আর্যরা অনুপ্রবেশকারী নন, ভারতের ভূমিপুত্র এবং হরপ্পা সভ‍্যতা আর্য সভ‍্যতারই অঙ্গ।

    1
    Aryans are not outsiders

    Last Updated on


    —উত্তম মণ্ডল

    আর্যরা বিদেশি নন, ভারতীয় এবং হরপ্পা বা সিন্ধু সভ‍্যতাও দ্রাবিড় সভ‍্যতা নয়, এটিও ভারতের বৈদিক সভ‍্যতার অঙ্গ। আজ সেই আলোচনায় আসছি।
    সাগরপার থেকে ব‍্যবসা করতে এসে ব্রিটিশরা একদিন গোটা ভারতের শাসক হয়ে বসেছিল। বণিকের মানদণ্ড দেখা দিয়েছিল রাজদণ্ডরূপে। আর তারপর অনুপ্রবেশকারী ব্রিটিশরা ভারতের ইতিহাসে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে ম‍্যাক্সমূলারকে ব‍্যবহার করে ঢুকিয়ে দেয় আর্য অনুপ্রবেশতত্ত্ব। অথচ ভারতের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং বিদগ্ধ পণ্ডিত বালগঙ্গাধর তিলক তাঁর লেখক “আর্টিক হোম অব্ দ‍্য বেদস্” গ্রন্থে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বলেছেন, আর্যরা বিদেশি নন, তাঁরা এই ভারতেরই মাটির সন্তান, কেউ কান দেয়নি সেকথায়। ব্রিটিশের হাতে তামাক খেতে অভ‍্যস্ত এদেশের ঐতিহাসিকরাও ম‍্যাক্সমূলারকেই অভ্রান্ত বলে ধরে নিয়েছেন। অধ্যাপক জেকোবি ( Jacobi ) অবশ্য তিলককেই সমর্থন করেছেন। বালগঙ্গাধর তিলক এবং অধ্যাপক জেকোবি জ‍্যোতিষ গণনা করে দেখিয়েছেন, ভারতের বৈদিক সভ‍্যতা হচ্ছে মহেঞ্জোদড়ো এবং হরপ্পা সভ‍্যতার চেয়ে অন্তত দু’হাজার বছর আগের। তাই বলা যায়, সিন্ধু সভ‍্যতা মোটেই দ্রাবিড় সভ‍্যতা নয়, এটি অবশ্যই বৈদিক সভ‍্যতারই অঙ্গ।
    এতদিন আমাদের বলা হয়েছে, স‍্যার জন মার্শালের ব‍্যাখ‍্যা ” মহেঞ্জোদড়ো” শব্দের অর্থ —“মৃতের স্তূপ।” কিন্তু ভাবুন তো, কেউ কি নিজের জন্মভূমির নাম “মৃতের স্তূপ” অর্থাৎ “প্রেতপুরী” রাখে ? তাই স‍্যার জন মার্শালের তত্ত্ব তাঁর নিজের কল্পনা মাত্র এবং তা কখনোই বাস্তবসম্মত নয়। তাই মহেঞ্জোদড়ো কখনোই “মৃতের স্তূপ” নয়।
    আবার স‍্যার মর্টিমার হুইলার এবং ম‍্যাকে (Mackky) লিখছেন, বিদেশি আর্যরা ভারতে ঢুকে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদড়ো নামে “পুর” বা নগরকে ইন্দ্র ধ্বংস করেছিলেন এবং তাই তাঁর নাম “পুরন্দর।” কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, বৈদিক অর্থ আর আক্ষরিক অর্থ এক নয়। তাই এক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। “পুরন্দর” শব্দের বৈদিক অর্থ হলো, হরপ্পা-মহেঞ্জোদড়োর সভ‍্যতা।
    “মহেঞ্জোদড়ো” শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো, “মহা-ইঞ্জ-দড়ো।” সংস্কৃত ভাষায় “ইঞ্জ” ধাতুর অর্থ হলো, নির্দেশ বা সংকেত দেওয়া। আর “দড়ো” শব্দের অর্থ, দুর্গ। এখনো বাংলা ভাষায় “দড়ো” বা “দড়” শব্দ শক্ত বা কঠিন অর্থে ব‍্যবহৃত হয়ে আসছে। যেমন, সে কাজে বেশ “দড়।”
    কাজেই “মহেঞ্জোদড়ো” শব্দের অর্থ হলো, সেনাছাউনি বা দুর্গ। ঋগ্বেদের ৪র্থ ও ৬ষ্ঠ মণ্ডলে আমরা আর্যদের দুই বিবদমান গোষ্ঠীর মধ্যে একটা ভয়ংকর যুদ্ধের কথা পাচ্ছি। যুদ্ধটা হয়েছিল যজ্বাবতী নদীর তীরে হরিয়ূপীয়া নামক স্থানে। এই যুদ্ধে আর্যপক্ষের সেনানায়ক ছিলেন চায়মান। অন্যদিকে, বিরোধীপক্ষ দাসদের সেনাপ্রধান ছিলেন বর্চিনদাস। এই বর্চিনদাসের ব‍্যুহে ছিল ১ লক্ষ ৫ জন সৈন্য।

