শের আলি আফ্রিদি—চাপা দেওয়া ইতিহাসের চমকপ্রদ অধ্যায় !

0

Last Updated on

দেবাশিস লাহা

হাতের উপর মশা। বেশ কয়েকটা। মারবে তারও উপায় নেই। সামান্যতম আওয়াজ মানেই বিপদ ডেকে আনা । সব ভেস্তে যাবে। সারা দিন ধরে অপেক্ষা করছে। পাখি আর ধরা দিচ্ছেনা। মাঝে একবার শুনেছিল লর্ড সাহেব আগে এই দ্বীপ মানে আন্দামানেই আসবেন। কয়েদিদের সুবিধা অসুবিধা, অভাব অভিযোগ সব শুনবেন। তারপর বাকি দ্বীপ ঘুরে দেখবেন। কিন্তু হল তার উল্টো। প্রথমেই গেলেন চ্যাথাম দ্বীপে। পড়ন্ত বেলায় তাঁর আন্দামানের কথা মনে হল। শুনলেন খুব স্বাস্থ্যকর জায়গা। সুন্দর একখান পাহাড়ও আছে। মাউন্ট হ্যারিয়েট। সাহেব বাবাজি সেই যে পাহাড়ে চড়ে বসেছেন, নামার আর নাম নেই। অন্ধকারে মশার কামড় খেয়েই কি সন্ধেটা কেটে যাবে। নেমে যায় বাবা লর্ড মেয়ো। বিরক্ত এবং অধৈর্য শের আলি আরেকবার ছুরিটা দেখে নিল। কিচেন নাইফ হলেও দুর্ধান্ত ধার। মাংস কাটা ছুরি বলে কথা। ধারালো ইস্পাতে আঙুল ঠেকতেই রক্তটা কেমন গরম হয়ে উঠল। চোখদুটো এখনও জ্বলছে । দেখতে দেখিতে পাঁচ বছর হয়ে গেল। আন্দামানে সাজা খাটছে।সেই ১৮৬৭ সাল থেকে। এত বছর পরে পোর্ট ব্লেয়ারে একটা মনের মত সন্ধে ! শুধু আর একটু অপেক্ষা ! পাহাড়ে যখন একবার উঠেছ, নামতে তোমাকে হবেই বাবাজীবন ! আর নামলে এই পথ দিয়েই যেতে হবে। একবার বাগে পেলে—ওই তো পায়ের শব্দ ! তিনি আসছেন, তিনি আসছেন, তিনি আসছেন! ভাইসরয় সাহেব আসছেন —
ডান হাতের মুঠোটা আপনা থেকেই শক্ত হয়ে গেল। শরীর জুড়ে শিহরণ। ওই তো ! বেশ কয়েকজন । অন্ধকার চিরে চাঁদ। ভরা পূর্ণিমা না হলেও জোছনার হাল্কা একটা আভা। কিন্তু লর্ড মেয়ো কোন লোকটা? পেছনের সাহেবটি আচমকা দাঁড়িয়ে পড়তেই আড়াল সরে গেল! ওই তো! — না, কোনো সন্দেহ নেই। ছবিতে যেমন দেখেছে৷শক্ত পোক্ত চেহারা, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল– পোশাক, ইউনিফর্ম – না আর এক মুহূর্ত দেরি নয় ! পাথরের আড়াল থেকে একটা ছায়া ছুটে গেল। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির দশাসই অবয়ব। পিঠ ভেদ করে প্রায় ফুসফুস ছুঁয়ে ফেলল ধারালো ছুরিটা। একবার দুবার –গভীর থেকে আরও গভীরে ! ফিনকি দিয়ে রক্ত ! হৈ হৈ করে ছুটে এল প্রহরী, রক্ষী ! হাতে নাতে ধরে ফেলল ! ছায়াটা একবারও পালানোর চেষ্টা করলনা। বরং পোজ মেরে ছবি দিল। শের আলি ! আন্দামানের কারাগারে বন্দী “বিপ্লবী” শের আলি আফ্রিদি ! ভাইসরয় রিচার্ড সাউথওয়েল বোর্ক, সিক্সথ আর্ল অফ মেয়ো ওরফে লর্ড মেয়োর দুঃসাহসী হত্যাকারী ! ক্যালেন্ডারে অনুসারে সেদিন ৮ই ফেব্রুয়ারি, ১৮৭২ !

