সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক ওরফে “ দুধ দেওয়া গরু ” ?

0

Last Updated on

দেবাশিস লাহা

এক কান কাটা ব্যক্তি অক্ষত কানটিকে জনসমক্ষে রাখিয়া অতি সাবধানে পথ চলে, দুই কান কাটা বুক ফুলাইয়া গটগট করিয়া হাঁটিয়া যায়—বাঙ্গালা ভাষায় এইরূপ একটি প্রবাদ অদ্যাপি বিদ্যমান। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মহাশয়া এতদিন প্রথম ভূমিকাটিই [অর্থাৎ এক কর্ণ কর্তিত হইয়াছে এইরূপ বিকলাঙ্গ] পালন করিয়া আসিয়াছেন। বলাই বাহুল্য এখানে “এক কান কাটা” বাগধারাটি আক্ষরিক কর্ণ কর্তনের অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। ইহা নির্লজ্জ অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে। এক কান কাটা অর্থাৎ যাহার কিঞ্চিৎ লজ্জা এখনও অবশিষ্ট আছে। সে অক্ষত কানটিকেই জনসমক্ষে প্রকাশ করিয়া নিজেকে সুস্থ, স্বাভাবিক প্রমাণ করিতে তৎপর হইয়া ওঠে। কিন্তু যাহার দুটি কর্ণই ঘচাং ফু হইয়া গিয়াছে তাহার আর আত্মমর্যাদা, গৌরব কিছুই হারাইবার নাই। চরমতম নির্লজ্জ হইয়া প্রকাশ্যে দাপাদাপি করিতে তাহার কণামাত্রও দ্বিধা হয়না। রাশি রাশি সাংবাদিকের সম্মুখে “ যে গরু দুধ দেয়, তার লাথি খাওয়া উচিত” এই অমৃতবানীর উচ্চারণ যে মাননীয়ার দুই কান কাটা হইয়া ওঠার হাতে গরম দৃষ্টান্ত হইয়া উঠিবে এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আয়োজিত ইফতার ভোজে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে তাঁহার এই সদর্প মন্তব্য রাজ্য তথা দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করিল তা চরম আহাম্মকেও বুঝিবে ! কী সেই মাত্রা ? কোন প্রেক্ষিতে তিনি এই চরমপন্থী পর্যবেক্ষণটি প্রকাশ করিলেন ? রাজ্যের সর্বোচ্চ আসনে বিরাজ করিয়া একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে “দুধ দেওয়া গরুর” সহিত তুলনা করা যে কতটা বিভেদ এবং বিদ্বেষকে প্রশ্রয় দান করিতে পারে তাহা সহজেই অনুমেয়। একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য তথা দেশে এই জাতীয় রাজনীতি মেরুকরণের দানবটিকে যে আরও বহুগুণ শক্তিশালী করিয়া তুলিবে তাহা বলাই বাহুল্য। কারণ “দুধ দেওয়া গরু”র মাধ্যমে তিনি স্পষ্টতই মুসলমান সম্প্রদায়টিকেই ইঙ্গিত করিয়াছেন। বক্তব্যে পরিষ্কার যে এই সম্প্রদায়টিই তাঁহাকে দুধ প্রদান করে । কীরূপ দুগ্ধ ? ইহা যে ননী, মাখ্‌ পরমান্ন প্রস্তুতের দুগ্ধ নহে তাহা উন্মাদেও বুঝিবে। তবে এই দুগ্ধ কি ? কেন ভোটদুদ্ধ ! হ্যাঁ এই দুগ্ধটির অমৃত সমান স্বাদ মাননীয়ার জিহ্বায় ক্ষমতার শিহরণ তোলে ! গোণোতান্ত্রিক থুড়ি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ইহার মূল্য যে কত অপরিসীম তাহা পাগলেও বোঝে ! তবে কী দাঁড়াইল ? মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী কি এই সম্প্রদায়টিকে গরু নামক এক দুগ্ধপ্রদানকারী চতুষ্পদের সহিত তুলনা করিয়া বসিলেন না ? গরুর লাথি খাওয়া উচিত হইলেও মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে এই জাতীয় পর্যবেক্ষণ কি চরম অনুচিত হইলনা ?
প্রশ্ন উঠিবে ইহা আবার নূতন কি ঘটিল ? ক্ষমতায় আসিবার প্রথম দিবস হইতেই তো উনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টিকে ভোট ব্যাংক হিসাবে ব্যবহার করিয়া আসিতেছেন। উহাদের প্রকৃত উন্নতির প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া ইমাম ভাতা, হজ হাউস, মসজিদ নির্মাণ, মাদ্রাসা শিক্ষা ইত্যাদি খাতে বিপুল অর্থের ব্যয় তিনি ক্ষমতা দখলের অব্যবহিত পরেই আরম্ভ করিয়াছিলেন। উহা এখনও একই তীব্রতায় চলিতেছে। বসিরহাট, বাদুরিয়া, হাজিনগর, কালিয়াচক এবং অতি সম্প্রতি ডায়মণ্ডহারবারে হিন্দু মুসলমান বৈরিতায় তিনি কাহাদের পক্ষ গ্রহণ করিয়াছেন তাহাও গোপন নাই। তবে কেন এই মন্তব্যটিকে অভিনব বলিতেছি। কেনই বা ইহা নূতন মাত্রা যোগ করিল ? কারণ সংখ্যালঘু তোষণ করিলেও এতদিন তিনি উহা নিজমুখে স্বীকার করেননাই। Open secret হইয়া উঠিলেও এই তোষণের কথা তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন নাই। তাহাই আজ সদর্পে ঘোষণা করিলেন।