    আরও পড়ুন :শালি ধান, শালি ব্রাহ্মণ ও ধানলক্ষ্মীর পাঁচালী

    ব‍্যূহের অগ্রভাগে ছিল বরশিখ বংশোদ্ভূত ৩ হাজার দুর্ধর্ষ বৃচিবন যোদ্ধা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্য সেনাপতি চায়মানের শতঘ্নী ও সূমী অস্ত্রের আক্রমণে বৃচিবনরা ভাঙা মাটির পাত্রের মতো ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ঋগ্বেদের পাতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি তার বিবরণ :
    “এতত‍্যক্ত ইন্দ্রিয়মচেতি যেনাবধীর্বরশিখস‍্য শেষ:।
    বজ্রস‍্য যত্তে নিহতস‍্য শুষ্মাৎস্বনাচ্চিদিন্দ্রপরমো দদার ।।
    বধীদিন্দ্রো বরশিখস‍্য শেষোহভ‍্যাবর্তিনে চায়মানয় শিক্ষন্ ।
    বৃচীবতো যদ্ হরিয়ূপীয়ায়াম হন্ পূর্বে অর্ধে ভিয়সাপরো দর্তন।।” –ঋগ্বেদ ৬/২৭/৪,৫
    এখানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধটা হয়েছিল যজ্বাবতী নদীর তীরে হরিয়ূপীয়া নামক স্থানে।
    এখন প্রশ্ন, কোথায় এই হরিয়ূপীয়া ?
    সংস্কৃত “যজ্ব” শব্দের প্রতিশব্দ হলো “হ্ব-র”, যার অর্থ স্রোত। আর এই অর্থে যজ্বাবতীর নাম “হ্বরবতী” এবং বর্তমানে তা থেকে “ইরাবতী।” ভূগোল থেকেও আম‍রা দেখতে পাচ্ছি, এই ইরাবতীর পশ্চিম তীরেই ব‍র্তমান মন্টগোমারী জেলায় আবিষ্কৃত হয়েছে হরপ্পা নগরীর ধ্বংসাবশেষ। এলাকার অধিবাসীরা এখনো এই হরিয়ূপীয়াকে “হরপ্পা” বলেন।
    সুতরাং, বলা যায়, সিন্ধু সভ‍্যতা বা হরপ্পা সভ‍্যতা বৈদিক সভ‍্যতারই অঙ্গ।
    বাল গঙ্গাধর তিলকের পর শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানান, আর্য ও অনার্যরা একই জনগোষ্ঠীর লোক। অবনীন্দ্রনাথ বলছেন, “জন্মায় না মানুষ একেবারেই ঋষি হয়ে, আগে বর্বর তারপর অনেকগুলো অবস্থা অতিক্রম করে তবে তো আর্যাবস্থা ! এক-ই মানুষ যেমন জাগার আগে ঘুমিয়ে থাকে, আজকের ক্রিয়াকর্মে পটু ছেলে একদিনের অকর্মণ্য শিশু অবস্থায় যেমন পড়ে আছে দেখছি, তেমনি এই সমস্ত অকর্মা তারা যে কর্মঠ ব্রতক্রিয়াশীল অন্যব্রত এবং আর্যদের একটা আদিম অবস্থার কথা জানায় না, তাই বা কে বলবে ! ঘুমন্ত, অর্ধ জাগরিত এবং জাগ্রত এই তিন অবস্থা সম্পূর্ণ নিশ্চেষ্ট, অপেক্ষাকৃত ক্রিয়াশীল এবং পরিপূর্ণ ক্রিয়াবান–এই নিয়মে সব দেশের সব মানুষ-ই উন্নতির পথে এগিয়েছে, ভারতবর্ষের আর্যগণের বেলাতেও যে এ নিয়মের ব‍্যতিক্রম হয়নি, সেটা ধরে নিতে পারি। ছেলেটা অকৃতকর্মা, পড়লে না, শুনলে না, সংসার পাতলে না—-আর এক ভাই সংসার পাতলে, অফিসে গেলো, রোজগারী হল এবং আর এক ভাই সে প্রচণ্ড চিন্তাশীল মহাপুরুষ ঋষি হয়ে বসলো। একটি পরিবারের মধ্যে সহোদরে-সহোদরে এই পার্থক্য যখন স্বভাবের নিয়মে ঘটতে দেখি, তখন এক-ই জাতির কেউ পেলে আর্য আখ্যা, কেউ পেলে অন্যব্রত, কেউবা অকর্মা দস্যু ইত্যাদি বদনাম—-এতে আশ্চর্য হবার কি আছে !”
    —বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী, আর্য ও অনার্য শিল্প : অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রূপা, ৩য়, সং, জানুয়ারি ১৯৮৩, পৃ: ২৮০-২৮৯.
    অবন ঠাকুরের কথাতেও আমাদের ম‍্যাক্সমূলারের ঘোর কাটেনি। এরপরেও কোনো কোনো ভারতীয় পণ্ডিত বললেন, আর্যরা বিদেশি নন, তাঁরা এই ভারতের মানুষ, সম্পূর্ণ এদেশীয়। দিল্লিতে ১৭/১২/১৯৯৪-এ অনুষ্ঠিত বিশ্ব প্রত্নতত্ত্ব সম্মেলনে বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলেছিলেন, আর্যরা ভারতীয়।
    খবরটি বেরিয়েছিল “দ‍্য স্টেটসম‍্যান” পত্রিকায়, ১৮/১২/১৯৯৪.
    মূল লেখাটি এখানে তুলে দিচ্ছি :