তারপর আর কি! বিচারপর্ব। শের সিং আফ্রিদি এমনিতেই যাবজ্জীবন কারাবাসের আসামি। আর এই হত্যাকান্ড তো চোখের সামনেই ঘটেছে। ডজন ডজন সাক্ষী। বড়লাট বলে কথা। ভারতের সর্বাধিনায়ক। ব্রিটিশ শাসক ছেড়ে কথা বলবে নাকি! এখন হলে গণধালাই দিয়েই খতম করে দেওয়া হত। বিশেষ করে যখন ডজন খানেক সেন্ট্রি আশেপাশেই ছিল। হাজার হলেও সভ্য জাত। এক মাস ধরে বিচার চলল। লর্ড মেয়োকে হত্যার অপরাধে ১৮৭৩ সালের ১১ই মার্চ শের আলিকে ফাঁসিতে ঝোলানো হল। “অত্যচারী, বিদেশী ব্রিটিশ শক্তির প্রতিভূ” লর্ড মেয়োকে হত্যা করে বীরের মৃত্যু বরণ করলেন মহাবীর “বিপ্লবী” শের আলি আফ্রিদি ! পোর্ট ব্লেয়ারের মাউন্ট হ্যারিয়েট ন্যাশনাল পার্ক সাক্ষী হয়ে থাকল বিরলতম এক বীরত্বের, অনন্যসাধারণ সাহসের ! ভারতবাসী হিসেবে গর্বে বুক—

আরে দাঁড়ান ! বুক, পেট আপাতত খালিই রাখুন ! আমার মনে কিন্তু প্রশ্ন জাগছে। বেশ বড়সড় প্রশ্ন। আপনার মনে জাগছেনা ? আলবাত জাগছে। নেতাজী, বিনয়, বাদল দিনেশ, মাস্টারদা সূর্য সেন, রাসবিহারী, বাঘা যতীন এঁদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। চুনোপুঁটি জেলা শাসক কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়েও ক্ষুদিরাম প্রফুল্ল চাকির সাহস, দেশপ্রেম বীরত্ব নিয়ে স্কুল পাঠ্য ইতিহাসে যে আলোচনা, চর্চা হয়, ভারত অধিপতি মহা পরাক্রমশালী লর্ড মেয়োর ভবলীলা সাঙ্গ করেও শের আলি আফ্রিদিকে নিয়ে কেন এর একবিন্দুও আহা আহা হলনা ? স্কুল পাঠ্য না হয় বাদই দিলাম এদেশের ইতিহাসে শের আলি আফ্রিদি নামক “বিপ্লবীটির” কোনো উল্লেখই নেই। আলোচনা চর্চা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, মাল্যদান এসব তো দূরের কথা ! কী ব্যাপার বলুন তো ! কেমন যেন একটা খটকা লাগছেনা ! বিশেষ করে যখন প্রায়ই কথা ওঠে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা নেই বললেই চলে, বিশেষ করে অগ্নি যুগের বিপ্লবী অর্থাৎ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে এই ধর্মটির প্রতিনিধিত্ব করেন এমন একজনও পাওয়া যায়না। এমতাবস্থায় শের আলি আফ্রিদির মত এমন দুঃসাহসী “বিল্পবী” পেয়েও তাকে নিয়ে একটি শব্দও খরচ করা হলনা কেন ? এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে ! স্বাধীনতার পর নেহেরু-আজাদের নেতৃত্বে যে বাম ইসলামিক ভাষ্যের অবতারণা, সেখানে তো শের আলির মত “বিপ্লবী”কে নেতাজী, মাস্টারদার মাথার উপর বসিয়ে স্যালুট ঠোকার কথা। অথচ বেমালুম চেপে দেওয়া হল ! কেন বলুন তো ! উত্তর খুব সোজা। কারণ শের আলি আফ্রিদি আদৌ স্বাধীনতা সংগ্রামী অথবা ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকির মত বিপ্লবীও ছিলেননা। তবে কে ছিলেন এই শের আলি ? নিশ্চয় বলব। তার আগে আসুন দেখে নিই কে ছিলেন এই শের আলি আফ্রিদি ? কী তাঁর পরিচয় ? পেশাই বা কী? আন্দামানেই বা তিনি কী করছিলেন ? আসুন আগে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজি !

শের আলি আফ্রিদির জন্ম তৎকালীন খাইবার প্রদেশের পেশোয়ারে। অর্থাৎ বর্তমান পাকিস্তান। তিনি পাঞ্জাব মাউন্টেড পুলিশে কিছুদিন কাজ করেন। পেশোয়ার কমিশনারের আপিসেও তিনি কিছুদিন কাজ করেছিলেন। এর আগে শের আলি আম্বালা স্থিত অশ্বারোহী বাহিনীতেও নিযুক্ত ছিলেন । ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অধীনে প্রেসিডেন্সি আর্মিতেও কিছুদিন কাজ করেন [১৮৫৭ সালের ঘটনা]। পরবর্তীকালে তিনি মেজর জেমস নামক এক ব্রিটিশের অধীনে অশ্বারোহী হিসেবে কাজ করেন। তারপর মালিক বদলে চলে আসেন রেনেল টেলরের কাছে। আর্দালি হিসেবে। এখানে কর্মরত থাকাকালীন তিনি একটি খুন করে বসেন। পারিবারিক কলহের ফলশ্রুতিতে হায়দার নামের এক আত্মীয়কে হত্যা করেন। গ্রেপ্তার হন। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন। ১৮৬৭ সালের ২রা এপ্রিল মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হয়। আবেদনের ভিত্তিতে সেটি অবশ্য যাবজ্জীবন কারাবাসে বদলে যায়। আর এই কারাবাসের শাস্তি ভোগ করার জন্য তাঁকে আন্দামানে নিয়ে আসা হয়। যেখানে বিপ্লবী থেকে শুরু করে খুনী, ডাকাত সবাইকেই রাখা হত। কারণ ব্রিটিশরা এক্ষেত্রে কোনো ফারাক করতনা। খুনী, ডাকাত, বিপ্লবী সবাইকেই এক চোখে দেখা হত। একই ব্যবহার করা হত। রাজনৈতিক বন্দী বলে ভিন্ন কোনো সমাদর ছিলনা।

