দে যেখানে “অবধ‍্য” বোঝানো হয়েছে , সেখানে “গোঘ্ন” শব্দে কখনোই “গোহত্যাকারী ” বুঝায় না।
    অতিথিকে “গোঘ্ন” বলা হয়েছে মানে এই নয়, ঘরে অতিথি এলে গোরু মেরে তার মাংস খাওয়াতে হবে।
    আসলে অতিথি হলেন “দেব ভব:”, অতিথি হলেন নারায়ণ। তাই অতিথির সেবা না করলে গোহত্যার মতো মহাপাপ হবে। তাই অতিথি হলেন “গোঘ্ন।”
    আর “অঘ্ন‍্যা” শব্দের এই ব‍্যাখ‍্যা করেছেন যাস্ক‍্য মুনি। তিনি বলেছেন, ” অঘ্ন‍্যা অহন্তবা” ( নিরুক্ত ১১/১৪).
    অর্থাৎ গোরু হলো অবধ‍্য।
    আর বৈদিক অর্থ যথাযথ অনুধাবন করেই ঐতিহাসিক রাধাকুমুদ বলছেন, aghnya–not to be killed.
    অর্থাৎ গোরু অবধ‍্য।

    আরও পড়ুন : গান্ধীজীর আগেই বাংলায় অহিংস আন্দোলন শুরু করেছিলেন শ্রীচৈতন্য


    গোরু নিয়ে আরো ভুল ব‍্যাখ‍্যা প্রচলিত আছে। যেমন, গোমেধ ও অশ্বমেধ যজ্ঞে নাকি গোরু এবং ঘোড়া মেরে তাদের মাংস খাওয়া হতো।
    এবার সে ব‍্যাখ‍্যায় আসছি।
    প্রসঙ্গত জানাই, বৈদিক শব্দের প্রতিশব্দ লেখা আছে “নিঘন্টু”-তে। সেখানে যজ্ঞের অর্থ বলা হচ্ছে “অধ্বর।” –নিঘন্টু ৩/১৭
    এর অর্থ হলো, “হিংসা না করা।”
    কাজেই যজ্ঞে গোরু-ঘোড়া বধ করা হতো, যাস্ক‍্যের মত অনুসারে তা অপ্রমাণ।
    এছাড়াও যজুর্বেদের একটি মন্ত্রে স্পষ্ট বলা হচ্ছে,
    “অশ্বং না হিংসী।”–৩/৩৭.
    কাজেই অশ্বমেধ যজ্ঞে অশ্ব বধের প্রশ্নই ওঠে না।
    অন্যদিকে, তেমনি বৈদিক শব্দকোষ নিঘন্টুতে “গো” শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে বলা হয়েছে –অঘ্ন‍্যা, অদিতি, উস্রা, উস্রীয়া, অহী, মহী, জগতি।
    গোরু হচ্ছে তাহলে “অদিতি।”
    এ প্রসঙ্গে নিঘন্টুর টীকাকার শ্রীদেবরাজ যাজ্ব বলছেন, অদিতি= নদ‍্যতি অখণ্ডনীয়া,
    অর্থাৎ যার অঙ্গচ্ছেদন অনুচিত।
    যজুর্বেদে আরও বলা হয়েছে,
    “গাং মা হিংসীরদিতিং বিরাজম্।” –১৩/৪৩
    অর্থাৎ গোরু হলো অদিতি এবং তা বধের অযোগ্যা। তাকে হিংসা করো না।
    যজুর্বেদের আরেকটি মন্ত্রে বলা হচ্ছে,
    “ঘৃতাং দুহানামদিতিং জনায়াগ্নে মা হিংসী পর মে ব‍্যোমন্।”–১৩/৪৬
    অর্থাৎ মানুষকে যে ঘৃত দান করে, সেই অদিতিকে হিংসা করো না।
    বৈদিকযুগে আর্যদের অন‍্যতম প্রধান সম্পদ ছিল গো-সম্পদ। অথর্ববেদের একটি মন্ত্রে দেখা যাচ্ছে (১৪/১/১৩), ফাল্গুনী নক্ষত্রে বিবাহিতা কন‍্যা বাপের ঘর থেকে স্বামীর ঘরে যেতেন‌। বাবার দেওয়া গো-সম্পদকেও সে সময় সালংকারা কন‍্যার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হতো।