যাহা করিয়াছেন বেশ করিয়াছেন। গরু যে মাননীয়াকেই দুগ্ধ প্রদান করিতেছে তাহা সবাই জানে। পূর্বতন বামপন্থী শাসকদলটিরও এই দুগ্ধে বিশেষ রুচি ছিল। এই দুধ দেওয়া গরুটির অবদানেই মাননীয়া এই নির্বাচনেও এই “চতুষ্পদ অধ্যুষিত” অঞ্চলগুলিতে যেমন ডায়মণ্ডহারবার, বসিরহাট, যাদবপুর তথা কলিকাতার আসনগুলিতে জয়লাভ করিয়াছেন। কিন্তু লাথি মারা কথা উঠিল কেন? মাননীয়ার ভাষায় গরু বলে চিহ্নিত সম্প্রদায়টি তো কেবল দুগ্ধই প্রদান করিয়া চলিতেছে। কখনও লাথি মারিয়াছে কি ? মারিলেও কাহাকে মারিয়াছে ? অথবা মারিবে ? মাননীয়াকে নিশ্চয় নয় ! ইহাতেই অশনি সংকেত দেখিতেছি। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে মাননীয়া নিশ্চিত হইয়া গিয়াছেন এই রাজ্যের হিন্দু মুসলমান এক অনিবার্য মেরুকরণকেই বাছিয়া লইয়াছে। তাঁহার কার্যকলাপের ফলে যে হিন্দুরা মুখ ফিরাইয়া লইয়াছে শত প্রচেষ্টাতেও উহাদের ফিরাইয়া আনা সম্ভব নয়। অথচ হাতে দুই বৎসরও নাই। ২০২১ এর পূর্বেই বিধানসভা নির্বাচন হইলেও বিস্মিত হইবার কিছু নাই। ইতোমধ্যেই আরম্ভ হওয়া দলবদলের হিড়িকটি জ্যামিতিক হারে বাড়িতে পারে। সরকারের পতনও অসম্ভব নহে। ইহা অনুমান করিয়াই কি তিনি এই দুই কান কাটার ভূমিকায় অবতীর্ণ হইলেন ? সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ শতাংশ মানুষের সমর্থন নিশ্চিত করিতে পারিলেই কেল্লা ফতেহ। হিন্দু সম্প্রদায়ের দশ শতাংশ ভোট পাইলেই সব মিলাইয়া ৪০% দাঁড়াইবে যা ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিবার পক্ষে যথেষ্ট।
কিন্তু “দুধ দেওয়া গরুর” লাথিটির অভিমুখ কারা ? সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় নয় তো ? মাননীয়া কি এইরূপ ইঙ্গিত প্রদান করিলেন যে ওঁর প্রিয় “গরুটি” যথেচ্ছ লাথি ছুঁড়িলেও তিনি চুপচাপ মানিয়া লইবেন ? প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন না? ইহার মাধ্যমে কি এই মর্মে কোনো বার্তা বা ছাড়পত্র প্রদান করিলেন—হে “দুধ দেওয়া গরু” তোমরা যত ইচ্ছা লাথি মারিতে পার। আমি কিছুই বলিবনা ! ক্রমবর্ধান মেরুকরণে লাগাম না টানিয়া উহাকে আরও তীব্র এবং ভয়াবহ করিবার এই পন্থা রাজ্যটিকে এক গভীর অন্ধকারের ভিতর ঠেলিয়া দিবে সন্দেহ নাই।
তবু প্রশ্ন একটিই। মাননীয়া যাহাদের “গরু” বলিলেন সেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কি এই বিশেষণটিকে আকুল আনন্দে গ্রহণ করিবে ? ১৪০০ বৎসর পূর্বের রীতিনীতি আঁকড়াইয়া বাঁচিয়া থাকা সম্প্রদায়টিকে বহু দেশ, গোষ্ঠী, রাজনৈতিক নেতা নিজেদের স্বার্থে বারবার ব্যবহার করিয়াছে। ওসামা বিন লাদেন যে আমেরিকার মদত পাইয়াছিল কে না জানে। তবে ব্যবহৃত হইবার ইচ্ছা না থাকিলে কাহাকেও ব্যবহার করা যায়না। এই রাজ্যের মুসলমান সমাজ কি এই বিশেষণটির বিরুদ্ধে গর্জাইয়া উঠিবে ? নাকি পুনরায় ব্যবহৃত হইবার সিদ্ধান্ত লইয়া পাশ ফিরিয়া নিদ্রামগ্ন হইবে ? সময় বলিবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here