এবার নিশ্চয় বোঝা গেল শের আলি আফ্রিদি আর যাই হোন, বিপ্লবী ছিলেন না। সাধারণ অপরাধী ছিলেন। খুনের শাস্তি ভোগ করতে দ্বীপান্তরিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কী ! যে দেশে গান্ধীকে মহাত্মা বানানো হয়, জহরলালকে যুগপুরুষ, সেখানে একটু এদিক ওদিক করে শের আলিকে মহা বিপ্লবী বানানো যেত না ? না, যেতনা ! তাতে ঝুঁকি ছিল ! ঝোলা থেকে এখন যে বেড়ালটা বেরিয়েছে, সেটা সত্তর বছর আগেই বেরিয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিসের বেড়াল ? পড়তে পড়তেই বুঝে যাবেন। আসুন এবার জেনে নিই ছুরিকাঘাতের পর লর্ড মেয়ো কি বলেছিলেন ? তিনি কি সঙ্গে সঙ্গে মারা গিয়েছিলেন নাকি চিকিৎসা চলাকালীন ? এবিষয়ে প্রামাণ্য তথ্যের জন্য হেলেন জেমস রচিত THE ASSASSINATION OF LORD MAYO: THE ‘FIRST’ JIHAD? গ্রন্থটির শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় নেই। ডক্টর হেলেন জেমস অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধীনে Department of Anthropology, College of Pacific and Asian Studies বিভাগের এসোসিয়েট প্রফেসর। এই বইটি কেন গুরুত্বপূর্ণ সেবিষয়ে পরে আসছি। আসুন দেখে নিই তিনি কি লিখছেন। নিচের উদ্ধৃতিটি এই বই থেকেই। বার্ন [Burne] সাহেব যিনি এই অপরাধের তদন্ত করেছিলেন এবং বিশদ, বিস্তারিত রিপোর্টও দিয়েছিলেন, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নিম্নলিখিত পর্যবেক্ষণটি রেখেছেন।

The Viceroy ran a few paces forward, and fell over the pier into some shallow water to the left. We left the assassin and ran to his help whilst struggling in the water, and assisted him out. At that particular moment, we had no idea he had been mortally or seriously hurt, for he helped to raise himself from the water, and had his senses fully about him. When lifting him up, however, I saw, for the first time, that he was bleeding copiously. He said, “Burne, they have hit me”, he walked firmly, felt his shoulder and said “I don’t think I am much hurt.” We laid him on a kind of platform or cart that was near at hand on the pier, but no sooner had we done so, than matters became serious, and blood began to flow rapidly. We did our utmost to bind up his terrible wounds. For a moment we discussed the advisability of sending for a Medical Officer from Chatham Island, or taking the Viceroy off to the ship. The Viceroy faintly said, “Take me to the ship.” We immediately lifted him up, assisted by the sailors, and carried him to the boat. The last words that he spoke were, “Lift up my head,” which he said twice whilst we were carrying him [THE ASSASSINATION OF LORD MAYO: THE ‘FIRST’ JIHAD? পৃষ্ঠা সংখ্যা ১৫]

ইংরেজি তর্জমা—
“[ছুরিকাহত] ভাইসরয় সাহেব কয়েক পা দৌড়ে গেলেন এবং জেটির পাটাতনের উপর থেকে অগভীর জলে পড়ে গেলেন। আমরা হত্যাকারীকে ছেড়ে তাঁর সাহায্যে ছুটে গেলাম। জল থেকে তুলে আনলাম। সেই মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারিনি তিনি এমন প্রাণঘাতী আঘাত পেয়েছেন। জল ছেড়ে ওঠার ব্যাপারে তাঁর নিজেরও সক্রিয় ভূমিকা ছিল এবং তিনি রীতিমত সজ্ঞানেই ছিলেন। উপরে তোলার সময় আমিই প্রথম লক্ষ করলাম প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তিনি আমাকে বললেন, “বার্ন, ওরা আমাকে আঘাত করেছে!” এই বলে তিনি বেশ দৃঢ় পায়েই কিছুটা হাটলেন, জানালেন, “মনে হয়না আমার আঘাত খুব গুরুতর!”

