অরণ্যের অধিকার: ভাঁওতা প্রতিশ্রুতি ও জেরবার বনবাসী

    0

    Last Updated on

    নীলাঞ্জন কুমার

    বনবাসীদের বনাঞ্চলে থাকার কিংবা অরণ্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার জঘন্য চক্রান্ত যেভাবে চলছে , তাতে খুব শিগগিরই তাদের অস্তিত্ব যে চরম বিপর্যয়ের মুখে তা নিয়ে খুব একটা কেউ ভাবিত বলে মনে হয় না। উপজাতি অন্তর্ভুক্তদের ক্ষেত্রে বসবাসের বিষয়ে যদিও থাকার বাধা নেই কিন্তু তফশিলিরা সমস্যায় পড়েছেন। ২০০৬ সালের অরণ্য অধিকার আইনের বিধি অনুযায়ী ৭৫ বছর অর্থাৎ তিন পুরুষ ওখানে বসবাস করতে হবে তাদের। ফলে বনাঞ্চলের অধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ জটিলতা দেখা যাচ্ছে। আরো জটিলতা সৃষ্টি করেছে রাজনৈতিক দলগুলি।আমরা দেখতে পাচ্ছি যে তফশিলিরা বনাঞ্চলে বসবাসের আবেদন জানিয়েছেন তাদের বহু আবেদন বাতিল করে হয়েছে। সেক্ষেত্রে এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেকের বেশি আবেদনপত্র বাতিল হয়েছে। এখানে ৯৫,৯৫৮টি আবেদনের মধ্যে বাতিল ৫০,২৮৮ টি অর্থাৎ প্রায়৫২%।

    সাম্প্রতিক সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের প্রধান প্রধান দলগুলোর মধ্যে বি জে পি, কংগ্রেস , সিপিএম ও পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তাহার গুলি যদি দেখা হয় তবে আদিবাসী স্বার্থে সিপিএম বাদে বাকি সকলে ‘ ধরি মাছ না ছুঁই পানি ‘ ভাবে দায় সেরেছে । সিপিএম তফশিলি উপজাতি চ্যাপ্টারে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার মধ্যে প্রথমত , তফশিলি উপজাতিদের জমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া , সমস্ত বেআইনি দখলিকৃত জমি উদ্ধার। ব্যবসার সুবিধার নামে ‘লার’ আইনের যে সংশোধনী তা বাতিল করা। যে আইনে ব্যবসার খাতিরে সম্মতি ছাড়াই আদিবাসীদের জমি অধিগ্রহণ করা যায়। দ্বিতীয়ত, বনাঞ্চল বেসরকারিকরণের জন্য তৈরি জাতীয় বনাঞ্চল নীতি প্রত্যাহার এবং আদিবাসীদের সুরক্ষা করে নতুন নীতি প্রণয়ন। তৃতীয়ত, বনবস্তি মানুষের অরণ্যের অধিকার আইন পুরোপুরি লাগু করা এবং১৯৮০ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে আদিবাসী ও বনবাসী দের উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করা। বসবাসের এলাকা থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ বন্ধ করা। যা বনবাসীদের স্বার্থে বিশেষ অনুকূল। তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তাহার বলছে , আমাদের অরণ্য আইনটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সেখানে অরণ্যবাসী মানুষ ও আদিবাসীদের স্বার্থরক্ষার বিপুল প্রয়োজন। কংগ্রেসের ইস্তাহারে আছে , অরণ্য আইন ও বন দপ্তরের ভূমিকার পরিবর্তনের এবং এই প্রক্রিয়ায় বনবাসী ও স্থানীয় মানুষদের অংশগ্রহণ ও সম্পদ বন্টনের প্রতিশ্রুতি। বি জে পি জানিয়েছে , বনবাসী ও আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু তারা বনবাসীদের যে ব্যাপক উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কায় দিন গোনার ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত।

    বনবাসী নিয়ে সি পিএম ইস্তাহারে যে গূঢ় আলোচনা করা হয়েছে তা যদি ফলপ্রসূ করা যেত তবে হয়তো আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা মিটতো। এ লোকসভা নির্বাচনে তারা যে জাতীয় ক্ষেত্রে লুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে তার ফলে এদের প্রতিশ্রুতি যে জলে যাবে তা বলা বাহুল্য। তবে দীর্ঘ ৩৪ বছর (১৯৭৭ – ২০১১) ধরে তাদের পশ্চিমবঙ্গ শাসনে যদি রাজ্যের ক্ষমতা অনুযায়ী তারা আদিবাসীদের স্বার্থরক্ষা নিয়ে সচেতন থাকতো তবে এ রাজ্যের জঙ্গল মহলে তারা লুপ্ত হতো না। সে সময়ও দেখেছি নির্বিচারে চোরা শিকার , বৃক্ষ নিধন , করাতকলের রমরমা , জিন্দালের মতো শিল্পপতিকে শালবনিতে বনসংরক্ষিত জমি দেওয়া কারখানার জন্য। আহা, তখন যদি তাদের এমন সুমতি হতো! তৃণমূল যেহেতু তাদের সাম্প্রতিক দলীয় বিপর্যয় নিয়ে বিশেষ ব্যস্ত তাই তারা গদি বাঁচাতে বেশি মনোযোগ দেবে। কংগ্রেস কোনদিন আদিবাসীদের স্বার্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করেনি এখনও করবে না। বিজেপিও একই পথের পথিক।