    আরও পড়ুন : প্রকাশ্যে গোহত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন শ্রী শ্রী মা-ও

    নিরুক্তের একটি শ্লোকে (২/৫) দেখা যাচ্ছে,
    “অথাপ‍্যস‍্যাং তাদ্ধিতেন তেন কস্নবন্নিসমা ভবন্তি।
    গোভি: শ্রীণীত।
    মৎসরামিতি পয়সা মৎসর সোমো, মন্ততেস্তৃপ্তি।”
    এর ব‍্যাখ‍্যা প্রসঙ্গে টীকাকার শ্রীদুর্গাচার্য লিখছেন,
    “অথাপ‍্যস‍্যামেব পশুগবি, তাদ্ধিতেন প্রয়োগেনাকৃৎস্নানায়াং সত‍্যাং কৃৎম্নবন্নিগমা ভবন্তি।
    তদযথাগোভি: শ্রীণীতমৎসরমিতি গোরেক দেশস্থ পয়স: কৃৎস্নব‍ৎপ্রয়োগ:”
    এককথায়, এর অর্থ হলো, বেদে “গো” শব্দটি দিয়ে গোরুর দুধকে বোঝানো হয়েছে এবং সংস্কৃত “তাদ্ধিত” নিয়মে এই অর্থ করা হয়েছে।
    কাজেই এটা পরিস্কার, আর্যরা মোটেও গোমাংসভোজী ছিলেন না। আর্য ঋষিরা এবং আর্যরা যা খেতেন তা হলো, গোরুর দুধ এবং যা ছিল বেদের ব‍্যাখ‍্যায় তাঁদের কাছে “অমৃততুল‍্য।”
    আমাদের পরম্পরাগত চিরাচরিত সংস্কার সেকথাই প্রমাণ করছে আজও।
    দেবাদিদেব শিবের বাহন হলো ষাঁড়। গাভী দেবী ভগবতী হিসেবে পূজিতা। আজও প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে বাঙালির গৃহস্থ বাড়িতে গোয়াল পুজো হয়। এছাড়াও দুর্গাপুজোর পর হয় “গোরু বাঁধনা” উৎসব। “বাঁধনা” মানে গৃহস্থের গো-সম্পদকে বেঁধে রাখার উৎসব। গর্ভবতী গাভী বাদে এদিন সব গোরুর গায়ে আতপ চাল ও গেরি পাথর ঘষে সাদা-গেরুয়া ছাপ দেওয়া হয়। বাড়িতে রাখা মাপের জন্য ব‍্যবহৃত ধাতুর তৈরি পোয়া দিয়ে এই ছাপ দেওয়া হয়।
    শিবমন্দিরে শিবের উদ্দেশ্যে এখনো ষাঁড় মানত করে ছেড়ে দেওয়ার রীতি রয়েছে।
    এছাড়া প্রাচীনকালে আমরা বিভিন্ন গ্রন্থে হরিণ শিকারের কথা পাই। চর্যাপদে হরিণ শিকারের কথা আছে।
    পাহাড়পুর ও ময়নামতীর পোড়া মাটির ফলকে শিকারজীবি শবর পুরুষ ( যাদের পেশা ছিল শিকার ) হরিণ শিকার করে কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে, এই ছবি দেখা যায়।
    (-তথ্যসূত্র: বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদি পর্ব : ড: নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ, কলকাতা, সপ্তম সংস্করণ, ফাল্গুন ১৪১৬, পৃ:৪৪৬)। কিন্তু কোথাও গো-বধের উল্লেখ দেখা যায় না।

    আর বেদ অপৌরুষেয়, কারো জন্মলব্ধ সৃষ্ট নয়। বেদের মন্ত্রগুলিও কাল্পনিক নয়, ঋষিদের তপস্যালব্ধ ফল। তাই এবার বিদেশি কুকুর ফেলে দেশি ঠাকুর ধরার সময় এসেছে আমাদের।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here