আলোচনার স্বার্থে এই অনুবাদটুকুই যথেষ্ঠ। [তিনি কিভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, বাকি অংশে সেই বিবরণই আছে]
এই অনুচ্ছেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্য,
মেয়ো সাহেব বলছেন, “বার্ন, ওরা আমাকে আঘাত করেছে।”

“ওরা” বলতে কারা ? হ্যাঁ এখান থেকে রহস্য ঘনীভূত। কারণ মেয়ো সাহেবের হত্যাকারী তো একজন। ইতিমধ্যে আমরা তাঁকে চিনেও নিয়েছি। তাঁর নাম শের আলি আফ্রিদি। তবে লর্ড মেয়ো কেন “ওরা” শব্দটি উচ্চারণ করলেন ? এখান থেকে কি পরিষ্কার হচ্ছে না শের আলি একা এই অপরাধটি করেননি ? তাঁকে সাহায্য, সহায়তা করার জন্য আরও এক বা একাধিক ব্যক্তি ছিল ? আলবাত ছিল ! এবং লর্ড মেয়ো সেকথা জানতেন। কারণ একক চেষ্টায় এধরনের হত্যাকান্ড ঘটানো অসম্ভব। কিন্তু “ওরা” কারা ?

এই কোটি টাকার প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু পিছিয়ে গেলেই হবেনা, সমসাময়িক ব্রিটিশ সরকারের গোপন নথী, দলিল দস্তাবেজও কিঞ্চিৎ ঘেঁটে দেখতে হবে। লর্ড মেয়োর সম্মানীয় সহযোগী ডেপুটি রবার্ট নেপিয়ার স্পষ্ট জানিয়েছেন এই “ওরা” হল ওয়াহাবি মুসলমান যারা জিহাদি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল সমগ্র ভারত জুড়েই কম বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। আন্দামান যাত্রার অব্যবহিত পূর্বে লর্ড মেয়ো যে চিঠি লিখেছিলেন সেখানেও এব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের দলিল দস্তাবেজ থেকে জানা যাচ্ছে ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহের সময়েও তারা যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। এই বিদ্রোহের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাই ওয়াহাবি জিহাদের অনুগামী ছিলেন। মৌলবি লিয়াকত আলি থেকে শুরু করে দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ প্রত্যেকের লক্ষ্যই ছিল ভারতকে আবার ইসলামি শাসনের অধীনে নিয়ে আসা। মেয়ো হত্যার তদন্তে রবার্ট নেপিয়ার স্পষ্ট জানিয়েছেন, “I believe it was an act of fanaticism, probably connected with the Wahabee organization “ (

বাংলা তর্জমা—আমি বিশ্বাস করি এটি [মেয়ো হত্যা] ধর্মীয় উগ্রতার ফসল,যা সম্ভবত ওয়াহাবি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
( Assassination of Lord Mayo –পৃষ্ঠা ক্রম ৬)
কিসের উপর নির্ভর করে নেপিয়ার একথা বললেন ? লর্ড মেয়োর চিঠি, গোপন ব্রিটিশ দস্তাবেজ ছাড়াও আরও কোনো প্রমাণ বা তথ্য? আসুন দেখে নেওয়া যাক।

১] লর্ড মেয়ো যেদিন আন্দামান সফরে আসেন, অর্থাৎ ১৮৭২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি, সেখানে শের আলি সহ মোট সাত হাজার কয়েদি ছিল। আর এই কয়েদিদের মধ্যেই ছিল বেশ কয়েকজন কুখ্যাত ওয়াহাবি নেতা, যেমন মোহম্মদ জাফর, ইয়াহিয়া আলি এবং মৌলবি আহমেদুল্লাহ ! ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহের সময় এবং প্রাক্বালে এরা পাটনা এবং দিল্লির বিভিন্ন মসজিদ থেকে জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। সিপাহি বিদ্রোহের পর এমন আটজনের বিচার করা হয়। বিচারে মৃত্যুদণ্ড হলেও যাবজ্জীবন কারাবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কারণ ব্রিটিশ সরকার ভেবেছিলেন মৃত্যুদণ্ড তাদের শহিদে পরিণত করবে। এই সব শহিদদের সামনে রেখে জিহাদি আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। মোহম্মদ শফি নামক এক ওয়াহাবি নেতা [যিনি এই আন্দোলনের অন্যতম ফাইনান্সার ছিলেন] প্রাণ বাঁচানোর জন্য রাজসাক্ষী হয়ে যান। তাই এই ষড়যন্ত্রের পর্দা উন্মোচন সহজসাধ্য হয়। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। শের আলি আফ্রিদির সঙ্গে এই ওয়াহাবি নেতাদের যোগাযোগ কোনভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায়না।