    বাম সরকার আমলে পশ্চিমবঙ্গে ‘জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট’ স্কিম হয়েছিল। তার কিছু নিয়ম নীতি আছে। যেমন বনবাসীরা কমিটি গঠন করে বন বিভাগের বনকর্মীদের সঙ্গে বন পাহারা দেবে আর কাঠ নিলামের সময় সে কমিটি ভালো ভাগ পাবে। তা দিয়ে বনবাসীদের উপকার হবে। এছাড়া নব্বই দশকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনির আড়াবাড়ির জঙ্গলের জন্য আন্তর্জাতিক পল গেটি পুরস্কারের অর্থমূল্যের সুদ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র ছাত্রীদের অর্থ সাহায্য করা হত, এখন তা চুলোয় গেছে। জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি পরে কার্যত সিপিএম বন কমিটি হয়ে বনবাসীদের ভোটে ব্যবহার করা হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল মন্ত্রীসভার প্রথম বনমন্ত্রী হিতেন বর্মন রাজ্যের বন দপ্তর সল্টলেকের অরণ্য ভবনে এসে আধিকারিক ও কর্মীদের সঙ্গে এক মিটিংয়ে সর্বসমক্ষে এই দপ্তরকে ‘চোর দপ্তর’ বলেন। যা পরের দিন ‘বর্তমান’ সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশিত হয়।
    জামশেদপুরে টাটা কারখানা যখন তৈরি হয় তখন আদিবাসীদের বাস্তুহারা হতে হয়েছিল। তারা প্রতিরোধ করেছিল কিন্তু তৎকালীন বিহার সরকার তা কড়া হাতে দমন করে। শুধু কি তাই , ২০০৫ সালে ছত্রিশগড় সরকার বাইলাডিলায় ৭০০০ কোটি টাকার এসার স্টীল ও লোহান্ডিগুডায় ১০০০ কোটির টাটা স্টীল কারখানার জন্য মউ সই করে। এই দুই এলাকার বনবাসীদের উৎখাতের জন্য দুই শিল্পপতির স্বার্থে ‘সালওয়া জুদুম’ ( শুদ্ধিকরণ অভিযান) শুরু হয়, যে অভিযানের নেতা মহেন্দ্র কর্মা। তারা জঙ্গল ফাঁকা করার জন্য বিভিন্ন কায়দাকানুন শুরু করে। চলে গ্রামকে গ্রাম পোড়ানো , ধর্ষণ, লুটপাট। শেষমেশ গ্রামবাসীরা মাও বাদীদের সাহায্য চায়। তাদের প্রতিরোধে দুটি প্রকল্প বানচাল ও সালওয়া জুদুম ব্যর্থ হয়।
    এ কথা সত্য যে বনবাসীদের উৎখাত করে হাজার হাজার একর জমি জঙ্গল পাহাড় খনিজ সম্পদ লুঠ করা হচ্ছে। এ সব বিষয়ে ওয়াকিবহাল মহলের ভাসা ভাসা বক্তব্য মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। বনবাসীর কাছে ফায়দা তোলার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন করে। বনবাসী যেমন কে তেমন রয়ে যায়। দু টাকার চাল , শাসক দলের নেতার পায়ে ধরে একশো দিনের কাজের মধ্যে কয়েক দিনের কাজ ছাড়া কিছুই জোটে না। অশিক্ষিত গরীব গুর্বো মানুষগুলোকে কে পথ দেখাবে তা কেউ জানে না। ভাবতে অবাক লাগে, এ দেশের মিডিয়া যতখানি রাজনৈতিক হত্যালীলা , নির্বাচনের এক্সিট পোল , জয় হিন্দ , জয় শ্রী রাম তরজা ছাপতে ও বৈদ্যুতিন সম্প্রচার করতে উৎসাহী তার এক শতাংশ বনবাসীদের সমস্যা নিয়ে তুলে ধরেনি। বনবাসীদের উৎখাতের সমস্যা নিয়ে কোন চ্যানেল টক শো করেনি, কারণ তাতে টি আর পি উঠবে না। ‘ দিদি ছাড়া কাউকে ভয় পায় না ‘ মার্কা দু:সাহসিক এ রাজ্যের মিডিয়া বুঝতে চায় না বনবাসীদের হালচাল।
    সারা ভারতে রাজনৈতিক দলগুলির গরিষ্ঠাংশ মানুষ শক্তের ভক্ত নরমের যম। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ মিডিয়াও তাই। আর আমার আপনার মতো মানুষ বনের সৌন্দর্য দেখতে যাই ট্যুরিস্ট হিসেবে। ব্যস, এটুকুই আমাদের কাজ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here