    আরও পড়ুন :আর্যরা বিদেশ থেকে আসেনি। হিন্দুরাই আর্য, বলতেন স্বামীজী


    Indo-Aryans were indigenous, claim experys
    NEW DELHI, Dce. 17. —
    Shifting the focus from the established theory that the Indo-Aryans were invaders from Central Asia, a new set of experts stress that they were indigenous, comprising local groups that flourished between 1500 to 1200 B.C., reports UNI.
    Attemping to disprove established paradigms, a crosssection of scholars headed by Dr. S.P. Gupta argue that none of the Central Asian cultures of that period had ever crossed the Indus river or the now dried-up Saraswati.
    Archaeology is the main tool that scholars use in attempting to disprove the “Myth of the Aryan Invasion.” Archaeology can trace the history of the dipersal of a culture from one place to another more accurately, Dr. Gupta said during the recently-concluded World Archaeology Congress here.
    The scholars argue that in stead of coming in waves from Central Asia, there were repeated emigrations outside, stemming from a combination of ecological and political disturbances, says Dr. S. R. Rao and Dr. N. S. Rajaram.
    The massacre of the Indus-Saraswati people at Mohenjodaro by the Aryans has been termed a “myth” by Mr. G.F. Dales.
    The same applies to the hypothesis that fortied towns like Harappa were torn down
    Therefore, the archaeologists have found no links between the numerous cultures prevalent prior to the Aryan settlement on the Indus plains and the Central Asian cultures.”
    — The Sunday Statesman, December 18, 1994, Page 16.
    এরপরেও এদেশের ঐতিহাসিকদের ঘুম ভাঙেনি। এরপর সম্প্রতি আরেকটি তথ্য আমাদের হাতে এসেছে, সেটি হলো ডি এন এ পরীক্ষার রিপোর্ট।
    হরপ্পা সভ‍্যতার মানব কংকালের ডি এন এ পরীক্ষায় জানা গেছে, আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে আসেনি এবং এখানে আক্রমণও করেনি। আর এখানকার চাষবাস মধ‍্য প্রাচ‍্য থেকে আমদানি করতে হয়নি। বহু আগে থেকেই হরপ্পাবাসীদের চাষবাস জীবিকা ছিল।
    এই দলের গবেষকরা হলেন দক্ষিণ ভারতের ডেকান কলেজের উপাচার্য অধ্যাপক ড: বসন্ত আচার্য, লক্ষ্মৌর বীরবল সাহানী ইনস্টিটিউট অব্ পালেওসায়েন্সের গবেষক নীরাজ রাই, হাভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ভি. এম. নরসিংহম, নাদিন রোল‍্যাণ্ড, ডেভিড রেক এবং হাভার্ড ও ম‍্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব্ টেকনোলজির গবেষক নিক পিটারস্।