২] বিচার চলাকালীন শের আলি বারবার জানিয়েছেন আল্লার নির্দেশেই তিনি একাজ করেছেন এবং একাজে আল্লাই তাঁর সহযোগী । শুধু তাই নয়, তিনি বার বার বলেছেন ভাই আবদুল্লাহ তাঁকে অনুপ্রেরণা, মনোবল এবং সাহস যুগিয়েছেন। কিন্তু কেই এই আবদুল্লাহ ? একজন জিহাদি যিনি বিচারক নরম্যানকে হত্যা করেছিলেন। উঁহু অবাক হবেননা। ব্রিটিশ আমলে এমন অনেক জিহাদি কর্মকান্ড পাঠ্যপুস্তক থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। শের আলিকে জিজ্ঞাসাবাদের নথিটিতে জিহাদ শব্দটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। ১৮৫৩ সালেও এমন একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। ১০ই সেপ্টেমবর পেশোয়ারের কমিশনার কর্নেল ফ্রেডারিক মেকসনও এক মুসলিম ঘাতকের হাতে প্রাণ দেন। এক্ষেত্রেও ছুরি ব্যবহার করা হয়েছিল। হত্যাকারী একটি পিটিশনের বাহানায় তাঁর আপিসে প্রবেশ করে। আক্রমণের চার দিন পর মেকসনের মৃত্যু হয়। আর আবদুল্লাহ [যে মহান ব্যক্তিটি শের আলিকে অনুপ্রাণিত করেছিল] বিচারক নরম্যানকে হত্যা করেন ১৮৭১ সালের ২০শে সেপ্টেমবর। একই কায়দায়। কলকাতা হাইকোর্টের Acting Chief Justice নরম্যান সাহেব তখন টাউন হলের সিঁড়ি ভাঙছিলেন। এই সময়ই তাঁকে পেছন থেকে ছুরি মারা হয়। লর্ড মেয়োর মতই ভাল মানুষ ছিলেন এই বিচারক নরম্যান। ভাইসরয় মেয়ো এই হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। তদন্তে পরিষ্কার আবদুল্লাহ নামে শের আলির কোনো সহোদর অর্থাৎ নিজের ভাই বিচারক নরম্যানকে হত্যা করেনি। ভাই বলতে শের আলি ধর্মীয় ভাই , মুসলিম ব্রাদারহুডকেই বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ জিহাদি আবদুল্লা তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। এই তথ্যই জিহাদি যোগটিকে আরও পরিষ্কার করে দিচ্ছে।

৩] কলকাতা থেকে আন্দামান যাত্রা করার আগেই লর্ড মেয়ো একটি প্রতিজ্ঞা এবং সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। কী সেই প্রতিজ্ঞা? ওয়াহাবিদের তিনি কঠোর হাতে দমন করবেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অনেকেই একথা জানতেন। হেলেন জেমসও সেকথা উল্লেখ করেছেন। মেয়োর আন্দামান নিকোবর সফর কোনো গোপন কর্মসূচী ছিলনা। রীতিমত ঘোষিত কার্যক্রম। কয়েদি থেকে আধিকারিক সবাই জানতেন। ভাইসরয়কে তাদের সমস্যা, দাবি জানাবেন বলে অনেকেই অপেক্ষাতে ছিলেন। লর্ড মেয়োর প্রতিজ্ঞা এবং সিদ্ধান্তের কথা কি জিহাদিদের কানে পৌঁছে গিয়েছিল ? তাই পোর্ট ব্লেয়ারে পা রাখতে না রাখতেই তাঁকে শেষ করে দেওয়া হল ?

৪] কেউ কেউ ব্যক্তিগত প্রতিশোধের তত্ত্ব দিয়েছেন। সেটি কেমন ? হায়দার হত্যার [যে জ্ঞাতিকে হত্যার কারণে তাঁকে আন্দামানে সাজা ভোগ করতে পাঠানো হয়েছিল] বিচার চলাকালীন শের আলি নাকি নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাই প্রতিশোধ হিসেবে তিনি লর্ড মেয়োকে হত্যা করেন। বলাই বাহুল্য এটি হাস্যকর যুক্তি। কারণ বিচারের সময় সব অপরাধীই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে। দ্বিতীয়ত, প্রতিশোধই যদি একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, তিনি শুধু মেয়ো সাহেবকেই বেছে নিলেন কেন ? ভাইসরয়ের পেছনে থাকা সুপারিনটেন্ডেন্ট অনেক সহজ শিকার ছিলেন। অথচ এতজন ব্রিটিশের মধ্যে শের আলি লর্ড মেয়োকেই বেছে নিলেন। তাও রাতের অন্ধকারে। সুদূর আন্দামানে বসে তিনি লর্ড মেয়োকে চিনলেন কি করে ? ১৮৬৭ সাল থেকে তিনি কারাবাস করছেন। উত্তর খুব সোজা। লর্ড মেয়োকে কেউ চিনিয়ে দিয়েছিল। নইলে শের আলির পক্ষে তাঁকে চিনে নেওয়া সম্ভব ছিলনা। আরও বড় প্রশ্ন তিনি তাঁর সেল বা কারাকক্ষ থেকে বাইরে বেরোলেন কি করে ? বন্দীর তো কারাগারেই থাকার কথা ! কে বা কারা তাঁকে এই সুযোগ করে দিয়েছিল ?

