আমরা কারা? ভদ্রলোক । দাবীটা কী ? বাঁচতে চাই

    0

    Last Updated on

    সম্বরণ চট্টোপাধ্যায়

    এই আন্দোলন কি শুধুই ডাক্তারদের? আমার আপনার নয়? একটু গভীরে গিয়ে ভেবে দেখুন তো!
    আমরা, অর্থাৎ শিক্ষি ত ভদ্রলোকেরা যারা কোন না কোন বৌদ্ধিক পেশার সঙ্গে যুক্ত, তা সে চাকরি হোক বা ব্যবসা, বা কোন স্বাধীন জীবিকার দ্বারা পরিবার প্রতিপালন করছি, বৃদ্ধ মা বাবা, স্ত্রী, সন্তানের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য পালন করছি, এ লড়াই কী তাদের সবার নয়?

    বুঝতে পারছেন না তো!

    বেশ, আপনি তো স্কুল শিক্ষক, আপনাকে কখনো কেউ শাসায় নি? বড়লোক কিম্বা বড়নেতার ছেলেকে পরীক্ষায় ফেল করানোর জন্য?

    আর এই যে উকিল মশাই, আপনাকে কিনতে না পারলে কি ধরনের কথা শুনতে হয়? “বৌদি ভাল আছে তো! পরশু সন্ধ্যেবেলা দেখলাম মুখার্জি পাড়ায়, একটু সাবধানে চলাফেরা করতে বলবেন, দিনকাল তো ভাল না, বুঝলেন কিনা, আচ্ছা চলি এখন, আরেকবার ভেবে দেখবেন।” কী, শোনেননি? মনে পড়ছে?

    আর ইঞ্জিনিয়ার দের কথা আর কী বলব!

    সোজা কথায়, বেঁচে থাকতে গেলে বিক্রি আপনাকে হতেই হবে। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, লোভে হোক বা ভয়ে।
    কী বললেন? আপনি বিক্রি হননি? হয় আপনি মিথ্যা বলছেন, কিম্বা আপনি যার অধীনে কাজ করেন সে বিক্রি হয়ে গেছে, অথবা আপনি বিক্রি হননি বলে শান্তিতে নেই। আপনি চরম ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আর এগুলোর কোনটাই না হলে জানবেন আপনি নির্বোধ, তাই বিনা পয়সাতেই বিক্রি হয়ে গেছেন, বুঝতেই পারছেন না।

    যাক গে, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। মোটকথা আমরা শিক্ষিত বাঙ্গালী সম্প্রদায়, যারা অর্থনৈতিক ভাবে স্বনির্ভর আর সমাজে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাইছি, তারা কেউ ভাল নেই। আমরা প্রতিনিয়ত মরে বেঁচে আছি।

    আমরা ভয় পাই কেন? আমাদের গায়ে কি জোর নেই? আমরা কি গালাগাল জানি না? আমরা বোম ছুঁড়লে কি ফাটবে না? তবে? আমরা ভয়ে ভয়ে কেন বেঁচে আছি?
    তা নয় আসলে ব্যাপারটা।
    আমরা ভীত মূলত দুটো কারণে, এক, আমাদের পরিবার, হ্যাঁ, পরিবারের সুরক্ষা আমাদের কাছে একটা বিরাট বড় কারন।
    তাই আমরা প্রতিবাদ করতে ভয় পাই, এগিয়ে যেতে ভয় পাই, মুখ খুলতে ভয় পাই।
    হ্যাঁ, এরজন্য আমাদের কাপুরুষ বলা হয়, মেরুদণ্ডহীন বলা হয়, সুবিধাবাদী গা বাঁচানো পাবলিক ও বলা হয়। আমরা শুনে যাই, অপমান হজম করি। সবকিছু হজম করেই তো বেঁচে আছি। সেইজন্যেই তো এত হজমোলা বিক্রি হয়। সে যাক গে, তাতে আমাদের কোন আপশোষ নেই। তবু একবার ভেবে দেখবেন আগুনখেকো বিপ্লবীরা, পরিবারগুলো না বাঁচলে জাতি বাঁচে কী?