    আরও পড়ুন :নালন্দা ধ্বংসকারী,বঙ্গবিজয়ী বখতিয়ার,কামরূপে ব্যর্থ কেন


    ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তাঁরা গবেষণা চালিয়েছেন। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো মহিলার দেহাবশেষের জিনগত পরীক্ষা করেছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, ভাষাগত পরীক্ষার মাধ্যমে হরপ্পা সভ‍্যতার সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় না। এই বিষয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষাও ঠিকভাবে হয়নি। এই প্রথম আর্য সভ‍্যতার জীবাশ্মের ডি এন এ পরীক্ষা করে গবেষণাটি চালানো হয়েছে।
    এই পরীক্ষার পর গবেষকদের দাবি, বৈদিক যুগের মানুষ হরপ্পা জাতির-ই অন্তর্ভুক্ত। চাষবাসও ভারতের বাইরে থেকে আসেনি। চাষবাসের প্রচলন থাকায় হরপ্পার মানুষদের মধ্যে ক্রমশই কমে এসেছিল যাযাবর বৃত্তি। ভারতের পূর্ব থেকে পশ্চিমে গিয়ে আর্যরাই গড়ে তুলেছিল হরপ্পা সভ‍্যতা।
    (–তথ্যসূত্র : জি মিডিয়া ব‍্যুরো, ০৭/১১/২০১৯)
    ফিরে যাচ্ছি ঋগ্বেদের বিশিষ্ট ভাষ্যকার যাস্ক‍্যর কাছে। যাস্ক‍্য বলছেন, “আর্য” মানে “ঈশ্বরপুত্র।” মানুষ মাত্রই ঈশ্বরপুত্র। পিতার আজ্ঞাবাহী, সদাচারপরায়ণ ব‍্যক্তিই হলেন “আর্য।” অতীতে ভারতের নাম ছিল “আর্যাবর্ত।” এই আর্যাবর্তে বসবাসকারী মানুষেরাই “আর্য।” পরে আর্যাবর্ত বলতে উত্তর ভারতকে বোঝানো হতে থাকে। ঋগ্বেদ ( ১০/৬৫/১, ৯/৬৩/৫, ১/৫১/৮), গৌতম ধর্মসূত্র ( ১৯/৯৬), বাল্মীকি রামায়ণ ( ১/১/১৬), মহাভারতের আদি পর্ব ( ৪০/৭), গীতা (২/২) এবং ধম্মপদে (২৭০/৫) সদাচারী ব‍্যক্তিকে “আর্য” বলা হয়েছে।
    সুতরাং, ভারতের আর্যরা এদেশে বিদেশি এবং অনুপ্রবেশকারী, ব্রিটিশদের তৈরি এই ধারণা অপ্রমাণ। বরং আর্যরা এই ভারতবর্ষের-ই ভূমিপুত্র, একথা নতুন করে ভাবতে হবে আমাদের। আর নতুন করে লিখতে হবে সে ইতিহাস।

    1 COMMENT

    1. খুবই সুন্দর লেখা,ততোধিক সুন্দর তথ্যসংগ্রহ।তোমার এই প্রয়াস অব্যাহত থাকুক।আরো লেখো।তোমার শেষাংশের লেখাটির অংশবিশেষের সংগ্রহ আমার কাছে আছে।সেটা ফেসবুকে শেয়ারও করেছিলাম।বছর খানেক আগে।যাই হোক তুমি চালিয়ে যাও।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here