৫] ভাইসরয় মেয়োর মত একজন সর্বোচ্চ প্রশাসক পরিদর্শনে আসছেন, অথচ উপযুক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকবেনা এমন হয় নাকি ! যথেষ্ট নিরাপত্তার বন্দোবস্ত ছিল। সেই ব্যবস্থা সন্তোষজনক ছিল বলেই লর্ড মেয়োকে আন্দামান সফরের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল। কেমন ছিল সেই ব্যবস্থা ? সুপারিন্টেনডেন্ট-এর দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল স্যার ডোনাল্ড স্টুয়ার্ট লর্ড মেয়োর জন্য নিম্নলিখিত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিলেন। হেলেন জেমস-এর বইটি থেকেই উদ্ধৃতি দেওয়া যাক।
That the convicts should all be kept at their ordinary work, and that petty officers in charge should see that no one was permitted to leave his gang. A detachment of free Police, armed with muskets, was to move with the Governor General’s party in front, flank, and rear; and on Viper and Ross [Islands], where the worst characters are quartered, detachments of Native Infantry were in support of the Police, who had instructions to allow no one to approach His Excellency. [THE ASSASSINATION OF LORD MAYO: THE ‘FIRST’ JIHAD? পৃষ্ঠা ক্রম ৯]
বাংলা তর্জমা—
কয়েদিদের দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যস্ত রাখা হবে।অধস্তন অফিসাররা নজর রাখবেন যাতে তারা নিজেরদের দল, এলাকা ছেড়ে বেরোতে না পারে। মাস্কেট হাতে সশস্ত্র পুলিশবাহিনী গভর্নর জেনারেলের সঙ্গী হবে। ভাইসরয় এবং তাঁর অনুচরবর্গকে সামনে, পেছনে, পাশে অর্থাৎ চারিদিকে পাহারা দেওয়াই তাদের কাজ হবে। আর ভাইপার এবং রস দ্বীপে যেখানে সবচেয়ে জঘন্য চরিত্রের কয়েদিদের রাখা হয়েছে, সেখানে পুলিশকে সাহায্য করার জন্য থাকবে পদাতিক বাহিনী। পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ভাইসরয়ের কাছাকাছি যাতে কেউ আসতে না পারে। ডেপুটি রবার্ট বার্ন সাহেব লিখছেন-

Major General Stewart explained to me that he had taken every proper precaution; that he had caused guards to be posted at each locality, as well as an armed body of Police and Chuprassis to accompany the Viceroy. The Viceroy was quite satisfied at what had been done, and I myself felt every confidence in General Stewart’s arrangements for his safety, making no addition to them beyond warning the Staff present to keep their eyes open during the day, and as a matter of precaution to keep near the Viceroy in order to obviate any chance of possible danger to him. [THE ASSASSINATION OF LORD MAYO: THE ‘FIRST’ JIHAD? পৃষ্ঠা ক্রম ৯]
সংক্ষিপ্ত বাংলা তর্জমা—
মেজর জেনারেল স্টুয়ার্ট আমাকে জানিয়েছেন সব রকম সাবধানতা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় প্রহরী মোতায়েন করা হয়েছে। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং চাপরাশির দল ভাইসরয়ের পাহারায় থাকবে। ভাইসরয়ও এই বন্দোবস্তে সন্তোষ জানিয়েছেন। আমি নিজেও মেজর স্টুয়ার্টের ব্যবস্থাপনায় আত্মবিশ্বাসী। যথাযথ এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে আমি আর কিছু সংযোজন করার দরকার মনে করিনি। আধিকারিকদের চোখ কান খোলা রাখতে বলেছিলাম, যাতে অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