    দ্বিতীয় কারনটা হল আমাদের একতার অভাব। আমরা পাশের বাড়ির খবরটাও জানি না। প্রতিবেশীর মেয়েটা হারিয়ে গেলেও আমরা টিভি দেখে জানতে পারি।
    এরজন্য যত গালাগালি আমাদের দেবেন মাথা পেতে নেব।

    এইভাবেই সবকিছু চলছিল। হয়ত এইভাবেই অদূর ভবিষ্যতে একদিন শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিত।
    কিন্তু, ঠিক তখনই ঘটে গেল এক নিঃশব্দ বিপ্লব। হ্যাঁ, সোশাল মিডিয়ার কথাই বলছি। এক পুঁজিবাদী ধনী ব্যবসায়ীর সৌজন্যে ইন্টারনেট চলে এল সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির সাধ্যের নাগালে। ব্যাস, এরপর যা ঘটতে শুরু করল, তা এক কথায় অভাবনীয়!
    ঢাকা দিয়ে রাখা শাকের তলা থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল একের পর এক সাপ। ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়ল নখ আর দাঁতওয়ালা বেড়াল। প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতনামা ‘বুদ্ধিজীবী’ দের মহান মহান উক্তি ও যুক্তিগুলোকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল সাধারণ ছা পোশা নকুলবাবু কিম্বা অখ্যাত বিশুদারা।

    কয়েক দশক ধরে ‘মহাপুরুষ’দের যে সব অমুল্য ‘বাণী’গুলো এতকাল দক্ষতার সঙ্গে জনগনের মস্তিষ্ক প্রক্ষালন পূর্বক চর্বন করছিল, সেই বাণীগুলো প্রায় রাতারাতি হাসির খোরাকে পরিণত হল। ‘বুদ্ধিজীবি’কূল ব্যাপক খচে গিয়ে বিশুদা, নকুলবাবুদের আক্রমণ করল, কিন্তু কী আশ্চর্য! প্রতিবেশী দেবুদা, যে কিনা বাজারে দেখা হলেও দাঁত বার করত না, সেও কোত্থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশুদাদের পক্ষ নিয়ে। শেষমেশ দেখা গেল ‘বুদ্ধিজীবি’ বাবুটি যুক্তিটুক্তি ভুলে গিয়ে অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছে নকুলদা আর বিশুদাকে আর বিশুদারা ব্যাপক মজা নিচ্ছে। আসলে এই বিশুদা স্কুলশিক্ষক আর নকুলদা সরকারি কর্মচারী। এনারা শিক্ষিত ভদ্রলোক, ওনাদের যথেষ্ট বুদ্ধি আছে কিন্তু ওনারা তথাকথিত বুদ্ধিজীবি নন। তাই ওনাদের কথা, ওনাদের মতামত, এতকাল কেউ শোনেনি। এমনকি ওনাদের পরিবারের সদস্যরাও না। কখনও বউ বলেছে “তুমি বেশী বোঝ? উনি কতবড় ইয়ে তুমি জান? ওনার ভুল ধরছ?” ব্যাস! ফুটো বেলুনের মত চুপসে গেছেন নকুলবাবু। কখনও মেয়ে বলেছে “বাবা, তুমি কিছু জান না, ওনার কত জ্ঞান!” ব্যাস, চুপ হয়ে গেছেন বিশুদা।

    কিন্তু এবার? এবার কি হবে? এখন যে ভরা হাটে সব হাঁড়ি ভেঙে যাচ্ছে! জলের মত পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে কার কত ফান্ডা!
    এ এক নবজাগরণ। একবিংশ শতাব্দীর বাঙালির নবজাগরণ। আর নবজাগরণ হলে বিপ্লব তো হবেই, আন্দোলন তো হবেই!
    যতই ধর্মীয় রঙ বা রাজনৈতিক রঙ লাগানোর চেষ্টা হোক না কেন, সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হবে। এ লড়াই স্বতঃস্ফূর্ত লড়াই, এ লড়াই বাঁচার লড়াই, এ লড়াই আমার আপনার লড়াই, এ লড়াই ভদ্রলোকের সঙ্গে অভদ্রলোকের লড়াই, সামাজিক মানুষের সঙ্গে অসামাজিকতার লড়াই। ইঁটের বিরুদ্ধে কলমের লড়াই। ‘হকিস্টিকে’র বিরুদ্ধে স্টেথোস্কোপ এর লড়াই। অশ্রাব্য গালিগালাজের বিরুদ্ধে যুক্তিপুর্ণ প্রতিবাদের লড়াই। শাসানো ধমকানোর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের লড়াই। দায়িত্বজ্ঞানহীন শক্তির বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল মানুষের লড়াই। অশুভ শক্তি আর শুভশক্তির লড়াই। অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াই।
    আসুন আমরা ওদের শুভকামনা জানাই। ওদের পাশে বসতে না পারি, অন্তত মানসিকভাবে ওদের পাশে থাকি। ওরা যে আমাদের লড়াইটাই লড়ছে! ওরা যে আমাদের হয়েই লড়ছে! ওরা জিতলে যে আমরাও জিতব। আপনি জিততে চান না? বলুন!

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here