কী ভাবছেন ? আপনার অনুমান সঠিক। ৮ই ফেব্রুয়ারী, ১৮৭২ সাল, সন্ধে সাতটার সময় লর্ড মেয়োর উপর যখন শের আলি ঝাঁপিয়ে পড়ল তখন এসব নিরাপত্তার নাম গন্ধ ছিলনা। মেজর স্টুয়ার্ট বর্ণিত security measures এর ছিটেফোঁটাও যদি সেই সময় হাজির থাকত, লর্ড মেয়োকে এভাবে মরতে হতনা। নৌকোতে অপেক্ষমান সহধর্মিনীর কাছে পৌঁছানোর আগেই তাঁকে চলে যেতে হল। কী ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন তো ? আমিও পাচ্ছি। হেলেন জেমসও পেয়েছেন। তাই তাঁর পুস্তিকার ভূমিকাতেই এই আশংকা ব্যক্ত করেছেন। এত নিরাপত্তার কথা বলা হলেও কেন এই শিথিলতা ? এই হত্যা নিছক দেশীয় বিষয় নাকি আন্তর্জাতিক শক্তির যোগ আছে ? সে বিষয়ে কেন যথাযথ তদন্ত করা হলনা !

দেড়শ বছর আগে যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন ছিল, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে দাঁড়িয়ে হয়ত তত দুরূহ নয়। জিহাদের নামে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু যেমন দেখছি, ইসলামকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ পূরণের নমুনাও কম চোখে পড়ছেনা। সমসাময়িক ব্রিটিশ প্রশাসনেও কি ওয়াহাবি / জিহাদিদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ? এদের শক্তি, প্রভাব ইত্যাদি সম্পর্কে আমরা এখন অনেক বেশি খবর রাখি। ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কেউ কি জিহাদি শের আলিকে ব্যবহার করেছিলেন ? নাকি ব্রিটিশ শাসকদের একাংশ ওয়াহাবি/ জিহাদি শক্তিকে মদত দিয়ে চলেছিল ? গোপন দলিল দস্তাবেজে জিহাদ শব্দটির বার বার উল্লেখ থাকলেও এই চরম বিপদের বিষয়টি তাঁরা কখনও জন সমক্ষে আনেননি। এনিয়ে কখনও আলোচনা, চর্চা ইত্যাদিও সামনে আসেনি। এত জন ব্রিটিশ আধিকারিক জিহাদি হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও কেন এই নীরবতা ? লর্ড মেয়ো তো একক শিকার নন। তাঁর আগে মেকসন, নরম্যান ! তবু কেন এই নীরবতা ? একটি কারণ সামনে আসছে। ব্রিটিশরা চাননি, এই ওয়াহাবিরা শহিদের মর্যাদা পান। তাই ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। কারণটি বিশ্বাসযোগ্য ? দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ শাসকের সেবক উচ্চ পদাধিকারীরা জিহাদিদের শিকার হবেন, আর তাঁরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখবেন ? যথাযথ তদন্ত পর্যন্ত করবেন না ?

মাত্র ৪৯ বছরেই এমন নৃশংসভাবে খুন হওয়া লর্ড মেয়ো লর্ড ক্লাইভ বা ওয়ারেন হেস্টিংস-এর মত অসৎ ঘরানার শাসক ছিলেননা। ট্রিনিটি কলেজ অফ লণ্ডন থেকে পড়াশোনা করা এই সুশিক্ষিত মানুষটি জীবনের একাধিক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সফল ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনেও রক্ষণশীল টোরি দলের উল্লেখযোগ্য মুখ হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৬৯ সালে ভারতের চতুর্থ ভাইসরয় নিযুক্ত হন। তাঁর অবদানও রীতিমত উজ্জ্বল। দেশের সীমানা মজবুত করা থেকে শুরু করে সেচ কার্য, রেল পরিষেবা, অরণ্য সংরক্ষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাঁর প্রভূত অবদান। তাঁর সময়েই ১৮৭২ সালে ভারতে প্রথম জন্মগণনা হয়। প্রাচ্যের এটন বলে পরিচিত [“Eton of India”] অনন্য স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন আজমীঢ়ের মেয়ো কলেজ তাঁরই অবদান। এটিই এদেশের প্রথম পাবলিক বোর্ডিং স্কুল।

এহেন কৃতী একজন প্রশাসককে এভাবে চলে যেতে হল কেন ? ব্রিটেনের রক্ষণশীল দলের প্রতিনিধি লর্ড মেয়ো ওয়াহাবি/ জিহাদি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এটিই কি তাঁর মৃত্যু ডেকে আনল ? বিরোধী লেবার পার্টি কি তাঁর ওয়াহাবি বিরোধী অবস্থান মেনে নিতে পারেনি ? ওয়াহাবি জঙ্গীদের প্রতি তাঁদের কি গোপন সমর্থন ছিল ? ইসলামিস্টদের প্রতি লেবার পার্টির দুর্বলতা যে একেবারে নতুন নয়, বিন্দুমাত্র পড়াশোনা করলেই সে চিত্র পরিষ্কার হয়ে যায়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায়, নিরাপত্তা ব্যবস্থার গলদ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, তবে ব্রিটিশরা জিহাদি কার্যকলাপকে কখনও সামনে আনলনা কেন ? জিহাদ শব্দটি গোপন ফাইলেই কেন বন্দী হয়ে রইল ? তাঁরা কি ইসলামিস্টদের উদ্দেশ্যকে আড়াল করতে চেয়েছিলেন? হিন্দু আইডেন্টিটি/ সংস্কৃতি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে জিহাদিদের গোপনে মদত দিয়েছিলেন ? দীর্ঘ দুশ বছরের শাসনে হিন্দু ধর্মের সংস্কার করলেও, ইসলামের কুসংস্কার, কুপ্রথা নিয়ে তাঁদের কোনো হেলদোল ছিল বলে মনে হয়না। জিহাদি দমনে তাঁরা যে যথেষ্ট উদ্যোগী হয়েছিলেন, এমন কোনো নজিরও নেই। খুব বড়সড় নাশকতা, হোমরা চোমরা কেউ খুন না হলে তাঁরা আদৌ কোনো ভূমিকা নিতেন বলে মনে হয়না। ইসলামকে কি তাঁরা [ব্রিটিশ শাসকদের একাংশ] আব্রাহামিক দোসর বলে মনে করতেন ? পরবর্তীতে যাতে এই ধর্মটিকে সুবিধামত ব্যবহার করা যায় ! তবে তো দূরদৃষ্টির প্রশংসা করতেই হবে। জিন্নাকে যেভাবে মাথায় তোলা হয়েছিল, দখলদার ইসলামি শক্তিকে যেভাবে patient hearing দেওয়া হয়েছিল, সবই তো পরিকল্পনা মাফিক !

কিন্তু স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই মেয়ো হত্যা এবং হত্যাকারীকে নিয়ে বিশেষ কোনো আলোচনা হয়না কেন ? এমন চাঞ্চল্যকর একটি অধ্যায় নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা, হেলদোল নেই কেন ? স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের “কত বড় অবদান ছিল” বলতে বলতে চেঁচাতে চেঁচাতে বোঝাতে বোঝাতে যারা গ্লাসের পর গ্লাস জল খেয়ে থাকেন, সেই মার্ক্সবাদী বামপন্থীরা ভুলেও শের আলি আফ্রিদির নাম নেন না ? অথচ এমন দুঃসাহসী একটি চরিত্রকে সহজেই মুসলমান “বিপ্লবী” তকমা দিয়ে বিনয় বাদল দিনেশকেও ম্লান করে দেওয়া যেত ! না, বুদ্ধিমান বামেরা সে পথে হাঁটেননি। কী দরকার বাবা ! কেঁচো খুঁড়তে যদি সাপ বেরিয়ে পড়ে। হা হা হা ! আসলে তাঁরাও তো জানেন জিহাদ এবং জিহাদি কোনো নতুন শব্দ নয়, হিন্দুত্ববাদীদের মনগড়া বস্তুও নয়, ব্রিটিশদের divide and rule পলিসির ফসলও নয়। ইসলামের জন্মলগ্ন থেকেই সে ছিল, আছে, থাকবে। লর্ড মেয়োর হত্যাকারীকে নিয়ে নাড়াচাড়া করলে বিপদ আছে ! স্বাধীন ভারতের স্বাধীন জনতাও জেনে যাবে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড অথবা মাউন্টব্যাটনের দরকার পড়েনা, ১৮৬০/ ৭০ সালেও এদেশে ওয়াহাবি জঙ্গী ছিল এবং তারা বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ পদাধিকারীকে হত্যাও করেছিল ! লর্ড মেয়োকেও ছাড়েনি !
ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারকে ফিরিয়ে দেওয়া নেহেরু-আজাদ কি এই সত্য ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রচার করবেন ? শান্তির ধর্মের অসম্মান হবে না ?
তাই ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকিরা ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করলেও, শের আলি আফ্রিদি অন্ধকারেই থেকে যান। বলা ভাল অন্ধকারে রাখা হয়। এমনটাই রণকৌশল! আবহমান রণ নীতি!

কিন্তু শের আলি? তার কি আদৌ মৃত্যু ঘটেছে? ওই দেখুন একটা ছায়া! পাথরের আড়ালে কেমন ওঁৎ পেতে আছে।ডান হাতে শানিত ছুরি বাঁ হাতে নৃশংস কালাশনিকভ! সময়ের সারণি থেকে অন্য রকমের লর্ড মেয়ো খুঁজে নিচ্ছে তার গনগনে চোখ। সে অপেক্ষা করছে। নেতাজি, ক্ষুদিরাম, বিনয় বাদল দীনেশ, মাস্টারদাকে হটিয়ে দিয়ে ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠাই সে একদিন দখল করে নেবে। জ্বলজ্বলিয়ে উঠবে তার নাম — শের আলি আফ্রিদি!

কখন? কবে? হা হা হা! ভাবুন, ভাবা প্র‍্যাকটিস করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here